সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়: খালেকুজ্জামান

প্রকাশিত: ৭:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২৬

সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়: খালেকুজ্জামান

Manual6 Ad Code
  • রবীন্দ্রনাথ-নজরুল স্মরণে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আলোচনা সভা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১ আগস্ট ২০২৬ : সংস্কৃতি চর্চা ছাড়া গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল—বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা কমরেড খালেকুজ্জামান।

Manual3 Ad Code

তিনি বলেছেন, একটি চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলার অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ওপর ক্রমাগত আক্রমণ চালাচ্ছে। মাজারে হামলা, ভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ, নারীদের ওপর বিধিনিষেধ, বাউলদের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ।

শুক্রবার (২১ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৫টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচার ভ্যানগার্ড মিলনায়তনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিখিল দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন।

Manual2 Ad Code

এতে আরও বক্তব্য দেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহসভাপতি কবি কামরুজ্জামান ভূঁইয়া, আবদুল্লাহ আল মামুন তাজুসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানের শুরুতে ও শেষে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা আবৃত্তি ও গণসংগীত পরিবেশন করেন।

খালেকুজ্জামান বলেন, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যেমন বাঙালির জাতীয় পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় পরিচয়। ফলে সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোনোভাবেই সমাজ ও রাজনীতির প্রভাবমুক্ত নয়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা অনন্য।

তিনি বলেন, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, গানসহ সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অসাধারণ পদচারণা ছিল। তাঁরা কেবল সাহিত্য সৃষ্টি করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; তাঁদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামেরও গভীর যোগ ছিল।

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে খালেকুজ্জামান বলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তিনি রাজপথেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর লেখনীকে প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ব্রিটিশবিরোধী লেখা প্রকাশের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয় এবং তাঁর ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধ করা হয়।

নজরুলের অনশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নজরুল যখন আমরণ অনশন শুরু করেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে চিঠি লিখে অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘Give up your hunger strike, our literature claims you.’ দুই কবির এই পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, তাঁরা শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না; তাঁদের সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও তাঁরা গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

Manual6 Ad Code

খালেকুজ্জামান বলেন, ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও শোষণ থেকে জনগণের মুক্তি আসেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও পুঁজিবাদী শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও লুণ্ঠন অব্যাহত রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো ও নীতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিগত সরকার ভারতের স্বার্থে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং বিপুল ব্যয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো প্রকল্প গ্রহণ করেছে। একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া, স্টারলিংয়ের সঙ্গে চুক্তি এবং মানবিক করিডোর দেওয়ার মতো বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান বিএনপি সরকারও একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলছে।

তিনি বলেন, ‘‘ফলে শাসক পরিবর্তন হলেও শাসন ব্যবস্থা একই রকম আছে।’’

সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গে বাসদ নেতা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল উভয়েই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। অথচ বর্তমানে একটি সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় মদদে কিংবা রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে হামলা ও মব সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। মাজারে হামলা, ভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ, নারীদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাধা, বাউলদের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধকতা তৈরির মতো ঘটনাগুলো এর উদাহরণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তাঁর দাবি, বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও মব সন্ত্রাসের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি এবং অপরাধীদের যথাযথ বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। এর ফলে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো আরও উৎসাহিত হচ্ছে।

খালেকুজ্জামান বলেন, ‘‘এই অপশক্তি ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ’২৪-এর অভ্যুত্থান দিয়ে ঢেকে দিতে চায়। মুক্তিযুদ্ধ হলো জনযুদ্ধ, এটি আমাদের ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের সাম্যের বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত না হওয়ায় শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ’২৪-এর অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। সুতরাং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ’২৪-এর অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’’

সভায় অন্যান্য বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এমন মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে তাঁর ভাবমূর্তি বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। একইভাবে কাজী নজরুল ইসলামকেও সাম্প্রদায়িক কবি হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চলছে।

তাঁরা বলেন, বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনই অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও মুক্তচিন্তার চেতনায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান রেখেছেন। ধর্ম-বর্ণের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মর্যাদা ও সাম্যের পক্ষে তাঁদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আজও সমাজকে পথ দেখায়।

বক্তারা বলেন, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মানুষের চিন্তা, মনন ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের পথ তৈরি করতে হবে।

তাঁরা আরও বলেন, মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ী হওয়া জরুরি। এ সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নতুন প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণার উৎস হতে পারে।

নেতৃবৃন্দ আগামী দিনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিকশিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা বলেন, সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিকল্প ও গণমুখী চর্চা গড়ে তুলতে হবে। সমাজ বিপ্লবের পরিপূরক হিসেবে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তাঁরা সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রগতিশীল জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

আলোচনা সভার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা আবৃত্তি ও গণসংগীত পরিবেশন করেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সামনে রেখে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী ও উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করে।

Manual5 Ad Code