কানাডায় শ্রীমঙ্গলের উষ্ণতায় পনেরো দিন

প্রকাশিত: ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০২৬

কানাডায় শ্রীমঙ্গলের উষ্ণতায় পনেরো দিন

Manual2 Ad Code

প্রকাশ রায় |

কিছু ভ্রমণ কেবল ভ্রমণ নয়—সেগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এক অপূর্ব উপলক্ষ। কিছু দেশ, কিছু শহর কিংবা কিছু প্রবাসী ঠিকানা কেবল মানচিত্রের নির্দিষ্ট কোনো স্থান নয়; সেখানে জড়িয়ে থাকে শৈশব, কৈশোর, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, অভিমান, আড্ডা আর অগণিত মুখের উজ্জ্বল স্মৃতি। কানাডায় আমার এবারের ১৫ দিনের সফরটিও তাই নিছক অবকাশযাপন ছিল না; বরং কয়েক দশক পেরিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রিয় মানুষগুলোর কাছে ফিরে পাওয়ার এক আবেগময় পুনর্মিলন।

জুন মাসের শেষ দিকে আমার স্ত্রী ও পুত্র মা ও ভাইদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে কানাডায় গিয়েছিল। আর আমি গেলাম আগস্টের শুরুতে। বিমানবন্দর থেকে কানাডার উদ্দেশে রওনা হওয়ার ছবি ফেসবুকে দেওয়ার পর যা ঘটল, তা যেন কালবৈশাখীর ঝড়ের মতোই হঠাৎ, প্রবল এবং পরম আন্তরিকতায় ভরা!

একটার পর একটা মেসেজ আসতে শুরু করল ভাই, বন্ধু, স্নেহশীলজন ও প্রিয়জনদের কাছ থেকে। প্রত্যেকটি বার্তা যেন আমাকে কানাডায় পৌঁছানোর আগেই স্বাগত জানিয়ে দিল।

প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সেলিম ভাই লিখলেন—“প্লিজ প্রকাশ, আমাদের সাথে কটি দিন কাটিয়ে যাও।”

প্রিয় ঝুটন-সুমিতের আবদার—“কোন সময় আইয়া লামরায়, দাদা?”

রওনা হওয়ার আগেই প্রিয় আশীষ ও দোলনদার বার্তা—“ওবা, ১৬ আগস্ট শ্রীমঙ্গলের পিকনিকেও থাকবায় কিন্তু!”

বন্ধু অপু ও বৌদির আন্তরিক আমন্ত্রণ—“কোন সময় আইরায়বা? তোমার অপেক্ষায় তোমার বউ-পুত্রদেরও নিমন্ত্রণ দিতে পাররাম না!”

বন্ধু তপনের ছোট্ট অথচ বহুদিনের বন্ধুত্বের উষ্ণতা মাখা প্রশ্ন—“কইবে তুই?”

বিজন নন্দীর নির্দেশ—“তুই কিন্তু আইতে হইবে এবং রাইত থাকবে।”

উজ্জ্বলদার খোঁজ—“আইতাছোইন বুলে?”

উর্মি বৌদির প্রশ্ন—“কবে আইরায়?”

পিনাকীদার আগ্রহ—“কয়টার সময় আইয়া লামবায়?”

এমন আরও অসংখ্য মেসেজ পেতে পেতে বিমানেই যেন মনটা ভারী হয়ে উঠেছিল। কত বছর, কত দূরত্ব, কত ব্যস্ততা—কিন্তু মানুষের আন্তরিক সম্পর্কগুলো যে সময় ও ভৌগোলিক দূরত্বের কাছে হার মানে না, সেই সত্যটি আবারও গভীরভাবে অনুভব করলাম। কানাডার মাটিতে পা রাখার আগেই আমি যেন শ্রীমঙ্গলের পরিচিত গলি, আড্ডা আর আপনজনদের কাছে ফিরে গিয়েছিলাম।

টিম হর্টনসে প্রথম আড্ডা

কানাডায় পৌঁছানোর পর সদাপ্রস্তুত ‘অভ্যর্থনাকেন্দ্র’ যেন অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। আর সেই অভ্যর্থনাকেন্দ্রের ঠিকানা—Tim Hortons।

কানাডায় পা রেখে প্রথম ক্যাফেতে চুমুক দেওয়ার আগেই দেখা হয়ে গেল প্রিয় রিঙ্কুদা, সুকোমলদা, সমীরদা, অরুণদা, অলকদা, ভাস্করদা, অঞ্জনদা, টিটুদা এবং প্রিয় শ্রীমঙ্গলিয়ান আপন মাসুদ, টিংকুসহ আরও অনেকের সঙ্গে।

কত বছর পর দেখা! অথচ মুখোমুখি হতেই মনে হলো, মাঝখানে যেন কোনো সময়ই পেরোয়নি। সেই পুরোনো হাসি, সেই পরিচিত রসিকতা, হাত মেলানো, বুক জড়িয়ে ধরা—সব মিলিয়ে মুহূর্তেই যেন ফিরে গেলাম বহু পুরোনো দিনগুলোর কাছে।

Manual3 Ad Code

প্রবাসে বসবাসকারী মানুষের জীবনে এমন একটি মিলন কতটা মূল্যবান, তা কেবল যারা আপনজন থেকে বহু দূরে থাকেন তারাই বুঝতে পারেন। হাজার মাইল দূরের দেশে একই শহরের মানুষ, একই স্মৃতির মানুষ, একই সংস্কৃতির মানুষ যখন একসঙ্গে বসেন, তখন একটি ছোট্ট ক্যাফেও মুহূর্তের মধ্যে হয়ে ওঠে নিজের শহরের চায়ের দোকান।

তবে এই আনন্দের মাঝেও ছিল একটু অভিমান। আসার আগে না জানানোর কারণে বন্ধু পাপলু বেশ অভিমান করেছিল। শেষ পর্যন্ত উল্টো গালি দিয়েই তার সেই অভিমান ভাঙাতে হলো! বন্ধুত্বের এই অদ্ভুত রসায়নটিও কম মধুর নয়।

প্রবাসে আপনজনের স্নেহ

কানাডার বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন আড্ডা ও অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে অসংখ্য প্রিয় মানুষের সঙ্গে। শ্রদ্ধাভাজন রজতদা, খোকাদা, উত্তমদা, সপুদা, অশোকদা, মিন্টুদাসহ অনেক স্নেহশীল মানুষের সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ হয়েছে।

প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও তাদের আন্তরিকতা আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। কোথাও আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর ছিল না; ছিল শুধু আপন করে নেওয়ার সহজ স্বাভাবিকতা।

কখনো মনে হয়েছে আমি কানাডায় নেই—আমি যেন আবার সেই শ্রীমঙ্গলেই আছি, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল কোনো স্বার্থ ছাড়াই, যেখানে বন্ধুত্ব মানে ছিল একসঙ্গে বসা, গল্প করা, হাসাহাসি করা আর প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো।

অন্টারিও লেকে মাছ ধরার অভিযান

এই সফরের আরেকটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল অন্টারিও লেকে মাছ ধরার মিশন।

প্রিয় সুব্রতদা, মিহীরদা, সজীবদা ও আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়ার সেই দিনটি ছিল একেবারেই অন্যরকম। শহুরে ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ কিংবা প্রবাসের নানা দায়িত্ব থেকে দূরে প্রকৃতির বিশালতার মধ্যে দাঁড়িয়ে মাছ ধরার অপেক্ষা—পুরো অভিজ্ঞতাটিই ছিল আনন্দময় ও স্মরণীয়।

মাছ ধরা হলো কি হলো না, শেষ পর্যন্ত সেটি বড় কথা হয়ে থাকেনি। আসল আনন্দ ছিল একসঙ্গে থাকা, গল্প করা, হাসি-ঠাট্টা আর প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় নিজেকে সমর্পণ করা।

কখনো কখনো গন্তব্যের চেয়ে পথটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই মাছ ধরার মিশনটিও আমার কাছে তেমনই একটি স্মৃতি।

টরেন্টোবাসী শ্রীমঙ্গলিয়ানদের মহামিলন

এরপর এলো টরেন্টোবাসী শ্রীমঙ্গলিয়ানদের পিকনিক। সত্যি বলতে কী, সেটি নিছক কোনো পিকনিক ছিল না; ছিল এক মহামিলনমেলা।

Manual1 Ad Code

শ্রীমঙ্গলের কত ভাই, ভাতিজা, বন্ধু, বোন ও শ্রদ্ধাভাজন মানুষের সঙ্গে কয়েক দশক পর দেখা হয়ে গেল! জীবনের নানা বাঁকে আমরা কে কোথায় ছড়িয়ে পড়েছি—কেউ কানাডায়, কেউ ইউরোপে, কেউ দেশে। কিন্তু দেখা হওয়ার মুহূর্তে মনে হলো, আমাদের সম্পর্কগুলো যেন সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

Manual4 Ad Code

ভাতিজা হিমেল, সোহেল, জুম্মন, ভাগনি নিলু এবং বোন রুনুসহ অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া ছিল বিশেষ আনন্দের।

প্রবাসে এমন একটি মিলনমেলার তাৎপর্য শুধু আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে শেকড়ের কাছে ফিরে আসার এক মানসিক যাত্রা। মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করুক, নিজের শহর, নিজের মানুষ এবং নিজের শৈশবের স্মৃতি তাকে কোনো না কোনোভাবে টেনে নিয়ে যায়।

এই পিকনিকেই পরিচয় হলো নাট্যবন্ধু শঙ্কুদার সঙ্গে। পিকনিকের মধ্যেই পরিচয়, আর পরিচয়ের মধ্যেই বন্ধুত্ব—মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠার এই সহজ সৌন্দর্য আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে।

শুরুটা নায়াগ্রায়, শেষটাও আড্ডায়

Manual4 Ad Code

আমার বহুল প্রত্যাশিত ১৫ দিনের কানাডাবাস শুরু হয়েছিল নায়াগ্রায় অপুর রিসোর্টে রাতভর আড্ডা দিয়ে। ????????

সেই রাতের গল্প, হাসি, স্মৃতি আর উচ্ছ্বাস যেন পরবর্তী দিনগুলোর জন্য একটি আবহ তৈরি করে দিয়েছিল। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ছিল একই রকম আনন্দের অপেক্ষা—সন্ধ্যায় কোথায় মিলিত হচ্ছি, কার বাসায় বসছি, কে আসছে, কে কাকে নিয়ে আসছে—এসব খবর একে অন্যকে জানিয়ে দেওয়া।

প্রবাসে থাকা মানুষের কাছে এই সন্ধ্যার আড্ডাগুলো হয়তো খুব সাধারণ কোনো ঘটনা। কিন্তু আমার কাছে সেগুলো ছিল ভীষণ অমূল্য। কারণ প্রতিটি আড্ডায় ছিল দীর্ঘদিন পর ফিরে পাওয়া কোনো না কোনো সম্পর্ক, কোনো পুরোনো স্মৃতি কিংবা নতুন করে তৈরি হওয়া কোনো বন্ধুত্ব।

এই বহুল আকাঙ্ক্ষিত আড্ডাগুলোর শুরু হয়েছিল প্রিয় নাট্যজন সেলিম ভাই, লাভলী ভাবী ও নাট্যবন্ধু দেলোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কখনো অপু, কখনো তপন, কখনো আশীষ, সমীরদা, উজ্জ্বলদা, বন্ধু উজ্জ্বল নন্দী—এভাবেই এক আড্ডা থেকে আরেক আড্ডায় গড়িয়ে গেছে দিনগুলো।

আর ফিরে আসার ঠিক আগের রাতে সেই আড্ডার শেষ পর্ব বসেছিল অভিমান ভাঙানো বন্ধু পাপলুর বাসায়।

ভাবতে অবাক লাগে, মাত্র ১৫টি দিন কত দ্রুত পার হয়ে গেল!

কিছুদিনের জন্য ফিরে পাওয়া এক পৃথিবী

এই সফরে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি অনুভব করেছি, তা হলো—মানুষ আসলে মানুষের কাছেই ফিরে আসে।

আমরা জীবনের প্রয়োজনে দেশ ছাড়ি, শহর বদলাই, মহাদেশ পেরিয়ে যাই। নতুন জীবন গড়ি, নতুন পরিচয় তৈরি করি। কিন্তু পুরোনো সম্পর্কগুলো আমাদের ভেতরে কোথাও না কোথাও থেকে যায়। কখনো একটি ফোনকল, কখনো একটি ফেসবুক পোস্ট, কখনো একটি আমন্ত্রণ, কখনো একটি আলিঙ্গন সেই পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।

কানাডায় গিয়ে আমি কোনো নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করিনি; বরং পুরোনো এক পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি।

সেই পৃথিবীর নাম বন্ধুত্ব।

সেই পৃথিবীর নাম ভালোবাসা।

সেই পৃথিবীর নাম শ্রীমঙ্গল।

আর সেই পৃথিবীর মানুষগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও তাদের হৃদয়ের একটি অংশ এখনো শ্রীমঙ্গলের মাটিতেই রয়ে গেছে।

১৫ দিনের এই সফর তাই আমার কাছে কেবল কানাডা ভ্রমণের স্মৃতি নয়। এটি ছিল কয়েক দশকের বন্ধুত্বকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ। ছিল প্রিয় মানুষদের ভালোবাসায় নিজেকে আবারও উজ্জীবিত করে তোলার সুযোগ।

আহা, কী মধুর, কী উজ্জীবিত সেই দিনগুলো! 

ফিরে আসার সময় মনে হলো, সঙ্গে করে তো আর মানুষগুলোকে নিয়ে আসতে পারলাম না; কিন্তু তাদের হাসি, ভালোবাসা, অভিমান, আলিঙ্গন, আড্ডা আর অগণিত স্মৃতি সঙ্গে করে নিয়ে এলাম।

ছবিগুলো হয়তো সেই মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখবে। কিন্তু ছবির বাইরেও কিছু মুহূর্ত থেকে যাবে হৃদয়ের গভীরে—যেগুলোর কোনো অ্যালবাম হয় না, কোনো ক্যামেরা সেগুলো ধারণ করতে পারে না।

প্রিয় বন্ধু, সজ্জন ও শ্রদ্ধাভাজন সকলের প্রতি রইল গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।

ভালো থেকো সবাই।
দেখা হবে আবারও।
কাটুক আরও কিছুদিন—
স্বর্ণালী মুহূর্তগুলো ছবিতে আছে যখন!

বিশেষ ধন্যবাদ ভাতিজা হিমেল ও ভাই সোহেলকে পিকনিকের ছবিগুলোর জন্য।
#

প্রকাশ রায়
অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংস্কৃতিজন
প্যারিস, ফ্রান্স।