বুয়েট গ্রাজুয়েটস ক্লাবে ভ্রমণগদ্য সুহৃদসভা

প্রকাশিত: ৬:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২৬

বুয়েট গ্রাজুয়েটস ক্লাবে ভ্রমণগদ্য সুহৃদসভা

Manual1 Ad Code

কামরুল হাসান |

প্রভাতটি ছিল, বৃষ্টিমুখর বলব না, বলব বৃষ্টিময়। বৃষ্টি, তা সে মুষলধারে ঝড়ুক কিংবা টিপটিপ, আপনাকে ঘরের ভেতর আঁটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, যদি না আপনার মাথায় থাকে কোনো আচ্ছাদন, হোক তা মামুলি ছাতা কিংবা বনেদী সিডানের ছাদ। ভেবেছিলাম মোটরবাইকে চড়ে যাব বনানী, বৃষ্টি দেখে পুরনো সিডানটি বের করি। আজ আমি এতটাই সতর্ক (গত আসরে পৌঁছে দেখেছিলাম আমি ছাড়া প্রায় সকলেই এসে পৌঁছেছে) যে পার্কিং জোনে প্রথম পার্ক করা গাড়িটি আমারই। ক্লাবের প্রবেশপথে ডিজিটাল বোর্ডে আড্ডার আমন্ত্রণপত্রের ডিজিটাল ডিসপ্লে জ্বলজ্বল করছে। বুয়েট গ্রাজুয়েটস ক্লাবে ভ্রমণগদ্যের আসরগুলো, এর আগে, দোতলার খোলা বারান্দায় বসেছে, এবার বসল চতুর্থতলায় জেআরসি মিলনায়তনে। এটিই ক্লাবটির একমাত্র মিলনায়তন।

Manual1 Ad Code

দ্বিতীয় যিনি এলেন তিনি, সরকারের একজন ভূতপূর্ব সচিব, গোলাম শফিক। আমাকে দেখে সামান্য হতাশ হয়ে বললেন, আমি সেকেন্ড। ফার্স্ট ও সেকেন্ড বয় অতঃপর মেতে উঠল জীবনের গল্পে এবং নিজেদের মাঝে অনেকগুলো মিল খুঁজে পেল।

প্রথম মিল দুজনেরই জন্মপরবর্তী প্রথম কয়েকটি বছর ঢাকা শহরে কাটলেও, বাবার কারণে চলে আসতে হয়েছিল গ্রামে। দ্বিতীয় মিল আমাদের শৈশব এবং কৈশোরের এক যুগ সময় কেটেছে গ্রামে দুরন্তপনায়। তৃতীয় মিল আমাদের দুজনের গ্রামাঞ্চলই জলশাসিত, তিনি হাওর অঞ্চলের মানুষ, আমি ভাটি অঞ্চলের।

তৃতীয় যিনি এলেন তার চেহারাটি চেনা চেনা লাগল, কিন্তু নাম স্মরণে এলো না। ইতিমধ্যে সরাসরি হারমোনিয়াম নিয়ে হাজির হওয়া রেজাউর রহমান যখন তাকে মাহফুজুর রহমান বলে সম্বোধন করলেন তখন নামটি জানা হলো। ধীরে, পুষ্পকোরক উন্মীলনের মতো, তার আরও আরও পরিচয় উন্মীলিত হলে জানলাম তিনিও একজন স্থপতি এবং পেশাদার কূটনৈতিক। রেজাউর রহমানও একজন স্থপতি এবং আজকের আড্ডার যিনি হোস্ট সেই শাকুর মজিদও একজন স্থপতি। তাদের কল্যাণেই এই প্রকৌশলশাস্ত্রশাসিত ক্লাবে আমাদের শরৎকালীন সমাবেশ সম্ভব হয়েছে।

Manual4 Ad Code

চতুর্থ মানুষটি ভ্রমণগদ্য সম্পাদক মাহমুদ হাফিজ যার ওয়ারড্রবে ষড়ঋতুর সবকটি রঙই আছে, এবং তিনি স্থির করতে পারেন না, কোন রঙটি গায়ে চড়াবেন। শরতের রঙ যে নীল তা ভুলে গিয়ে তিনি গায়ে চাপিয়েছেন সবুজ; সবুজের একটি ভ্যারিয়েশন, তাকে কচি কলাপাতা রঙ বলা যায়। ভ্রমণগদ্য সুহৃদসভার প্রাণপুরুষ ইনাম আল হক আফ্রিকায় পরিভ্রমণরত; এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন দুজন; এক, শাকুর মজিদ, যিনি খাবারের বিল দিবেন আর দুই, মাহমুদ হাফিজ, যিনি লেখকদের হাতে ধরিয়ে দিবেন ভ্রমণগদ্যের সর্বশেষ সংখ্যা। তবে প্রেস থেকে যেসকল দুঃসংবাদ আসছিল তাতে মনে হলো এ যাত্রা ভ্রমণগদ্যের মুখ দেখা হবে না।

রেজাউর রহমান একটি নিচু টেবিল খুঁজছিলেন যার উপরে হারমোনিয়ামটি বসানো যায়। বৃষ্টিভেজা প্রভাতে সিএনজিতে চড়িয়ে হারমোনিয়ামটি এনে তিনি ক্লান্ত আর একথা ভেবে ক্ষুব্ধ যে তার নিজের গাড়িটি গ্যারেজে ঘুমন্ত অশ্বের মতো নাসারন্ধ্র ফুলাচ্ছে অথচ তাকে কি না আসতে হলো হতদরিদ্র এক সিএনজি চেপে। তার মনটি রাবীন্দ্রিক বিধায় কুড়িবার বলে দেওয়ার পরেও যখন ড্রাইভার আসেনি তখন মেজাজ সপ্তসুর ছেড়ে সপ্তআকাশে উঠে যাবার কথা, কিন্তু তিনি উষ্মা দমন করে ঘুমপাগল চালককে মনে মনে ক্ষমা করে দিলেন। কেননা রাগ বাড়লে গানের রাগ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে এবং সর্বশেষে সকল স্বর উল্টেপাল্টে দিলে যে রাগ সৃষ্টি হয়, সেই টোড়ি এসে পড়ে।

ইতিমধ্যে জামিলুর রেজা চৌধুরীর নামে নামাঙ্কিত মিলনায়তনের প্রশস্ত স্পেসে পেতে রাখা তিন বৃত্তাকার টেবিলের দ্বিতীয়টিতে এসে নীরবে বসেছেন ফরিদুর রহমান ও লোপা মমতাজ। ওপাশে আতিকুর রহমান। দুই দয়ালুর মাঝে বসে থাকা লোপাকে মনে হয় বৃষ্টিস্নাত প্রভাতটির স্নিগ্ধতা, এবং তার চোখেমুখে যে তরুণ উচ্ছ্বাস তা রৌদ্রসম্ভাবনা জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। হঠাৎ ফুলের সৌরভে চারিপাশ ভরে উঠলে, এবং সুগন্ধিলোভী নাসারন্ধ্রে সুখকর অনুভূতি সৃষ্টি হলে তাকিয়ে দেখি দোলনচাঁপার স্তবক হাতে ক্ষমা মাহমুদ এসে উপস্থিত। ফুলের তোড়া আজকের আড্ডায় হোস্ট শাকুর মজিদের জন্য, যিনি তখন পর্যন্ত এসে হাজির হননি।

এভারেস্টজয়ী ইকরামুল হাসান শাকিল এসে বসেছেন আমার পাশে। বললেন আবহাওয়া নিয়ে অলিম্পিয়াডের ফাইনালে ৫০০ অংশগ্রহণকারীর সমাবেশে হিমালয় জয়ের গল্প ( গল্প নয় যদিও, গল্পের চেয়ে রোমাঞ্চকর সত্য) শুনিয়েছেন Keynote Speaker হিসেবে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই তাকে ডাকে তরুণদের মাঝে এডভেঞ্চার, সাহস ও দৃঢ়প্রত্যয় ছড়িয়ে দিতে। রাশিয়া স্পন্সরড অলিম্পিয়াডটি বৈশ্বিক রূপ পাবে রাশিয়ায়, যেখানে বাংলাদেশ থেকে সেরা পাঁচজন যোগ দিবেন আর তাদের স্পন্সর রাশিয়াই। আপনিও কি যাচ্ছেন? আমার প্রশ্নে শাকিল হেসে বলল, ‘না। আমি যাচ্ছি না।’ আমার অন্যপাশে এসে বসেছেন মিলা মাহফুজা, তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘হোস্টকে তো দেখছি না।’

রেজাউর রহমান গিয়ে বসেছেন হারমোনিয়ামের পেছনে। তিনি গান যেমন দরদ দিয়ে গান, সমান দরদে কথা বলতে ভালোবাসেন। ঋতু যেহেতু শরৎ, রবিঠাকুরের বর্ষাসংগীতের বিপুল সম্ভার একপাশে ঠেলে তার মনে গুনগুন করে উঠছে শরতের গান ও ধ্বনি। বললেন অত যে হিসেবী রবীন্দ্রনাথ, তিনিও কখনো কখনো বেহিসেবী হয়েছেন পদ ও সুরের পথচলায়। তখনো সাড়ে আটটা বাজেনি, রেজাউর রহমানের প্রাণে সুর বেজে উঠছে প্রবলভাবে, তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের বিহ্বল করতে গান ধরলেন,

Manual1 Ad Code

“আজ যেমন করে গাইছে আকাশ, তেমন করে গাও গো,
আজ যেমন করে চাইছে আকাশ তেমন করে চাও গো।”

Manual7 Ad Code

(চলবে)