মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করা যায় না

প্রকাশিত: ৯:০৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করা যায় না

Manual7 Ad Code
  • কুষ্টিয়ায় নজরুলের প্রয়াণ দিবসের আলোচনা সভায় বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক | কুষ্টিয়া, ২৯ আগস্ট ২০২৬ : বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নেতৃবৃন্দ।

তারা বলেছেন, কবি নজরুল অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই আদর্শের বিপরীতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

শনিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৫টায় কুষ্টিয়া পৌরসভার বিজয় উল্লাস চত্বরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মহাপ্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

Manual7 Ad Code

চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কুষ্টিয়া জেলা শাখা এ আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি জামালউদ্দীন খানের সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন নিদু খন্দকার।

এতে আলোচনা করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিখিল দাস, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুজ্জামান, সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজিম তিতিল এবং সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী শম্পা বসু।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভা। কবিতা ও গানের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, শিশু সাহিত্য, নাটক, গীতিকাব্য, সংগীত, সাংবাদিকতা ও অভিনয়সহ সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁর সৃজনশীল পদচারণা ছিল। তাঁর সাহিত্য শুধু নান্দনিকতার চর্চা নয়; একই সঙ্গে তা অন্যায়, অবিচার, ঔপনিবেশিক শাসন, ধর্মীয় গোঁড়ামি, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

বক্তারা বলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরার পাশাপাশি নজরুল রাজপথের আন্দোলনেও অংশ নিয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন। ১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত ‘ভাঙার গান’ ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাসহ তাঁর বহু রচনায় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও বিদ্রোহের চেতনা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে নজরুলকে কেবল একজন কবি হিসেবে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়।

তারা আরও বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তী পাকিস্তানি শাসন থেকে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে মুক্ত হলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে শোষণ-বৈষম্যের অবসান ঘটেনি। তাদের ভাষায়, সাম্রাজ্যবাদী ও নয়া-উপনিবেশিক প্রভাব এবং দেশীয় শোষণব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ এখনো কাঙ্ক্ষিত মুক্তি পায়নি।

আলোচনায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন বক্তারা। তারা অভিযোগ করেন, অতীতে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। একইভাবে, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত অসম বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, এ ধরনের চুক্তির ফলে দেশের কৃষি ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, ধর্মীয় পরিচয়কে মানুষের বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বিরোধিতা করেছেন কবি। তাঁর সাহিত্যকর্মে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষা বারবার উঠে এসেছে। অথচ বর্তমান সময়ে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিস্তারের প্রবণতা সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Manual1 Ad Code

তাদের অভিযোগ, ‘তৌহিদী জনতা’র নামে একশ্রেণির সন্ত্রাসী মাজার, মন্দির, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা। বক্তারা বলেন, ধর্মের নামে ব্যবসা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে নজরুল তাঁর সময়েই তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর সেই প্রতিবাদী চেতনা বর্তমান সময়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

নারীর অধিকার প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার কথা বলেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে নারীকে কেবল নির্ভরশীল বা গৌণ চরিত্র হিসেবে নয়, বরং সংগ্রামী ও স্বাধীন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সমাজে নারীরা এখনো সম্পত্তিতে পুরুষের সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত। পাশাপাশি নারী নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। ফলে নজরুলের নারী-সমতার দর্শন বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে বলে মত দেন বক্তারা।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ তুলে তারা বলেন, নজরুলের সাহিত্যকর্মে শ্রমিক, কৃষক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার এবং মর্যাদার প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় শ্রমজীবী মানুষের ওপর শোষণ ও নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকরা ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনে নামলে বিভিন্ন সময় হামলা ও গুলির মুখে পড়তে হয়—এমন অভিযোগও করেন তারা।

বক্তারা বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রমজীবী মানুষের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার দাবিও তারা তুলে ধরেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, নজরুলের সৃষ্টিকর্মকে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে না। তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনের মূল শিক্ষা—অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান, নারী-পুরুষের সমতা এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা—সমাজে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

Manual5 Ad Code

তারা বলেন, বর্তমান শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রামের পরিপূরক হিসেবে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। সংস্কৃতি মানুষের চিন্তা, বিবেক ও মননকে জাগ্রত করতে পারে। তাই প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।

সভায় বক্তারা আরও বলেন, নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে তাঁর সাহিত্য পাঠ, সংগীত, আবৃত্তি ও নাট্যচর্চার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক-সামাজিক দর্শন নিয়েও আলোচনা বাড়াতে হবে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তারা।

আলোচনা সভা শেষে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন। নজরুলের গান ও কবিতার পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব শেষ হয়।

Manual8 Ad Code

কুষ্টিয়ায় চারণের নতুন কমিটি

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিখিল দাস কুষ্টিয়া জেলা শাখার নবনির্বাচিত কমিটি ঘোষণা করেন।

জামালউদ্দীন খানকে সভাপতি এবং খন্দকার হেদায়েত উল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তারা নজরুলের অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও প্রতিবাদী চেতনায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।