মানসম্মত মজুরি চান চা শ্রমিকরা

প্রকাশিত: ৮:৪২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬

মানসম্মত মজুরি চান চা শ্রমিকরা

Manual2 Ad Code
  • দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণের দাবি—আলোচনা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত চায় চা শ্রমিক ইউনিয়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : দেশের অন্যান্য শিল্প খাতের শ্রমিকদের তুলনায় চা শিল্পের কারিগরি শ্রমিকদের দৈনিক ও মাসিক মজুরি অত্যন্ত নাজুক—এমন দাবি করেছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন।

বর্তমান বাজারদর, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যতে শ্রমিকদের উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চা শ্রমিকদের জন্য একটি মানসম্মত ও যৌক্তিক মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

Manual6 Ad Code

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ‘লেবার হাউজে’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

নৃপেন পাল বলেন, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং বিদ্যমান শ্রম পরিস্থিতি যাচাই করতে সরকার গত ১৯ আগস্ট একটি পরিদর্শন কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটি বিভিন্ন চা-বাগান সরেজমিনে পরিদর্শন করে শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থা, কর্মপরিবেশ ও শ্রম পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ ও বাস্তবমুখী প্রতিবেদন সরকারের কাছে উপস্থাপন করবে বলে তারা আশা করছেন।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেন, বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, চিকিৎসা, শিক্ষা, খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় মেটাতে চা শ্রমিকদের বিদ্যমান আয় যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিন ধরে সীমিত আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করতে গিয়ে শ্রমিক পরিবারগুলো নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। তাই কেবল বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নয়, ভবিষ্যতে শ্রমিকদের জীবনমান কীভাবে উন্নত করা যায়, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

Manual3 Ad Code

সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেন, সব ধরনের প্রতিকূলতা দূর করে সরকার চা শ্রমিকদের জন্য একটি মানসম্মত মজুরি নির্ধারণ করবে বলে তারা আশাবাদী। একটি ন্যায়সংগত মজুরি চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সার্বিক কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ

Manual4 Ad Code

সংবাদ সম্মেলনে চা শ্রমিকদের মজুরির পাশাপাশি বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন নেতারা।

নৃপেন পাল বলেন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বাচাশ্রই) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে উচ্চ আদালত দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তারা অবগত হয়েছেন। পাশাপাশি গত ৪ আগস্ট সরকার ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজনের ব্যয় নির্বাহের জন্য ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেন, শ্রমিকদের সাংগঠনিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে বলে তারা মনে করেন।

‘কিছুটা অপেক্ষা করলে সমাধানের পথ সুগম হবে’

চা শ্রমিকদের আশু কল্যাণ, বর্তমান সরকারের চা শ্রমিকদের প্রতি আন্তরিকতা এবং দেশের চা শিল্পের উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।

চা শ্রমিকদের সাময়িকভাবে অপেক্ষা করারও অনুরোধ জানান ইউনিয়ন নেতারা। তারা বলেন, সময়ের প্রয়োজনে কিছুটা অপেক্ষা করলে চা শ্রমিকদের জন্য একটি মানসম্মত মজুরি নির্ধারণ এবং কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন আয়োজনের পথ আরও সুগম হবে।

নেতারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে চা শিল্পের উৎপাদন, শ্রমিক কল্যাণ এবং শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় করে একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান

সংবাদ সম্মেলন থেকে সমাজের শোষিত ও বঞ্চিত চা জনগোষ্ঠীর জীবনমান, অধিকার ও বিভিন্ন সমস্যার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে গণমাধ্যমকে যথাযথভাবে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।

নেতারা বলেন, দেশের অর্থনীতি ও চা শিল্পে চা শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অথচ তাদের জীবনমান, শ্রমের মূল্য, অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না পেলে চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শ্রমিকদের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে গণমাধ্যমের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে চা শ্রমিকদের মজুরি, জীবনমানের উন্নয়ন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন এবং দেশের চা শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়।

Manual1 Ad Code

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ কন্দের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি বৈশিষ্ট তাঁতী, সহসভাপতি জেসমিন আক্তার, অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, বালিশিরা ভ্যালির সহসভাপতি সবিতা গোয়ালা ও সাংগঠনিক সম্পাদক কর্ণ তাঁতী, সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা ও সম্পাদক দেবু বাউরী, লংলা ভ্যালির সভাপতি মো. শহীদুল ইসলাম, জুড়ী ভ্যালির সভাপতি কমল চন্দ্র বুনার্জি, সহসভাপতি শ্রীমতি বাউরী এবং সম্পাদক রতন কুমার পাল।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—একদিকে বর্তমান দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও মানসম্মত মজুরি নিশ্চিত করা, অন্যদিকে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন দ্রুত সম্পন্ন করা। শ্রমিকদের দাবি, তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্য ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে চা শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিশীলতাও আরও শক্তিশালী হবে।

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান

এদিকে, চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেছেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযোগী যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো ধরনের তালবাহানা বা গড়িমসি গ্রহণযোগ্য নয়। চা শ্রমিকরা কারও দয়া বা অনুকম্পা চান না; তারা শ্রমের যথাযথ মূল্য চান। দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও চা শিল্পে যে মূল্য সংযোজন করছেন, তার যথাযথ পারিশ্রমিকই তাদের দাবি।

তার ভাষায়, শ্রমিকের মজুরি শুধু একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত আয় নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা জড়িত। ফলে চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ