জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা: উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২৬

জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা: উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

Manual1 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত, মৌলিক অধিকার এবং সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ ও কর্মক্ষম জীবনের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তা বলতে কেবল মানুষের পেট ভরানোর মতো খাবারের জোগান নিশ্চিত করাকে বোঝায় না। খাদ্য হতে হবে পর্যাপ্ত, সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পুষ্টিকর। সেই সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এমন হতে হবে, যাতে আয়, শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কেউ পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত না হন। অতএব, খাদ্যনিরাপত্তা একই সঙ্গে কৃষি, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপ্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান উৎপাদনে সাফল্য, মাছ, ডিম ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, কৃষিপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম দেশের খাদ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন ও জটিল সংকটও দেখা দিয়েছে। খাদ্যের দাম ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, কৃষিজমির সংকোচন, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ, পুষ্টিহীনতা, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার এবং খাদ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

ফলে আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, প্রত্যেক মানুষ কি সারা বছর সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছেন? কৃষক কি তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন? ভোক্তা কি খাবারের প্রকৃত গুণমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারছেন? আর রাষ্ট্র কি খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে পারছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে খাদ্যনিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা: খাদ্য থাকা আর খাদ্য পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—এফএওর স্বীকৃত ধারণা অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সব মানুষ সব সময় সক্রিয় ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার বাস্তব সুযোগ রাখেন। এ ধারণার চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রয়েছে—খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্য, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার ও পুষ্টিমান এবং সময়ের সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির স্থিতিশীলতা।

খাদ্যের প্রাপ্যতা বলতে বোঝায় দেশে উৎপাদন, আমদানি ও মজুতের মাধ্যমে পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান থাকা। কিন্তু বাজারে খাদ্য থাকলেই প্রত্যেক মানুষ তা কিনতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। খাদ্যের দাম যদি পরিবারের আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে বাজারে পণ্য থাকা সত্ত্বেও সেই পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। আবার খাবার পাওয়া গেলেও তা দূষিত, ভেজালযুক্ত কিংবা পুষ্টিগতভাবে অপর্যাপ্ত হলে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না।

এখানে স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার স্বাভাবিক সময়ে খাবার কিনতে পারলেও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বেকারত্ব, অসুস্থতা কিংবা দ্রব্যমূল্যের আকস্মিক বৃদ্ধির সময় খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারাতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা তাই এক দিনের বা এক মৌসুমের অর্জন নয়; এটি সারা বছর ধরে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার বিষয়।

খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা বা নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। খাদ্যনিরাপত্তা মূলত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা বোঝায়; অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য বলতে এমন খাদ্য বোঝায়, যা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্যায়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ রাখা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত খাবার থাকলেও তা নিরাপদ না হলে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।

বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

বিশ্বে কৃষি উৎপাদন, প্রযুক্তি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হলেও ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর The State of Food Security and Nutrition in the World 2024 প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে প্রায় ৭৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের ক্ষুধার্ত থাকার হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে প্রায় ২৮০ কোটির বেশি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকার বিষয়টিও উঠে আসে।

এই সংকটের পেছনে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি দায়ী নয়। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত, দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্যবাজারের অস্থিরতা এর সঙ্গে জড়িত। কোথাও খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে, কিন্তু সংঘাতের কারণে তা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; কোথাও খাদ্য আছে, কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা নেই; আবার কোথাও পুষ্টিকর খাবারের তুলনায় সস্তা ও নিম্নমানের খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা এবং আয়বৈষম্য খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমতা তৈরি করে। একজন সচ্ছল মানুষের জন্য যে খাদ্যতালিকা সহজলভ্য, একজন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য তা অনেক সময় নাগালের বাইরে থাকে।

বিশেষত চালের ওপর অতিনির্ভরতা, খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, দুধ, ডিম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সীমিত উপস্থিতি এবং পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের বড় অংশ মৌলিক খাদ্যে ব্যয় হওয়ার কারণে পুষ্টিনিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্য উৎপাদনের সাফল্যকে মানুষের পুষ্টিগত অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি।

উৎপাদনে সাফল্য, তবু কেন খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। স্বাধীনতার পর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চফলনশীল জাত, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সার ও কৃষি উপকরণের ব্যবহার, কৃষি গবেষণা এবং কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ফলে ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মাছ, ডিম, মুরগি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

তবে কৃষি উৎপাদনের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ নয়। কৃষিজমি কমে যাওয়া, জমির খণ্ডিত মালিকানা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট, সেচের পানির প্রাপ্যতা, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কৃষকের আয় ও উৎপাদনব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে কৃষক উৎপাদন ব্যয় অনুযায়ী ন্যায্য মূল্য পান না, অথচ ভোক্তাকে একই পণ্য বেশি দামে কিনতে হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী সরবরাহব্যবস্থায় অদক্ষতা, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণের ঘাটতি এবং বাজার তদারকির দুর্বলতা এই ব্যবধান বাড়াতে পারে।

কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে, ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য পৌঁছাতে না পারলে খাদ্যপ্রাপ্যতা বাধাগ্রস্ত হয়। তাই কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে ন্যায্য ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত নীতির লক্ষ্য।

এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা, বাজারদর ও আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক সমবায়, উৎপাদক সংগঠন, কৃষিপণ্যের স্থানীয় বাজার এবং সরাসরি বিপণনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন: খাদ্যনিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি হুমকি

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে কঠিন করে তুলছে। লবণাক্ত জমিতে প্রচলিত ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে; আবার পানির সংকট, দুর্যোগে ফসলহানি এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা দরিদ্র পরিবারগুলোকে বাড়তি ঝুঁকিতে ফেলে।

হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা ধানের ফসল নষ্ট করতে পারে। চরাঞ্চলে নদীভাঙন মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি কেড়ে নেয়। উত্তরাঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদন এবং সেচের ব্যয় বাড়াতে পারে। দুর্যোগের ক্ষতি শুধু মাঠের ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্য পরিবহন, বাজার, গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবারের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এখন আর ঐচ্ছিক কোনো কর্মসূচি নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। লবণাক্ততা, খরা ও বন্যাসহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, পানি সাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; কৃষক যেন প্রয়োজনীয় বীজ, প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বাজারসুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। খাদ্যব্যবস্থাকে শুধু ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল রাখলে পুষ্টি, মাটির স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ডাল, তেলবীজ, ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ: নীরব জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো খাদ্যদূষণ ও ভেজাল। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিক্রয় ও রান্না—প্রতিটি পর্যায়ে অসতর্কতা, অনিয়ম কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের কারণে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।

রাসায়নিক দূষণ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, অননুমোদিত রং, অনুপযুক্ত সংরক্ষণকারী পদার্থ এবং জীবাণুজনিত দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, নিরাপদ পানির অভাব, কাঁচা ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ না করাও খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হন এবং প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই পরিসংখ্যান নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

বাংলাদেশে খাদ্যবাজারের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। কোনো পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলে শুধু জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়; দূষণের উৎস শনাক্ত, সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন হলে পণ্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তবে খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে প্রচারিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। কোন পণ্য, কোন এলাকা, কোন সময় এবং কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়েছে—এসব তথ্য ছাড়া একটি নমুনার ফলাফলকে পুরো দেশের খাদ্যবাজারের চিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বচ্ছ পরীক্ষণব্যবস্থাই জনআস্থা বাড়ানোর ভিত্তি।

খাদ্য নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু বিক্রেতার নয়। কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহনকারী, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভোক্তা—সবার দায়িত্ব রয়েছে। তবে দায়িত্বের এই বণ্টন যেন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের আইনগত দায়কে দুর্বল না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিহীনতা: পেট ভরলেই সুস্থতা আসে না

একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থা সফল কি না, তা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি রয়েছে কি না, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, নারীরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন কি না এবং দরিদ্র পরিবারগুলো স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারছে কি না—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে শিশুদের খর্বাকৃতি, রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি এবং খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যের ঘাটতি দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। বিশেষত গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, শিশু, কিশোরী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।

শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন—গর্ভধারণ থেকে দ্বিতীয় জন্মদিন পর্যন্ত—শারীরিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই মাতৃপুষ্টি, বুকের দুধ খাওয়ানো, বয়স অনুযায়ী পরিপূরক খাবার, টিকাদান এবং সংক্রমণ প্রতিরোধকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী মূল্যে ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। স্কুলের খাদ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি, দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রম এবং পুষ্টিশিক্ষাকে আরও কার্যকর করতে হবে।

এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি: দরিদ্র পরিবারকে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পুষ্টিনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। খাবার কেনার সামর্থ্য, বাজারে প্রাপ্যতা এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে পুষ্টিশিক্ষার সুফল সীমিত থেকে যায়।

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার: খাদ্যাভ্যাসের নতুন সংকট

বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে প্যাকেটজাত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার। বিস্কুট, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, মিষ্টি পানীয়, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত খাবার নগর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ত জীবন, সহজে বহনযোগ্য খাবারের চাহিদা, বিজ্ঞাপন এবং পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস এই প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে সব প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অস্বাস্থ্যকর বলা ঠিক নয়। দুধ পাস্তুরিত করা, খাবার হিমায়িত করা কিংবা নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উপকারী হতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন কিছু পণ্যের ব্যাপক গ্রহণ, যেগুলোতে অতিরিক্ত লবণ, মুক্ত চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি বা ক্যালরি রয়েছে এবং যেগুলো পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যের জায়গা দখল করতে পারে।

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে The BMJ-তে প্রকাশিত একটি ছাতাগবেষণায় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশি সংস্পর্শের সঙ্গে একাধিক প্রতিকূল স্বাস্থ্যফলের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়। তবে এসব গবেষণার বড় অংশ পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা উচিত নয়। খাদ্যের উপাদান, গ্রহণের পরিমাণ, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য জীবনযাপনগত বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।

তবু অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সোডিয়াম উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়; অতিরিক্ত মুক্ত চিনি দাঁতের ক্ষয়, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত; আর সম্পৃক্ত চর্বির অতিরিক্ত গ্রহণ রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। এসব ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অসংক্রামক রোগ মোট মৃত্যুর বড় অংশের জন্য দায়ী। তাই এসব রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যপরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।

খাবারের প্যাকেটে সতর্কবার্তা: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ

খাদ্যের প্যাকেট হাতে নিয়ে একজন সাধারণ ভোক্তার পক্ষে কি সহজে বোঝা সম্ভব যে পণ্যটিতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি কিংবা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে? প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা জটিল পুষ্টিতথ্য কি সবাই বুঝতে পারেন? আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও মোড়কের আড়ালে পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি অস্পষ্ট থাকলে ভোক্তার সুরক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল—খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে পুষ্টিগত তথ্য বা সতর্কবার্তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা।

বাংলাদেশে বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ১৫ অক্টোবর গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এফওপিএল চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রণীত ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন। এই তথ্যের মূল তাৎপর্য হলো, এসব পণ্যের বিস্তার ব্যাপক। তবে গবেষণার নমুনা, তথ্য সংগ্রহের সময়, খাবারের সংজ্ঞা ও গ্রহণের পরিমাণ যাচাই না করে এ থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের সিদ্ধান্ত টানা যাবে না।

সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের উদ্দেশ্য হলো ভোক্তাকে সহজে বোঝানো, কোনো পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে কি না। দেশভেদে এর নকশা আলাদা হতে পারে। কোথাও কালো অষ্টভুজাকৃতির চিহ্ন, কোথাও স্পষ্ট লিখিত সতর্কবার্তা কিংবা অন্য দৃশ্যমান নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, স্থানীয় ভোক্তার বোধগম্যতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনা করে।

এফওপিএলের একটি বড় সুবিধা হলো, এটি পুষ্টিতথ্য বুঝতে প্রয়োজনীয় সময় ও জটিলতা কমাতে পারে। একজন ভোক্তা একাধিক পণ্যের মধ্যে তুলনা করার সময় দ্রুত বুঝতে পারবেন, কোন পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বেশি। এর ফলে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন সহজ হতে পারে।

আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো খাদ্যশিল্পের পণ্য সংস্কারে প্রণোদনা সৃষ্টি। অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত পণ্যে সতর্কবার্তা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক হলে উৎপাদকরা পণ্যের উপাদান পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ফলে লেবেলিং শুধু ভোক্তার আচরণ পরিবর্তনের উপায় নয়; এটি খাদ্যপণ্যের পুষ্টিগত মান উন্নত করারও একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার।

তবে লেবেলিং একাই অসংক্রামক রোগের সমাধান নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সতর্কবার্তার দৃশ্যমানতা, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড, সঠিক পুষ্টিতথ্য, নিয়মিত নজরদারি এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।

বাধ্যতামূলক লেবেলিং কেন প্রয়োজন?

স্বেচ্ছামূলক লেবেলিং ব্যবস্থায় সব উৎপাদক একই নিয়ম অনুসরণ করবেন—এমন নিশ্চয়তা থাকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান স্পষ্ট ও সহজবোধ্য তথ্য দিতে পারে, অন্য প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দৃশ্যমান কিংবা বিভ্রান্তিকর চিহ্ন ব্যবহার করতে পারে। এতে ভোক্তার পক্ষে বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে তুলনা করা কঠিন হয়।

এ ছাড়া যেসব পণ্যে সতর্কবার্তা সবচেয়ে প্রয়োজন, সেগুলোর উৎপাদক স্বেচ্ছায় সেই সতর্কবার্তা দিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই অনিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রযোজ্য পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন নিয়ম থাকা প্রয়োজন।

ছোট প্যাকেটের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। প্যাকেট ছোট হওয়ায় নকশাগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি তাতে কমে যায় না। সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার পরিবর্তে পাঠযোগ্যতা ও দৃশ্যমানতা বজায় রেখে উপযোগী নকশা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রবিধানমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে খাদ্যশিল্পের বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্যাকেজিং পরিবর্তন, পুষ্টিগত পরীক্ষা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া সংশোধনে ব্যয় হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতির সময় ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই বিবেচনা যেন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যকে দুর্বল না করে কিংবা অনির্দিষ্টকালের বিলম্বের কারণ না হয়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যথাযথ আইনি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জনস্বাস্থ্য রক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে যুক্তিযুক্ত পথ।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

চিলি ২০১৬ সালে নির্দিষ্ট পুষ্টিগত সীমা অতিক্রম করা প্যাকেটজাত খাবারে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কবার্তা চালু করে। একই সঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট ধরনের বিপণন এবং স্কুলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরবর্তী গবেষণায় পণ্য নির্বাচন, খাদ্যপণ্যের গঠন পরিবর্তন এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিপণনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

Manual2 Ad Code

মেক্সিকো, পেরু এবং লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশও প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল চালু করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর লেবেলিং ব্যবস্থার জন্য স্পষ্ট নকশা, নির্ধারিত পুষ্টিগত সীমা, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন।

তবে অন্য দেশের নীতি হুবহু বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ করা উচিত নয়। দেশের খাদ্যবাজার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকের সক্ষমতা, ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামর্থ্য বিবেচনা করে উপযোগী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় প্রমাণের ভিত্তিতে নীতিমালা উন্নত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

আইন আছে, প্রয়োগ কতটা কার্যকর?

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩; ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯; বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু আইন প্রণয়ন আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন, নমুনা পরীক্ষা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, অপরাধের দ্রুত নিষ্পত্তি, অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি এবং ভোক্তার অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে আইনের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না।

নিরাপদ খাদ্য নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকায় তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রয়—প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। কোথাও অনিয়ম শনাক্ত হলে কোন প্রতিষ্ঠান তদন্ত করবে, কে নমুনা পরীক্ষা করবে, কে ব্যবস্থা নেবে এবং কীভাবে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি।

খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনআস্থা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।

আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ। ছোট বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বড় উৎপাদক বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম যেন উপেক্ষিত না থাকে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ অপরিহার্য।

খাদ্য অপচয় রোধ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন

খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদিত খাদ্য সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা। ফসল তোলার পর যথাযথ সংরক্ষণ, শীতল পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ঘাটতির কারণে অনেক কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল খাদ্যের ক্ষেত্রে এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ।

Manual1 Ad Code

খাদ্য অপচয় কমানো মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো নয়; উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, জ্বালানি, শ্রম ও অন্যান্য সম্পদের অপচয়ও কমানো। উৎপাদিত খাদ্যের বড় অংশ নষ্ট হলে নতুন করে উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ে এবং পরিবেশের ক্ষতিও বৃদ্ধি পায়।

Manual1 Ad Code

এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহকেন্দ্র, আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহনব্যবস্থা এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো বাড়াতে হবে। কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এসব সুবিধা সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য উন্নত করা এবং খাদ্য উদ্বৃত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

পরিবার ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও খাবার অপচয় কমানো জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া, অবশিষ্ট নিরাপদ খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হওয়া নাগরিক দায়িত্বের অংশ।

খাদ্যনিরাপত্তায় নাগরিক, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের হলেও নাগরিক সচেতনতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তাকে খাদ্যের মেয়াদ, উপাদান, সংরক্ষণবিধি এবং প্রযোজ্য মানচিহ্ন যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহার, হাত ধোয়া, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণও খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।

তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলে রাষ্ট্র বা উৎপাদকের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। একজন ভোক্তার পক্ষে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক উপাদান বা জীবাণু নিজে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ অপরিহার্য।

বিদ্যালয় ও কলেজে খাদ্য ও পুষ্টিশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের সুষম খাদ্য, নিরাপদ পানি, খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং প্যাকেটের পুষ্টিতথ্য বোঝার বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়ের আশপাশে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ প্রয়োজন।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু খাদ্যে ভেজাল বা বাজারদরের অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ করা নয়; খাদ্যনীতির অগ্রগতি, আইনের প্রয়োগ, গবেষণার ফলাফল এবং জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কেও তথ্যভিত্তিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে কোনো গবেষণার পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে তার উৎস, নমুনা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা জরুরি। অতিরঞ্জিত বা যাচাইহীন তথ্য জনসচেতনতার পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষত এফওপিএল প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ আলোচনা, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই যা করা প্রয়োজন

বাংলাদেশে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও শাকসবজির উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, কৃষকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সাশ্রয়ী খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও সরবরাহব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরাসরি বিপণনের সুযোগ বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, খাদ্যদূষণ প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং অপরাধের কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যপণ্যের উৎস শনাক্ত করার জন্য ট্রেসেবিলিটি বা অনুসরণযোগ্যতা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, প্রস্তাবিত বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বির জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সীমা, স্পষ্ট সতর্কবার্তা, অভিন্ন নকশা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদককে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হলেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য যেন দুর্বল না হয়।

পঞ্চমত, পুষ্টিনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। দরিদ্র পরিবার, শিশু, গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, স্কুলের খাদ্য কর্মসূচি এবং মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, খাদ্য অপচয় কমিয়ে সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহন এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলে কৃষকের ক্ষতি কমবে এবং ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো সহজ হবে।

সপ্তমত, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন, মূল্য, পুষ্টি, খাদ্যদূষণ এবং অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও প্রকাশ করা প্রয়োজন। গবেষণার তথ্য নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে এবং গৃহীত কর্মসূচির ফলাফল স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

অষ্টমত, খাদ্যব্যবস্থার সব পর্যায়ে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ও তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তাকে কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ

খাদ্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, কিন্তু সেই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে খাদ্যের নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, ক্রয়ক্ষমতা ও ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

Manual6 Ad Code

একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত টন ধান উৎপাদিত হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হবে, কৃষক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না; নিম্ন আয়ের পরিবার পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে কি না; শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না; খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে কি না; এবং ভোক্তা খাদ্যের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন কি না।

বিশ্ব খাদ্য দিবসের অঙ্গীকারকে বাস্তব জীবনে রূপ দিতে হলে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও প্রচারণার বাইরে গিয়ে কার্যকর নীতি, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পুষ্টিশিক্ষা, খাদ্য অপচয় হ্রাস এবং প্যাকেটজাত খাবারের বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের মতো উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তা কোনো এক দিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, খাদ্যব্যবস্থা মানুষের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করছে, কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে না এবং উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি বজায় থাকছে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কেউ ক্ষুধার কারণে বঞ্চিত হবেন না, অর্থের অভাবে পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে থাকবেন না এবং অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হবেন না। খাদ্য হবে সহজলভ্য, পুষ্টিকর ও নিরাপদ; কৃষক পাবেন ন্যায্য মূল্য; ভোক্তা পাবেন সঠিক তথ্য; আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক খাদ্যব্যবস্থা।

নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ। সুস্থ জীবন, পুষ্টিকর খাদ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রতিদিনের জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে।
#

লেখক পরিচিতি

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; ’৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি; বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি।

ই-মেইল: syedzaman.62@gmail.com