প্রবাসীর মৃত্যু, রাষ্ট্রের দায় ও নাগরিকত্বের নৈতিকতা প্রশ্ন!

প্রকাশিত: ৩:২৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬

প্রবাসীর মৃত্যু, রাষ্ট্রের দায় ও নাগরিকত্বের নৈতিকতা প্রশ্ন!

Manual4 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

রেমিট্যান্স নেবেন, কিন্তু মরদেহ নিতে আপত্তি কেন? রাষ্ট্র কি নাগরিকের মৃত্যুর পরও মর্যাদা অস্বীকার করবে?

প্রবাসীর শ্রমে অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, অথচ বিপদে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দায় এড়িয়ে যাওয়া হবে—এ কেমন রাষ্ট্রচিন্তা? নাগরিকের অপরাধের বিচার আদালত করবে, কিন্তু তাঁর মরদেহ স্বদেশে ফিরবে কি না, সেই নৈতিক রায় দেওয়ার অধিকার কারও নেই।

একজন মানুষ যখন বিদেশে পাড়ি জমান, তখন তিনি শুধু একটি চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশ ছাড়েন না। সঙ্গে নিয়ে যান পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন, ঋণের বোঝা, প্রিয়জনদের প্রত্যাশা এবং নিজের দেশের প্রতি এক ধরনের নীরব আস্থা। তাঁর বিশ্বাস থাকে, বিদেশের মাটিতে যত প্রতিকূলতাই আসুক, প্রয়োজনে পেছনে একটি রাষ্ট্র আছে, একটি পতাকা আছে, একটি দূতাবাস আছে, আছে নিজের দেশে ফিরে আসার অধিকার। সেই বিশ্বাসই তাঁকে পরিবার ছেড়ে হাজার মাইল দূরে কাজ করার মানসিক শক্তি জোগায়।

কিন্তু সেই মানুষটির জীবনের শেষ অধ্যায়ে যদি প্রশ্ন ওঠে—তাঁর মরদেহ দেশে ফিরবে কি না, তিনি মৃত্যুর পরও স্বদেশের গ্রহণযোগ্য নাগরিক কি না, কিংবা তাঁর অপরাধের অভিযোগের কারণে তাঁর মরদেহ দেশে আসা উচিত কি না—তখন প্রশ্নটি আর শুধু একটি পরিবারের শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি রাষ্ট্রের চরিত্র, সমাজের নৈতিকতা এবং নাগরিকত্বের ধারণাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান আমরা গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করি। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়, পরিবারের জীবনমান উন্নত করে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনে এবং জাতীয় অর্থনীতির নানা সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁদের আমরা বলি ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’। বিমানবন্দরে তাঁদের সম্মান জানাই, তাঁদের অবদান নিয়ে বক্তৃতা দিই, তাঁদের সাফল্যের গল্প প্রকাশ করি।

কিন্তু সেই প্রবাসী শ্রমিক যখন কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হন, বিনা বেতনে কাজ করতে বাধ্য হন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মারা যান, বিদেশে আটক হন কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন, তখন রাষ্ট্র তাঁর পাশে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়? তাঁর আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে কতটা সক্রিয় হয়? তাঁর পরিবারের কাছে সত্য তুলে ধরতে কতটা আন্তরিকতা দেখায়?

আর তাঁর মৃত্যুর পর যখন তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন ওঠে, তখনও যদি তাঁকে অপরাধের পরিচয়ে বিচার করা হয়, তাহলে আমাদের নাগরিকত্ববোধের ভিত নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হয়।

যে রাষ্ট্র নাগরিকের শ্রমের মূল্য গ্রহণ করে, সেই রাষ্ট্র তাঁর জীবন, অধিকার ও মৃত্যুর পর মর্যাদার দায় এড়াতে পারে না।

রেমিট্যান্সের গৌরব, মানবিক দায়ের সংকট

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবাসী শ্রমিকের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি তাঁদের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠান। সেই অর্থে চলে পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং সামাজিক উন্নয়নের অসংখ্য উদ্যোগ। অনেক পরিবারের কাছে প্রবাসী সদস্যের পাঠানো অর্থই দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের একমাত্র অবলম্বন।

কিন্তু এই অর্থের পেছনে যে শ্রম, ঝুঁকি, বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক যন্ত্রণা রয়েছে, জাতীয় আলোচনায় তা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।

একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন, সুদের বোঝা কাঁধে নেন। অনেক সময় দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হন। বিদেশে পৌঁছে প্রত্যাশিত কাজ পান না, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বেতন পান না, কিংবা এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ তাঁর জানা থাকে না। নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ হলে চাকরি হারানোর পাশাপাশি আবাসন, বৈধ অবস্থান ও দেশে ফেরার সক্ষমতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

অথচ দেশে ফিরে তাঁর পাঠানো অর্থকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প তৈরি হয়। তাঁর নামে ব্যাংকিং সেবা, প্রণোদনা, সম্মাননা এবং নানা উদ্যোগের প্রচার চলে। এই উদ্যোগগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি নেই। আপত্তি হলো, অর্থনৈতিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পায় কি না।

একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নাগরিকের উপার্জিত অর্থকে বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিয়ে আসা নয়; সেই অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে নাগরিকটি যেন শোষণ, নির্যাতন, প্রতারণা কিংবা বিচারবহির্ভূত অবহেলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রবাসীর অর্থ আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করবে, অথচ তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাষ্ট্র নীরব থাকবে—এমন অসম সম্পর্ক কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সৌদি আরব: ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহি এক বিষয় নয়

সৌদি আরব বাংলাদেশের মানুষের কাছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দেশ। পবিত্র মক্কা ও মদিনার কারণে দেশটির প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও শ্রদ্ধা গভীর। হজ ও ওমরাহর সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

কিন্তু ধর্মীয় শ্রদ্ধা আর একটি রাষ্ট্রের শ্রমনীতি, বিচারব্যবস্থা কিংবা মানবাধিকার পরিস্থিতির সমালোচনামূলক মূল্যায়ন—এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

কোনো দেশের ধর্মীয় গুরুত্ব তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলে দিতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থও এই নয় যে, সেখানে কর্মরত নিজেদের নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে আমরা নীরব থাকব।

রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের একটি বাস্তব দিক রয়েছে; অন্যদিকে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন রয়েছে। পরিণত কূটনীতি এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন, সেখানে সহযোগিতা করবে; যেখানে নাগরিকের অধিকার বিপন্ন, সেখানে তথ্য চাইবে, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে এবং প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানাবে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলেই প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কারণ সম্পর্কের গভীরতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল শুধু রাষ্ট্র বা অর্থনীতির স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না, সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

শ্রমিকের স্বাধীনতা কতখানি?

সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিকদের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বিশেষ করে গৃহকর্মী, নারী অভিবাসী শ্রমিক এবং নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল কর্মীদের ক্ষেত্রে শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গৃহকর্মীদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, বেতন আটকে রাখা, চলাচলে বিধিনিষেধ, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং জবরদস্তিমূলক শ্রমের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে। ২০১৯ সালে বিবিসি নিউজ অ্যারাবিকের একটি অনুসন্ধানে সৌদি আরবের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গৃহকর্মীদের অবৈধ কেনাবেচাসদৃশ বিজ্ঞাপন প্রকাশের বিষয়টিও সামনে আসে।

এসব অভিযোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে শ্রমিকের স্বাধীনতার প্রশ্নটি বুঝতে হবে।

একজন শ্রমিক কেবল মজুরি পেলেই স্বাধীন শ্রমিক হয়ে ওঠেন না। তাঁর কাজের পরিবেশ কেমন, কর্মঘণ্টার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ আছে কি না, বেতন চাইতে পারেন কি না, নির্যাতনের অভিযোগ করতে পারেন কি না, নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ আছে কি না এবং প্রয়োজনে নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যখন একজন শ্রমিকের বাসস্থান, আয়, চলাচল এবং আইনি অবস্থান কার্যত অন্য কারও ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তাঁর পক্ষে শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যায়। কাগজে-কলমে কর্মসংস্থান থাকলেও বাস্তবে স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।

এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। সৌদি আরবে কর্মরত সব শ্রমিকের অভিজ্ঞতা এক নয়, সব নিয়োগকর্তাও একই রকম নন। দেশটিতে শ্রম সংস্কার ও সুরক্ষামূলক বিধান প্রবর্তনের উদ্যোগও রয়েছে। কিন্তু আইনে কোনো অধিকার স্বীকৃত থাকা আর বাস্তবে সেই অধিকার কার্যকরভাবে ভোগ করতে পারা এক বিষয় নয়।

প্রশ্ন হলো, অভিযোগ উঠলে শ্রমিক কত সহজে প্রতিকার পান? অভিযোগ জানানোর কারণে চাকরি, বাসস্থান কিংবা বৈধ অবস্থান হারানোর আশঙ্কা থাকে কি না? ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা সহজ? নির্যাতনের শিকার একজন নারী গৃহকর্মী নিরাপদ আশ্রয় ও স্বাধীন আইনি সহায়তা পান কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শ্রমবাজারের সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বলা যায় না।

আধুনিক দাসত্বের আলোচনাও এখানেই প্রাসঙ্গিক। সব অভিবাসী শ্রমিককে দাস বলা যেমন তথ্যগতভাবে ভুল, তেমনি জবরদস্তিমূলক শ্রম, স্বাধীনতা হরণ ও শোষণের বাস্তবতাকে কেবল চাকরির সমস্যা বলে পাশ কাটানোও অন্যায়। একজন মানুষকে তাঁর শ্রমের বিনিময়ে মজুরি দেওয়া হচ্ছে কি না, তার পাশাপাশি তাঁকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কতখানি স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে নতুন নয়। কখনো দুর্ঘটনা, কখনো অসুস্থতা, কখনো কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি, কখনো আত্মহত্যা, আবার কখনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অস্পষ্টতা—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা মারা যান। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন এবং অসংখ্য অনুত্তরিত প্রশ্ন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের সংগৃহীত তথ্যের বরাতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবে ৮৮৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ হয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, এসব মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল।

এই পরিসংখ্যান নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে মৃত্যুগুলোর সবই অস্বাভাবিক ছিল, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর জন্য নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়ী। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: বিদেশে এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির মৃত্যু হলে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় ময়নাতদন্ত, পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ একটি চিকিৎসাগত বা প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাস হতে পারে। কিন্তু সেই শ্রেণিবিন্যাস কীভাবে নির্ধারিত হলো, মৃত্যুর আগে কর্মপরিবেশ কেমন ছিল, কোনো রোগের চিকিৎসা পাওয়া গিয়েছিল কি না, অতিরিক্ত শ্রম বা তীব্র তাপের প্রভাব ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারের সন্দেহ দূর হয় না।

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পাওয়া পরিবারের অধিকার। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের জন্যও জরুরি। মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিকের আবাসন এবং নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

প্রবাসীর মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। সেটি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা মূল্যায়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশের দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিদেশে মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। মৃত্যুর কারণ, তদন্তের অবস্থা, মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া, বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণের দাবি এবং পরিবারের সহায়তা—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা দরকার। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পরিবারের সম্মতি রক্ষা করেই এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

মৃত্যুদণ্ড, কূটনীতি এবং জানার অধিকার

গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা প্রবাসী অধিকার ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’-সংক্রান্ত অভিযোগের কথা জানিয়েছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আগে না পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে এবং পরে সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার কথা জানানো হয়।

এ ধরনের ঘটনায় আবেগের পাশাপাশি তথ্যের যথার্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের প্রকৃতি, মামলার নথি, আদালতের রায়, আপিলের সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা জরুরি। তবে একটি মৌলিক নীতি এখানে স্পষ্ট: বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাঁর ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।

অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে। কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, কার্যকর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, দোভাষী ও আইনজীবীর সহায়তা এবং কনস্যুলার যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কোনো বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে প্রতিটি ক্ষেত্রে আগাম অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নির্দিষ্ট ঘটনা ও প্রযোজ্য আইনি বিধানের আলোকে যাচাই করতে হবে। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহিতকরণের বাধ্যবাধকতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান দেয়। ৩৭ অনুচ্ছেদ বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু-সংক্রান্ত কিছু পরিস্থিতিতে কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করে। তবে এসব অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নির্ভর করে ঘটনার ধরন, সংশ্লিষ্ট বিধান এবং রাষ্ট্রগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতার ওপর।

তাই বাংলাদেশের প্রশ্ন তোলার ভিত্তি হওয়া উচিত তথ্য, আইন ও কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া একটি পদক্ষেপ হতে পারে; কিন্তু কার্যকর কূটনীতি শুধু ব্যাখ্যা চাওয়ায় শেষ হয় না। সংশ্লিষ্ট মামলার তথ্য সংগ্রহ, বিচারপ্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা, কনস্যুলার যোগাযোগের বাস্তব অবস্থা নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি।

বিদেশে কর্মরত নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাঁর পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিচার শেষ হওয়ার পর নয়, বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালেই রাষ্ট্রের কনস্যুলার সক্ষমতার কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়া দরকার।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঘটনাটিকে ‘আমাদের জন্য শিক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে প্রকাশিত বক্তব্যে উঠে এসেছে। এই মন্তব্যের তাৎপর্য এখানেই—শিক্ষাটি যেন কেবল ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। কী ব্যর্থতা ঘটেছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল, কনস্যুলার যোগাযোগ কার্যকর ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আনা হবে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার।

প্রশ্নটি তাই শুধু দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, বিদেশে একজন বাংলাদেশির জীবন যখন চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন তাঁর রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত থাকে?

‘ঐ পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক এটা আমি চাই না’

এই বিতর্কে আরও অস্বস্তিকর একটি বিষয় হলো, বিএনপির সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতনের স্টার টিভিতে প্রচারিত মন্তব্য—“ঐ পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক এটা আমি চাই না।”

Manual7 Ad Code

একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত মন্তব্যকে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। একইভাবে একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো রাজনৈতিক দল কিংবা দেশের সব মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করাও যুক্তিসংগত নয়। কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধির বক্তব্যের সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য থাকে। বিশেষ করে যখন সেই বক্তব্য বিদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নাগরিকের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে উচ্চারিত হয়।

এখানে মূল প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তির অপরাধকে সমর্থন করা বা অস্বীকার করা নয়। প্রশ্ন হলো, অপরাধের বিচার এবং মৃত্যুর পর মানুষের মর্যাদাকে আমরা কীভাবে পৃথক করে দেখি।

কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকলে তাঁর বিচার হবে। আদালত প্রমাণ, সাক্ষ্য ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করে রায় দেবেন। শাস্তি নির্ধারণের অধিকারও আইন ও বিচারব্যবস্থার নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে থাকবে। কিন্তু একজন ব্যক্তিকে ‘পাপী’ আখ্যা দিয়ে তাঁর মরদেহ স্বদেশে ফিরতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নকে নৈতিক শুদ্ধতার পরীক্ষায় পরিণত করা বিপজ্জনক।

কারণ মরদেহের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না, কোনো অর্থনৈতিক অবদান থাকে না, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও থাকে না। কিন্তু মরদেহের সঙ্গে থাকে একটি পরিবারের শোক, মা-বাবার অপেক্ষা, সন্তানের স্মৃতি, স্ত্রীর বা স্বামীর অনিশ্চয়তা এবং প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখার আকুতি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধীকে নির্দোষ ঘোষণা করা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইনানুগ প্রক্রিয়া, নাগরিকের অধিকার এবং পরিবারের মানবিক প্রয়োজনের মধ্যে ন্যায়সংগত ভারসাম্য বজায় রাখা।

মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা মানে অপরাধকে সমর্থন করা নয়। এটি কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়াও নয়। বরং এটি স্বজনদের শোক প্রকাশের সুযোগ, পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতির প্রতি সম্মান এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের ন্যূনতম মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হবে কি না, তা কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত নৈতিক আপত্তিকে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিণত করা যায় না।

একজন মানুষ অপরাধী হতে পারেন; কিন্তু তাঁর অপরাধের বিচার আর তাঁর পরিবারকে শোক পালনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এক বিষয় নয়।

নাগরিকত্ব কোনো পুরস্কার নয়, যা রাষ্ট্র ভালো আচরণের বিনিময়ে প্রদান করবে। এটি অধিকার ও দায়িত্বের সম্পর্ক, যা আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হওয়ার কথা।

রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের পরিচয় কি শুধু অর্থনৈতিক?

আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনায় প্রবাসী শ্রমিককে প্রায়ই অর্থনৈতিক অবদানের নিরিখে মূল্যায়ন করা হয়। তিনি কত টাকা পাঠিয়েছেন, কত বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে, তাঁর রেমিট্যান্সে কত পরিবার উপকৃত হয়েছে—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন নাগরিকের মূল্য কি তাঁর অর্থনৈতিক অবদানের সমান?

যে শ্রমিক দেশে প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠান, তাঁর অধিকার যেমন সুরক্ষিত থাকা উচিত, তেমনি যে শ্রমিক অল্প আয় করেন, চাকরি হারান, ঋণগ্রস্ত হন কিংবা কোনো অপরাধে দণ্ডিত হন, তিনিও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাঁর আইনি অধিকার এবং মৌলিক মানবিক মর্যাদা অর্থনৈতিক অবদানের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না।

নাগরিকত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখন, যখন নাগরিকটি ক্ষমতাহীন। তিনি যখন বিদেশি ভাষায় নিজের কথা বলতে পারেন না, আইনি ব্যবস্থা বোঝেন না, ব্যয়বহুল আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না, কিংবা প্রভাবশালী নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সাহস পান না—তখন তাঁর রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

রাষ্ট্র যদি কেবল সফল নাগরিককে সম্মান জানায়, কিন্তু বিপদগ্রস্ত নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নাগরিকত্বের ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এই দায়বদ্ধতা অপরাধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নাগরিকের অপরাধকে আড়াল করা রাষ্ট্রের কাজ নয়; আবার অপরাধের কারণে তাঁর ন্যায্য বিচার, কনস্যুলার সহায়তা কিংবা প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অধিকারকে অস্বীকার করাও রাষ্ট্রের কাজ নয়।

আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা নয়। আইনের শাসন মানে অপরাধের অভিযোগের মুখেও আইনানুগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান মেনে চলা এবং ব্যক্তিগত ঘৃণাকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে না দেওয়া।

কূটনীতির সাফল্য শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দিয়ে মাপা যায় না

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ধর্মীয় যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের স্বার্থ রয়েছে। এই সম্পর্ককে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। বরং বাংলাদেশের উচিত সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করা।

কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্কের সাফল্য শুধু উচ্চপর্যায়ের সফর, যৌথ বিবৃতি, বিনিয়োগের ঘোষণা কিংবা শ্রমিক নিয়োগের সংখ্যায় পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো, বিদেশে কর্মরত সাধারণ নাগরিকের সমস্যা সমাধানে সেই সম্পর্ক কতটা কার্যকর।

একজন বাংলাদেশি শ্রমিক বেতন না পেলে দূতাবাস কী করে? তিনি নিয়োগকর্তার নির্যাতনের অভিযোগ করলে কী ধরনের সহায়তা পান? তাঁর পাসপোর্ট আটকে রাখা হলে কীভাবে প্রতিকার পান? দুর্ঘটনায় মারা গেলে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়? তাঁর পরিবার ক্ষতিপূরণ দাবি করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কে যোগাযোগ করে? গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে তিনি আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য দূতাবাস কী ভূমিকা রাখে?

এসব প্রশ্নের উত্তরেই কূটনীতির কার্যকারিতা দৃশ্যমান হয়।

বাংলাদেশের কূটনীতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন মানবিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশ হবে।

সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমবাজার-সংক্রান্ত আলোচনায় কর্মপরিবেশ, বেতন পরিশোধ, শ্রমিকের নিরাপদ বাসস্থান, অভিযোগ নিষ্পত্তি, নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ, চিকিৎসাসেবা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে গুরুত্ব পেতে হবে।

বাংলাদেশি শ্রমিকের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কূটনৈতিক দৃঢ়তা দেখানো সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের বিরোধিতা নয়। বরং একটি সুস্থ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কের ভিত্তি হলো উভয় পক্ষের নাগরিক ও আইনি দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া।

দূতাবাস কি শুধু কাগজপত্রের প্রতিষ্ঠান?

প্রবাসীদের কাছে দূতাবাস বা কনস্যুলেট অনেক সময় শেষ আশ্রয়ের জায়গা। নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ, বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা, আটক হওয়া কিংবা মৃত্যুর মতো সংকটে পরিবার ও শ্রমিক দূতাবাসের দ্বারস্থ হন।

Manual4 Ad Code

কিন্তু দূতাবাসের সেবা যদি জটিল প্রক্রিয়া, দীর্ঘ অপেক্ষা, ভাষাগত সমস্যা কিংবা যোগাযোগের অসুবিধায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সবচেয়ে অসহায় মানুষটির জন্য সেই প্রতিষ্ঠান কার্যকর আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে না।

প্রবাসী শ্রমিকের জন্য দূতাবাসের সেবা সহজলভ্য, দ্রুত এবং জবাবদিহিমূলক হওয়া জরুরি। জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ গ্রহণের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানার সুযোগ থাকতে হবে। গুরুতর অপরাধে আটক নাগরিকের ক্ষেত্রে আইনজীবী, দোভাষী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে, প্রযোজ্য আইন ও কনস্যুলার সীমাবদ্ধতা মেনে।

এখানে একটি বাস্তবতা মনে রাখা দরকার। দূতাবাস বিদেশি আদালতের রায় বাতিল করতে পারে না, কোনো দেশের আইন নিজের ইচ্ছায় পরিবর্তন করাতে পারে না এবং সব ধরনের আইনি ফল নিশ্চিত করার ক্ষমতাও রাখে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তার ভূমিকা সীমিত। তথ্য সংগ্রহ, নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রযোজ্য কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা, উপযুক্ত আইনি সহায়তা খুঁজে পেতে সহযোগিতা করা এবং পরিবারের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া—এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

রাষ্ট্রের সক্ষমতা মানে সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করার ক্ষমতা নয়; বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকা।

বাংলাদেশের বিদেশস্থ মিশনগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও শুধু কতটি পাসপোর্ট ইস্যু হয়েছে, কতটি কাগজ সত্যায়িত হয়েছে কিংবা কতজনকে সেবা দেওয়া হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। শ্রমিকের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কত সময় লেগেছে, মৃত্যুর পর পরিবারকে কত দ্রুত তথ্য দেওয়া হয়েছে, বকেয়া মজুরি আদায়ে কতটা সহায়তা করা হয়েছে এবং গুরুতর মামলায় কনস্যুলার যোগাযোগ কতটা কার্যকর হয়েছে—এসব সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে।

পরিবার শুধু মরদেহ চায় না, সত্যও চায়

বিদেশে কোনো শ্রমিক মারা গেলে তাঁর পরিবারের প্রথম চাওয়া সাধারণত প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু তার সঙ্গে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকে।

কীভাবে মৃত্যু হলো? তিনি কি কর্মস্থলে ছিলেন? কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল কি? অসুস্থ হলে চিকিৎসা পেয়েছিলেন কি? তাঁর বকেয়া বেতন রয়েছে কি? নিয়োগকর্তার কাছে কোনো পাওনা আছে কি? জীবনবিমা বা প্রযোজ্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি? মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে তদন্তের ব্যবস্থা হবে কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া পরিবারের ন্যায্য অধিকার। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই সব দায়িত্বের সমাপ্তি নয়।

অনেক পরিবারের কাছে বিদেশে কর্মরত সদস্য ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি শুধু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে না; ঋণ, জীবিকার সংকট এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মুখেও পড়ে। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ তখনও পরিশোধ করতে হয়। সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের দায়ও থেকে যায়।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের উচিত মৃত শ্রমিকের পরিবারের জন্য একটি সমন্বিত সহায়তাব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর মধ্যে থাকতে পারে মৃত্যুর তথ্য যাচাই, মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়ায় সহায়তা, প্রাপ্য বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণ দাবি, বিমাসংক্রান্ত তথ্য, আইনি সহায়তা এবং প্রযোজ্য সরকারি তহবিল থেকে সহযোগিতা।

একই সঙ্গে বিদেশে মৃত্যুর ঘটনায় তথ্য সংগ্রহ ও তদন্তের প্রক্রিয়া এমন হতে হবে, যাতে পরিবার চাইলে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পেতে পারে। সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্তের সুযোগ থাকা জরুরি। আর মৃত্যু স্বাভাবিক বলে নির্ধারিত হলেও পরিবারকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য পাওয়ার পথ দেখাতে হবে।

একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা শুধু শোকবার্তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শোকাহত পরিবারকে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে ফেলে না রেখে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই সেই মানবিকতার বাস্তব প্রকাশ ঘটে।

এখন কী করা দরকার?

এই সংকটের সমাধান শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা।

প্রথমত, সৌদি আরবসহ বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্যের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত হালনাগাদযোগ্য ডেটাবেইস গড়ে তুলতে হবে। মৃত্যুর তারিখ, স্থান, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কারণ, তদন্তের অবস্থা, মরদেহ প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি এবং পরিবারের সহায়তার বিষয়গুলো যথাযথ গোপনীয়তা রক্ষা করে নথিবদ্ধ করা দরকার। অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে কী ধরনের অনুসন্ধান করা হয়েছে, তারও প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গুরুতর ফৌজদারি মামলায় আটক বাংলাদেশিদের জন্য কনস্যুলার সহায়তার সুস্পষ্ট প্রটোকল প্রয়োজন। নাগরিক আটক হওয়ার খবর পাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ, দোভাষী ও আইনজীবীর সহায়তা সম্পর্কে তথ্য এবং প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলে মামলার গুরুত্ব অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে।

তৃতীয়ত, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর আগেই তাঁদের অধিকার সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কোন চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন, বেতন না পেলে কোথায় অভিযোগ করবেন, পাসপোর্ট আটকে রাখা হলে কী করবেন, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ হলে কীভাবে সহায়তা পাবেন এবং জরুরি অবস্থায় দূতাবাসের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবেন—এসব বিষয়ে সহজ ভাষায় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। নারী গৃহকর্মীসহ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যাওয়া শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা থাকতে হবে।

চতুর্থত, সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় শ্রমিকের অধিকারকে নিয়মিত আলোচ্যসূচিতে রাখতে হবে। নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা, চুক্তি অনুযায়ী বেতন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শ্রমিকের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে তথ্য বিনিময় ও ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে।

পঞ্চমত, বিদেশে মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের পরিবারের জন্য সহায়তা সহজ করতে হবে। মরদেহ দেশে আনা, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণ দাবি এবং আইনি পরামর্শের জন্য একটি সমন্বিত সহায়তাকেন্দ্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারকে যেন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে না হয়, সে জন্য দায়িত্ব নির্ধারণ ও নির্দিষ্ট সময়সীমার ব্যবস্থা দরকার।

ষষ্ঠত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যে নাগরিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। কোনো নাগরিকের অপরাধের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাঁর পরিবারকে অপমান করা কিংবা তাঁর মরদেহ নিয়ে নৈতিক বর্জনের ভাষা ব্যবহার করা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখেও মানবিকতা, সংযম এবং আইনি নীতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো সম্ভব।

সপ্তমত, প্রবাসী কল্যাণসংক্রান্ত সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য প্রকাশ্য জবাবদিহির ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। দূতাবাসগুলো কতটি গুরুতর অভিযোগ পেয়েছে, কতটির নিষ্পত্তি হয়েছে, কতটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং কোন ধরনের সমস্যায় সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে শুধু প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে না, নীতিনির্ধারণও হবে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে।

প্রবাসীর অধিকার কোনো দয়া নয়

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে আমাদের জনপরিসরে একটি প্রচলিত ভাষা রয়েছে—তাঁরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তাঁরা রেমিট্যান্স যোদ্ধা, তাঁরা দেশের গর্ব। এই ভাষার ইতিবাচক দিক আছে। কিন্তু এর মধ্যে একটি ঝুঁকিও রয়েছে: আমরা কখনো কখনো তাঁদের মানুষ হিসেবে মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে অর্থনৈতিক অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে শুরু করি।

যেন তাঁরা অর্থ পাঠান বলেই সম্মান পাওয়ার যোগ্য। যেন তাঁদের উপার্জনের কারণেই তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব তৈরি হয়।

বাস্তবতা তার উল্টো। তাঁরা অর্থ পাঠান বলে নয়, তাঁরা মানুষ ও নাগরিক বলেই তাঁদের অধিকার রয়েছে। রেমিট্যান্স তাঁদের অধিকার রক্ষার কোনো মূল্য নয়; বরং তাঁদের অধিকার রক্ষা রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র দায়িত্ব। যিনি অর্থ পাঠাতে পারছেন না, যিনি অসুস্থ, যিনি বেকার, যিনি আইনি জটিলতায় পড়েছেন কিংবা যিনি অপরাধে দণ্ডিত—তাঁর ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য।

একটি মানবিক রাষ্ট্র নাগরিকের প্রতি তার দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে না তাঁর জনপ্রিয়তা, সম্পদ, সামাজিক অবস্থান কিংবা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। বরং নাগরিকটি যত বেশি অসহায়, তাঁর অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই কারণেই বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশির নিরাপত্তার প্রশ্নকে কেবল শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, কূটনীতি এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আমাদেরই

বিদেশে কর্মরত একজন বাংলাদেশি যখন অর্থ পাঠান, তখন সেই অর্থ দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। তাঁর পরিবার উপকৃত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান শক্তিশালী হয়। রাষ্ট্র ও সমাজ তাঁর অবদানের সুফল ভোগ করে।

কিন্তু সেই মানুষটি যখন বিদেশে বিপদে পড়েন, তখন তাঁর পাসপোর্ট, তাঁর আইনি অধিকার, তাঁর নিরাপত্তা এবং তাঁর মর্যাদার প্রশ্নও রাষ্ট্রের সামনে এসে দাঁড়ায়। তিনি মারা গেলে তাঁর পরিবারের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়া, মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা এবং প্রযোজ্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করাও সেই দায়িত্বের অংশ।

Manual5 Ad Code

আর তিনি যদি অপরাধে অভিযুক্ত হন বা দণ্ডিত হন, তবুও আইনের শাসন ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন বিলীন হয়ে যায় না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অপরাধের বিচার আদালতের কাজ। রাষ্ট্রের কাজ হলো আইনানুগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, নাগরিকের প্রযোজ্য অধিকার রক্ষা করা এবং পরিবারের মানবিক প্রয়োজনকে সম্মান করা। একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত নৈতিক আপত্তি কোনো নাগরিকের মরদেহের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার নির্ধারণের মানদণ্ড হতে পারে না।

একটি দেশের মর্যাদা শুধু তার অর্থনীতির আকার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে সেই দেশের সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের প্রতি আচরণে।

যে শ্রমিক বিদেশে ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন, তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি বিপদে পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি মারা গেলে তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই দায়িত্ব কোনো করুণা নয়, কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, কোনো অর্থনৈতিক বিনিময়ও নয়। এটি নাগরিকত্বের মৌলিক অঙ্গ।

তাই প্রশ্নটি শুধু সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরবে কি না, তা নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর: আমাদের রাষ্ট্র কি নাগরিককে কেবল তাঁর শ্রম ও উপার্জনের সময় মনে রাখবে, নাকি তাঁর বিপদ, অসহায়ত্ব এবং মৃত্যুর পরও তাঁর মর্যাদার পাশে দাঁড়াবে?

Manual2 Ad Code

রেমিট্যান্স গ্রহণ করা হবে, কিন্তু প্রবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না; তাঁর শ্রমের প্রশংসা করা হবে, কিন্তু বিপদের সময় তাঁকে একা ছেড়ে দেওয়া হবে; তাঁর অপরাধের বিচারকে স্বাগত জানানো হবে, কিন্তু তাঁর পরিবারের শোক ও মর্যাদার প্রশ্নকে তুচ্ছ করা হবে—এমন রাষ্ট্রচিন্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কত অর্থ সে পায়, তা দিয়ে নয়; বরং সবচেয়ে অসহায় নাগরিকটির অধিকার রক্ষায় সে কতটা দৃঢ়, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।

প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো প্রতিটি রেমিট্যান্স আমাদের একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর বিদেশের মাটিতে তাঁর প্রতিটি মৃত্যু আমাদের সামনে একটি নৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরে: আমরা কি শুধু তাঁর উপার্জনের অংশীদার, নাকি তাঁর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদারও দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে, আমাদের কাছে নাগরিকত্ব কেবল একটি পরিচয়পত্র, নাকি বিপদের মুহূর্তেও পাশে থাকার একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার।
#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; ’৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি; বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি।

ই-মেইল: syedzaman.62@gmail.com

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ