সিলেট ২০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২৬
‘আমার দেখা সাংবাদিকতা’। এটি আমার লিখতে থাকা একটি বইয়ের নাম। বইটিতে আছে অসংখ্য ভালো-মন্দ স্মৃতি, আনন্দ-বেদনার গল্প, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব। আছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার গভীর সংকটের কথা, সেই সংকটের পেছনের কারণ, দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে আমার নিজের দেখা ও অভিজ্ঞতার নানা ঘটনা। সব মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠছে টক-ঝাল-মিষ্টি উপাদানে ভরা সাংবাদিকতার এক বিচিত্র আখ্যান।
বইটির লেখা এখনো শেষ হয়নি। কাজেই এ মুহূর্তে বইটি নিয়ে আগেভাগে প্রচার কিংবা প্রকাশের কোনো তাড়া আমার নেই। আগে লিখে উঠি। তারপর দেখা যাবে। তবে এরই মধ্যে অসংখ্য ঘটনা লিখে ফেলেছি। যে পর্যন্ত লিখেছি, তাতে মনে হয়, প্রতিটি ঘটনা নিয়ে আলাদা করে কথা বলতে গেলে শতপর্বের পডকাস্ট হয়ে যাবে।
আজ হঠাৎ করেই একটি পর্ব রেকর্ড করতে ইচ্ছে হলো। কেন ইচ্ছে হলো, তা ঠিক জানি না। তবে বইয়ের কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা নিয়ে পডকাস্টে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমন দু-একটি ঘটনা আছে, যেগুলো কেবল গল্প নয়, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে মানুষ চেনার অভিজ্ঞতাও। আপাতত দুটি সংবাদমাধ্যমের কথা বলব। আশ্চর্যের বিষয়, দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার একটি অদ্ভুত মিল আছে। দুই জায়গার কোনোটিতেই ছয় মাসের বেশি থাকা সম্ভব হয়নি। বলছি না, থাকতে চাইনি। বরং বলা ভালো, টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাগুলো শুনে আপনাদের কারও কারও হয়তো বেশ মজার মনে হবে। কিন্তু আমার কাছে এগুলো মোটেও মজার নয়। চার্লি চ্যাপলিনের একটি কথা মনে পড়ে। লং শটে যে দৃশ্যটি হাসির মনে হয়, ক্লোজআপে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বেদনার। আমার অভিজ্ঞতাও অনেকটা সে রকম। দূর থেকে ঘটনাগুলো হয়তো হাস্যকর, কিন্তু খুব কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এর মধ্যে কতটা হতাশা, বিস্ময় আর কষ্ট জমে আছে।
প্রথমে বলি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কথা। সেখানে আইটি কাম ওয়েব প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মরত একজনের একটি কাজের কথা শুনলে আপনারা হয়তো প্রশ্ন করবেন, এমন একজনকে চাকরিতে রেখেছিলাম কেন? কিংবা কেন তাঁকে চাকরিচ্যুত করিনি?
আমার কর্মজীবনে একটি বিষয়ে আমি বরাবরই সচেতন থেকেছি। আমি চাকরি দিয়েছি বহু সংবাদকর্মীর। কখনো কাউকে চাকরি থেকে বাদ দিইনি। ভুল করলে শিখিয়েছি, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি দেখলে শুধরানোর চেষ্টা করেছি। কাউকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বাদ দেওয়ার পক্ষে আমি নই। তবে এটাও ঠিক, সেই নীতির কারণে কখনো কখনো আমাকে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
যাঁর কথা বলছি, তাঁর চেহারায় ছিল একধরনের নিষ্পাপ সরলতা। মুখভর্তি লম্বা দাড়ি। আমি নতুন প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি ওমরাহ করতে গেলেন। ফিরে এলেন। তাঁর কথাবার্তায় বিনয় এতটাই প্রকট ছিল যে, প্রায় প্রতিটি বাক্যের শুরুতে একটি ‘স্যার’ থাকত, শেষেও আরেকটি ‘স্যার’ যোগ হতো। এমন সম্বোধন শুনলে যে কেউ তাঁকে অত্যন্ত বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল মানুষ বলেই ধরে নেবেন।
প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মীদের মতো তাঁরও বেতন-ভাতা বাড়িয়েছি। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছি। ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে কখনো কটু কথা বলেছি বলেও মনে পড়ে না। তাঁর সঙ্গে আমার এমন কোনো বিরোধও ছিল না, যা থেকে ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্ম হতে পারে।
একদিন তাঁকে ডেকে বললাম, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদগুলোর শিরোনামের ফন্ট খুব ছোট। পাঠকদের পড়তে অসুবিধা হয়। ফন্টের আকার একটু বাড়িয়ে দিতে হবে। কাজটি খুবই সাধারণ। বড়জোর পাঁচ মিনিটের কাজ। তাঁকে বললাম, যত দ্রুত সম্ভব করে ফেলুন। এ-ও জানিয়ে দিলাম, বিষয়টি চেয়ারম্যান মহোদয়েরও নির্দেশ। তিনিও ওয়েবসাইট পড়তে গিয়ে একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
এমন একটি সাধারণ নির্দেশ বাস্তবায়নে কতক্ষণই বা লাগার কথা? অথচ কাজটি করতে তাঁর চার দিন লেগে গেল। শুধু তাই নয়, প্রতিদিনই আমাকে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে হয়েছে যে ফন্টের আকার এখনো বাড়েনি। কাজটি যেন করতে চাইছিলেন না তিনি। নানা অজুহাতে সময় পার করছিলেন।
বিষয়টি আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। পরে খোঁজখবর নিয়ে যা জানতে পারলাম, তাতে বিস্মিত না হয়ে পারিনি। আমাকে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে আমার কাজের সক্ষমতা ও পারফরম্যান্সকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি নাকি কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখেছিলেন।
আমি সত্যিই হতবাক হয়েছিলাম। একজন কর্মী তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পাদকের নির্দেশ অমান্য করছেন, এমনকি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি সাধারণ কাজকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত হিসাব মেলানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, এ ধারণা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। এর চেয়েও বিস্ময়কর ছিল, যে মানুষটির কথাবার্তায় এত বিনয়, তাঁর আচরণের পেছনে এমন উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ!
মানুষকে চেনা যে কত কঠিন, এমন অভিজ্ঞতা তা আবারও বুঝিয়ে দিয়েছিল। কারও মুখের ভাষা আর ভেতরের উদ্দেশ্য যে সব সময় এক হয় না, কর্মজীবনে তার অনেক উদাহরণ দেখেছি। তবে এই ঘটনাটি আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল।
আমি জানি না, সেই ব্যক্তি এখনো সেখানে চাকরি করেন কি না। তাঁর বর্তমান অবস্থা জানারও কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু ঘটনাটি আমার মনে রয়ে গেছে। কারণ, এখানে বিষয়টি শুধু একজন কর্মীর কাজ না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করে একজন সহকর্মীকে ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করা যে কতটা নোংরা কূটচাল, যা আমার মতো মানুষের জন্য চিন্তারও বাইরে। সংবাদমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন মানসিকতা শেষ পর্যন্ত শুধু একজন সম্পাদককে নয়, পুরো কর্মপরিবেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এবার দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানের কথা বলি। সেটি ছাপা পত্রিকা। সেখানকার পত্রিকামালিকের শ্যালক ছিলেন হিসাব বিভাগের প্রধান। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকাশও ছিল অদ্ভুত। সামনে এলে এমন বিনয় দেখাতেন যে, তাঁকে নিয়ে কারও মনে সন্দেহ জাগার কথা নয়। ছয় ফুটেরও বেশি উচ্চতার মানুষটির বিনয় যেন উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যেত। তাঁর প্রতিটি বাক্যে ‘স্যার’ সম্বোধন থাকত। কথা বলার ধরন দেখে মনে হতো, আমার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।
পত্রিকা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, কীভাবে কাজের উন্নতি করা যায়, এসব নিয়ে তিনি আমার কক্ষে এসে আলোচনা করতেন। সামনে বসে নানা পরামর্শ দিতেন, সম্ভাবনার কথা বলতেন। কিন্তু পরে জানতে পারতাম, কক্ষ থেকে বেরিয়ে অন্য বিভাগের প্রধান ও কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে নানা পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত হচ্ছেন তিনি।
অফিসের কেউ কেউ এসে আমাকে এসব কথা জানাতেন। আমি তাঁদের থামিয়ে দিতাম। বলতাম, নিজের কাজ করুন, যার যার দায়িত্ব পালন করুন। অযথা একজন মানুষ সম্পর্কে এসব কথা বলবেন না। অভিযোগ শুনেই কাউকে দোষী ভাবতে চাইতাম না। বিশেষ করে যাঁকে সামনে থেকে এতটা বিনয়ী ও সহযোগিতাপরায়ণ দেখেছি, তাঁর বিরুদ্ধে এমন কথা সহজে বিশ্বাস করতে পারতাম না।
এদিকে পত্রিকার কাজ এগোচ্ছিল। ছোট একটি দল নিয়েও প্রতিদিন ভালো ভালো প্রধান সংবাদ প্রকাশ করছিলাম। ভেতরের পাতাগুলোতেও আসছিল নতুনত্ব। সংবাদ নির্বাচন, উপস্থাপনা ও পাতার বিন্যাসে এমন কিছু পরিবর্তন আনছিলাম, যা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার কথা। মার্কেটিং দলও যথাসাধ্য চেষ্টা করছিল। বিজ্ঞাপনদাতাদের কেউ কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছিলেন। সব মিলিয়ে পত্রিকাটিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজের পরিবেশ ও সম্ভাবনা, দুটোই তৈরি হচ্ছিল।
কিন্তু একটা জায়গায় হিসাব মিলছিল না। এত আয়োজন, এত পরিশ্রম, এত ভালো সংবাদ পরিবেশনের পরও পত্রিকার মার্কেটিং প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাচ্ছিল না। যে সাড়া পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথাও যেন অদৃশ্য কোনো বাধা কাজ করছিল। কিন্তু সেই বাধাটি কোথায়, কীভাবে কাজ করছে, তা বুঝতে পারছিলাম না।
এরই মধ্যে লক্ষ করলাম, হিসাব বিভাগের সেই প্রধান অফিসে আসছেন না। তাঁর ফোনও বন্ধ। তিনি পত্রিকামালিকের শ্যালক। তার ওপর হিসাব বিভাগের প্রধান। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছিলাম। ভাবলাম, মাস শেষে তাঁর সঙ্গে কথা বলব। এর মধ্যেই খবর পেলাম, তিনি জ্বরে আক্রান্ত। অসুস্থ মানুষটির জন্য দোয়া করলাম। তারপর আবার কাজে ডুবে গেলাম।
কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা ছিল সত্যিই অবাক করার মতো।
তিনি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যে ১১ দিন ছুটিতে ছিলেন, সেই সময়টুকুতে পত্রিকায় যত বিজ্ঞাপন এসেছিল, তার পরিমাণ ছিল পুরো এক মাসের সমান। অর্থাৎ, তিনি অফিসে অনুপস্থিত থাকার সময় বিজ্ঞাপন আসার প্রবাহ হঠাৎ করে বেড়েছিল চোখে পড়ার মতো।
কেন এমন হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পরে যা জানতে পারলাম, তা আমার সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম বড় বিস্ময়।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা থেকে বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন ফোন করেছি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, অনুরোধ করেছি, প্রতিশ্রুতি আদায় করেছি। কখনো একটি বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য কতবার যে ফোন করতে হয়েছে, তার হিসাব নেই। কারণ, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন পাওয়া সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে সরকারি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে যোগাযোগ, তদবির ও নিয়মিত অনুসরণের প্রয়োজন হয়।
পরে জানতে পারলাম, হিসাব বিভাগের সেই প্রধান এবং তাঁর অনুগত কয়েকজন ব্যক্তি নাকি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে বিজ্ঞাপন না দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। যে বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য আমাকে বারবার অনুরোধ করতে হয়েছে, সেই বিজ্ঞাপনই নাকি তাঁরা না করে দিয়েছেন।
একবার ভাবুন, কোনো সংবাদপত্র বিজ্ঞাপনের জন্য দিনের পর দিন চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বারবার অনুরোধ করছে। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানেরই দায়িত্বশীল কেউ যদি বিজ্ঞাপনদাতাকে বলে দেন, বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তাহলে ফল কী হবে? বিজ্ঞাপনদাতা তো আর বারবার এসে অনুরোধ করবেন না। একবার না বললে দ্বিতীয়বার হয়তো আর ফিরেও তাকাবেন না। এটি তো শীর্ষ সার্কুলেশনের পত্রিকা না।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। কারণ, এখানে একজন সম্পাদকের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছিল এমন কিছু ঘটনার ভিত্তিতে, যার নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে ছিল না। তিনি সংবাদপত্রের মান বাড়ানোর চেষ্টা করছেন, ভালো সংবাদ প্রকাশ করছেন, দলকে নিয়ে এগোচ্ছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই কেউ যদি সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে সম্পাদক কীভাবে সফল হবেন?
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আমি কাউকে শুধু ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে দোষারোপ করতে চাই না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় যে বিষয়টি উপলব্ধি করেছি, তা হলো, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কখনো কখনো এমন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। সামনে সহযোগিতার আশ্বাস, পেছনে বাধা। মুখে শ্রদ্ধা, কাজে অসহযোগিতা। ব্যক্তিগত বিনয় আর প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ যে এক জিনিস নয়, তা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে।
মানুষের জন্য যত কিছুই করুন, সবাই যে আপনার ভালো চাইবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারও কারও কাছে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোষ্ঠীগত আনুগত্য কিংবা নিজের অবস্থান রক্ষা করা বড় হয়ে ওঠে। তখন প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না। এমনকি কখনো কখনো নিজের প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করেও তাঁরা অন্য কাউকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে একরকম যুদ্ধে নেমে পড়েন।
এই অভিজ্ঞতাটা আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বলে মনে হয়।
একটি সংবাদপত্র কেবল মালিকের ব্যবসা নয়। কেবল সম্পাদকের ব্যক্তিগত স্বপ্নও নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক মানুষের জীবিকা, সাংবাদিকদের শ্রম, পাঠকের আস্থা, বিজ্ঞাপনদাতার অর্থ এবং সমাজের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা। একটি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেওয়া মানে শুধু একজন সম্পাদককে বিপদে ফেলা নয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো কর্মীদলের ওপর, প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের ওপর, এমনকি সংবাদমাধ্যমটির পাঠক ও সমাজের ওপরও।
একজন সম্পাদককে বিপদে ফেলা আর একটি প্রতিষ্ঠানকে বিপদে ফেলা অনেক সময় একই হয়ে যায়। কারণ, সম্পাদক শুধু একজন ব্যক্তি নন। তাঁর দায়িত্বের পরিধি ব্যক্তিগত সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব ছাড়িয়ে যায়। তিনি প্রতিষ্ঠানের সংবাদনীতির দায়িত্ব নেন, কর্মীদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন, পাঠকের আস্থা অর্জনের জন্য লড়েন। তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রতিষ্ঠান, কর্মী এবং সমাজ-রাষ্ট্রের কল্যাণ নিয়ে ভাবনার দায়।
অথচ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যদি কেউ সেই সম্পাদককে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য কাজ করেন, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা শুধু সম্পাদকের হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠানও। যে পত্রিকাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সম্পাদক দিনরাত পরিশ্রম করছেন, সেই পত্রিকাটিই তাঁর অজান্তে ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই দুই অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকালে আমার মনে হয়, সাংবাদিকতার সংকট কেবল রাজনৈতিক চাপ, মালিকের হস্তক্ষেপ কিংবা অর্থনৈতিক দুরবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। এর একটি বড় অংশ লুকিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতে।
কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন সম্পাদককে যদি প্রতিনিয়ত নিজের সহকর্মীদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ করতে হয়, তাহলে তিনি সংবাদপত্রের উন্নয়নে কতটা মনোযোগ দিতে পারবেন? আর যাঁরা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে আছেন, তাঁদের কেউ যদি সেই প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করার কাজে যুক্ত হন, তাহলে বাইরে থেকে যত ভালো সংবাদই প্রকাশ করা হোক, ভেতরের এই ক্ষয় একসময় না একসময় প্রকাশ পাবেই।
আমি কাউকে ফেরেশতা ভাবতে চাই না। আবার কাউকে শয়তান আখ্যা দিয়েও নিজের অভিজ্ঞতার হিসাব মেলাতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে চাই, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর মুখের কথায় নয়, দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। সামনে কতবার ‘স্যার’ বললেন, কতটা বিনয় দেখালেন, কত সুন্দর করে কথা বললেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কী করলেন।
আমার দেখা সাংবাদিকতার গল্পগুলো তাই কেবল সংবাদ, শিরোনাম, সম্পাদকীয় কিংবা পত্রিকার পাতার গল্প নয়। এগুলো মানুষ চেনার গল্পও। কখনো ভালোবাসার, কখনো আস্থার, কখনো ভুল বোঝার, আবার কখনো বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়ার গল্প।
বইটি লিখছি বলেই হয়তো এসব স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসছে। অনেক ঘটনার দিকে আজ দূর থেকে তাকাতে পারি। কোথাও হাসি পায়, কোথাও কষ্ট হয়, কোথাও বিস্মিত হই। কিন্তু একটা বিষয় এখনো আমাকে ভাবায়। আমরা যখন একটি সংবাদমাধ্যমের দুরবস্থার কথা বলি, তখন প্রায়ই মালিক, সরকার কিংবা রাজনৈতিক চাপের দিকে আঙুল তুলি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যে মানুষগুলো প্রতিদিন কাজ করেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কতটা কথা বলি?
একটি সংবাদমাধ্যমকে বাইরে থেকে আঘাত করা যায়। কিন্তু ভেতরের মানুষগুলো যদি নিজেরাই তার ক্ষতি করতে থাকেন, তাহলে সেই আঘাত ঠেকানো আরও কঠিন।
আমার দেখা সাংবাদিকতার এই গল্পগুলো হয়তো সেই অদৃশ্য সংকটেরই কিছু খণ্ডচিত্র। সব প্রতিষ্ঠানে এমন হয় না। সব মানুষও এক রকম নন। কিন্তু যেখানে এমন ঘটনা ঘটে, সেখানে শুধু একজন সম্পাদককে বদলে দিয়ে কিংবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি তৈরি করা।
কারণ, একটি সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার সংবাদ নয়। তার মানুষও। আর সেই মানুষগুলোই যদি প্রতিষ্ঠানের শক্তি না হয়ে দুর্বলতার কারণ হয়ে ওঠেন, তাহলে ভালো সংবাদ প্রকাশ করেও একটি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
‘আমার দেখা সাংবাদিকতা’ লিখতে গিয়ে এমন অনেক কথাই সামনে আসবে। কিছু ঘটনা হয়তো আপনাদের হাসাবে। কিছু ঘটনা বিস্মিত করবে। আবার কিছু ঘটনা শুনে হয়তো মনে হবে, সাংবাদিকতার ভেতরের জগৎ বাইরে থেকে যতটা দেখা যায়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
আজকের এই লেখায় আপাতত এই দুটি অভিজ্ঞতার কথাই বললাম। বইটির লেখা শেষ হলে আরও অনেক গল্প সামনে আনার সুযোগ হবে। তার আগে আমার চাওয়া একটাই, আমরা যেন সাংবাদিকতার সংকট নিয়ে কথা বলার সময় শুধু বাইরের কারণগুলো না দেখি। প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও তাকাই। কারণ, কখনো কখনো একটি সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তার নিজের ঘরের ভেতরেই।
#
লুৎফর রহমান হিমেল
সম্পাদক, লেখক ও সমালোচক।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি