সিলেট ১৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:২৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
প্রিয় সৌদি আরবপ্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনেরা,
আপনাদের জীবিত শরীর আমাদের অর্থনীতির সম্পদ। অথচ মৃত্যুর পর সেই শরীরেরও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়! কী নির্মম বৈপরীত্য!
বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনাদের কাছে আমার এই ক্ষমা করুণা থেকে নয়, নাগরিক লজ্জা থেকে। যে মানুষগুলোর শ্রমে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়, তাঁদের নিরাপত্তা, বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে আমরা কতখানি সক্ষম?
সৌদি আরব আমাদের কাছে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ধর্মীয় শ্রদ্ধা আর একটি রাষ্ট্রের শ্রমনীতি ও বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটুকু করতে না পারা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট।
সৌদি আরবে বাংলাদেশিরা কি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন শ্রমিকের মর্যাদা পান? নাকি এমন একটি শ্রমব্যবস্থায় প্রবেশ করেন, যেখানে শ্রমের বিনিময়ে মজুরি মিললেও নিজের জীবন ও স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে পড়ে?
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের গবেষণায় সৌদি আরবে অভিবাসী নারী গৃহকর্মীদের জবরদস্তিমূলক শ্রম, যৌন নির্যাতন, বর্ণবাদ ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতার তথ্য উঠে এসেছে। সৌদির সাধারণ শ্রমআইনের বাইরে থাকা গৃহকর্মীদের জন্য পৃথক বিধিমালা থাকলেও কার্যকর সুরক্ষার ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০১৯ সালে বিবিসি নিউজ অ্যারাবিকের অনুসন্ধানে সৌদি আরবের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গৃহকর্মীদের অবৈধ কেনাবেচার বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়।
সব অভিবাসী শ্রমিক দাস নন। কিন্তু যখন নিয়োগকর্তার ক্ষমতা একজন মানুষের কাজ, চলাচল ও জীবনের সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন প্রশ্নটি আর কেবল কর্মসংস্থানের থাকে না; হয়ে ওঠে আধুনিক দাসত্ব, শ্রেণিবৈষম্য ও মানবিক মর্যাদার।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সংগ্রহ করা বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবে ৮৮৭ বাংলাদেশির মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।কিন্তু মৃত্যুকে স্বাভাবিক ঘোষণা করলেই কি মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের দায় শেষ হয়ে যায়?
এর মধ্যে গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষায় অভিযোগ ছিল একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’। অথচ বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশ মিশনকে আগে জানানো হয়নি। বাংলাদেশ সরকার পরে সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিচার হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতি, বিচারের স্বচ্ছতা, দোভাষী ও আইনজীবীর সহায়তা এবং কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ সম্পর্কে জানার অধিকার কি আমাদের নেই? ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ ও ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদে কনস্যুলার যোগাযোগ এবং বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুর খবর অবহিত করার বিধান রয়েছে। সৌদি আরব রাজতন্ত্র হলেও এই আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঘটনাটিকে ‘আমাদের জন্য শিক্ষা’ বলেছেন।
আমি জানতে চাই, শিক্ষাটি কার জন্য? প্রবাসীর, নাকি রাষ্ট্রেরও?
আরও বেদনাদায়ক বিএনপির সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতনের স্টার টিভিতে প্রচারিত মন্তব্য—“ঐ পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক এটা আমি চাই না।”
একজন জনপ্রতিনিধির মন্তব্য সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। কিন্তু বক্তব্যটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করে।
একজন নাগরিকের অপরাধের বিচার আদালত করবে। কিন্তু তাঁর মরদেহ স্বদেশে ফেরার নৈতিক যোগ্যতা নির্ধারণের অধিকার একজন জনপ্রতিনিধিকে কে দিয়েছে?
মানুষ অপরাধী হতে পারে, দণ্ডিত হতে পারে। কিন্তু অপরাধের বিচার আর মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। নাগরিকত্ব কোনো নৈতিক পুরস্কার নয়, যা রাষ্ট্র ভালো আচরণের বিনিময়ে প্রদান করবে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে লাউঞ্জ তৈরি, সম্মাননা প্রদান কিংবা তাঁদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলা যথেষ্ট নয়। একজন শ্রমিক বিপদে পড়লে দূতাবাস তাঁর পাশে কত দ্রুত দাঁড়ায়, আটক হলে আইনি সহায়তা পান কি না, মৃত্যুর কারণ তদন্ত হয় কি না, পরিবার ক্ষতিপূরণ পায় কি না—রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়বদ্ধতা এখানেই।
যে রাষ্ট্র নাগরিকের শ্রমের অর্থকে জাতীয় সম্পদ মনে করে, সে রাষ্ট্র তাঁর জীবন ও মৃত্যুর পর মর্যাদার দায় অস্বীকার করতে পারে না।পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য শুধু কত বিনিয়োগ এল বা কত রেমিট্যান্স পাওয়া গেল, তা দিয়ে মাপা যায় না। সবচেয়ে ক্ষমতাহীন নাগরিকটি বিদেশের মাটিতে কতখানি সুরক্ষা পান, সেটিও রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা।
বিভ্রম- ৫
#
রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
অধ্যাপক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি