সিলেট ২০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২৬
বিপ্লবীরা কখনো মাথানত করেনি। লাল ঝান্ডা হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। কখনো পিছু হটেনি। কথাগুলো এক নিঃস্বাসে বলেছেন, কমরেড অমল সেন। আমি আমাদের পার্টি নেতা কমরেড মাহামুদুল হাসান মানিক ভাইয়ের ইস্কাটনের বাসায়, প্রায়ই যেতাম। সেখানে থাকতেন আমাদের পার্টির সভাপতি কমরেড অমল সেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। তিনি মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তার অবদান প্রগতিশীল আন্দোলনকে আরো বেগবান করেছে।
আমি প্রায়ই মাহামুদুল হাসান মানিক ভাইয়ের বাসায়, কমরেড অমল সেন দাদার সাথে আড্ডা দিতে যেতাম। আমি বাসায় গেলে ভাবি খুব আপ্যায়ন করতো। দাদার প্রতি ভাবির পিতৃতুল্য একটা গভীর ভালোবাসা ছিলো। দাদা ঠিকমতো খেয়েছেন কিনা, হাত ধুয়েছেন কিনা, সব কিছু গোছানো কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি গেলে, দাদা খুবই খুশি হতেন। কারণ, সে সময়ে দাদা অনেকটা একাকিত্ব বোধ করতেন। বেশী বয়স হলে, যে রকমটি সবারই হয়ে থাকে। আমিও কমরেড অমল সেন দাদার সাথে কথা বলতে পেরে খুশি হতাম। কারণ, একজন মহান তেভাগা আন্দোলনের নেতা, তাঁর কাছে আমার অনেক কিছুই শেখার আছে। তবে সব সময় মানিক ভাইয়ের বাসায় যেতে পারতাম না। সে সময়টায় জীবন-জীবিকারও একটা তাগিদ ছিলো। তাই মাঝে মধ্যেই যেতাম। সব সময় নয়।
দাদার মুখে শুনেছিলাম, তেভাগা আন্দোলন কিভাবে হয়েছিলো। সে সময়ে জমিদারি প্রথা চালু ছিলো। কৃষকরা অন্যের জমিতে চাষাবাদ করতেন। বীজ বপন করতেন, ফসলের পরিচর্যা করতেন। ফসল হলে, উৎপাদিত ফসলের বড় অংশই জমির মালিক ও জোতদাররা নিয়ে যেতো। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্যই তেভাগা আন্দোলনের জন্ম হয়। সে সময়ে গ্রামে গ্রামে সভা, মিছিল ও কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কৃষকরা সম্মিলিত ভাবে নিদ্ধান্ত নেন, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য ভাগ তারা আদায় করবেন।
এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, ময়মনসিংহ, যশোর-খুলনা অঞ্চল, ২৪ পরগনা ও মেদিনীপুর পর্যন্ত। শাসক গোষ্ঠী ও তাদের পেটুয়া বাহিনী ব্যাপক দমন পিড়ন চালায়। আন্দোলনের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি অভিযান, গ্রেপ্তার, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করেন। এতে অনেক কৃষক হতাহতো হোন ও অনেকে সেখানেই প্রাণ হারান। আন্দোলনের নেতা-কর্মীদেরও গ্রেপ্তার করেন। তেভাগা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সব দাবীগুলো পূরণ করতে পারেনি। দেশ ভাগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাম্প্রদায়ীক উত্তেজনা ও সরকারী দমন-পীড়ন আন্দোলনকে দূর্বল করে দেয়। তবে, এই তেভাগা আন্দোলনের করণেই, ১৯৫০ সালে পূর্ব বঙ্গের ভূমি সংস্কার উদ্যোগগুলোকে ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরীতে বিরাট ভূমিকা রাখেন।
আমি দাদার সাথে কথা বলে যা জেনেছিলাম। তিনি এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে, তিনি নিজ পরিবারের জমিদারী ও শ্রেণী স্বার্থ ত্যাগ করেন। ছাত্র জীবনেই (১৯৩৩-৩৪ সালের দিকে) তিনি তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (CPI) সঙ্গে যুক্ত হোন। সেই সাথে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। দাদা, ব্রজলাল (বিএল) কলেজ থেকে রসায়ন বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।
কমরেড অমল সেন এর রাজনৈতিক জীবন ছিলো বৈচিত্রপূর্ণ। রাজনৈতিক আদর্শের কারণে তৎকালীন বৃটিশ ও পাকিস্থান সরকারের আমল মিলিয়ে জীবনের প্রায় ১৯ বছর কারাভোগ করতে হয়েছে। জেলে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করলেও তিনি শাসক শ্রেনীর কাছে আপস করেনি। ১৯৪৬ সালে যশোরের নড়াইল অঞ্চলে “তেভাগা আন্দোলনের” কারণে, কৃষকরা তাকে “বাসু দা” বলে ডাকতেন।
তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পর, পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) শীর্ষ নেতা ছিলেন। পরবর্তিতে ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) গঠিত হলে, তিনি সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তিতে পূনর্গঠিত ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি নির্বাচিত হোন।
তিনি ১৯১৪ সালের ১৯ জুলাই, নড়াইল জেলার আফরা গ্রামে (তাঁর পৈত্রিক বাড়ি ছিলো, যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বাকড়ী গ্রামে) জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারী, ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আমরা এই মহান বিপ্লবীর রেখে যাওয়া আদর্শ ও লাল ঝান্ডা বহন করে চলেছি। এই সমাজের ঘুণেধরা ব্যবস্থাকে বদলিয়ে, নতুন সমাজ বিনির্মাণ করতে, তাঁর আদর্শ আমাদের উজ্জিবিত করে। যুগে যুগে লড়ে যাওয়া, মহান ত্যাগীদের যারা জীবনের সর্বস্ব বিলিয়ে, লাল ঝান্ডা হাতে তুলে নিয়েছিলেন, কমরেড অমল সেন তাদের একজন। মহান বিপ্লবী কমরেড অমল সেন, আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। লাল সালাম, তেভাগা আন্দোলনের সংগ্রামী কৃষকদের।
#
আব্দুল্লাহ আল মামুন

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি