শ্রীমঙ্গল শহর:শৃঙ্খলা এবং এক চিলতে রিজিক

প্রকাশিত: ২:৩৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২৬

শ্রীমঙ্গল শহর:শৃঙ্খলা এবং এক চিলতে রিজিক

Manual7 Ad Code

মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী |

রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছে—ভালো কথা, কিন্তু নিরপেক্ষতা ও মানবিকতাও কি নিশ্চিত হচ্ছে?

একটি শহরের সচল রক্তনালি হলো তার সড়ক ও ফুটপাত। পথচারীরা নির্বিঘ্নে হাঁটতে চান, যানজটমুক্ত শহর চান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ চান—এ দাবি যেমন যৌক্তিক, তেমনি জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু শহরের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে যেন উপেক্ষিত না হয় আরেকটি বাস্তবতা—ফুটপাতের পাশে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলোর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

এসব ব্যবসায়ীর অনেকেই সীমিত পুঁজি নিয়ে সারা বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের বাড়তি বেচাকেনা তাঁদের কাছে পরিবারের খরচ সামলানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সন্তানের পড়াশোনা, অসুস্থ মা-বাবার ওষুধ কিংবা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁদের সামান্য উপার্জন।

অবশ্য সবার পরিস্থিতি এক নয়। তবে যাঁরা মৌসুমি ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের কাছে উৎসবের কয়েকটি দিনও অনেক সময় সারা বছরের অপেক্ষার উপলক্ষ। তাই উৎসবের ঠিক আগে হঠাৎ ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু একজন ব্যবসায়ীর ওপর নয়, তাঁর পরিবারের ওপরও পড়ে।

তবে জীবিকার প্রশ্ন তোলার অর্থ ফুটপাত দখলকে বৈধতা দেওয়া নয়। ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য; সেখানে ব্যবসার কারণে জনসাধারণের চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। শহরের শৃঙ্খলা রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি হতে হবে পরিকল্পিত, আইনসম্মত ও মানবিক।

Manual6 Ad Code

প্রতিবছর একই পরিস্থিতি হলে আগাম পরিকল্পনা কোথায়?

শ্রীমঙ্গল শহরে উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের ভিড় ও অস্থায়ী ব্যবসার চাপ তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। যদি প্রতিবছরই একই পরিস্থিতি দেখা যায়, তাহলে আগাম পরিকল্পনা, সতর্কতা এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কি সম্ভব নয়?

উচ্ছেদ অভিযানের আগে মাইকিং করে সতর্ক করা, নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া এবং সম্ভব হলে বিকল্প বৈধ স্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে একদিকে ফুটপাত ও সড়ক বাধামুক্ত রাখা সহজ হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু উচ্ছেদ পরিচালনা করা নয়; সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করাও তার দায়িত্বের অংশ। আজ উচ্ছেদ, কাল আবার দখল—এভাবে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা এবং সবার জন্য স্পষ্ট নিয়ম।

প্রশাসনের দায়িত্বে দলীয় ব্যক্তিদের ভূমিকা কতটুকু?

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল শহরের ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সহযোগিতার কথাও প্রচার করা হচ্ছে। জনস্বার্থে কোনো উদ্যোগে নাগরিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতা ইতিবাচক হতে পারে। তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই থাকা উচিত।

অভিযানে দলীয় ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে মানুষের মুখে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন; শোনা কথাকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে নীতিগত প্রশ্নটি থেকেই যায়—কোনো অভিযানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভূমিকার সীমা কোথায়? তাঁরা সহযোগিতা করবেন, নাকি আইন প্রয়োগের দায়িত্ব নিজেরাই হাতে তুলে নেবেন?

Manual3 Ad Code

কেউ যদি আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই দোকানপাটে হাত দেন, জোর করে মালামাল সরান কিংবা ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখান, তাহলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রশাসনিক অভিযান যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না হয়।

আরেকটি প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঘিরে। ফেসবুকে অভিযোগ উঠলে প্রশাসন তৎপর হবে—এটি ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু শহরের ফুটপাত, যানজট ও অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি থাকবে না কেন? প্রশাসন কি দায়িত্ব পালনে জনমতের চাপের অপেক্ষায় থাকবে, নাকি আইন ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে?

এখানে কোনো রাজনৈতিক দলকে দোষী সাব্যস্ত করা বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রমাণহীন অভিযোগ তোলা উদ্দেশ্য নয়। বরং জনস্বার্থে নেওয়া প্রতিটি উদ্যোগে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

শুধু ফুটপাত নয়, পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও জরুরি

শহরের যানজট নিরসনের প্রশ্নটি শুধু ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। শহরের ভেতরে যানবাহনের স্ট্যান্ড কোথায় থাকবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে, কোন স্থানে গাড়ি ঘোরানো যাবে এবং কোথায় পার্কিং করা যাবে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

যত্রতত্র গাড়ি ঘোরানো, নির্ধারিত স্থান ছাড়া মোটরসাইকেল পার্কিং, সড়কের ওপর যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা কিংবা দোকানের সামনে আড্ডা দিতে গিয়ে রাস্তার জায়গা আটকে রাখা—এসব আচরণও যানজট ও জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে।

Manual2 Ad Code

বিশেষ করে, কেউ সামাজিকভাবে প্রভাবশালী কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ধারী হলেই যেন নিয়ম ভাঙার বাড়তি সুবিধা না পান। ট্রাফিক পুলিশের আইনসম্মত নির্দেশ সবারই মানা উচিত। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর পরিচয় নয়, ঘটনার প্রকৃতি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দখল যদি জনদুর্ভোগের কারণ হয়, তাহলে সড়কের ওপর গাড়ি রেখে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করাও সমান গুরুত্বে বিবেচনা করতে হবে। শহরের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মানদণ্ড ব্যক্তি বা পরিচয়ভেদে বদলাতে পারে না।

যানজট নিরসনে প্রয়োজন নির্ধারিত পার্কিং, যানবাহনের উপযুক্ত স্ট্যান্ড, যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট স্থান, অনুমোদিত স্থানে গাড়ি ঘোরানোর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি। একই সঙ্গে উৎসবের সময় অনুমোদিত স্থানে অস্থায়ী বাজারের সুযোগ তৈরি করা গেলে পথচারীদের চলাচল ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব হতে পারে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় পরিস্থিতি, জায়গার প্রাপ্যতা, জননিরাপত্তা ও প্রচলিত আইন বিবেচনায় নিতে হবে।

উচ্ছেদ নয়, প্রয়োজন কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান

আমরা চাই, শ্রীমঙ্গল শহরের সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত থাকুক। পথচারীরা স্বস্তিতে চলাচল করুন, যানজট কমুক, শহরের সৌন্দর্য বাড়ুক। একই সঙ্গে চাই, প্রশাসনের প্রতিটি উদ্যোগে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রতিফলন ঘটুক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় থাকুক।

শহরের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মানুষের জীবিকার বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না; আবার জীবিকার প্রশ্ন তুলে জনসাধারণের চলাচলের অধিকারও অস্বীকার করা যাবে না। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই দায়িত্বশীল প্রশাসন ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার প্রকৃত পরীক্ষা।

আমাদের প্রত্যাশা, শ্রীমঙ্গলের প্রশাসন শহরের প্রতিটি সমস্যা সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সড়কের ওপর গাড়ি রাখা ব্যক্তি—কেউই যেন নিয়মের ঊর্ধ্বে না থাকেন। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাব নয়, আইন ও জনস্বার্থই হোক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান ভিত্তি।

শৃঙ্খলা চাই, তবে সবার জন্য সমান শৃঙ্খলা। উন্নয়ন চাই, তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও মানবিক। রাস্তা পরিষ্কার হোক, কিন্তু ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে; প্রশাসন কার্যকর হোক, তবে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গে।

শ্রীমঙ্গল কারও একার শহর নয়—এ শহর সবার। তাই শহরকে সুন্দর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করার উদ্যোগও হতে হবে সবার জন্য, সব পক্ষের প্রতি ন্যায়সংগত এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত।

রাস্তা পরিষ্কার হোক, পথ চলুক অবাধে, যানজট কমুক—আর পথপাশের মানুষগুলোর স্বপ্নও বেঁচে থাকুক স্বমহিমায়।
#
মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী
সভাপতি
শ্রীমঙ্গল অনলাইন প্রেসক্লাব;
ও
সম্পাদক
আমার সিলেট (amarsylhet24.com)
(অনলাইন নিউজ পোর্টাল)

Manual3 Ad Code