রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে মানুষ গড়ার এক মহান কারিগর ‘কমরেড নাদেজদা ক্রুপস্কায়া’

প্রকাশিত: ৮:৪২ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২০

রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে মানুষ গড়ার এক মহান কারিগর ‘কমরেড নাদেজদা ক্রুপস্কায়া’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ১৬ মে ২০২০ : নাদেজদা ক্রুপস্কায়া (এন. ক্রুপস্কায়া) সোভিয়েত রাশিয়ার পিটার্সবুর্গ শহরে এক ধনাঢ্য পরিবারে ১৮৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ক্রুপস্কায়ার মা ছোট বেলায় অনাথ আশ্রমে পড়াশুনা ও জমিদার বাড়ির চাকরানীর কাজ ক’রে জীবিকা নির্বাহ করলেও তার বাবা ছিলেন তৎকালীন জার সরকারের সেনাবাহিনীর অফিসার।

বাবা কোন ধর্মে বিশ্বাস করতেন না। এবং রাশিয়ার তৎকালীন পেটিবুর্জোয়া বামপন্থী বিপ্লবী সংগঠন নিহিলিস্ট, নারোদপন্থী, তারপর নারোদোনায়া ভলিয়ার (জনগণের স্বাধীনতা) সমর্থক ছিলেন। যার ফলে তিনি ছিলেন তৎকালীন শাসক জার সরকারের কট্টর বিরোধী। ১৮৬৩’র পোল্যান্ড বিদ্রোহ দমনে তাকে পাঠানো হলে তার ভূমিকা জনগণের পক্ষে যায়। এন. ক্রুপস্কায়ার জন্মের পর পুনরায় পোল্যান্ডের জনগণের জার বিরোধী বিদ্রোহ দমনে তাকে তরুণ ও দক্ষ সেনা অফিসার হিসেবে পাঠানো হলে ক্রুপস্কায়ার বাবা বিদ্রোহ দমন তো দূরের কথা, বরং তিনি পোলিয় জনগণের বিস্ফোরিত আন্দোলনকে আরো সহযোগিতা করেন। এই অপরাধে জার শাসক তাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করে।

ক্রুপস্কায়া শৈশবে মা’র জমিদার বাড়ির চাকরানীর কাজ করা অবস্থায় জমিদার গৃহকর্ত্রীর অত্যাচার এবং কৃষকদের উপর জমিদারের যে জুলুম চলতো তার গল্প শুনতেন। এবং একইসাথে শুনতেন জনগণের প্রতি তার বাবার অকৃত্রিম ভালবাসা ও যুদ্ধবাজ জার সরকারের প্রতি বিদ্রোহী মনোভাব ও ঘৃণার কথা। মা-বাবার এই শর্ত তাকে প্রগতিশীল ক’রে তোলে।

ক্রুপস্কায়া তার স্মৃতিকথায় বলেন যে, ‘আমি বড় হয়ে মার্কসবাদী দর্শন দ্রুতই গ্রহণ করতে পারার কারণ হলো আমার মা-বাবার প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি। কমিউনিস্ট ইশতেহার গ্রহণ করতে তারাই আমাকে শর্ত যুগিয়েছেন।’

বাবা সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হবার পর বাবার বিভিন্ন শহরে চাকুরির সুবাদে তিনি বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পান। তিনি দেখেছেন বর্বর জার সরকারের হাতে বন্দী বিদ্রোহী পোলিয় নারী, পুরুষ, শিশুদের উপর নির্যাতন, দেখেছেন বুভুক্ষু শিশুদের কোলে নিয়ে মায়েদের আহাজারি, ক্ষিদের তাড়নায় দুই টাকায় বিক্রি হয়ে যাওয়া কিশোরীদের মুখ। আরো দেখেছেন জমিদার শ্রেণির কৃষকদের উপর শোষণ-নির্যাতন ও জমিদারের বাইজিখানায় ঘুঙুরের শব্দের সাথে তরুণী মেয়েদের আর্তচিৎকার। ক্রুপস্কায়া তখন এই ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাটাকেই মনে মনে বদলে দিতে চান, কিন্তু কীভাবে দিবেন তার দিশা পান না। বাবার মতো তিনিও প্রচুর পড়াশুনা করেন। একসময় তিনি টলস্টয়ের ভক্ত হয়ে যান। কৃষকদের সাথে একাত্ম হতে কৃষকদের কৃষি শ্রমও করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে সক্ষম হন যে, টলস্টয়ের দৈহিক শ্রম ও ‘আত্মশুদ্ধি’ জনগণের মুক্তির কোন পথ নয়। শ্রমিক ও কৃষকদের মুক্তির জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন।

জার শাসিত অনুন্নত পুঁজিবাদী রুশ সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল। জার সরকারের আইন ছিল মেয়েদের জন্য উচ্চ শিক্ষা ও ডাক্তারী পড়া নিষিদ্ধ। মেয়েদের কাজ হচ্ছে সন্তান লালন-পালন ও স্বামীর সেবা করা। ক্রুপস্কায়া চিরাচরিত এই প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততান্ত্রিক আইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এই সংগ্রামে তিনি সফল হন এবং পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের একটি পাঠচক্রে তিনি যোগ দেন। এই পাঠচক্র-যে মার্কসবাদী পাঠচক্র, বিশ্বকে পরিবর্তন করার বিপ্লবী পাঠচক্র তা তিনি প্রথমে বুঝতে না পারলেও যখনই তাকে মার্কস-এর ‘পুঁজি’ পড়তে দেয়া হয় তখন তার মনে পড়ে যায় বাবা মাঝে মাঝে পশ্চিমা (ইউরোপ) বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করতেন। মার্কস-এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইস্তেহার নিয়েও অল্প-স্বল্প বলতেন। রাশিয়ায় মার্কসবাদী বই নিষিদ্ধ থাকায় খুবই সতর্কতার সাথে ‘পুঁজি’ বইটি তাকে পাঠ করতে হয়। মার্কস-এর ‘পুঁজি’ প্রথম খ- পড়েই তিনি মানব মুক্তির দর্শন পেয়ে যান। এরপর তিনি উক্ত পাঠচক্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে শুরু করেন।

শ্রমিক ও কৃষকদের সাথে ছাত্রদের মেলামেশা, ঘনিষ্ঠতা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকায় খুবই গোপনে শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যে কাজ করতেন। ১৮৯৬ সালে সুতাকল, তাঁত শ্রমিকদের ধর্মঘট ও হরতালে তিনি নেতৃত্ব দেন। এই ধর্মঘটে বহু নেতাকর্মীর সাথে তিনিও গ্রেফতার হন। সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে থাকাকালীন অবস্থায় বিশ্ববিপ্লবের মহান নেতা ভ. ই. লেনিনকে তিনি বিয়ে করেন।

তৎকালীন পশ্চাৎপদ রাশিয়ায় নারীদের উচ্চশিক্ষা ও চাকরি করা ছিল নিষিদ্ধ। নারীদের রাজনীতি করা-তো ছিল আরো কঠিন ব্যাপার। এই আইন ও কুসংস্কারকে ধূলিসাৎ ক’রে তিনি নারীদের শিক্ষা, চাকুরি, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেন। ১৯ শতকে পশ্চাৎপদ রাশিয়ায় ক্রুপস্কায়ার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ছিল নারীমুক্তি প্রশ্নে এক অগ্রপদক্ষেপ। হাতেগোনা কয়েকজন বুদ্ধিজীবী নারীর মধ্যে ক্রুপস্কায়া ছিলেন অন্যতম।

রুশ কমিউনিস্ট পার্টিতে তিনি বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তারমধ্যে ১৯০৫ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় সংস্থায় সহকারীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের পর তিনি রুশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় লোকশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত হন। এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি লেনিন ও স্ট্যালিনের সমাজতান্ত্রিক শিক্ষানীতি কার্যকর করেন। এবং সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের ইয়াং পাইওনিয়ার ও কমসোমলের (শিশু, কিশোর ও তরুণদের সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি চেতনায় গড়ে তোলার সংগঠন) নির্বাহী দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পুঁজিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থার মূলোৎপাটন ক’রে তরুণ, কিশোর, শিশুদের গড়ে তুলেছেন সাম্যবাদী চেতনায় ও একেকজন দেশপ্রেমিক নায়ক হিসেবে। যে নায়করা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করেছেন।

এন. ক্রুপস্কায়া তার বিভিন্ন প্রবন্ধে, নিবন্ধে তরুণ, কিশোর, শিশুদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন, শিক্ষকদের পরামর্শ দিয়েছেন। বুর্জোয়া শিক্ষানীতির পরিবর্তে ব্যাপকসংখ্যক শ্রমিক-কৃষক ও তাদের সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।

একইসাথে তিনি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির আলোকে নারীমুক্তি প্রশ্নেও কাজ করেন। কন্যা শিশুদের শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করা, যুব শ্রমিক সংঘে মেয়েদের প্রতিনিধিত্ব করা। কমসোমলের সারা ইউনিয়ন অষ্টম কংগ্রেসে তিনি তার ভাষণে বলেন- কমসোমলের আশু কর্তব্যের মধ্যে একটি প্রধান কাজ হলো নারীমুক্তির জন্য কাজ করা। শিক্ষকদের এক সভায় ভাষণদানকালে তিনি শহর-গ্রামের নিরক্ষর নারীদের উদ্দেশে ভ. ই. লেনিনের সেই বিখ্যাত বাণী উচ্চারণ করেন- ‘দেশ শাসনের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে প্রত্যেকটি রাঁধুনীকে’। বাস্তবেই সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার নারীরা দেশ শাসনের যোগ্য হয়েছিলেন। তারা বুঝেছিলেন প্রকৃত নারীমুক্তি কাকে বলে।

১৯৩৪ সালে প্যারিসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের সমর্থনে তিনি বিবৃতি দেন। যখন স্ট্যালিনের সমাজতান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে সংশোধনবাদী ট্রটস্কীপন্থীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেই সময়ে তিনি দৃঢ়হাতে স্ট্যালিনীয় নীতির পক্ষে দাঁড়ান এবং নারীদের উদ্দেশেও তিনি বলেন, ‘স্ট্যালিন-গঠনতন্ত্র সাম্যবাদী গঠনতন্ত্র। এই গঠনতন্ত্রে নারীদের সম্পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়েছে।’ বিশ্বাসঘাতক সংশোধনবাদী ট্রটস্কীপন্থীদের প্রতিরোধের জন্য সমস্ত নারীদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

১৯৩৮, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তিনি নারী দিবসের ঘোষক ক্লারাসেৎকিনকে স্মরণ করেন এবং এক বিবৃতিতে পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তের নিপীড়িত নারীদের, বিশেষত চীন ও স্পেনের গৃহযুদ্ধে বন্দুক কাঁধে যোদ্ধা নারীদের প্রতি আহ্বান জানান সম্মিলিত ফ্রন্ট গড়ে তোলার জন্য।
এন. ক্রুপস্কায়া শিশু-কিশোর-তরুণদের গড়ে তোলার প্রশ্নে ‘শিক্ষাদীক্ষা’ ও ‘আত্মশিক্ষা সংগঠন’ নামে অতিগুরুত্বপূর্ণ দু’টি পুস্তক রচনা করেন। এছাড়া কমিউনিস্ট বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা-প্রাভদা, যুব কমিউনিস্ট পত্রিকা, শিক্ষকদের পত্রিকা, কমিউনিস্ট শিক্ষাদীক্ষা পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন।

প্রখ্যাত এই কমিউনিস্ট নেত্রী, শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ছাড়া যে নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতা সম্ভব নয়- এ সত্যকে বিশ্বের নিপীড়িত নারীদের কাছে তুলে ধরেছেন। এবং প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কষ্টসাধ্য, ঝুঁকিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বকারী ভূমিকা রেখেছেন।

বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত ও বঞ্চিত নারীদের মহান শিক্ষক কমরেড ক্রুপস্কায়ার আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে ও তাকে বাস্তব শ্রেণি সংগ্রামে রূপদান করতে হবে। তাহলেই আমাদের দেশের নারীরাও পাবে লেনিন-স্ট্যালিনের রুশ সমাজতান্ত্রিক সমাজের মতো সত্যিকার নারীমুক্তি ও নারী স্বাধীনতা।

তথ্যসূত্র :Liberation of revolutionary women, William Greek