বিপ্লবী ‘আতিয়ূর রহমান’ বর্ণিল ও বহুমাত্রিক জীবনের অধিকারী

প্রকাশিত: ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২৪

বিপ্লবী ‘আতিয়ূর রহমান’ বর্ণিল ও বহুমাত্রিক জীবনের অধিকারী

Manual1 Ad Code

কাজল মাহমুদ |

‘কীর্তিমানের মৃত্যু নেই’ কথাটা সত্যিই মনে হয়, যখন কি-না আতিয়ূর রহমানের মতো এক বর্ণিল ও বহুমাত্রিক জীবনের অধিকারী কৃতীজনের ক্ষেত্রে জীবন বিশ্লেষণের জন্য এ লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস।

Manual7 Ad Code

চুয়াডাঙ্গার বুকে প্রগতিশীল চিন্তাধারায় উৎসর্গীত যে কয়েকজন ত্যাগী ব্যক্তিদের সন্ধান মেলে, ৪৪ বছরের ক্ষণজন্মা পুরুষ আতিয়ূর রহমান অন্যতম। রাজনীতি, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিকতায় তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী সংগঠক। তাঁর জীবনেতিহাস পর্যালোচনায় জানতে পারি বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন ভীষণ সাহসী, তেজী, মানবদরদী এবং অনুসন্ধিৎসু।

Manual7 Ad Code

মাত্র ১২ বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর রেখাপাত করে। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি বাড়ী থেকে পালিয়ে পাড়ি দেন পৃথিবীর পাঠশালাতে। সেখান থেকেই অর্জন করেন মানবসেবার নানা কৌশল, ত্যাগ, ভালবাসা, অধিকার আদায়ের শক্তি ও সাহস।

Manual7 Ad Code

১৯৫১ সালে চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনা পেপার মিলস লিঃ এবং ১৯৫৮ সালে নাটোরের গোপালপুরস্থ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিঃ, উভয় স্থানেই তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। নানা অভিজ্ঞতায় তিনি বাস্তব জীবনে একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠেন এবং তাঁর চিন্তা-চেতনা দেশ ও মানবতার সেবায় উৎসর্গীত হয়। হয়ে ওঠেন শ্রমিক শ্রেণির সমব্যাথী সহযোদ্ধা। শ্রমিকদের উপর কর্তৃপক্ষের জুলুম, অমানবিক শোষণ, পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার নির্মমতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। প্রতিবাদী আতিয়ূর রহমান জড়িয়ে পড়েন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে। ক্রমে নিজেকে শাণিত করে তোলেন সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার আদর্শে।

নানা পরিচয়ের ভেতর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিলো মুখ্য। তিনি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলায় বাম প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির উদ্যোক্তা। তাঁর যোগ্য ও সক্রিয় নেতৃত্বে এ অঞ্চলে বাম রাজনীতি ব্যাপক মাত্রা লাভ করে। শোষণহীন রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে ওঠে বাম-ভিত্তিক সংগঠন ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন ও বিভিন্ন প্রগতিশীল গণসংগঠনসমূহ। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ন্যাপের মহকুমা সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পরিচালনা ও নেতৃত্বে তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা মহকুমার প্রায় প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, থানায় ন্যাপের কমিটি গঠন করা হয়। তাঁর অসাধারণ দক্ষতায় ন্যাপ এতদঞ্চলে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

অগ্নিঝরা ষাটের দশকে স্বৈরাচার সামরিক শাসন বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে চুয়াডাঙ্গা শহরে আতিয়ূর রহমানের তেজোদীপ্ত সাহসী ভূমিকার কথা স্মরণযোগ্য। প্রাক-মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি চুয়াডাঙ্গা শিল্পী সাহিত্যিক সাংবাদিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯-’৭০ এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে দলের নেতৃত্ব দান করেন এবং দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি জনৈক রাজাকারের ষড়যন্ত্রে পাকবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে নির্মম অত্যাচারের শিকার হন এবং পরবর্তীতে (৭০ দিন পর) অলৌকিকভাবে মুক্তিলাভ করেন। কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আর সুস্থ হননি এবং ১৯৭৭ সালের ৭ জুলাই পরলোকগমনেই তাঁর সকল যন্ত্রণার পরিসমাপ্তি ঘটে। সবার অগোচরে ঝরে যায় একজন মানবদরদী, দেশপ্রেমিক, নিবেদিতপ্রাণ মু্ক্তিযোদ্ধা।

Manual5 Ad Code

সমাজসেবাতেও তিনি রাখেন অসামান্য অবদান। জন্মগতভাবেই মানব ও সমাজকল্যাণে নিবেদিত এই মানবের সামাজিক বিভিন্ন পর্যায়ে ছিলো সমান পদচারণা। চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক (১৯৬২ খ্রি.) থেকে একনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ভূমিকা পালন করেন। মর্নিং নিউজ ও দৈনিক বাংলা’র মহকুমা সংবাদদাতা ছিলেন এবং আদর্শ ও নির্ভীক সাহসী সাংবাদিকতার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি বাংলাদেশ-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি’র চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখা গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। চুয়াডাঙ্গাতে ‘উদীচী’ গঠনে প্রচেষ্টা গ্রহণকারীদের অন্যতম। ঊষা সাহিত্য বাসর-এর মাধ্যমে তিনি সাহিত্যসেবার দৃষ্টান্তও রেখেছেন। এ ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা শহরে দোকান-কর্মচারী সমিতি, ধানকল-আটাকল শ্রমিক ইউনিয়ন, রিক্সা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন, বিএডিসি শ্রমিক ইউনিয়ন, রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন, ওয়াপদা শ্রমিক ইউনিয়ন ইত্যাদি শ্রমিক সংগঠন তৈরি করে তাদেরকে অধিকার সচেতন করে তোলেন।

শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনেক। নারী শিক্ষা ছাড়া সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয় – এই উপলব্ধিতে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে ‘ঝিনুক বিদ্যাপীঠ’ নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রিজিয়া খাতুন প্রভাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর পরোক্ষ কিন্তু অনিবার্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। বহুমুখী কর্মধারার অক্লান্ত সৈনিক আতিয়ূর রহমান আর্তমানবতার সেবায় নিরলস কাজ করে গেছেন এবং এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দরিদ্র অসহায় নিপীড়িত মানুষের তিনি ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি সম্ভাব্য ক্ষেত্রে চাকুরি দানে সহায়তা করে অনেক নারী-পুরুষকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
এমনই একজন মহান ব্যক্তিত্ব আতিয়ূর রহমান, যাঁর কর্মমুখর জীবন বিশ্লেষণ করলে কোন্ পরিচয়ে তিনি বেশি উদ্ভাসিত হবেন? তিনি কী সাহিত্যিক? সাংবাদিক? সমাজসেবক? রাজনীতিবিদ? সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব? নাকি সব ক’টি মিলে তিনি ছিলেন একজন নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল অনন্যসাধারণ মানুষের দৃষ্টান্ত, যিনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও দেশের স্বার্থে শোষণহীন সমাজ গঠনে সারাটা জীবন ব্যয় করেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন মহান তেজস্বী ব্যক্তিত্বের বড়ই অভাব। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি আমার অশেষ প্রণতি।
প্রসঙ্গত বলি — চুয়াডাঙ্গার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রয়াত হয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নমস্য তাঁদের কৃতির জন্য। আমাদের উচিত তাঁদের স্মরণ করা। সেটা শুধু আমাদের জন্যই নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও, এমনকি কাঙ্ক্ষিত সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রেও।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ