সিলেট ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৩৭ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা, ০৩ মে ২০২৬ : বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও চেতনার সংগ্রাম এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী আজ। যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম, গণআন্দোলন ও সাহিত্যসাধনার অবিস্মরণীয় প্রতীক।
১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে পুত্র শহীদ শাফী ইমাম রুমী ও স্বামী শরীফ ইমামকে হারিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির সংগ্রামী মা—‘শহীদ জননী’।
জাহানারা ইমাম শুধু একজন শোকাহত মা নন, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে তার নেতৃত্বে গঠিত একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটি দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
জন্মদিনে নানা আয়োজনে স্মরণ
শহীদ জননীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, স্মরণানুষ্ঠান, দোয়া মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটি আলোচনা সভার মাধ্যমে দিনটি পালন করছে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।
মুক্তিযুদ্ধে পরিবার হারিয়েও ভেঙে পড়েননি
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ জাহানারা ইমামের জীবনে বয়ে আনে গভীর শোক ও সংগ্রামের অধ্যায়। তার বড় ছেলে শাফী ইমাম রুমী মাত্র ১৯ বছর বয়সে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ ত্যাগ করে দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে তিনি শহীদ হন। একই সময়ে স্বামী প্রকৌশলী শরীফ ইমামও নিহত হন।
স্বামী ও সন্তান হারানোর এই বেদনাই জাহানারা ইমামের ভেতরে জ্বালিয়ে দেয় প্রতিবাদের আগুন। তিনি ব্যক্তিগত শোককে রূপ দেন জাতীয় সংগ্রামে। যুদ্ধের নয় মাস তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেন এবং দিনলিপির পাতায় তুলে রাখেন সেই ভয়াল সময়ের স্মৃতি।
‘একাত্তরের দিনগুলি’ : মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত দলিল
জাহানারা ইমামের অমর সৃষ্টি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। এটি শুধু একটি দিনলিপি নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের জীবন্ত ইতিহাস। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, নির্যাতন, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন—সবকিছুই উঠে এসেছে এই বইয়ে।
১৯৮৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশের পর এটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে এবং মুক্তিযুদ্ধের দলিল হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরতে বইটি এখনও সমান প্রাসঙ্গিক।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ঐতিহাসিক নেতৃত্ব
১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী গোলাম আযমকে দলের আমীর ঘোষণা করলে দেশে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ২১ জানুয়ারি ৭০টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটি।
পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি আরও বিস্তৃত আকারে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম।
ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশজুড়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যান। তার নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক গণআদালত। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার অনুষ্ঠিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পেছনে জাহানারা ইমামের সেই গণআন্দোলনকে পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখা হয়।
শিক্ষা, কর্মজীবন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন
শৈশবে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতা আবদুল আলীর উৎসাহে রক্ষণশীল পরিবেশের বাইরে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন জাহানারা ইমাম। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরে বিএড সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। পরবর্তীতে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে শিক্ষকতা ছেড়ে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।
সাহিত্যকর্মে অনন্য অবদান
একজন সুসাহিত্যিক হিসেবেও জাহানারা ইমামের অবদান অনস্বীকার্য। ‘একাত্তরের দিনগুলি’ ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— অন্য জীবন, বীরশ্রেষ্ঠ, জীবন মৃত্যু, চিরায়ত সাহিত্য, বুকের ভেতরে আগুন, নাটকের অবসান, দুই মেরু, নিঃসঙ্গ পাইন, নয় এ মধুর খেলা, ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস এবং প্রবাসের দিনলিপি।
তার সাহিত্যকর্মে দেশপ্রেম, মানবিকতা, সংগ্রাম, নারীর শক্তি এবং জীবনের গভীর বোধ প্রতিফলিত হয়েছে।
মৃত্যুতেও অমর
দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকার পর ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে মৃত্যু তাকে নিঃশেষ করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং ন্যায়বিচারের সংগ্রামে তিনি আজও প্রেরণার উৎস।
জাতির শ্রদ্ধা
জাহানারা ইমাম ছিলেন সাহস, ত্যাগ ও সত্যের প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন মায়ের শোকও জাতির মুক্তির শক্তিতে রূপ নিতে পারে। তার ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই মহীয়সী নারীকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন শহীদ জননী, সাহসী সংগঠক ও বিবেকবান সাহিত্যিক হিসেবে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—
আজ তেসরা মে-র প্রভাতে জাগে ইতিহাসের শিখা,
বাংলার আকাশ জুড়ে ওঠে স্মৃতির গম্ভীর দীক্ষা।
সাতানব্বইটি বসন্ত পেরিয়ে আজও দীপ্ত নাম,
জাহানারা ইমাম তুমি শহীদ জননীর চিরধাম।
মুর্শিদাবাদের সুন্দরপুরে ভোরের প্রথম আলো,
একটি কন্যা এলো ধরায় মমতার রঙ ঢালো।
সময়ের স্রোতে বড় হলে তুমি দৃপ্ত সম্ভ্রমে,
রক্ষণশীল দেয়াল ভেঙে দাঁড়ালে আলোর সম্ব্রমে।
পিতার হাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে উঠিল প্রাণে,
অন্ধকারে পথের দিশা দিলে জ্ঞানের টানে।
কলকাতার সেই শিক্ষাঙ্গন, লেডি ব্রাবোর্ন দ্বার,
তোমার চরণ চিনে নিল এক নবযুগের পার।
ঢাকার বুকে জ্ঞানের সাধনা, শিক্ষকতার দিন,
কত শত কিশোরীর মনে জাগালে আলোর ঋণ।
সিদ্ধেশ্বরীর প্রাঙ্গণে তুমি দৃঢ় কণ্ঠস্বরে,
শিখিয়েছ—নারী মাথা তোলে দাঁড়াক বিশ্বভরে।
কেবল ঘরের গৃহিণী নও, কেবল নও সংসার,
দেশের তরে দীপ্ত আত্মা, মানুষের অধিকার।
স্বামী শরীফ পাশে ছিলেন সহযাত্রার মতন,
স্বপ্ন বুনে গড়ছিলে ঘর, প্রেম ছিল অনুক্ষণ।
তারপর এলো যুদ্ধের বছর, একাত্তরের ডাক,
রক্তমাখা মার্চের রাতে কেঁপে উঠিল ফাঁক।
ঢাকার পথে বুটের শব্দ, অগ্নি, লাশের ঢেউ,
মানুষ তখন মৃত্যুর মুখে—কোথাও আশ্রয় নেই।
সেই ঘরে ছিল তরুণ রুমি, দীপ্ত চোখে আগুন,
উনিশ বছরের সাহস বুকে জ্বলে উঠিল গুণ।
আমেরিকার সুখের ডাকে ফিরল না সে আর,
মায়ের চোখে স্বাধীন দেশের শপথ অটল ভার।
বলেছিল কি—“মা, দেশ ডাকে, যাই তবে যুদ্ধেতে”,
তুমি শুধু বুক চেপে বলেছ—“যাও রে সত্য পথে।”
মায়ের চোখে জল ছিল ঠিক, তবু কণ্ঠে জয়,
এমন মাতা জন্ম না নিলে ইতিহাস হয় ক্ষয়।
রুমি গেল গেরিলা দলে নগরযুদ্ধ পথে,
অন্ধকারে বজ্র হয়ে নামল শত্রুর রথে।
তুমি তখন প্রতীক্ষাতে গুনছ দিনের ক্ষণ,
দরজাতে যে কড়া পড়ে—বুক কাঁপে অনুক্ষণ।
একদিন এলো নৃশংস কাল, পাক হানাদার দল,
ছিনিয়ে নিল প্রাণের সন্তান, বন্ধ হলো চল।
স্বামীও গেল মৃত্যুর পথে, ঘর হলো নিরাশ,
তবু তুমি ভাঙনি জননী, ভাঙেনি বিশ্বাস।
শোকের ভস্মে বসে বসে যে নারী লিখে যায়,
চিরকুটে আর ছেঁড়া পাতায় মুক্তির মহিমায়।
ভয়ের ভেতর গোপন ভাষায় লিখলে দিনের কথা,
জাতির তরে রেখে গেলে আগুনমাখা ব্যথা।
সেই দিনলিপি পরে হলো অমর গ্রন্থখানি,
একাত্তরের দিনগুলি—বাংলার প্রাণের বাণী।
এ কেবল কি স্মৃতির খাতা? এ তো রক্ত দলিল,
নয় মাস জুড়ে জাতির চোখে অশ্রু, শপথ, তিল।
যেখানে মায়ের নিশ্বাস আছে, রুমির পদধ্বনি,
যেখানে রাতের জানালাতে বন্দুকেরও রণি।
যেখানে ক্ষুধা, ভীতি, আশা, প্রতিরোধের গান,
যেখানে জেগে ওঠে আবার মুক্ত দেশের প্রাণ।
স্বাধীনতার পরে তুমি থামনি একটুও আর,
দেখলে ঘাতক মাথা তোলে, বিষ ছড়ায় বারবার।
রাজাকার আর দালালরা যখন হাসে মুখে,
তোমার ভিতর আগুন জ্বলে জনগণের সুখে।
নব্বই দশক এলে আবার ডাক দিলে জনতারে,
“বিচার চাই, বিচার চাই”—ধ্বনি উঠিল ধ্বনিধারে।
সত্তরটি সংগঠন মিলে এক হল একসাথে,
তোমার কণ্ঠে জাতি দাঁড়াল ন্যায়ের মহাপথে।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি,
তোমার হাতে পেল তখন জাগরণের অমৃতি।
রোগে ক্ষয়ে শরীর ছিল, তবু মন পর্বত,
ক্যান্সারেরও কাঁটা ভেঙে চললে দৃঢ় রথ।
ছাব্বিশে মার্চ গণআদালত সোহরাওয়ার্দী তলে,
লাখো মুখের শপথধ্বনি উঠল দিগন্ত জ্বলে।
গোলাম আযম প্রতীকী দণ্ড পেল জনরায়,
বাংলার বুকে বিচার চেতা বজ্রের মত যায়।
আইনের পথে পরে যখন বিচার হলো সত্য,
তোমার বপন বীজের ফলেই জাগল নূতন নিত্য।
মানবতাবিরোধী যারা লুণ্ঠন করেছিল প্রাণ,
তাদের প্রতি ন্যায়বিচারের উঠল দৃপ্ত গান।
তুমি শিখালে—ক্ষমা মানে নয় তো ভুলে যাওয়া,
রক্তঋণকে মুছে ফেলে নীরবতায় চাওয়া।
ন্যায়ের আগে শান্তি আসে না কোনো সমাজে,
অপরাধী মুক্ত থাকলে আগুন জ্বলে লাজে।
একজন মা হয়েও তুমি হলে জাতির ঢাল,
শোকের ভিতর দাঁড় করালে প্রতিবাদের কাল।
একজন লেখক হয়েও তুমি ইতিহাসের মুখ,
কলম তোমার তরবারি যেন ছিন্ন করল দুখ।
“অন্য জীবন”, “দুই মেরু”, “বুকের ভেতর আগুন”,
প্রবাসদিনের দিনলিপিতে জ্বলল বেদনার গুণ।
“ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস” লিখে দিলে তুমি,
মৃত্যুর মুখেও কীভাবে মানুষ দাঁড়ায় ভূমি।
তোমার জীবন শুধু নয় তো ব্যক্তিগত ক্ষয়,
এ যে জাতির আয়নাতে দেখা সত্যময়।
যেখানে নারী মাথা তোলে, অন্যায় করে লড়াই,
যেখানে সন্তান দেশমাতৃকায় জীবন দিতে চায়।
আজকের তরুণ যদি কখনো পথ হারায়ে যায়,
তোমার পাতা খুলে দেখুক—কেমন করে চায়।
কেমন করে শোককে নিয়ে পতাকা করা যায়,
কেমন করে মৃত্যুর মুখে স্বাধীনতা চায়।
আজকের নারী যদি কখনো অবহেলায় থামে,
তোমার নামের আগুন নিক সে বুকের অন্তঃস্থানে।
তুমি বলো—জ্ঞানই শক্তি, সত্যই সর্বজয়,
দুর্বলতা নয়, সংগ্রামেই মানুষের পরিচয়।
বাংলার যত জননী আজ সন্তানেরে শেখায়,
রুমির কথা, তোমার কথা নীরব স্নেহে লেখায়।
শিশুর মুখে প্রথম যখন স্বাধীনতার নাম,
সেই উচ্চারণে জড়িয়ে থাকে তোমারই অবিরাম।
ঢাকার পথে, গ্রামের ঘাটে, নগরীর ব্যস্ত দিনে,
তোমার স্মৃতি শিউলি হয়ে ঝরে ভোরের ক্ষীণে।
বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠশালা, গ্রন্থাগারের ধ্বনি,
সবখানে আজ উচ্চারিত—শহীদ জননী।
ডেট্রয়েটের দূর হাসপাতালে থেমেছিল প্রাণসুর,
কিন্তু তোমার অগ্নিজীবন হয়নি কভু দূর।
ছাব্বিশে জুন নিভল দেহের প্রদীপ ক্ষণিককাল,
আদর্শ তোমার জ্বলছে এখন সূর্যের সমতাল।
যতদিন এই বাংলাদেশে পদ্মা বইবে বুকে,
যতদিন ধান শিষ দোলে কৃষকের সুখরুখে,
যতদিন শিশুরা লিখবে অ আ ক খ নাম,
ততদিন জাগবে শ্রদ্ধায়—জাহানারা ইমাম।
যতদিন অন্যায় দেখলে মানুষ রুখে দাঁড়ায়,
যতদিন সত্য বলার শক্তি কেউ না হারায়,
যতদিন শহীদের রক্ত ডাকে প্রজন্মগণ,
ততদিন তোমারই নামে জাগবে স্পন্দন।
আজ জন্মদিনে নতশিরে জানাই অর্ঘ্য গান,
তোমার পায়ে রাখি আমরা কৃতজ্ঞতার প্রাণ।
মায়ের চেয়ে বড় যে মা—জাতির মমতাধাম,
শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হোক—জাহানারা ইমাম।
শহীদ জননী, তোমার তরে এ বাংলার শপথ—
ঘাতক, দালাল, মিথ্যার সাথে চলবে নাকো রথ।
মানবতা আর স্বাধীনতার রাখব জাগ্রত দাম,
হে অমর দীপ, হে জননী—জাহানারা ইমাম।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি