মে দিবসের র‍্যালিতে অংশ নিন

প্রকাশিত: ৭:১৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৯, ২০২৬

মে দিবসের র‍্যালিতে অংশ নিন

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ : বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির দিন মহান মে দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে র‍্যালির কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

Manual6 Ad Code

আগামী ১ মে ২০২৬, শুক্রবার সকাল ৯টায় রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত পার্টি কার্যালয় থেকে এ র‍্যালি শুরু হবে। দলটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নুর আহমদ বকুল স্বাক্ষরিত ও গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে মহান মে দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরে বলা হয়, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক হলো মে দিবস। বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এ দিবস আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং শ্রম অধিকার সংকোচনের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের ঐক্য আরও জরুরি হয়ে উঠেছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

ওয়ার্কার্স পার্টি নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ এখনও ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, নিরাপদ কর্মস্থল, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাসহ নানা দাবিতে সংগ্রাম করে চলেছেন। পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের অবদান দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও তাদের জীবনমান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ বাস্তবতায় মে দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অধিকার আদায়ের নতুন শপথের দিন।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, র‍্যালিতে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকাস্থ সদস্যবৃন্দ, দলীয় নেতাকর্মী, বন্ধুপ্রতিম ব্যক্তি, বিভিন্ন গণসংগঠনের সমর্থক এবং শুভানুধ্যায়ীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে সবাইকে উপস্থিত থেকে কর্মসূচি সফল করার জন্য দলটির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়।

বিবৃতিতে “দুনিয়ার মজদুর এক হও” স্লোগান উচ্চারণ করে আন্তর্জাতিক শ্রমিক ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের ন্যায্য দাবি এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মহান মে দিবসকে ঘিরে বামপন্থী ও শ্রমিকমুখী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি দেশের শ্রম রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে শ্রম অধিকার, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা ইস্যুতে এ ধরনের কর্মসূচি জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।

প্রসঙ্গত, প্রতি বছর ১ মে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মহান মে দিবস পালিত হয়। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিক আন্দোলনের স্মৃতিকে ধারণ করে দিবসটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করা হয়।

পহেলা মে : রক্তের শপথে শ্রমের জাগরণ
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

রক্তমাখা এক প্রভাতে ওঠে লাল সূর্য হাসি,
শ্রমিক কণ্ঠ জেগে ওঠে ভাঙে নীরব ফাঁসি।
শিকাগোর সেই রাজপথে দ্রোহের আগুন ধূলি,
হে-মার্কেটের আকাশজুড়ে বজ্র উঠল দুলি।

পহেলা মে—তোমার নামে আজও চলে শ্লোগান,
ঘামে ভেজা হাতের মুঠি চূর্ণ করে শাসক।
কারখানার কালো দরজা কাঁপে হুঙ্কার ধ্বনি,
“আট ঘণ্টা হোক কাজের দিন”—শপথ ছিল জ্বনি।

যারা শুধু রুটি চেয়েছে, চেয়েছে মানব মান,
তাদের বুকে গুলি ঝরে লিখল নতুন গান।
রক্তধারা রাজপথ বেয়ে নদীর মতো বহমান,
সেই নদীতে আজও জ্বলে লাল পতাকার সংগ্রাম।

অগাস্ট স্পাইস উচ্চারিলেন—“দ্রোহ দমবে না”,
ফাঁসির মঞ্চ কাঁপিয়ে বলল ইতিহাস-গাঁথা।
পারসনসের চোখে তখন অনন্তেরই দীপ,
ফিশার হেসে মৃত্যুকে কয়—“এই তো বিপ্লবের নীপ।”

এঞ্জেল বলল—“জনগণের কণ্ঠস্বর শোনাও”,
দড়ির ফাঁসে ঝুলেও তারা সূর্যকে ডেকেছিল।
মৃত্যু তাদের থামায় নি তো, থামায় নি সে গান,
মাটির নিচে বীজ হয়ে যায় বিপ্লবী আহ্বান।

মে দিবস তাই কেবল কোনো ছুটির মেলা নয়,
নতুন শপথ, জাগ্রত রণ, ভাঙার দৃপ্ত পণ।
মে দিবস তাই কারখানাতে মজুর হাতের ঢেউ,
ক্ষেতের আলের কৃষক কণ্ঠ, শ্রমের নূতন বেউ।

যে হাতে গড়ে সেতু-নগর, জাহাজ, রেল আর বাঁধ,
যে হাতে উঠে ধানের শীষে সোনার রোদেল সাধ,
যে হাতে বোনে বস্ত্র কারে, বইয়ের ছাপা হয়,
সে হাত কেন ক্ষুধায় কাঁপে, কেন বঞ্চনা সয়?

যে নারী ভোরে সুঁইয়ের ফোঁড়ে কারখানাতে যায়,
সন্ধ্যা হলে সন্তানেরে কোলে তুলে চায়,
তার চোখজোড়া ক্লান্ত কেন, মজুরি কেন কম?
কেন তারই ঘামে ভেজা ঘর থাকে নীরব শ্মশান?

যে শিশু আজ ইটের ভাটায় কাঁধে তোলে ভার,
স্কুলের পথে যায় না কেন তারই অধিকার?
যে কিশোরী পোশাক সেলাই করে দিনরাত জেগে,
তারই মুখে স্বপ্ন কেন শুকায় কান্না বেয়ে?

মে দিবসের মানে তবে ন্যায়ের নতুন পথ,
শ্রমের দামে মানুষ বাঁচুক—এই তো দৃপ্ত রথ।
আট ঘণ্টা কাজ, বিশ্রামও চাই, চাই আনন্দ গান,
চাই শিক্ষার আলোকরশ্মি, চাই চিকিৎসা-ধান।

চাই নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, চাই সমান মজুরী,
চাই শ্রমঘামে রাষ্ট্র গড়ার সম্মানিত সুরী।
চাই ইউনিয়ন গড়ার অধিকার নির্ভয়,
চাই সংগঠিত কণ্ঠস্বর—মানুষ বাঁচার জয়।

শ্রমিক যখন বিভক্ত থাকে জাতি-ধর্ম-ভাগে,
শোষক তখন হাসে চুপে সিংহাসনের রাগে।
মে দিবস তাই শেখায় এসে—হাত ধরো সব হাত,
বাংলা, আরব, লাতিন, আফ্রিকা—একই রক্তস্রোত।

কৃষক যদি ঋণে ডুবে জমি হারায় শেষে,
শ্রমিক যদি ছাঁটাই হয়ে ফেরে ঘরে ক্লেশে,
ছাত্র যদি বেকার ঘুরে ভবিষ্যতের দ্বারে,
তবে বুঝিবে শোষণ বসে একই অন্ধকারে।

এই পৃথিবীর প্রতিটি নগর, প্রতিটি গ্রাম-গলি,
শ্রমের রক্ত ছাড়া গড়া কিছুই নয় তো চলি।
তবু কেন প্রাসাদ উঁচু, বস্তি থাকে নিচে?
তবু কেন উৎসব জ্বলে কারও কান্না পিছে?

যে ডাক্তার রাত জাগে গিয়ে রোগীর প্রাণে ফেরে,
যে নার্স সেবা দেয় নির্ঘুম, জীবন রাখে ঘিরে,
যে পরিচ্ছন্ন শ্রমিক ভোরে শহর ঝাড়ে নীরব,
সবার ঘামে সভ্যতারই সকাল হয় সুদীপ্ত।

তাই তো বলি—শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা শেখো আজ,
মিথ্যা ভোগের অহংকারে কোরো না লাজহীন সাজ।
মানুষ আগে, মুনাফা পরে—এই হোক বিধান,
এই বাণীই মে দিবসের অগ্নি-উচ্চ গান।

বাংলার মাঠে, নদীর ঘাটে, কারখানার ধোঁয়ায়,
চা-বাগানে, জাহাজঘাটে, মৎস্যজীবীর নৌকায়,
রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ডেলিভারির জন,
সবাই মিলে তোলে নগর—তাদের কোথায় খেল?

তাদের ঘরে বিদ্যুৎ কম, ভাড়া বাড়ে নিত্য,
বাজারদরে হাঁসফাঁস করে সংসারেরই চিত্র।
দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরে যায়, ক্ষতিপূরণ শূন্য,
তবু সংবাদ দুই দিনেরই, পরে সবই ধূসর।

মে দিবস তাই স্মারক নয়, কর্মসূচির দিন,
আইন বদল, নীতি বদল, বদল চাই সংগীন।
ন্যায্য মজুরি মানবো আমরা জীবনেরই মানে,
কর্মঘণ্টা আইনমতো চলুক প্রতিক্ষণে।

Manual1 Ad Code

চুক্তিহীন সব নিয়োগ যেন শেষ হয় এবার,
নারী-পুরুষ সমান বেতন হোক অবিচার পার।
প্রবাসী যারা ঘাম ঝরায়ে রেমিট্যান্সে দেশ,
তাদের অধিকারের প্রশ্নে হোক জাগরণের রেশ।

ডিজিটালের নতুন যুগে গিগ শ্রমিকের দল,
অ্যাপের নিচে নামহীন কত ক্লান্তির জল।
তাদেরও তো শ্রমের দাম চাই, চাই সুরক্ষা ছায়া,
মে দিবসের পতাকা তলে তাদের স্থানও চায়।

পরিবেশের ধ্বংসযজ্ঞে শ্রমিক আগে মরে,
বিষাক্ত ধোঁয়া, নদী দূষণ, ঝুঁকি পড়ে ঘরে।
সবুজ কারখানা, নিরাপদ কাজ—নতুন যুগের ডাক,
শ্রমের সাথে পৃথিবী বাঁচাও—এবার সবার হাক।

যুদ্ধ যখন বাজার খোঁজে অস্ত্রের লোভে ধায়,
মুদ্রাস্ফীতি ক্ষুধার কাঁটা গরিব বুকে গায়।
শান্তির দাবী, ন্যায়ের দাবী, শ্রমের বিশ্বজোট,
মে দিবসের আন্তর্জাতিক রক্তমাখা শপথ।

Manual5 Ad Code

যে ইতিহাস ভুলে যায় জাতি, হারায় পথের মান,
তাই আজ আবার স্মরণ করি শহীদদেরই গান।
শিকাগো থেকে ঢাকা নগর, খুলনা, চট্টগ্রাম,
রক্তের ধারা এক স্রোতে কয়—“মানুষ হোক অবিরাম।”

তোমার নামে পহেলা মে, লাল পতাকা ওড়ে,
অন্যায়ের সব প্রাচীর ভাঙে জনতারই ঘোরে।
ভয় দেখিয়ে আর ক’দিন বা রাখবে শোষক রাজ?
উঠে দাঁড়াক সংগঠিত জন—এই তো সময় আজ।

শ্রমিক যদি জাগে একদিন, বদলাবে কালের মুখ,
ক্ষুধার ভাঁজে ফুটবে হাসি, ঘুচবে বঞ্চনার দুখ।
কারখানাতে গান উঠিবে, মাঠে উঠিবে ধান,
বিদ্যালয়ে শিশুর কণ্ঠে বাজবে নতুন প্রাণ।

সাম্যের রুটি ভাগ হবে সব, মর্যাদা হবে সাথি,
মানবধর্মে মিলবে গেয়ে সব ভাষা সব জাতি।
পৃথিবী জুড়ে শ্রমের হাতে উঠুক নব নির্মাণ,
মে দিবসের দীপ্ত মশাল দিক সে অভিষেক দান।

এসো তবে আজ শপথ করি, কেবল বুলি নয়,
সংগঠনের দৃঢ় পথে নামুক জনতার জয়।
মিথ্যা ভেদ আর ঘৃণার দেয়াল ভাঙুক হাতের ঘায়ে,
শ্রমের ন্যায্য পৃথিবী গড়ি মানুষেরই চায়ে।

পহেলা মে, তোমায় জানাই লাল সেলাম আবার,
রক্তে ধোয়া স্মৃতির ভেতর জাগুক অগ্নিধার।
যতদিন এক শ্রমিক ক্ষুধায় কাঁদে রাতের শেষে,
ততদিন মে দিবস জাগে সংগ্রামেরই দেশে।

Manual4 Ad Code

যতদিন এক শিশু কাঁদে অনাহারের ক্ষণে,
যতদিন মজুরি লুটে নেয় দম্ভী শোষণ গোষ্ঠী গোপনে,
ততদিন তোমার ডাকে ডাকে উঠবে কণ্ঠস্বর—
“মানুষের শ্রম মানুষেরই”—হোক পৃথিবী ভর।

লাল সালাম সেই শহীদদের, যারা দিল প্রাণ,
লাল সালাম সব খেটে খাওয়া মানুষেরই গান।
লাল সালাম প্রতিটি হাতে, ঘামে ভেজা বুকে,
পহেলা মে’র অমর শপথ থাকুক যুগে যুগে।
—(শিকাগোর পহেলা মে,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ