রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির তেরো বছর: দাবি পূরণ হয়নি এখনো

প্রকাশিত: ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৪, ২০২৬

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির তেরো বছর: দাবি পূরণ হয়নি এখনো

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | সাভার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ : রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির তেরো বছর পূর্ণ হলো আজ।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে ধসে পড়েছিল নয়তলা ভবন রানা প্লাজা। এটি ছিল দেশের পোশাক শিল্পে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ভবন ধসে প্রাণ হারান হাজারেরও বেশি মানুষ। যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন, তারাও পঙ্গুত্ব নিয়ে কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।

জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনসহ শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ বলছে, যাদের অবহেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, এই তেরো বছরেও তাদের শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোও এখনো যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়নি।

Manual8 Ad Code

তাদের দাবি, যাদের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, ভবন মালিক সোহেল রানাসহ তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া। আহত শ্রমিক ও নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের পুনর্বাসন করা। শ্রমিকদের আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। রানা প্লাজার জায়গাটি অধিগ্রহণ করে শ্রমিকদের জন্যে হাসপাতাল নির্মাণ এবং ২৪ এপ্রিলকে ‘জাতীয় শ্রমিক শোক দিবস’ ঘোষণা করা।

জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ জানায়, এর আগেও গতবছর একযুগ পূর্তিতে ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সারাদেশে শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি পালন করেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি দিবস পালন করা হচ্ছে। সকালে সাভারের আশুলিয়ার আঞ্চলিক শ্রমিক সংগঠনগুলো নিয়ে গড়ে তোলা “শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের” পক্ষ থেকে রানা প্লাজার অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। কর্মসূচিতে ১৮টি শ্রমিক সংগঠন অংশ নিয়েছে। প্রতিটি সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঁচ জন করে অংশগ্রহণ করেছে। এ ছাড়াও, আহত-নিহত শ্রমিকদের স্বজনরাও এতে অংশ নেন।’

‘মর্মান্তিক ওই ঘটনার পর থেকেই আমরা বেশ কয়েকটি দাবিতে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি দিবস পালনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছি। কিন্তু, এই তেরো বছরেও আমাদের দাবিগুলো পূরণ হয়নি’, যোগ করেন তিনি।

রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, রানা প্লাজার আহত শ্রমিক ও নিহত শ্রমিকদের পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের সহযোগিতায় সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।’

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, তেরো বছর পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত রানা প্লাজার বিচারকাজ শেষ হয়নি। প্রতিশ্রুতি মতো দেওয়া হয়নি শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় অনেক শ্রমিকের জীবন অন্ধকারে চলে গেছে। সরকার তাদের নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিলেও অনেক পরিবার এখনও মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা ভবন মালিক সোহেল রানার ফাঁসিসহ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।

রানা প্লাজার তেরো বছর
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

আজও সেই সকাল নামে ধূসর বিষণ্নতায়,
ভাঙা কংক্রিটে লেগে থাকে রক্তের গন্ধ হায়।
সাভারের আকাশ জুড়ে জমাট নীরবতা,
মানুষের আর্তনাদে কেঁপেছিল যে ব্যথা।

তেরোটি বছর গেল—কেউ ভুলতে পারেনি,
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা স্বপ্ন হারায়নি।
মায়ের কোল ফাঁকা, বাবার চোখ শুকনো,
ভাইয়ের ডাকে সাড়া নেই—নেই কোনো মুখ চিনো।

Manual2 Ad Code

সেদিনও তো সকাল ছিল অন্য দিনের মতো,
কাজে যাওয়া মানুষেরা ছিল ব্যস্ত যত।
হাসি মুখে বেরিয়ে গিয়েছিল যে ঘর ছেড়ে,
ফিরে এলো না তারা—রইল শুধু শূন্য ঘরে।

কত যে কণ্ঠ চুপ হলো ইট-পাথরের তলে,
কত আশা থেমে গেল এক নিমিষের ছলে।
কত শিশুর স্বপ্ন ভাঙল বাবার হাত ছাড়া,
কত সংসার নিভে গেল হঠাৎ অন্ধকারে।

Manual2 Ad Code

বলে তারা—বিচার হবে, শাস্তি হবে ঠিক,
কিন্তু তেরো বছরেও রইল সে প্রশ্ন চিরকালিক।
যারা ছিল দায়ী এই নির্মম অবহেলায়,
কেন তারা রয়ে গেছে নিরাপদ ছায়ায়?

ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি, কাগজে লেখা কথা,
বাস্তবের জীবনে তা কেবলই এক ব্যথা।
যারা বেঁচে আছে আজ পঙ্গুত্বের ভারে,
দিন কাটে তাদের দুঃখের অন্ধকারে।

হাসপাতালের শয্যায় কত দীর্ঘশ্বাস পড়ে,
চিকিৎসা নেই যথেষ্ট—দুঃখ জমে ঘরে।
যে হাত কাপড় সেলাই করত দেশের তরে,
আজ সে হাত কাঁপে শুধু ব্যথার অশ্রুধারে।

Manual7 Ad Code

কোথায় সেই প্রতিশ্রুতি—আজীবন সেবা?
কোথায় পুনর্বাসনের নিরাপদ ভরসা?
কোথায় সেই শোকদিবস—রাষ্ট্রের স্বীকৃতি?
কেন এখনো নীরব থাকে ক্ষমতার নীতি?

রানা প্লাজার জায়গায় কেন নেই হাসপাতাল?
কেন শ্রমিক বাঁচে না—থাকে অনাদর কাল?
যে মাটিতে রক্ত ঝরেছে সহস্র প্রাণের,
সেই মাটিতে উঠুক ঘর চিকিৎসা-দানের।

ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় আজও মানুষ এসে,
কিন্তু শোক কি মুছে যায় আনুষ্ঠানিক শেষে?
যে দুঃখ রয়ে গেছে অন্তরের গভীরে,
তা কি কখনো হারায় সময়ের নীরব নীড়ে?

শ্রমিকেরা চেয়েছিল শুধু বাঁচার অধিকার,
নিরাপদ কর্মস্থল, সামান্য সম্মান আর।
তাদের সেই দাবিগুলো আজও অপূর্ণ পড়ে,
নির্মম বাস্তবতা হাসে নীরব ঘোরে।

রাজনীতি, প্রতিশ্রুতি, সভা-সমাবেশ,
সবই যেন শব্দ শুধু—নেই কোনো পরিবেশ
যেখানে বিচার সত্যি দাঁড়াবে দৃঢ় পায়ে,
দোষীরা শাস্তি পাবে ন্যায়ের আলোর ছায়ায়।

একদিন কি আসবে তবে সেই ন্যায়বিচার?
যেখানে দোষীর শাস্তি হবে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য?
যেখানে শ্রমিক বাঁচবে মর্যাদার সাথে,
ভয়হীন কর্মস্থল গড়বে নতুন প্রভাতে?

রানা প্লাজা শুধু একটি ভবনের নাম নয়,
এটি এক ইতিহাস—বেদনার অশেষ ক্ষয়।
এটি একটি প্রশ্ন, একটি প্রতিবাদ,
এটি এক জাতির বিবেকের অবিরাম উন্মাদ।

তেরো বছর পরেও সেই ক্ষত রয়ে যায়,
নতুন প্রজন্মও জানে—কী ভয়াবহ হায়।
যদি না শিখি আমরা সেই দিনের পাঠ,
তবে কি থামবে আর এমন মৃত্যুর ঘাট?

তাই আজ শপথ হোক—শুধু শোক নয় আর,
ন্যায়ের জন্যে জাগুক প্রতিটি অধিকার।
শ্রমিকের জীবনের মূল্য দিক সমাজ,
মানবিক হোক দেশ—এই হোক আজ সাজ।

যে রক্ত ঝরেছে একদিন সাভারের বুকে,
তা বৃথা যেতে পারে না ইতিহাসের মুখে।
তাদের আত্মত্যাগ হোক আলোর দিশা,
ন্যায়ের পথে এগিয়ে যাক প্রতিটি নিশা।

রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ আজও বলে যায়—
“ভুলে যেও না, মানুষ—এই দায় তোমারই দায়।”

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ