না খেয়ে থাকার উপকারীতা

প্রকাশিত: ৭:১৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৯, ২০২১

না খেয়ে থাকার উপকারীতা

|ইশরাত নাহের ইরিনা|

আজ বলবো অনেক অনেক দিন আগের কথা। যখন বিদ্যুৎ আবিস্কার হয়নি। মানুষ গুহায় বাস করত। তখন মানুষ সন্ধ্যা নামার আগেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরতো। পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার খাবার এবং শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ত। খাবার সংগ্রহ করার পর তারা খেতো।তার মানে তাদের রাতের খাবারের পর একটা দীর্ঘ বিরতি থাকত। বিজ্ঞানের ভাষায় এই জীবন যাত্রাকে বলে Fasting, আজকে কথা বলব Intermittent Fasting নিয়ে।

মানসিক স্বাস্থ্য

আগের দিনের মানুষের এতো রোগ ছিলো না এবং তারা বাচতেনও বেশিদিন। তারা বিজ্ঞানের এই অভিনব Intermittent Fasting এর কথা হয়তো জানতেন না ,কিন্তু তবুও তাদের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব ছিলো ।আজ বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষ Intermittent Fasting গ্রহন করছেন । এই পদ্ধতিতে রাতের খাবার একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে পরের দিন পর্যন্ত সর্বমোট ১৬ ঘন্টা না খেয়ে থাকতে হয়। শুধু সাদা পানি খাওয়া যাবে। এই জীবনধারা খুবই সহজ । আপনি যদি রাত আটটায় ডিনার সেরে ফেলেন এবং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরেন ,তাহলে পরেদিন সকালে খুব সহজেই এই সময় মেনে চলা সহজ। তারমানে পরেরদিন দুপুর বারটায় যখন ষোল ঘন্টা হবে , তখন খাবার খেতে পারেন। ফল বা ফলের জুস দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। তারপর একেবারে দুপুরের খাবার সেরে নেয়া যেতে পারে ।তবে বেশি মসলাযুক্ত,তৈলাক্ত এবং ঝাল খাবার কোনোভাবেই খাওয়া উচিত না এসময়।

আধুনিক বিজ্ঞান আজ Intermittent Fasting কে  রোগমুক্তির হাতিয়ার বলছে। কিন্তু ধর্মীয়ভাবে এই প্রথা অনেক আগে থেকেই চলে এসেছে। আমাদের মুসলিম ধর্মে বা অন্য ধর্মেও রোজা রাখার নিয়ম চালু আছে। মুসলিম ধর্মে Dry fasting প্রচলিত যেখানে কিছুই খাওয়া যাবেনা, আর অন্যান্য ধর্মে  Intermittent Fasting প্রচলিত যেখানে শুধু পানি বা ফল খাওয়া যাবে। তবে উভয় পদ্ধতিই আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, অনেক রোগের বিরুদ্ধে লড়তে সহায়তা করতে এবং শরীরে যে ক্ষত বা অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টি হয় সেটাকে মেরামত করতে সাহায্য করে। কিন্তু আমরা এর সদ্বব্যাবহার করিনা কারন আমরা রোজা ভেঙ্গেই  ভাজা-পোড়া খাই। বরং রমজান মাসে আমাদের খাবার দাবার আরো বেশি রাজকীয় হয়ে উঠে। তাই ধর্মীয় পূন্য ছাড়াও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে আমাদের এই Intermittent Fasting যথাযথ সুফল বয়ে আনতে পারছেনা।  তাই ফাস্টিং কে কার্যকরী করতে হলে স্বাস্থকর খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত হতে হবে এবং সেই সাথে সামগ্রিক জীবনযাত্রায় গুনগত পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।

এবার আসা যাক কেনো এই Intermittent Fasting উপকারীঃ

আমাদের শরীরে দুইটি ধাপ আছে, একটি হচ্ছে  elimination phase and অপরটি building phase.আমরা যদি elimination phase খাওয়া দাওয়া করি ,তাহলে সেটা আমাদের  ওজন বাড়িয়ে দিতে এবং শরীরের অন্যান্য অসামঞ্জস্যতা দেখা দিতে সাহায্য করে । কিন্তু আমরা যদি  building phase এ খাওয়া দাওয়া করি তখন আমাদের শরীর প্রয়োজনীয় পুস্টি পাবে, আমাদের পরিপাকন্ত্র সুস্থ্য থাকবে এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধ্বি পাবে। আমরা যখন রাতের  খাবার খাওয়ার পর ষোল ঘন্টা অন্য কিছু না  খেয়ে শুধু পানি খেয়ে থাকবো, ওই সময়টাকে elimination phase বলে। এই সময়ে বডিতে থাকা সব বিষাক্ত এবং ক্ষতিকর পদার্থ বেরিয়ে আসবে যেহেতু  শুধু পানি খাওয়া হচ্ছে  এবং যা খাচ্ছি  সেটাও ঠিক মত হজম হচ্ছে।

আমরা যখন একটু পর পর খেতে থাকি ,আমাদের পরিপাকতন্ত্র অনবরত মেশিনের মত কাজ করতে থাকে ।খাদ্য থেকে প্রাপ্ত উপাদানকে শক্তিতে রুপান্তরিত করে ।কিন্তু একটু  চিন্তা করে দেখুন তো একবার ,একটা মেশিন যদি সারাক্ষন চলতেই থাকে ,এটি আস্তে আস্তে ক্ষয় হতে থাকে ,নস্ট হতে থাকে।আর তাই Intermittent Fasting এর এই ধারনার মূলে রয়েছে পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয়া যাতে করে এটি আমদের শরীরের অন্যান্য অংশে কাজ করে আমদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে ,আমাদের ওজন নিয়ন্ত্রন করতে পারে, gut health কে সুস্থ্য রাখতে পারে,রোগের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। আমাদের যখন জ্বর হয়  তখন কিছু খেতে ইচ্ছা করেনা ।আমাদের শরীর আমাদের সিগনাল দেয় ‘আর খেয়োনা’ । কিন্তু আমরা ভুলটা এখানেই করি ,আমরা অসুস্থ হলে মনে করি আরো বেশি খেতে হবে ।আর এজন্যই আমাদের মেডিসিন ছাড়া কোনো অসুখ সহজে কমেনা ।কারন আমরা যখন অনবরত খাওয়ার মধ্যে থাকি, আমাদের শরীর তখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (immune system) কে বৃদ্ধি করতে পারেনা এবং  শরীরের ক্ষত/প্রদাহ (inflammation/imbalance) কে ভালো করতে পারেনা, বরং পরিপাকতন্ত্র( digestive system) তখন আমরা যা খাচ্ছি ,সে খাবার কে শক্তি ( energy) তে পরিনত করতে ব্যাস্ত থাকে।

আর তাই আজ বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার মানুষ ‘সুস্থ জীবন-যাপন’ এবং স্বাভাবিকভাবে রোগ মুক্তির লক্ষ্যে Fasting কে বেচে নিয়েছে। আমরা   কয়দিন FAST করবো ,সেটা আমাদের ইচ্ছা শক্তি,শারীরিক অবস্থা  এবং অভ্যাসের উপর নির্ভর করে ,তবে শুরু করাটাই প্রধান। বিভিন্ন গবেষনা বলে ,টানা তিন দিন FAST করা বেশি উপকারী। কেউ যদি ওজন কমানোর জন্য fasting কে বেছে নিতে চান ,আমি দুঃখিত ,এই আর্টিক্যালটি আপনার জন্য নয়।কারন Fasting এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো শরীরেরর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং সামগ্রিকভাবে একটি স্বাস্থ্যপূর্ন জীবনযাত্রার অভ্যাস গড়ে তোলা।

Fasting ওজন নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে, তবে ওজন যদি কমাতে চান তাহলে ‘না খাওয়ার’ বদলে খাদ্যতালিকায় সব পুস্টি উপাদান পরিমিত পরিমানে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে  হবে ,ঠিকমত ঘুমাতে এবং ব্যায়াম করতে হবে ,সব ধরনের নেতিবাচকতা বাদ দিতে হবে, নিজেকে অনেক ভালোবাসতে হবে, নিজের এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সহনশীল হতে হবে এবং আশেপাশের সবকিছুর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।কারন সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন না আনলে ,শারীরিক এবং মানষিকভাবে সুস্থ থাকা সম্ভব না ।তাই শুধুমাত্র ওজন কমানোর উপর গুরুত্ত্ব না দিয়ে ,একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রায় অভস্ত্য হোন ।এতে করে সুস্থ থাকতে পারবেন এবং ওজন নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন। ওজন কমানোর জন্য আসলে  fasting না, এটা মাথায় রাখবেন কারণ এই ভুল অনেকেই করে থাকেন।

আর রোখার উপকারীতা বা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত না  খেয়ে থাকার উপকারীতা  আপনি তখনই পাবেন ,যখন রোজা ভাঙ্গার পর স্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন । আর বেশি সময় না খেয়ে থাকলে অনেকের এসিডিটির সমস্যা হয় ,তাই এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখবেন  যে রোজার মাস ছাড়া অন্য সময়ে রোজা রাখলে ,সেটা যেনো কোন স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরী না করে । আর যাদের বিভিন্ন শারীরিক এবং মানষিক রোগ আছে ,তারা রোজার রাখার আগে অবশ্যই একজন চিকিসকের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধ্বান্ত নিবেন ,কিভাবে রোজা রাখবেন, কিভাবে খেতে হবে, জীবনযাত্রা কেমন হবে ।