শহীদ মাগফার চৌধুরী আজাদের ৭৮তম জন্মদিন আজ

প্রকাশিত: ১:১৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২৪

শহীদ মাগফার চৌধুরী আজাদের ৭৮তম জন্মদিন আজ

Manual3 Ad Code

গেরিলা ১৯৭১ | ঢাকা, ১১ জুলাই ২০২৪ : শহীদ মাগফার চৌধুরী আজাদের ৭৮তম জন্মদিন আজ।

১৯৪৬ সালের ১১ই জুলাই জন্মেছিলেন তিনি। একাত্তরে জন্মভূমির জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদ আজাদ। তাঁর মা শ্রদ্ধেয় মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগম এবং বাবা তৎকালীন সময়কার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইউনুস আহমেদ চৌধুরী।

শহীদ আজাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায়, আত্মসম্মান রক্ষার্থে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিলেন সাফিয়া বেগম।

পরবর্তী সময়ে, এই মহীয়সী মানুষটি কঠিন পরিশ্রম করে ছেলেকে লেখাপড়া শেখান। মাধ্যমিকে আজাদ পড়েছিলেন সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। এইচএসসি’র পর করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

তিনি প্রশিক্ষণ নিতে মেলাঘরে যাননি। কিন্তু বন্ধুদের কাছে যুদ্ধে যাবার পথ জানতে ও যুদ্ধে যোগ দেবার প্রবল ইচ্ছে প্রকাশ করেন। এমনকি এ বিষয়ে তাঁর মা শ্রদ্ধেয়া সাফিয়া বেগমের অনুমতিও নিয়েছিলেন।

শহীদ শাফী ইমাম রুমি ১৫ই আগস্ট ১৯৭১ তারিখে, তাঁর মা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম’কে নিয়ে তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। আগস্টের পর শহীদ আজাদ’কে নিয়ে মেলাঘরে যাবার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিলেন।

(দ্রষ্টব্যঃ সৈয়দ আশরাফুল হকের স্মৃতিচারণ, ভিডিও প্রামান্য https://bit.ly/2JrcQFj )

একাত্তরের আগস্টে ঢাকায় পরিচালিত দুর্ধর্ষ সব অপারেশনের মুহূর্তে শহীদ আজাদ’দের মগবাজার এলাকার ভাড়া বাড়িটি ছিল এক ‘সেফ হাউজ’। যা সে সময় গেরিলাদের জন্য এক অতি প্রয়োজনীয় বিষয় ছিল। ১৯৭১ সালের ৩০শে আগস্ট রাতে, শহীদ আজাদ’দের বাড়িতে ছিলেন আহত বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল (বীর বিক্রম), বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী কামালউদ্দিন (বীর বিক্রম), শহীদ আজাদের খালাতো ভাই ফেরদৌস আহমেদ জায়েদ ও টগর।

গভীর রাতে পাকিস্তানী সেনারা ঘিরে ফেলে বাড়ি ও দরজায় আঘাত করে। ভেতরে ঢুকেই জুয়েলের গুলিবিদ্ধ আহত হাতে আঘাত করলে, কাজী কামালউদ্দিন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন কাইয়ুম (?) (মতান্তরে মেজর কাইয়ুমের) হাত থেকে স্টেনগান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে গুলি বেরিয়ে যায় এবং শহীদ আজাদের খালাতো ভাই জায়েদ গুলিবিদ্ধ হন। (জায়েদ আজও বেঁচে আছেন)।
মল্লযুদ্ধের এক পর্যায়ে কাজী কামালের পরনের লুঙ্গি খুলে গেলে সুতোহীন শরীরে কাজী কামাল ওই বাড়ি ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তিনি রাতের আঁধারে হাজির হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের বাসায়। অন্ধকারে লুকিয়ে থেকে সেদিন সেই বাসা থেকে পোশাক চেয়ে পরিধান করেন তিনি। (এ ঘটনার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী আজও বেঁচে আছেন এবং আমাদের সূত্র কানাডায় অবস্থান করছেন)

উল্লেখ্য, ২৯শে আগস্ট ১৯৭১ দিবাগত রাত থেকে ৩০ তারিখ ভোর পর্যন্ত পাকিস্তানী সেনাসদস্যরা রাতের অন্ধকারে ঢাকার বিভিন্ন বাসায় চালায় গ্রেফতার অভিযান (হাবিবুল আলম বীর প্রতীকের তথ্যমতে সংখ্যাটি নুন্যতম অর্ধশত)।

Manual8 Ad Code

৩৫৫, এলিফ্যান্ট রোড, ‘কনিকা’ থেকে শহীদ শাফি ইমাম রুমী (বীর বিক্রম), ২০, নিউ ইস্কাটন থেকে শহীদ সৈয়দ হাফিজুর রহমান, মগবাজার থেকে শহীদ আজাদ ও শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল (বীর বিক্রম), গুলশান-২ থেকে শহীদ আবু বকর (বীর বিক্রম) এবং ৩৭০, আউটার সার্কুলার রোডের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিংবিদন্তী সুরকার, গায়ক, গীতিকার, মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আলতাফ মাহমুদকে।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, শহীদ বদিউল আলম বদি (বীর বিক্রম), ২৯শে আগস্ট দুপুরে ধানমন্ডিতে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জালাল উদ্দিনের বাসায় অবস্থান করছিলেন। তাঁর ছেলে ফরিদ ছিল শহীদ বদি’র বন্ধু। এখানে বন্ধুদের সাথে প্রায়শই তিনি তাশ খেলার আড্ডায় বসতেন। খেলার একপর্যায়ে, ফরিদ ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এবং বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আর্মি নিয়ে প্রবেশ করে ও বাড়ি ঘেরাও করে। বদিউল জানালা টপকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। পাকিস্তানী হায়েনারা সেখান থেকে শুধু বদিউল’কেই ধরে নিয়ে যায়। ঢাকার অগ্রগামী গেরিলা দলটির পতনের সূচনা হয়েছিল এভাবেই।

পরদিন, অনেক খোঁজ করে শহীদ আজাদের মা শ্রদ্ধেয় সাফিয়া বেগম রমনা থানায় ছেলের খোঁজ পান। সেখানে তিনি এক সিপাহী’কে ঘুষ দিয়ে আজাদের সঙ্গে দেখা করেন। মাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আজাদ। মা জানতে চাইলেন ‘কেমন আছো’, আজাদ মাকে বললেন, ‘খুব মারে, ভয় হচ্ছে কখন সব স্বীকার করে ফেলি’। ছেলের সামনে তিনি ভেঙ্গে পড়েন নি। বরং ছেলেকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোন কিছু স্বীকার করবে না’।

সেদিন থানা হাজতে মায়ের কাছে আজাদ ভাত খেতে চান। আজাদ মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়ে বলেন, ‘মা কতদিন ভাত খাই না। আমার জন্য ভাত নিয়ে এসো’। মা ভাত নিয়ে যান থানায়। গিয়ে দেখেন ছেলে নেই। শহীদ আজাদ আর কোনদিনও ফিরে আসেননি। ধরে নেওয়া হয় সেদিনই পাকিস্তানী ঘাতকরা আজাদকে অন্যান্য গেরিলা যোদ্ধাদের সাথে হত্যা করে লাশ গুম করে।

Manual3 Ad Code

জুরাইন গোরস্থানে শহীদ আজাদের মায়ের সমাধি। যিনি আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে ছিলেন। একমাত্র পুত্র শহীদ হবার পর তিনি মাটিতে শুয়েছেন ১৪টি বছর, এই সময়টিতে তিনি কোনদিন ভাত স্পর্শ করেননি। কারণ, তাঁর নাড়ি ছেঁড়া ধন, শেষ দেখায় ভাত খেতে চেয়েছিলো তাঁর কাছে। বর্ণনাতীত নির্যাতনে মুমূর্ষু ছেলে’কে বলেছিলেন, ‘বাবা, তুমি সহ্য করো, কারও নাম বলোনা”।

৩০শে আগস্ট ১৯৭১, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাত দুর্ধর্ষ যোদ্ধার সমাপ্তি হয়েছিল এভাবেই সুতীব্র বেদনার মাঝে।

Manual3 Ad Code

কি অবাক করা মিল, স্বাধীন দেশে সেই একই তারিখে ১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট (ঠিক ১৪ বছর পর) ছেলের কাছে চলে যান শ্রদ্ধেয় মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগম, শহীদ আজাদের মা। ১৪ বছর পরের, তারিখগত এই মিলটি আমাদের ভাবায় বৈকি।

পরম করুনাময় তাঁদের চিরশান্তির স্থানে আসীন করুন।
⚫️ ছবিতে সবার মাঝে দৃশ্যমান শহীদ মাগফার চৌধুরী আজাদ।

তথ্যসূত্র :
গেরিলা ১৯৭১

Manual8 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ