খোলা তেল বিক্রি বন্ধে আইন বাস্তবায়ন ও জনমত গঠনের তাগিদ ক্যাবের

প্রকাশিত: ১০:৫০ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২৬

খোলা তেল বিক্রি বন্ধে আইন বাস্তবায়ন ও জনমত গঠনের তাগিদ ক্যাবের

Manual2 Ad Code
  • স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ছোট প্যাকেটে ভোজ্যতেল বাজারজাতের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৯ জুন ২০২৬ : দেশে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি বন্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিরাপদ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ প্যাকেটজাত তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

একই সঙ্গে স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে ১০০ থেকে ৫০০ মিলিলিটার ধারণক্ষমতার ছোট প্যাকেটে ভোজ্যতেল বাজারজাত করার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তা অধিকারকর্মী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

রোববার (২৮ জুন ২০২৬) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্যাব কার্যালয়ে ক্যাব ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

Manual7 Ad Code

সভায় ভোক্তা অধিকার, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

খোলা তেল ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি

সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের পরামর্শক মুশতাক আহমেদ মুহাম্মদ ইফতিখার বলেন, দেশে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ খোলা ভোজ্যতেল ব্যবহার করেন। খোলা অবস্থায় তেল দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও পরিবহনের ফলে এর পুষ্টিগুণ, বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর কার্যকারিতা হ্রাস পায়। পাশাপাশি ধুলাবালি, আর্দ্রতা, রাসায়নিক দূষণ ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে এসে তেল স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণের কর্মসূচি জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু খোলা তেল ব্যবহারের কারণে এই উদ্যোগের সুফল অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। তাই নিরাপদ, মানসম্মত ও ভিটামিনসমৃদ্ধ প্যাকেটজাত তেলের ব্যবহার বাড়াতে হবে।”

মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ছোট প্যাকেটের ভোজ্যতেল বাজারজাত করা হলে নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারগুলোও সহজে নিরাপদ তেল কিনতে পারবে। এতে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে অপুষ্টি ও ভিটামিন ঘাটতি মোকাবিলায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

সভায় ক্যাবের সহ-সভাপতি নাজের হোসেন বলেন, খোলা তেল বিক্রির বিরুদ্ধে সরকারের স্পষ্ট আইন ও নীতিমালা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায় না। অনেক এলাকায় এখনও অবাধে খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে, যা ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।

তিনি বলেন, “আইন শুধু কাগজে থাকলে চলবে না। বাজার তদারকি জোরদার করে খোলা তেল বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প হিসেবে সাশ্রয়ী মূল্যে ছোট প্যাকেটের তেল নিশ্চিত করতে হবে।”

অতিরিক্ত তেল গ্রহণও বড় সমস্যা

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, শুধু খোলা তেল বর্জন করলেই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে না; তেল ব্যবহারের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। অতিরিক্ত তেল গ্রহণ এসব রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। তাই নিরাপদ তেলের পাশাপাশি সচেতন ও পরিমিত তেল ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।”

ছোট প্যাকেট চালুতে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ

সভায় বক্তারা ছোট প্যাকেটে ভোজ্যতেল বাজারজাতের পক্ষে মত দিলেও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও তুলে ধরেন। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য বৃদ্ধি, প্যাকেট লিকেজ, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ভোক্তাদের সচেতনতার অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কে এম ইকবাল হোসেন বলেন, “প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ছোট প্যাকেটের কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, প্যাকেট সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিল্প প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং ভোক্তাদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

‘ক্যাশ-ব্যাক’ ও প্যাকেট ফেরত ব্যবস্থার প্রস্তাব

পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে সভায় ব্যবহৃত তেলের প্যাকেট ফেরত নেওয়ার জন্য ‘রিটার্ন অ্যান্ড সেল’ বা ‘ক্যাশ-ব্যাক’ পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করা হয়। বক্তারা বলেন, ভোক্তারা ব্যবহৃত প্যাকেট ফেরত দিলে নির্দিষ্ট অর্থ বা মূল্যছাড় পেলে তারা প্যাকেট ফেলে না দিয়ে পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থায় যুক্ত হতে উৎসাহিত হবেন।

এ ছাড়া উন্নতমানের প্যাকেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার, উৎপাদক পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ এবং গণমাধ্যমভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে এবং ভোক্তা সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “ক্যাব দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তার অধিকার রক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও ভোক্তাদের মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।”

Manual5 Ad Code

দেশব্যাপী জনমত গড়ার ঘোষণা

সভাপতির বক্তব্যে ক্যাব সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, জনস্বার্থে খোলা তেল পরিহার করে বোতলজাত ও নিরাপদ তেল ব্যবহারের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে নিরাপদ ভোজ্যতেল পৌঁছে দিতে বাজারব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।

তিনি জানান, খোলা তেল বিক্রি বন্ধ এবং ছোট প্যাকেটজাত নিরাপদ তেল বাজারজাতের দাবিতে ক্যাব দেশব্যাপী জনসচেতনতা ও জনমত গঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পাশাপাশি কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করবে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ

মতবিনিময় সভায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মাসুম আরেফিন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী শশীকান্ত দাস, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. রাশিদা পারভীন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মো. নাজমুস সাকিব, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) প্রতিনিধি লাইলুন নাহারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও এনজিওর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Manual5 Ad Code

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

Manual7 Ad Code

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করা সময়ের দাবি। তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বাজারে সুলভ মূল্যে মানসম্মত প্যাকেটজাত তেল সরবরাহ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মতে, সরকার, শিল্পখাত, ভোক্তা সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নিরাপদ ভোজ্যতেল ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ