১১৫ দিনেই কাটা যাবে বিনা-২৩ ধান

প্রকাশিত: ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২৩

১১৫ দিনেই কাটা যাবে বিনা-২৩ ধান

Manual4 Ad Code

কৃষি বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ৩০ জুন ২০২৩ : লবণাক্ততা ও বন্যা সহিষ্ণু ‘বিনা ধান-২৩’-এর পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বা জীবনরহস্য ও বিভিন্ন জিন আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। ধানের জীবনরহস্য উন্মোচন দেশে এটিই প্রথম। এই ধান ১১৫ দিনেই কাটা যাবে। সেইসাথে ধানের চাল মাঝারি চিকন ও উচ্চফলনশীল আমন মৌসুমের ধান এটি। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৫.৩ টন এবং সর্বোচ্চ ফলন ৫.৮ টন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) একদল গবেষক এ গবেষণা পরিচালনা করেন এবং জাত অবমুক্ত করেন।

জাতের বৈশিষ্ট্য:
বিনাধান-২৩, স্বল্পমেয়াদী (জীবনকাল ১১৫-১২৫ দিন) ও অধিক ফলনশীল। আলোক অসংবেদনশীল, দেশের জোয়ারভাটা, লবণাক্ততা ও বন্যা কবলিত এলাকার জন্য উপযোগী আমন মৌসুমে চাষোপযোগী। পরিপক্ক অবস্থায় জাতটি ৮ ডিএস/মি মাত্রার লবণাক্ততা ও ১৫ দিন পর্যন্ত জলমগ্নতা সহ্য করতে পারে।

Manual4 Ad Code

জমি ও মাটি:
মাঝারি-উচুঁ থেকে নিচু জমি এ ধানের চাষের জন্য উপযুক্ত। লবণাক্ত ও বন্যা কবলিত এলাকাসহ দেশের জোয়ারভাটা কবলিত অঞ্চলে বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম জেলায় চাষোপযোগী।

জমি তৈরী:
জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী রোপা আমন জাতের মতই।

বপণের সময়:
জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে জুলাই মাসের ২য় সপ্তাহের (১-৩০ আষাঢ়) মধ্যে বীজ তলায় বীজ বপনের উপযুক্ত সময়।

বীজ হার:
প্রতি হেক্টর জমি চাষের জন্য ২৫-৩০ কেজি বা এক একর জমির জন্য ১০-১২ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়।

বীজ শোধন:
উপযুক্ত ফলন নিশ্চিত করতে হলে পুষ্ট ও রোগবালাই মুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। প্রতি ১০ কেজি বীজ শোধনের জন্য ২৫ গ্রাম ভিটাভ্যাক্স-২০০ ব্যবহার করলে ভাল হয়।

সার ও প্রয়োগ পদ্ধতি:
বীজতলার জন্য:
উর্বর জমিতে বীজতলা তৈরী করলে কোনরূপ সার প্রয়োজন হয়না। অনুর্বর ও স্বল্প উর্বর জমিতে প্রতিবর্গ মিটারে ১.৫-২.০ কেজি গোবর বা কম্পোষ্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। চারা গজানোর পর গাছ হলুদ হয়ে গেলে দু’সপ্তাহ পর প্রতিবর্গ মিটারে ১৪-২৫ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের পর জমি থেকে পানি নিষ্কাশন করা যাবে না।

Manual4 Ad Code

প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ১০০-১২০ কেজি, টিএসপি ৮০-১০০ কেজি ও এমওপি ৩০-৪০ কেজি।

Manual7 Ad Code

রোপা ক্ষেতের জন্য: প্রতি হেক্টরেঃ ইউরিয়া ১৬০-১৮০ কেজি, টিএসপি ৮০-১০০ কেজি, এমওপি ৬০-৮০ কেজি, জিপসাম ৬০-৮০ কেজি ও দস্তা ১.০-৪.০ কেজি।

প্রয়োগের নিয়ম:
রোপার জন্য জমি তৈরীর শেষ চাষের আগে সম্পূর্ণ টিএসপিএবং এমওপি জমিতে সমভাবে ছিটিয়ে চাষের মাধ্যমে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সারের অর্ধেক পরিমাণ চারা রোপনের ৭-৮ দিন পর, এবং বাকি অর্ধেক ২০-২৫ দিন পর জমির উর্বরতার উপর নির্ভর করে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার প্রয়োগের ২/১ দিন আগে জমির অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আগাছা দমন করতে হবে।

জমির উর্বরতা ও ফসলের অবস্থার উপর নির্ভর করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ মাত্রার তারতম্য করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে টিএসপি ও দস্তা সার একই সাথে প্রয়োগ করা যাবে না। তাই এক্ষেত্রে এক চাষ পূর্বে টিএসপি প্রয়োগ করতে হবে এবং শেষ চাষের সময় ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার ছিটিয়ে প্রয়োগ করা অবশ্যক।

সেচ ও নিষ্কাশন:
সেচের খুব একটা প্রয়োজন হয়না তবে প্রয়োজন হলে সেচ দিতে হবে। ধান পাকার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি শুকিয়ে ফেলা ভাল।

আগাছা দমন ও মালচিং:
চারা রোপনের পর আগাছা দেখা দিলে নিড়ানী বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার ও মাটি নরম করতে হবে ।

বালাই ব্যবস্থাপনা:
এ জাতে রোগ বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। তবে প্রয়োজনে বালাইনাশক প্রয়োগ করা উচিত। এ জাতটি মাজরা পোকার প্রতি মধ্যম প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন। মাজরা পোকার আক্রমন হলে দানাদার কীটনাশক (মার্শাল ৬ জি/কুরাটার ৫ জি) জমিতে সেপ্র করা যেতে পারে ।

খোল ঝলসানো বা সিথব্লাইট রোগ দেখা গেলে ফলিকুর (টেবুকোনাজল) বা স্কোর (ডাইফেনোকোনাজল) একর প্রতি ২০০ মিলি হারে ২০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে থোর আসার সময় বা তার পরপরই স্প্রে করা যেতে পারে। এছাড়া ব্লাস্ট রোগ দমনের জন্যএকর প্রতি ট্রুপার ১৫০ মিলি হারে ২০০ লিটার পানিতে স্প্রে করা যেতে পারে। পোকামাকড় দমনের জন্য আইপিএম পদ্ধতিই সবচেয়ে ভাল ।

গবেষণার মাধ্যমে অধ্যাপক বজলুর রহমান মোল্যা এ জাত উদ্ভাবন করেন। তিনি এ জাত সম্পর্কে বলেন, বিনা উদ্ভাবিত বিনা ধান-২৩ একটি লবণাক্ত ও বন্যা সহিষ্ণু ধানের জাত। ২০১৯ সালে বাকৃবি ও বিনার গবেষকবৃন্দের প্রচেষ্টায় বিনাধান-২৩ ও তা থেকে উৎপন্ন তিনটি মিউটেন্ট (রেডিয়েশন দ্বারা প্রভাবিত জাত) ধানের জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করা হয়; যা বাংলাদেশে প্রথম।

এ জিনোম সিকোয়েন্স উদ্ভাবনের ফলে দেশে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ওই ধানের জাতে আমরা প্রতিকূল আবহাওয়া সহিষ্ণু ২৩টি জিন, উচ্চ ফলনশীল বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী ১৬টি জিন এবং চালের আকার-আকৃতির জন্য দায়ী চারটি জিন শনাক্ত করতে পেরেছি। যার মাধ্যমে বিনাধান-২৩ আগের ভ্যারিয়েন্ট থেকে অধিক ফলনশীল হবে।

Manual2 Ad Code

১১৫ দিনেই কাটা যাবে বিনা-২৩ ধান সংবাদের তথ্য বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট নিশ্চিত করেছে।