ব্রিকস সম্মেলনে নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়

প্রকাশিত: ১০:১৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২৫

ব্রিকস সম্মেলনে নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়

Manual6 Ad Code

এ কে এম আতিকুর রহমান |

ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেইরোতে গত ৬-৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হলো ১৭তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা দুই দিনের এই শীর্ষ সম্মেলনের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সম্ভবত এবারই প্রথম চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে তাঁর প্রধানমন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্মেলনে ভাষণ দেন।

Manual3 Ad Code

উল্লেখ্য, ব্রিকস সদস্য দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের বসবাস এবং তারা বৈশ্বিক উৎপাদনে ৪০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে।

এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় (থিম) ছিল ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই শাসনের জন্য বিশ্বব্যাপী দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদার করা’। চলমান বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্রিকস দক্ষিণ সহযোগিতা শক্তিশালী করার মাধ্যমে যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছুটা কাজ করতে পারে, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বাস্তবতা অনুধাবন করে রাজনীতি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির এই আহবান অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলেই নেতাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

Manual5 Ad Code

সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ২০২৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত হবে।
শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিন অর্থাৎ ৬ জুলাই উদ্বোধনী ভাষণে প্রেসিডেন্ট লুলা ব্রিকসকে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) উত্তরসূরি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যেহেতু বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ চলছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব নজিরবিহীন সংঘাত অতিক্রম করছে, তাই বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোকে জোরদার করার মাধ্যমে বিশ্বে শান্তি ও উন্নয়ন স্থাপনে ব্রিকস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Manual8 Ad Code

উদ্বোধনীর দিনের বিবৃতিতে গাজায় দ্রুত, স্থায়ী ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতির জন্য সব পক্ষকে সদিচ্ছার সঙ্গে আরো আলোচনার আহবান জানানো হয়।

একই সঙ্গে গাজা ও ফিলিস্তিনের দখল করা সব এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আহবানও জানানো হয়। সম্মেলনে ইরানের প্রতি প্রতীকী সমর্থন জানিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার নিন্দাও জানানো হয়। বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্রিকস এক বিবৃতিতে এই শুল্ককে ‘অবৈধ ও স্বেচ্ছাচারী’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়মেরও লঙ্ঘন।
রিও ডি জেনেইরো ঘোষণাপত্রে ১২৬টি প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা, জলবায়ু সহযোগিতা ইত্যাদি। ঘোষণাপত্রটি কয়েক মাসের ফলপ্রসূ সমন্বয়কে প্রতিফলিত করে, যেখানে ২০০টিরও বেশি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ক্ষুধা নির্মূল, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং উদীয়মান প্রযুক্তি বিকাশের মতো ক্ষেত্রগুলোতে ২০০টি নতুন সহযোগিতা ব্যবস্থা তৈরি বা জোরদার করা হয়েছে।

ঘোষণায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া, সার্বভৌম সমতা, সংহতি, গণতন্ত্র, উন্মুক্ততা, অন্তর্ভুক্তি, সহযোগিতা এবং ঐকমত্যের ব্রিকস চেতনার প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ঘোষণাপত্রে যেসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি জোরদার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, সেগুলোকে পাঁচটি ভাগে বর্ণনা করা হয়েছে—(১) বহুপাক্ষিকতা জোরদার এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার করা; (২) শান্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা প্রবর্তন; (৩) আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও আর্থিক সহযোগিতা গভীরতর করা; (৪) জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং টেকসই, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন প্রসারণ এবং (৫) মানব, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন প্রসারণের জন্য অংশীদারি।

ব্রিকস দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরো ন্যায়সংগত বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা এবং দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংলাপ ও পরামর্শ প্রচেষ্টা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। তারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আইএমএফ কোটা এবং বিশ্বব্যাংকের শেয়ারহোল্ডিং বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতাদের ঘোষণার পাশাপাশি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার দেওয়া আরো তিনটি নথি অনুমোদিত হয়েছে। সেগুলো ছিল জলবায়ু অর্থায়নের ওপর ব্রিকস নেতাদের কাঠামো ঘোষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বব্যাপী শাসনের ওপর ব্রিকস নেতাদের ঘোষণা এবং সামাজিকভাবে নির্ধারিত রোগ নির্মূলের জন্য ব্রিকস অংশীদারি।

রিও শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কিছুটা মতবিরোধের যে উপস্থিতি ছিল, তা লক্ষ করা গেছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রায়ই সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করলেও আবার জোটনিরপেক্ষ নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে দেখা যায় অনেক সদস্যকেই। পশ্চিমাদের সম্পর্কে অবস্থানগত পার্থক্য ব্রিকস দেশগুলোর মুখোমুখি হওয়ার আরেকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ। তবে এসব মোকাবেলা করেই ব্রিকস ঐক্যকে গুরুত্ব দিয়ে তার যাত্রাকে অব্যাহত রেখেছে।

ইরানের ওপর আক্রমণ এবং একতরফা শুল্কের সমালোচনা করা সত্ত্বেও ব্রিকস ঘোষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা হয়নি। মনে করা হয়, ব্রাজিল, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়াসহ জোটের মধ্যে জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলো এর পেছনে কাজ করেছে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্রিকস নীতিগুলোকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ বলে অভিহিত করেছেন।

Manual1 Ad Code

এবারের শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আচরণে যে অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক প্রকৃতি কিছুটা হলেও দৃশ্যমান হয়েছে, তা দেখে অনেকের কাছেই ব্রিকসকে আগের চেয়ে কম ঐক্যবদ্ধ মনে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধভাবে তা সামলানোই বড় কথা। তবে সহযোগিতার দিকটিকে যেভাবে গভীর করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তাতে হয়তো দুর্বলতা থাকলে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। ব্রিকসের নতুন উন্নয়ন ব্যাংক অর্থবহ সফলতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে এআই শাসনের পাশাপাশি সামাজিকভাবে নির্ধারিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াই এবং পরিবেশ সুরক্ষার অর্থায়নে ব্রিকস সহযোগিতার জন্য উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। যা হোক, চলমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ব্রিকসকে বেশ কিছু ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে এবং সময়ই বলে দেবে ব্রিকস সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটুকু সফল হবে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক সচিব

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ