সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কিংবদন্তি বিপুল রঞ্জন চৌধুরী

প্রকাশিত: ১২:১১ পূর্বাহ্ণ, মে ৩০, ২০২৬

সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কিংবদন্তি বিপুল রঞ্জন চৌধুরী

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ৩০ মে ২০২৬ : সিলেট অঞ্চলের শতবর্ষের সাংবাদিকতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে কজন ব্যক্তিত্ব তাঁদের সততা, নীতিনিষ্ঠা, অনুসন্ধিৎসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিপুল রঞ্জন চৌধুরী। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু পেশা ছিল না; ছিল সমাজসেবা, সত্যের অনুসন্ধান এবং জনকল্যাণের এক নিরন্তর ব্রত। আজ তাঁর ১১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই প্রজ্ঞাবান সাংবাদিক, সমাজসেবক ও জননেতার জীবন ও কর্ম নতুন করে স্মরণ করার সময় এসেছে।

জন্ম, পরিবার ও শৈশব

১৯২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বিপুল রঞ্জন চৌধুরী। তিনি ছিলেন পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের পরিবারে চার ভাই ও তিন বোন ছিলেন। বর্তমানে এক ভাই ও এক বোন কলকাতায় বসবাস করছেন; অন্যরা সবাই পরলোকগমন করেছেন।

১৯৫৪ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ২৯ বছর বয়সে জমিদারির দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। সে সময়কার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা, বিচক্ষণতা এবং দায়িত্ববোধের কারণে তিনি সফলভাবে পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিকতার প্রতি আজীবন অনুরাগ

বিপুল রঞ্জন চৌধুরীর সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ শুরু হয় কৈশোর ও যৌবনকাল থেকেই। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল সীমিত, তখন আগরতলার সংবাদ, কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান এবং আনন্দবাজার পত্রিকার যে কটি কপি শ্রীমঙ্গলে পৌঁছাত, তিনি ছিলেন সেগুলোর নিয়মিত পাঠক।

পাঠক থেকে লেখক এবং পরবর্তীতে সাংবাদিক—এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

শিলচরের সুরমা, করিমগঞ্জের যুগশক্তি, কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড ও অমৃতবাজার পত্রিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন লেখালেখি করেন। ১৯৬২ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকতা শুরু করেন।

Manual5 Ad Code

উল্লেখ্য, ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত যুগভেরী উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র হিসেবে ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। এমন একটি ঐতিহাসিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপুল রঞ্জন চৌধুরী সিলেট অঞ্চলের সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেন।

সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

বিপুল রঞ্জন চৌধুরীর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর নিরপেক্ষতা ও সত্যনিষ্ঠা। তিনি কখনো হলুদ সাংবাদিকতায় জড়াননি। ব্যক্তিগত লাভ, রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা ক্ষমতাসীনদের তুষ্ট করার জন্য সংবাদ পরিবেশন তাঁর চরিত্রে ছিল না।

মৃদুভাষী হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা। সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার ক্ষেত্রে কোনো আপস করেননি। সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত আদর্শের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।

তাঁর সমসাময়িকদের মতে, সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অনুসন্ধিৎসু। কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া প্রকাশ করতেন না। একটি ঘটনার পেছনের কারণ, প্রেক্ষাপট ও প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন না করা পর্যন্ত তিনি সন্তুষ্ট হতেন না।

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের দীর্ঘদিনের অভিভাবক

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংগঠনিক নেতৃত্বেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই টানা প্রায় বিশ বছর, অর্থাৎ ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রেসক্লাবকে কেবল একটি পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে নয়, বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত মূল্যবোধ, তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি বিকশিত হয়।

জনসেবায় সক্রিয় ভূমিকা

সাংবাদিকতার পাশাপাশি জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও বিপুল রঞ্জন চৌধুরীর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

তাঁর সততা, কর্মদক্ষতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে ১৯৬০ সালে তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

তিনি ছিলেন—

শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য (১৯৮০),
ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, শ্রীমঙ্গলের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য (১৯৮১),
সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শ্রীমঙ্গলের সদস্য (১৯৭৪),
চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদস্য (১৯৭৭)।

Manual7 Ad Code

তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত ভুনবীর দশরথ উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ভুনবীর দশরথ উচ্চ বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

একই সঙ্গে তিনি শ্রীমঙ্গল রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে দীর্ঘদিন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের নির্মম অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিপুল রঞ্জন চৌধুরীর জীবনেও গভীর ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়।

যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর শহরের বাসভবন এবং গ্রামের বাড়ি সম্পূর্ণরূপে লুটপাটের শিকার হয়। ভীমসীস্থ পারিবারিক সম্পত্তি থেকে শত শত মন ধান ও আলু, গবাদিপশু, কৃষিযন্ত্র, মাছ, আসবাবপত্রসহ বিপুল সম্পদ লুট করা হয়। এমনকি ঘরের দরজা-জানালা এবং টিন পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর তিনি ন্যায়বিচারের আশায় ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে আবেদন করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিচার চেয়ে আবেদন জানালেও তাঁর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

তবুও তিনি কখনো ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। যুদ্ধের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সংবাদপত্র ও আলোকচিত্র সংরক্ষণ করেছিলেন। ফলে আজও সেগুলো মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য

বিপুল রঞ্জন চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, পরিচ্ছন্ন এবং সময়নিষ্ঠ মানুষ।

সাদা পোশাক ছিল তাঁর বিশেষ পছন্দ। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার শুদ্ধ বানান এবং সঠিক বাক্যগঠনের বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ভাষাগত শুদ্ধতা তাঁর কাছে ছিল ব্যক্তিত্বের অংশ।

যেকোনো কাজ তিনি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে চাইতেন। কোনো তথ্য জানার প্রয়োজন হলে তার ক্ষুদ্রতম অংশও যাচাই করার চেষ্টা করতেন। পরিচিত-অপরিচিত বহু মানুষ বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যের জন্য তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসতেন।

তিনি নিয়মিত নিজেই বাজার করতেন এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অনুসরণ করতেন। দোকানদারদের পাওনা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস ছিল। পয়লা বৈশাখের আগেই সকল বকেয়া শোধ করার ব্যাপারে তিনি বিশেষ যত্নবান ছিলেন।

সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও মানবিক মূল্যবোধ

নজরুলসংগীত, শ্যামাসংগীত ও কীর্তনের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। সংগীতের প্রতি তাঁর রুচি ছিল পরিশীলিত ও বিশ্লেষণধর্মী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে তিনি গঠনমূলক মূল্যায়ন করতেন।

বিশ্বকাপ ফুটবল ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়। সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে রাত জেগে খেলা দেখা ছিল তাঁর পারিবারিক আনন্দের অংশ। তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনা ও দিয়েগো ম্যারাডোনার একনিষ্ঠ সমর্থক।

Manual3 Ad Code

শিক্ষা ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্যের পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। সন্তানদের শৈশবে বিকেলের সময় মাঠে খেলাধুলা করার জন্য উৎসাহিত করতেন।

ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা জাতিভেদ প্রথার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষকেই সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। তাঁর কাছে মানবিকতা ছিল সবচেয়ে বড় পরিচয়।

স্বাস্থ্যসচেতন ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ

ভ্রমণ, আলোকচিত্র গ্রহণ এবং বৃক্ষরোপণ ছিল তাঁর অন্যতম শখ। কোথাও গেলে পছন্দের গাছের চারা সঙ্গে নিয়ে আসতেন।

স্বাস্থ্যসচেতন জীবনযাপনের ফলে দীর্ঘ জীবনে তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিল রোগ থেকে অনেকটাই মুক্ত ছিলেন। পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেন অত্যন্ত কঠোরভাবে।

চিরবিদায় ও উত্তরাধিকার

২০১৫ সালের ৩০ মে বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে শ্রীমঙ্গল শহরের নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

আজ তাঁর ১১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাংবাদিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, নৈতিক সাহস, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক বিরল উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানো।

সিলেটের শতবর্ষের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কিংবদন্তি বিপুল রঞ্জন চৌধুরীর ১১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি বলেন, “বিপুল রঞ্জন চৌধুরী শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন এক চলমান ইতিহাস, এক নৈতিক মানদণ্ড এবং সমাজসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন দেখিয়েছে—সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজের বিবেক জাগ্রত রাখার দায়িত্বও বহন করে।”

“বিপুল রঞ্জন চৌধুরী : সাংবাদিকতার দীপশিখা”
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

আজও সুরমার বাতাস বয়ে আনে ধ্বনি,
পাতার ফাঁকে ফাঁকে জাগে স্মৃতির চিরবাণী।
শতবর্ষের পথে লেখা সাংবাদিকতার গান,
সেই ইতিহাসে দীপ্ত এক মহীয়ান নাম।

তিনি বিপুল রঞ্জন, সত্যের অগ্রদূত,
অন্ধকারে জ্বালিয়েছেন আলোর অমৃতসূত্র।
কলম ছিল শাণিত তাঁর ন্যায়বোধের শপথে,
ভয়কে রাখেননি কখনো বিবেকেরই রথে।

জন্ম নিলেন একদিন জানুয়ারির প্রভাতে,
ঊনিশশো চব্বিশ সালের নির্মল আলোকরাতে।
জমিদার-পরিবারে এলেন তিনি ধরণীতে,
তবু অহংকার রাখেননি হৃদয়ের গহিনেতে।

পিতার স্নেহ, বংশের গৌরব, ঐতিহ্যের ধারা,
সবকিছুকে ছাড়িয়ে ছিল মানুষ হবার তারা।
যখন পিতা বিদায় নিলেন জীবনের সীমানায়,
তখন তরুণ বিপুল দাঁড়ালেন দায়িত্বের ছায়ায়।

ঊনত্রিশ বছরের যুবক, দৃঢ় দুই নয়ন,
কাঁধে নিলেন সংসার-জমিদারির ভার তখন।
বিধির কঠিন আহ্বান এলো আকস্মিক বেগে,
তবু তিনি হার মানেননি ঝড়ের মুখোমুখি লেগে।

চারিদিকে পরিবর্তনের উত্তাল সময়ধারা,
দেশভাগ, দুঃসময়ের ধুলো, অনিশ্চিত পারা।
তবু তিনি সংবাদপত্র হাতে বসতেন নীরবে,
সত্য খুঁজতেন মনোযোগে ইতিহাসের তীরে।

স্টেটসম্যান, আনন্দবাজার, সংবাদ কিংবা সুরমা,
অক্ষরেরই রাজপথ ছিল তাঁর জীবনের ভূমা।
সংবাদের প্রতিটি পঙ্‌ক্তি, প্রতিটি ভাষ্যরেখা,
দেশ ও কালের পরিবর্তনের জানালা হয়ে দেখা।

যুগভেরীর পাতায় এসে শুরু হলো পথ,
কলম পেল দায়িত্ব, পেল বিবেকের রথ।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে চাকরি ছিল না কভু,
এ ছিল নৈতিক অঙ্গীকার, সমাজসেবার তবু।

তিনি ছিলেন অনুসন্ধানী, সত্যসন্ধানী প্রাণ,
মিথ্যার সঙ্গে আপস করেননি একটিবারও জান।
হলুদ রঙের প্রলোভনে ঝুঁকেনি তাঁর মন,
সত্যের চেয়ে বড় ছিল না কোনো প্রাপ্তি-ধন।

মৃদুকণ্ঠে কথা বলতেন, দৃঢ় ছিল উচ্চারণ,
যেখানে অন্যায় দেখেছেন, করেছেন প্রতিবাদ-ঘোষণ।
তোষামোদের ভাষা তাঁর অভিধানে ছিল না,
ক্ষমতার সামনে নতজানু হওয়ার শিক্ষা মিলল না।

প্রেসক্লাবের দীর্ঘদিনের প্রজ্ঞাময় সভাপতি,
সংগঠনের ভিত গড়েছেন নিষ্ঠার মহারথী।
নবীনদের শিখিয়েছেন সংবাদ কেমন হয়,
সত্য যদি পাশে থাকে, ভয়কে তুচ্ছ কয়।

শ্রীমঙ্গলের জনপদে তাঁর ছিল পরিচয়,
সততা আর কর্মদক্ষতা যার প্রধান আশ্রয়।
পৌরসভার কমিশনার হয়ে পেয়েছিলেন মান,
মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করত, এ ছিল বড় সম্মান।

রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে সেবার দীপ জ্বেলে,
বন্ধুর সাথে চলেছেন তিনি কর্তব্যেরই মেলে।
বিদ্যালয়, কলেজ, নানা প্রতিষ্ঠানের তরে,
দিয়েছেন সময়, শ্রম আর চিন্তার অফুরন্ত ঘরে।

Manual2 Ad Code

শুধু সংবাদ নয়, সমাজও ছিল তাঁর ভাবনা,
মানুষের কল্যাণে ছিল জীবনভর সাধনা।
যে বিদ্যালয় পিতা গড়েন মানুষের আশায়,
তার দায়িত্ব পালন করেছেন অক্লান্ত প্রত্যাশায়।

এলো একাত্তরের সেই রক্তমাখা দিন,
দেশ জুড়ে আগুন জ্বলে, কাঁদে নদী-ভূমি-চিন।
স্বাধীনতার স্বপ্ন যখন রণাঙ্গনে জাগে,
তখন তাঁর ঘরবাড়ি লুটেরাদের হাতে লাগে।

ধান গেল, আলু গেল, গরু-মহিষ হারাল,
পুকুরভরা মাছের স্রোতও লুণ্ঠনের পথ ধরাল।
ঘর গেল, দরজা গেল, জানালা গেল খুলে,
তবু তাঁর মনোবল যায়নি কোনো কূলে।

সর্বস্বহারা মানুষটি ন্যায়ের দুয়ারে দাঁড়ায়,
প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখে বিচার চেয়ে যায়।
একবার নয়, বারেবারে আবেদন করেন তিনি,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হার মানেননি।

সময় বদলায়, শাসন বদলায়, বদলায় পরিবেশ,
তবু তাঁর ন্যায়বোধ থাকে অবিচল অনিমেষ।
বিচারহীনতার দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তিনি,
সত্যের দাবিতে রেখেছেন জাগ্রত অগ্নিধ্বনি।

অদ্ভুত ছিল তাঁর জীবনযাপনের শৃঙ্খলা,
পরিপাটি পোশাক যেন ব্যক্তিত্বের শিখলা।
সাদা রঙের প্রতি ছিল সহজ অনুরাগ,
স্বচ্ছতারই প্রতীক যেন তাঁর দৈনন্দিন ভাগ।

বাংলা ভাষার শুদ্ধতা ছিল হৃদয়ের মান,
ভুল বানান দেখলে যেন কষ্ট পেত প্রাণ।
বাক্যগঠনের শৃঙ্খলায় ছিলেন কঠোর প্রহরী,
ভাষাকে তিনি ভাবতেন জাতির অন্যতম ধনভাণ্ডারী।

গ্রামের মানুষ এলে যদি সমস্যার ভার নিয়ে,
বসে শুনতেন ধৈর্য ধরে মমতার আলো দিয়ে।
আইনের পথ, যুক্তির কথা বুঝিয়ে দিতেন খুঁটিয়ে,
সত্যিকার নেতৃত্ব এমনই আসে ফুটিয়ে।

গাছ ছিল তাঁর প্রিয় বন্ধু, মাটির সবুজ গান,
যেখানেই যেতেন সঙ্গে আনতেন চারার টান।
ছবিতোলা, ভ্রমণ, প্রকৃতি—শখের রঙিন ডালি,
জীবনের প্রতি ভালোবাসা ছিল অনন্ত খেয়ালি।

নাতি-নাতনিদের কাছে তিনি অন্য এক মানুষ,
গম্ভীরতার আড়ালে ছিল স্নেহের নরম স্পর্শ।
প্রিয়জনের হাসিমুখে গলে যেত কঠিন ভাব,
পরিবারের বন্ধনে পেতেন শান্তির আলাপ।

কোনো কাজই অসম্পূর্ণ রাখার অভ্যাস ছিল না,
বিন্দু-বিসর্গ খুঁটিয়ে দেখা ছাড়া শান্তি মিলত না।
বাজার করতেন নিজেই, রাখতেন হিসাব সঠিক,
নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল অনন্য, সুস্পষ্ট, দীক্ষিত।

বছর শেষে দেনা-পাওনা মিটিয়ে ফেলতেন আগে,
পয়লা বৈশাখ আসার পূর্বে দায়িত্ব রাখতেন জাগে।
পাওনাদারের চেয়ে যেন দেনাদারেরই চিন্তা,
এমন মানুষ আজও বিরল, এমন সততার বিন্তা।

নজরুলগীতি, শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তনের অনুরণন,
তাঁর হৃদয়ে জাগিয়ে রাখত সংস্কৃতির স্পন্দন।
গানের চেয়ে যন্ত্র যদি বাড়িয়ে দিত শব্দ,
বোদ্ধা শ্রোতার মতো বলতেন, “হলো কি তবে গণ্ডগোল?”

স্ক্রিপ্ট পড়ে গান শোনার ছিল বিচক্ষণতা,
সংস্কৃতির গভীর বোধে ছিল তাঁর নিত্যতা।
শিল্পকে তিনি দেখতেন শুধু বিনোদনের চোখে নয়,
সৃজনশীলতার ভেতর খুঁজতেন জাতির পরিচয়।

বিশ্বকাপের রাত জেগে ফুটবলের উল্লাস,
সন্তান আর নাতিদের সঙ্গে আনন্দের সুবাস।
ম্যারাডোনার জাদুকরি পায়ে মুগ্ধ ছিলেন তিনি,
আর্জেন্টিনার পতাকাতে দেখতেন স্বপ্নরশ্মি।

শিশুরা বিকেলে মাঠে যাক—এ ছিল তাঁর বাণী,
শরীর-মন দুটোকেই গড়ুক মুক্ত প্রাণের টানি।
শুধু বইয়ের পাতায় নয়, জীবনেরও পাঠ,
খেলার মাঠে শেখা যায় সাহস, শৃঙ্খলা, ঠাঁট।

ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মানুষ ছিল বড়,
জাতিভেদের দেয়াল ভাঙার ছিল তাঁরই ঘর।
যা বলার মুখোমুখি বলতেন নির্ভীক কণ্ঠে,
সত্যকে তিনি রাখতেন সদা হৃদয়েরই অন্তে।

রথের মেলা, চড়কপূজা, গ্রামের উৎসবধারা,
প্রজন্মের হাতে তুলে দিতেন ঐতিহ্যের সাড়া।
শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ ছিল তাঁর গভীর টান,
সেই টানেই উজ্জ্বল হয়ে আছে তাঁর পরিচয়খান।

খাজনা, কর, বিলের টাকা সময়মতো দিতেন,
রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বকে সম্মানের চোখে নিতেন।
আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে সুবিধা নেননি কভু,
নীতির পথেই হেঁটেছেন তিনি জীবনভর তবু।

স্বাস্থ্য ছিল সচেতনতার দীর্ঘ অনুশাসন,
নিয়মমাফিক জীবনযাপনে পেয়েছেন প্রাপ্তি-মন।
ধীরে ধীরে হাত ধোয়া, পুকুরে স্নানের রীতি,
প্রতিটি কাজে ফুটে উঠত শৃঙ্খলারই স্মৃতি।

শেষ বিকেলের আলো যখন জানালায় নেমে আসে,
দুই হাজার পনেরোর মে মাসের নিরালা বাতাসে,
বিরানব্বই বছরের দীর্ঘ জীবনের গান,
থেমে গেল শান্তভাবে, নিভল না সম্মান।

শরীর গেল, কিন্তু রয়ে গেল আলোর উত্তরাধিকার,
রয়ে গেল নৈতিকতার অনন্য অঙ্গীকার।
রয়ে গেল সংবাদপথে সত্যের দৃপ্ত শপথ,
রয়ে গেল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার রথ।

যে কাগজপত্র বাঁচিয়েছিলেন যুদ্ধের দুঃসময়ে,
যে ছবিগুলো বুকে রেখেছিলেন অশ্রু লুকিয়ে,
সেগুলো আজ ইতিহাসের মূল্যবান দলিল,
সময়ের কাছে রেখে গেছে সত্যের অক্ষয় নীল।

আজ তাঁর মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরি,
সাংবাদিকতার প্রাঙ্গণে তিনি অমর জ্যোতির্ময় ধরি।
সিলেটের শতবর্ষের গৌরবগাথা যত,
তাঁর নামটি উচ্চারিত হবে ততবার অবিরত।

যতদিন সংবাদপত্রে সত্যের আলো জ্বলে,
যতদিন বিবেক বাঁচে মানুষের অন্তরতলে,
যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ওঠে ধরা,
ততদিন বিপুল রঞ্জন থাকবেন অমল ধ্রুবতারা।

নদী বদলাবে, সময় বদলাবে, বদলাবে প্রজন্মধারা,
তবু ইতিহাসের আকাশে জ্বলবে তাঁরই তারা।
সত্য, সাহস, সততার যে নির্মল মহাকাব্য,
বিপুল রঞ্জন চৌধুরী তারই উজ্জ্বল অধ্যায়।

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার অর্ঘ্য লয়ে,
বাংলার সাংবাদিকতা দাঁড়াক তাঁর স্মৃতি বয়ে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যাক এই অমল বাণী—
সত্যের পথে অবিচল মানুষই হয় চিরজয়ী, চিরপ্রাণী।
—(বিপুল রঞ্জন চৌধুরী : সাংবাদিকতার দীপশিখা,— সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিপুল রঞ্জন চৌধুরীর নাম তাই শুধু একটি ব্যক্তির নাম নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি যুগের প্রতীক।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ