সিলেট ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২৬
বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে তামাক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় কনসার্ট ও খেলা প্রদর্শনী, তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৬ জুলাই ২০২৬ : বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে রাজধানীর সরকারি পার্ক ও উন্মুক্ত খেলার মাঠে তামাক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠান আয়োজন এবং তামাকজাত পণ্যের প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে যেমন ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত)-এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি জনপরিসর বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগও ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) পরিচালিত বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে অবস্থিত কামাল আতাতুর্ক পার্কে আবুল খায়ের টোবাকো কোম্পানি লিমিটেডের উদ্যোগ বা পৃষ্ঠপোষকতায় কনসার্ট, মেলা এবং বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা বড় পর্দায় প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব আয়োজনকে কেন্দ্র করে পার্কজুড়ে বিভিন্ন স্টল স্থাপন করে সিগারেটের নাম, লোগো, ট্রেডমার্ক ও অন্যান্য ব্র্যান্ডিং দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং তামাকজাত পণ্যের প্রচারণা ও বিক্রয় পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কামাল আতাতুর্ক পার্ক রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত জনপরিসর। প্রতিদিন এখানে শিশু-কিশোর, তরুণ, প্রবীণ এবং বিভিন্ন বয়সী মানুষ হাঁটা, ব্যায়াম, খেলাধুলা ও অবসর বিনোদনের জন্য আসেন। কিন্তু বাণিজ্যিক আয়োজনের কারণে পার্কের স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে। বড় আকারের মঞ্চ, স্টল এবং দর্শক সমাগমের ফলে মাঠের বড় অংশ সাধারণ মানুষের জন্য অপ্রবেশযোগ্য হয়ে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে তরুণদের আকৃষ্ট করার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি তামাক কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রচারণা চালায়, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত যে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে তামাকজাত পণ্যের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়।
এদিকে সরকার চলতি বছরই ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ সংশোধনের মাধ্যমে আইনটিকে আরও কঠোর করেছে। সংশোধিত আইনের ধারা ৫(গ) অনুযায়ী, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনে বলা হয়েছে, তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান কিংবা কোনো অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির ব্যয়ভার বহন (স্পনসরশিপ) করা যাবে না। একই সঙ্গে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির আড়ালেও কোনো তামাক কোম্পানির নাম, সাইন, ট্রেডমার্ক বা প্রতীক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশোধিত আইনের ধারা ৬(খ) অনুযায়ী, খেলার মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কামাল আতাতুর্ক পার্কে অনুষ্ঠিত আয়োজনে এই বিধানও উপেক্ষা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের দাবি, শুধু বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্ক নয়, রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে তামাক কোম্পানিগুলো একই ধরনের কৌশলে ব্র্যান্ড প্রচারণা চালাচ্ছে। খেলা প্রদর্শনের নামে তারা স্টল স্থাপন, ব্র্যান্ডিং, লোগো প্রদর্শন এবং বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জোটের নেতারা বলছেন, সরকার যখন তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধারাবাহিকভাবে আইন সংশোধন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন কিছু তামাক কোম্পানি নানা কৌশলে সেই আইনকে পাশ কাটিয়ে আগ্রাসী বিপণন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু আইনের শাসনই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না, বরং তরুণদের তামাক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
তাদের মতে, বিশ্বকাপ ফুটবল এমন একটি আয়োজন, যা শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে। এই আবেগ ও জনসমাগমকে ব্যবহার করে তামাক কোম্পানির ব্র্যান্ড দৃশ্যমান করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিরও পরিপন্থী।
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট অবিলম্বে কামাল আতাতুর্ক পার্ক, জগন্নাথ হলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তামাক কোম্পানির বিজ্ঞাপন, প্রচারণা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং তামাকজাত পণ্য বিক্রির অভিযোগ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
জোটের দপ্তর সম্পাদক সৈয়দা অনন্যা রহমান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে জোটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, সংশ্লিষ্ট আয়োজক প্রতিষ্ঠান কিংবা আবুল খায়ের টোবাকো কোম্পানি লিমিটেডের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পার্ক ও উন্মুক্ত খেলার মাঠ নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত জনপরিসর। এসব স্থানে তামাক কোম্পানির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপস্থিতি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি