বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:১২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২৬

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আজ

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৫ জুলাই ২০২৬ : আজ ১৫ জুলাই বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস (World Youth Skills Day)। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

Manual4 Ad Code

যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা অর্জন, শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রস্তুত করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে দক্ষতা উন্নয়ন এখন আর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Manual5 Ad Code

এ বছর বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের প্রতিপাদ্য “দক্ষতায় গড়ি সম্মিলিত ভবিষ্যৎ”। প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো—সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা এবং যুবসমাজের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমন একটি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, যারা পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারে নিজেদের সক্ষমভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখবে।

জাতিসংঘের উদ্যোগ

বিশ্বব্যাপী যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতি বছর ১৫ জুলাইকে বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। যুব বেকারত্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকেই প্রতিবছর দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে।

জাতিসংঘের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে দক্ষ যুবসমাজ অন্যতম প্রধান শক্তি। বিশেষ করে এসডিজি-৪ (মানসম্মত শিক্ষা), এসডিজি-৮ (শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি) এবং এসডিজি-৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো) বাস্তবায়নে দক্ষতা উন্নয়নের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন গুরুত্বপূর্ণ যুব দক্ষতা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যুব জনগোষ্ঠীর দেশ। দেশের উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কর্মক্ষম বয়সের হওয়ায় এটিকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কারিগরি শিক্ষা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, নেতৃত্ব, ডিজিটাল সাক্ষরতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং উদ্যোক্তা মনোভাব বর্তমান সময়ে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে একজন তরুণ শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারেন।

পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বহু প্রচলিত পেশার পাশাপাশি নতুন নতুন পেশার সৃষ্টি হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, রোবোটিক্স, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট কৃষি এবং সৃজনশীল অর্থনীতিতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় তরুণদের যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি আজীবন শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জনই ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের প্রধান শর্ত হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের উদ্যোগ

বাংলাদেশ সরকার যুব উন্নয়ন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা দেশের তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে কাজ করছে।

এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল তৈরি, স্টার্টআপ সংস্কৃতি বিকাশ, ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউনিসেফ, ইউএনডিপি এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে।

দক্ষতা উন্নয়নে করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের যুবসমাজকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

– শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
– প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতার সম্প্রসারণ।
– কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি।
– নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সমান দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা।
– উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা।
– শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বৃদ্ধি।
– জীবনব্যাপী শিক্ষা ও পুনঃদক্ষতা (Reskilling) এবং দক্ষতা উন্নয়ন (Upskilling)-এর সুযোগ সম্প্রসারণ।

Manual1 Ad Code

দিবস উপলক্ষে কর্মসূচি

Manual4 Ad Code

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আলোচনা সভা, সেমিনার, কর্মশালা, দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং সচেতনতামূলক বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে। দিবসটির প্রতিপাদ্য তুলে ধরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং যুব সংগঠনও বিশেষ কর্মসূচি পালন করছে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনে দক্ষ যুবসমাজ

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ মানবসম্পদই আগামী দিনের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নে দক্ষ যুবসমাজের কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি দেশের প্রতিটি তরুণ-তরুণীকে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং সমাজের সব অংশীজনের প্রতি একটি সম্মিলিত বার্তা দেয়—দক্ষ যুবশক্তিই পারে উদ্ভাবনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ