সিলেট ২১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২৬
জনস্বার্থে ক্রয় বা অধিগ্রহণে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল ব্যবহারের প্রস্তাব
বরিশাল নগরীতে ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর ও জলাশয় ভরাটের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি মালিকানাধীন পুকুর-, জলাশয়ের সংকোচন এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার দুর্বলতা নগরীর ভবিষ্যৎ পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বরিশালের জলাবদ্ধতা আরও বাড়বে, তাপমাত্রাজনিত দুর্ভোগ তীব্র হবে এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রা ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।
বরিশালের ভৌগোলিক বাস্তবতা এ উদ্বেগকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নগরীর ভূমির উচ্চতা তুলনামূলকভাবে কম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাসের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে দক্ষিণাঞ্চলের এ নগরী। একসময় জালের মতো বিস্তৃত খালগুলো নগরীর পানি নিষ্কাশন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু দখল, দূষণ, ভরাট এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক খাল আজ সংকটাপন্ন। এ অবস্থায় পুকুর ও জলাশয়ও হারিয়ে গেলে নগরীর পরিবেশগত ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
পুকুর-জলাশয় শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, জনস্বার্থেরও বিষয়
পুকুর ও জলাশয়কে কেবল জমির মালিকের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করলে এর বৃহত্তর পরিবেশগত গুরুত্ব উপেক্ষিত হয়। এসব জলাধার বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধারণ করতে পারে, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করে এবং নগরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতাপ্রবণ নিম্নাঞ্চলে পুকুর-জলাশয়ের অস্তিত্ব নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি পুকুর ভরাট হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বৃষ্টির পানি ধারণের জায়গা কমে যায়, আশপাশের এলাকায় পানি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নগরীর বিভিন্ন স্থানে এভাবে একের পর এক জলাশয় হারিয়ে গেলে সামগ্রিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
এখানে একটি বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির মালিকেরা নিজেদের প্রয়োজন, পারিবারিক আবাসন কিংবা আর্থিক বিবেচনায় পুকুর ভরাট করতে আগ্রহী হতে পারেন। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ ভরাট বন্ধ করা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে শুধু নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করে সব জলাশয় রক্ষা করা কঠিন হতে পারে। তাই ব্যক্তি মালিকের স্বার্থ এবং নগরবাসীর বৃহত্তর স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সরকারি তহবিলে জলাশয় ক্রয় বা অধিগ্রহণের প্রস্তাব
এ ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হতে পারে—জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ পুকুর ও জলাশয় সরকারিভাবে সংরক্ষণের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা। সরকার চাইলে এ উদ্দেশ্যে উপযুক্ত বিদ্যমান তহবিল ব্যবহারের সম্ভাবনাও যাচাই করতে পারে। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের অর্থে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় সংরক্ষণের সুযোগ আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবটি হলো, প্রথমে বরিশাল সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নগরীর পুকুর-জলাশয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। কোন জলাশয় বৃষ্টির পানি ধারণে গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত, কোনটির অস্তিত্ব বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোনগুলো সরকারি মালিকানাধীন—এসব তথ্য জরিপের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
এরপর জনস্বার্থ ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। ব্যক্তি মালিকানাধীন গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়ের ক্ষেত্রে ন্যায্য বাজারমূল্যে স্বেচ্ছায় ক্রয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেখানে আইনগতভাবে জনস্বার্থে অধিগ্রহণ প্রয়োজন ও সম্ভব, সেখানে প্রচলিত আইন, যথাযথ মূল্যায়ন এবং ক্ষতিপূরণের বিধান অনুসরণ করতে হবে।
তবে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের অর্থ এ ধরনের কাজে ব্যবহার করা যাবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা, তহবিলের অনুমোদিত খাত ও প্রকল্পের যোগ্যতা যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে। সরাসরি ব্যবহার সম্ভব না হলে পৃথক সরকারি বরাদ্দ, বিশেষ সংরক্ষণ তহবিল অথবা অন্য উপযুক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
শুধু ক্রয় নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ
জলাশয় অধিগ্রহণ বা ক্রয় করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। সেগুলো যাতে পুনরায় ভরাট, দখল বা দূষণের শিকার না হয়, সে জন্য স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন। জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণ, রেকর্ড সংরক্ষণ, নিয়মিত তদারকি, বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি নগরীর খালগুলোর প্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনার সঙ্গে জলাশয় সংরক্ষণকে যুক্ত করতে হবে।
নগরীর মাস্টারপ্ল্যান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলাশয় সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলক অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক, ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ নয়; মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন
বরিশালের মতো নিম্নভূমিনির্ভর নগরীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পুকুর, জলাশয় ও খালকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একটি সমন্বিত প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশনব্যবস্থার অংশ। একদিকে জলাশয় ভরাট চলবে, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হবে—এমন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান দিতে পারবে না।
তাই বরিশাল সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং নগর উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাই করে একটি পরীক্ষামূলক জলাশয় সংরক্ষণ প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যে পুকুরটি ভরাট হচ্ছে, আগামী দিনে সেটি আর সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য নগর নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। তাই বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ পুকুর ও জলাশয় রক্ষায় শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন কার্যকর সরকারি বিনিয়োগ, ন্যায়সংগত ক্রয় বা আইনানুগ অধিগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা।
বরিশালকে জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে হলে জলাশয় হারানোর আগেই তা সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কাজী মিজানুর রহমান
পরিবেশ ও সমাজকর্মী।
২১।১০। ২৬ খৃষ্টাব্দ

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি