শোষণমুক্তির সংগ্রাম: বিকল্প অর্থনীতি নির্মাণে করণীয় ও বাংলাদেশের বামপন্থা

প্রকাশিত: ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২৬

শোষণমুক্তির সংগ্রাম: বিকল্প অর্থনীতি নির্মাণে করণীয় ও বাংলাদেশের বামপন্থা

Manual8 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

বাঙালি জাতি ও জনগণের বড় ও শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা। বাংলাদেশের ইতিহাস হলো স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষের সুদীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। এ দেশের মানুষ লড়াই করেছে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শ্রেণি শোষণ ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে। দেশীয় সামরিক-বেসামরিক স্বৈরাচার ও লুটেরা শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে। জনগণের সংগ্রামের মুখেই একদিন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদকে এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ চলে গেলেও আমাদের উপর চেপে বসল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ধরণের শাসন ও শোষণ।

বাংলাদেশের মানুষ প্রথম থেকেই জাতিগত শাসন-শোষণ-বঞ্চণা-অনুন্নয়ন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এসেছে- যার চূড়ান্ত রূপ লাভ করল ’৭১-এর সুমহান সশস্ত্র স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ভিতর দিয়ে।

কিন্তু যুগযুগব্যাপী এ দেশের কৃষক-শ্রমিকসহ অন্যান্য মেহনতী ও সাধারণ জনগণ শ্রেণি শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির যে আকাঙ্খাকে বুকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে এসেছে, সে আকাঙ্খা পূর্ণ হয় নি। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-লুণ্ঠন-দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে জনগণের লড়াই চলছে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে ‘৭২-এর সংবিধান প্রণীত হলেও রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা যায় নি। সাম্রাজ্যবাদের ফিন্যান্স পুঁজি জনগণকে নির্মমভাবে শোষণ-লণ্ঠন, ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম করে নিজেদের সম্পদ ও টাকার স্ফীতি ঘটাতেই নিয়োজিত। গ্রামীণ-টেলিনর ও অন্যান্য মোবাইল ফোন কোম্পানিসহ বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীর কমিশন এজেন্সী, কালো বাজারী, তেল-গ্যাস-কয়লা-খনিজ-প্রাকৃতিক সম্পদকে দেশের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর প্রশ্নে জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে প্রাধান্য না দিয়ে চুক্তি সম্পাদন করে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির হাতে ন্যস্ত করা, চোরাচালানী, বড় বড় কণ্ট্রাক্টরী, জাতীয় শিল্পের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন আমদানি-রপ্তানি, সাপ্লাই, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীসমূহের সহযোগী ও ছোট পার্টনার হিসেবে কাজ করা, বৈষম্যমূলক বিদেশী বিনিয়োগ নীতিমালা, এটাই হচ্ছে বিদেশীদের উন্নয়ন সহায়তার চরিত্র। এই সকল সহায়তা খবরদারিমূলক, আমাদের দেশের জনগণের প্রতি এদের দরদ-সহমর্মিতা বলতে কিছু নেই। এমনকি স্বাধীন ও জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি হিসেবে গড়ে তোলাসহ স্বয়ম্ভর শিল্পায়নের দিকে ন্যূনতম আগ্রহও দেখা যায় না। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা শিল্পায়নের একটা উদাহরণ যেভাবে সৃষ্টি করতে পেরেছে; আমাদের দেশেও সেই ধরণের অঙ্গীকার, উদাহরণ ও মডেল সৃষ্টি করা সম্ভব।

যদিও আমাদের দেশের বুর্জোয়ারা সাম্রাজ্যবাদ, বহুজাতিক কোম্পানী, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত ও তাদের উচ্ছিষ্ট ভোগকারী শ্রেণি হিসেবে এরা কাজ করছে; বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তাদের একটা ঘনিষ্ঠ স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-লুণ্ঠনমূলক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির কারণে দেশের অর্জন, অগ্রগতি, উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভূমি সংস্কারসহ কৃষির গণতান্ত্রিক সংস্কার, শিল্পায়ন ও সুশাসন বাধাগ্রস্ত হয়েছে পদে পদে। প্রশাসনে, অর্থনীতিতে ও সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতির কারনে বিরাজ করছে অস্থিরতা, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, বিশৃঙ্খলা, অনুন্নয়ন ও শোষণ-লুণ্ঠন। জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও এ কারণে গড়ে উঠতে পারেনি। ক্ষমতাধর কিছু ব্যক্তিবগের্র চরম দুর্নীতির মাধ্যমে কালো পুঁজি সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে- যা বিলাসিতা, বিদেশে পাচার ও অনুৎপাদনমূলক ব্যবসার কাজে ব্যয়িত হয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদ প্রধানত ঋণ ও তথাকথিত সাহায্য এবং অসম বাণিজ্য ও জাতীয়স্বার্থবিরোধী অসম চুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুণ্ঠন ও আমাদের খনিজ সম্পদ সম্পূর্ণ লুণ্ঠন করে নিয়েছে এবং এখনো নিতে চায়। এটাই হচ্ছে আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদের নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের প্রধান রূপ। এ ছাড়া আছে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীসমূহের প্রত্যক্ষ পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০ বছরের ট্যাক্স হলিডে সুবিধাসহ বিপুল অংকের মুনাফা ও সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা। চা বাগানগুলোর একটা বড় অংশ বৃটিশ পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন রয়েছে। আমাদের অনেকগুলো গ্যাসক্ষেত্র বিদেশী কোম্পানীকে প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ মালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে গ্যাসক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানীর স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকী দিতে হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই আমাদের দেশের জনগণের প্রধান শোষক ও দুশমন।

আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে প্রতি বছর যে উদ্বৃত্তমূল্য সৃষ্টি করছে, তার বড় অংশ আত্মসাৎ করছে সাম্রাজ্যবাদ। এই উদ্বৃত্তমূল্য দেশের মধ্যে পুঁজি হিসেবে সঞ্চিত হচ্ছে না, দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী মুনাফার উচ্ছিষ্ট ভোগ করে, জনগণকে বেপরোয়া শোষণ-লুণ্ঠন করে দেশীয় আমলা মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া তার ধনভান্ডার বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু তাও কোন উৎপাদনমূলক জাতীয় বিকাশের কাজে ব্যবহৃত হয় নি। তার একটা বিশাল অংশ বিদেশে পাচার হয়ে যায়। আরেকটা অংশ বিদেশ থেকে গাড়ীসহ আমদানিকৃত বিলাসদ্রব্যের জন্য অনুৎপাদনমূলক ব্যবসার কাজে খাটাচ্ছে। যে গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে এত হাকডাক, সেই শিল্পে তৈরীকৃত পোশাক বিদেশে রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রায় আয় হয়, এই আয়ের একটা অংশ বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি বাবদ খরচ হয়ে যায়। অথচ গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল তৈরির কারখানা গড়ে তোলা আমাদের দেশেও সম্ভব।

একদিকে যখন আমাদের দেশে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা, শোষণ-দারিদ্র্য, অনাহারজনিত মৃত্যু ও বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে কোন মতে বেঁচে থাকার চেষ্টায় লিপ্ত, অপরদিকে তারই পাশাপাশি দেখা যায়, মুষ্টিমেয় কিছু লোকের চোখ ঝলসে দেওয়ার মত বিলাসিতা ও জাতীয় সম্পদের জঘন্য অপচয়। আমাদের দেশের জাতীয় বাজেটের শতকরা ৩০% থেকে ৪০% সম্পূর্ণ অপচয়/অবচয় হয় দুর্নীতি-অনিয়ম-আত্মসাৎ-স্বজনপ্রীতি-অপব্যবহার-অবহেলাসহ নানা কারণে। অন্যদিকে গোটা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সাম্রাজ্যবাদী ঋণের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই ঋণ করা অর্থ কোন উৎপাদনমূলক কাজে ব্যবহৃত হয় না। এক গবেষণা ও পরিসংখ্যানভিত্তিক নিবন্ধে দেখা যায় যে, এ পর্যন্ত আমাদের দেশে আসা ফরেইন এইডের শতকরা ৭৫ ভাগ বিভিন্ন শর্তাবলীর আড়ালে বিদেশীরাই লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে। ফলে জনগণের কাঁধে ক্রমাগত ঋণ ও সুদের বোঝা বেড়েই চলেছে।

নয়া উপনিবেশবাদ শুধু যে শোষণ-লুণ্ঠন করছে এটাই একমাত্র কথা নয়। সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্ন কায়দায় আমাদের অর্থনীতিকে তাদের উপর নির্ভরশীল করে রাখছে। এবং আমাদের দেশের স্বয়ম্ভর শিল্প বিকাশসহ স্বাধীনভাবে সার্বিক জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দারুণভাবে বাধা প্রদান করছে। এইভাবে একদিকে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বাধীনতা হারাচ্ছি, অপরদিকে ভূমি সংস্কারসহ শিল্প বিকাশের কোন অগ্রগতি হচ্ছে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উপযোগিতা ও বাজার থাকা সত্ত্বেও আদমজী জুট মিল বন্ধ করাসহ এই খাতকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বস্তুতঃ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সংস্থা। কার্যতঃ তারাই আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও নীতি নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের শর্তাদির কারণে আমাদের দেশের অর্থনীতি জাতীয় ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারছে না। সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা বহুজাতিক কর্পোরেশন বা কোম্পানীর স্বার্থরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক আমাদের দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের তথাকথিত ফর্মুলা দিয়েছে। সেই ফর্মুলার নাম ‘দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র’ সংক্ষেপে ‘পিআরএসপি’। এই কৌশলপত্র দিয়ে আমাদের দেশে জনগণের দারিদ্র্য বিমোচন তো হবেই না, বরং সাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিক কোম্পানীর শোষণ-লুণ্ঠন অব্যাহত রাখার নিমিত্ত্বে দারিদ্র্যাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করাসহ সহনীয় মাত্রা বা পর্যায়ে নিয়ে আসা মাত্র। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে বিশ্বব্যাংক দায়মুক্তি নিয়েছিল।

আমাদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একদিকে শিল্প বিকাশ ও অপরদিকে ভূমি সংস্কার ও কৃষির গণতান্ত্রিক সংস্কার। এ দু’টো ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আজকের দিনে অবশ্য সাম্রাজ্যবাদ বিপ্লব ঠেকানোর জন্য কৃষিতে বুর্জোয়া ঢং-এ কিছু সংস্কার করতে চায়। কারণ তারা আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে প্রধানতঃ যেটা চায়, তা হল দেশটি যেন বিশ্ব পুঁজিবাদী সম্পর্কের আওতার মধ্যে থাকে। এতেই তাদের লাভ। সেই কারণে আমাদের দেশেও একাধিকবার ভূমি সংস্কার ইত্যাদির কথা বলা হলেও, তাদের তৈরি করা ‘পিআরএসপি’তে ভূমি সংস্কারের বিষয়টি রাখা হয় নি। এ ছাড়া ‘পিআরএসপি’ আর ড. ইউনূস উদ্ভাবিত ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচী দিয়ে শোষণ-লুণ্ঠনমূলক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া বাংলাদেশে জনগণের দারিদ্র্য বিমোচন হবে না, আদৌ হতে পারে না। আমাদের দেশে পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যেই কোনো ধরণের গণতান্ত্রিক সংস্কার বা কোনো প্রকার বুর্জোয়া সংস্কারও সম্ভব হয় নি। বড় বড় দলগুলোর কেউই স্বাধীন জাতীয়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া সংস্কার করার ন্যূনতম কর্মসূচী এ পর্যন্ত ঘোষণা করে নি। এমনকি উৎপাদন ব্যবস্থায় যে সামন্ত অবশেষ ও প্রাক-পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক রয়েছে, তাদের জিইয়ে রেখে উৎপাদন শক্তিকে আটকে রাখবে বলে মনে হয়। সাম্রাজ্যবাদি সংকীর্ণ কায়েমীস্বার্থ ও শোষণের রাজত্বকে বজায় রাখার স্বার্থে ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসন ব্যবস্থাকে মূলতঃ টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

আমাদের দেশের গোটা অর্থনীতি বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির অংশবিশেষ। বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতি আজ এক সাধারণ সংকটের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। এর ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন অগ্রগতি হলেও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কারণে জনজীবনে লাগাতার সংকট লেগেই রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল থেকে এই অর্থনৈতিক সংকটের যে কোন সমাধান নেই এবং বুর্জোয়া সংস্কারের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবন-যাপনে মৌলিক সমস্যার যে কোন রকম সমাধান সম্ভব নয়, তাও জনগণকে স্পষ্ট করে বুঝতে হবে।

লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের মৌলিক উন্নতি ঘটে নি। রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় রকমের পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতী সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো মৌল পরিবর্তন ঘটে নি। নিষ্ঠুর শোষণ-লুণ্ঠনে সাধারণ খেটে খাওয়া গরীব মানুষের জীবনে আজ নাভিঃশ্বাস উঠেছে। ভূমি সংস্কার ও শিল্প বিকাশ না হওয়ায় বেকারের সংখ্যাও ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প বিকাশের উদ্যোগের অভাব, ভূমি সংস্কার ও কৃষিতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টার অনুপস্থিতি এবং সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী সীমাহীন বেপরোয়া শোষণ-লুণ্ঠনের কারণে প্রকৃত অর্থে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

দেশের শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি মানুষের জমি নাই বা থাকলেও নেহায়েত সামান্য। দেশের শতকরা ২৮ ভাগ বেকার। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা শতকরা ৩৮ ভাগেরও বেশি। দেশের জনসমষ্টির ৩৫ ভাগ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে। দেশের জনসমষ্টির ২০ ভাগ মানুষ অন্ততঃ ছয় মাস অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে কোনমতে বাঁচার চেষ্টা করে। প্রতি বৎসর না খেয়ে যে কত হাজার হাজার মানুষ মারা যায় তার খবর দৈনিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পায় না, বেতার-বিটিভিসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া চ্যানেলগুলোতে প্রচার করা হয় না, সরকারী পরিসংখ্যান-তথ্য-গবেষণাতেও স্থান পায় না। এদের নিয়ে লেখালেখিও অনেকে পছন্দ করেন না। এরা কারা? এরা হচ্ছেন শহর ও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, গ্রামাঞ্চলের খেতমজুর-দিনমজুর, বর্গাচাষী, গরীব কৃষক, মাঝারি কৃষক এবং শহর ও গ্রামের অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ, সর্বহারা-অর্ধ সর্বহারা, বেকার-অর্ধ বেকার। এই গরীব ও শোষিতের মধ্যে শ্রমিক শ্রেণি হচ্ছে সবচেয়ে অগ্রগামী, বিপ্লবী ও সংগঠিত। রাজনৈতিক ক্ষমতার ও দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তারা অবস্থান করেন। সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন ভূমিহীন ও খেতমজুর। এদের একাংশ পরের জমিতে বর্গাচাষী হিসেবে কাজ করেন আর বিরাট অংশ খেতমজুর হিসেবে অথবা অন্য কোনোভাবে কঠোর মেহনত করে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটান। বেকারত্বের সমস্যা তাদের জীবনে সবচেয়ে বড় সমস্যা। মনুষ্যবাসের উপযোগী মজুরী তারা পায় না। গ্রামীণ পরিবারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পরের জমিতে বর্গাচাষ করে। বর্গার অধীনে জমির পরিমাণ হলো মোট আবাদী জমির এক পঞ্চমাংশেরও অনেক কম। আমাদের ভূমি ব্যবস্থা চরম অসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। মোট আবাদী জমির এক পঞ্চমাংশ জোতদার ও ধনী কৃষক পরিবারগুলোর হাতে রয়েছে। গ্রামের সাধারণ জনগণ সাধারণতঃ গ্রামীণ মহাজন ও এনজিওদের নির্মম শোষণের শিকার। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদ ও আমলা পুঁজির কারসাজির ফলে কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম পান না। বাজারের শোষণের ফলে সকল শ্রেণির কৃষক-খেতমজুর-দিনমজুর এবং শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ শোষিত হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির দরুণ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বাস করছেন। বাড়ছে আয় বৈষম্য। সাধারণ জনগণের জীবনে অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত নয়।

দেশ এখনো দুইভাগে বিভক্ত। একদিকে শ্রমজীবী মানুষ, অপরদিকে একদল সুবিধাভোগী লোক। বাংলাদেশের শতকরা ৯০ জন মানুষ যারা উৎপাদন করেন, শ্রমিক-কৃষক-খেতমজুর ও অন্যান্য মেহনতী মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করেও দু’বেলা পেটপুরে খেতে পারে না। শোষণ আর অনুন্নয়ন থেকে সৃষ্ট ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বঞ্চনা-মৃত্যু তাদের নিত্যসাথী। কিন্তু এরই পাশাপাশি হাতে গোনা কিছু লোক চরম বিলাসিতায় দিন যাপন করছে। এরা যে বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। রাজধানী ঢাকা শহরে যেখানে কয়েক লক্ষ মানুষ নোংরা অস্বাস্থ্যকর দুর্গন্ধময় খুপড়িতে বাস করে, সেখানে এরা বাস করে প্রাসাদতুল্য অট্টালিকায়। ঘরে তাদের বিলাসী দ্রব্যে ভর্তি। তাদের একেকটি পায়খানার মধ্যেই রয়েছে কয়েক লক্ষ টাকার সামগ্রী। যে দেশে প্রতি বছর না খেয়ে মানুষ মরে হাজারে হাজারে, যে দেশে কয়েক কোটি মানুষ প্রতি রাতে ক্ষুধা পেটে নিয়ে ঘুমাতে যায়, সেই দেশেই সৌখিনতা, বিলাসিতা, বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণ, বছর বছর নতুন নতুন গাড়ী কেনা, বিদেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ-মুদ্রা পাচার, প্রতি রাতে মধ্যপানে যে অপচয় এরা করে তা জঘন্যতম ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ছাড়া কি হতে পারে? কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবসে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলতে চাই যে, এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। শ্রমজীবী মানুষ শোষণ-লুণ্ঠন-দুর্নীতির যন্ত্রণা থেকে মুক্তির সুতীব্র আকাঙ্খায় ছটফট করছে। মানুষ চায় পরিবর্তন। গোটা সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন। এর নাম বিপ্লব। প্রয়োজন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতির স্বার্থে। প্রয়োজন শতকরা ৯৫ জন মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থে। এই বিপ্লব সাম্রাজ্যবাদের নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের অবসানসহ শোষণ-লুণ্ঠন-দুর্নীতি-অনিয়মের রাজত্বের মূলোচ্ছেদ করে কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষেত্র থেকে সামন্ত অবশেষের উচ্ছেদ ঘটিয়ে এক নতুন প্রগতিশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে জনগণের এক শিল্প বিকশিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে সম্পূর্ণত জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার। বিপ্লব আজ সামাজিকভাবে অবশ্যম্ভাবীরূপে দেখা দিয়েছে। ক্ষুধাপীড়িত, অত্যাচারিত, শোষণ-লুণ্ঠন-দুর্নীতি জর্জরিত মানুষকে বেঁচে থাকার তাগিদে মুক্তির আকাঙ্খায় নিজ নিজ ভাগ্য পরিবর্তনের প্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাম প্রগতিশীল শক্তির পক্ষে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণকে অবশ্যই লাল ঝান্ডার নিচে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করতে হবে সর্বহারা-শ্রমিক-কৃষক-খেতমজুর-সাধারণ জনগণের স্বার্থের রাজনৈতিক বিকাশ।

আর তাই বলতে হয়, সাম্রাজ্যবাদ ও করপোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে স্লোগান তোলাই যথেষ্ট নয়। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হলে বামপন্থীদের এমন একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাজির করতে হবে, যা উৎপাদন বাড়াবে, বৈষম্য কমাবে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্লোগান দেওয়া যায়, পুঁজিবাদের শোষণ নিয়ে বক্তৃতা করা যায়, বৈষম্য ও লুটপাটের বিরুদ্ধে মিছিলও করা যায়। কিন্তু এসবের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে না পারলে রাজনৈতিক সংগ্রাম একসময় তার সামাজিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে। যে কৃষক উৎপাদন করেও ফসলের ন্যায্য দাম পান না, যে শ্রমিক নিজের শ্রমে সম্পদ সৃষ্টি করেও ন্যূনতম মর্যাদা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকেন, যে তরুণ শিক্ষিত হয়েও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পান না, কিংবা যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুঁজি ও ঋণের অভাবে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেন না—তাঁদের সামনে কার্যকর বিকল্প হাজির করাই রাজনীতির প্রধান কর্তব্য ও পরীক্ষা।

বাংলাদেশের বামপন্থীদের সামনে আজ এই কর্তব্য ও পরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদী শোষণ, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য, করপোরেট পুঁজির বিস্তার, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। শ্রমিক-কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাম রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ঐতিহাসিক অবদান থাকা সত্ত্বেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: বিদ্যমান শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে তাঁরা ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান, সেই ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর উত্তর দিতে হবে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের হিসাব দিয়ে, শ্রমিকের মজুরি ও কর্মপরিবেশের বাস্তবতা দিয়ে, ক্ষুদ্র শিল্পের অর্থায়ন ও প্রযুক্তির সুযোগ দিয়ে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও জবাবদিহি দিয়ে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে। শোষণমুক্তির রাজনীতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে তার বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই স্লোগাননির্ভর হয়ে পড়বে।

Manual2 Ad Code

তত্ত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন

চীনের নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের বহুল আলোচিত একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। বিড়াল কালো না সাদা, সেটি মুখ্য নয়; ইঁদুর ধরতে পারলেই বিড়াল ভালো। উক্তিটি মূলত বাস্তব ফলাফল ও কার্যকারিতার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থনৈতিক নীতি বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাফল্য শুধু তার নাম, আদর্শিক পরিচয় কিংবা ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হয়, সেই ব্যবস্থা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারছে কি না, দারিদ্র্য কমাতে পারছে কি না, মানুষের জীবনমান উন্নত করছে কি না এবং সৃষ্ট সম্পদের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

দেংয়ের নেতৃত্বে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির মধ্য দিয়ে চীন কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বাজারের প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিদেশি পুঁজি ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশটি উৎপাদনক্ষমতা বাড়ায় এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে, অবকাঠামো সম্প্রসারিত হয় এবং শিল্প উৎপাদনে চীন বৈশ্বিক গুরুত্ব অর্জন করে।

তবে চীনের অভিজ্ঞতাকে নিখুঁত সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বাস্তবায়ন হিসেবে উপস্থাপন করাও যুক্তিসংগত নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সেখানে সম্পদের বৈষম্য, শ্রমিকের দর-কষাকষির ক্ষমতা, অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশগত ক্ষতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রের নেতৃত্বে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেসব প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক।

চীনের অভিজ্ঞতা থেকে তাই দুটি শিক্ষা নেওয়া যায়। প্রথমত, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজারের বাস্তবতা উপেক্ষা করে আধুনিক অর্থনীতি পরিচালনা করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন বাড়ানোই অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়। উৎপাদিত সম্পদের বণ্টন, শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নতুন বৈষম্যও তৈরি করতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীর বামপন্থীদের তাই বাজারের অস্তিত্ব অস্বীকার করা কিংবা বাজারের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা—এই দুই অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। বাজারকে কোথায় ব্যবহার করা হবে, কোথায় নিয়ন্ত্রণ করা হবে, কোন খাত সামাজিক মালিকানায় থাকবে এবং কোন সিদ্ধান্ত জনগণের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণ করাই হবে বিকল্প অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

চীন, ভিয়েতনাম ও কিউবা: অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

চীনের পর ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের বামপন্থীদের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া ‘দই মই’ সংস্কারের মাধ্যমে ভিয়েতনাম কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বজায় রেখে বাজারের শক্তিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাজে লাগানোর চেষ্টা করে দেশটি। কৃষি উৎপাদন, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভিয়েতনামের অগ্রগতি দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন আনা এবং সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখার চেষ্টা একই সঙ্গে চলতে পারে।

কিন্তু ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতাও প্রশ্নমুক্ত নয়। শিল্পায়নের সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার, আয়বৈষম্য, পরিবেশগত চাপ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের প্রশ্ন জড়িত। উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি শ্রমিক ও কৃষকের জীবনমান কতটা উন্নত করছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কিউবার অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের মার্কিন অবরোধ, বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা, আমদানিনির্ভরতা এবং উৎপাদনসংকটের মধ্যে দেশটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্ষুদ্র বেসরকারি উদ্যোগ ও সমবায়ের পরিসর সম্প্রসারণের পদক্ষেপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে কিউবার ঐতিহাসিক অর্জন আলোচনার দাবি রাখে। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানির সংকট, উৎপাদনশীলতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।

এই তিন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সমাজতন্ত্রের কোনো একটিমাত্র অপরিবর্তনীয় অর্থনৈতিক নকশা নেই। ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, উৎপাদন কাঠামো এবং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপ বদলাতে পারে। তবে পরিবর্তনের বিচার করতে হবে মানুষের মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার, উৎপাদনক্ষমতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সম্মিলিত মানদণ্ডে।

বাংলাদেশের বামপন্থীদের কাজ এসব দেশের কোনো মডেল হুবহু অনুকরণ করা নয়। বরং তাদের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী একটি স্বতন্ত্র বিকল্প নির্মাণ করা। কারণ বাংলাদেশের কৃষি, জনসংখ্যা, শিল্পায়নের স্তর, শ্রমবাজার, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক ইতিহাস অন্য দেশগুলোর থেকে আলাদা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শোষণের বাস্তব রূপ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটেছে। তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী শ্রমিকদের আয়, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাত দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আয় ও সম্পদের বণ্টন, কর্মসংস্থানের মান, জীবনযাত্রার ব্যয়, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন রয়েছে।

একটি দেশের মোট উৎপাদন বাড়লেই তার সব নাগরিক সমানভাবে লাভবান হন না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কার হাতে জমা হচ্ছে, শ্রমের তুলনায় পুঁজির আয় কত দ্রুত বাড়ছে, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীরা কতটা মুনাফা নিচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি কোন শ্রেণি বা গোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করছে—এসব প্রশ্ন অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কেন্দ্রে থাকা উচিত।

কৃষকের ক্ষেত্রে সমস্যাটি স্পষ্ট। উৎপাদনের জন্য বীজ, সার, সেচ, জ্বালানি, শ্রম ও পরিবহনে ব্যয় বাড়লেও ফসল বিক্রির সময় অনেক কৃষক ন্যায্য দাম পান না। সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, দ্রুত পণ্য বিক্রির বাধ্যবাধকতা, বাজারতথ্যের অসমতা এবং ঋণের চাপ তাঁদের দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল করে। অন্যদিকে, ভোক্তাকে অনেক সময় বেশি দাম দিতে হয়। অর্থাৎ উৎপাদক কম দাম পান, ভোক্তা বেশি দাম দেন, অথচ সরবরাহব্যবস্থার মধ্যবর্তী শক্তিশালী অংশ লাভবান হতে পারে।

শ্রমবাজারেও একই ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। শ্রমিকের শ্রমে শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ে, কিন্তু ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে সম্ভব হয়নি। অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, অস্থায়ী কাজ এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা শ্রমজীবী মানুষের ঝুঁকি বাড়ায়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতার মুখোমুখি হন। সুলভ ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমিক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগের অভাব তাঁদের উৎপাদন সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিপরীতে, বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পুঁজি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগ এবং বাজারের ওপর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি।

ব্যাংকঋণ, সরকারি ক্রয়, জমি বরাদ্দ, জ্বালানি, করসুবিধা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই জরুরি। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, দুর্নীতি কিংবা একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও প্রতিকার না থাকলে অর্থনীতিতে ন্যায্য প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

এখানেই বামপন্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচির বিশেষ গুরুত্ব। তাঁরা যদি শুধু শোষণের সাধারণ ব্যাখ্যা দেন, কিন্তু বাজারে ক্ষমতার অসমতা কমানোর প্রতিষ্ঠান ও নীতির প্রস্তাব দিতে না পারেন, তাহলে মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কৃষকের মুক্তির পথ: উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত সমবায়

বাংলাদেশে বিকল্প অর্থনীতি নির্মাণের প্রথম ক্ষেত্র হতে পারে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। কৃষককে শুধু উৎপাদনকারী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁকে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণনের সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়াতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।

এ ক্ষেত্রে সমবায় একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হতে পারে। তবে সমবায় বলতে শুধু ঋণ বিতরণ কিংবা সার-বীজ সরবরাহের সংগঠন বোঝালে চলবে না। সমবায়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত কৃষকের সম্মিলিত সক্ষমতা গড়ে তোলা।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা যৌথভাবে কৃষি উপকরণ কিনতে পারেন, যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারেন, ফসল সংরক্ষণের জন্য গুদাম ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ফসল কাটার পরপরই বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রির চাপ হ্রাস পেতে পারে।

সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকেরা বাজারদর, চাহিদা, আবহাওয়া, উৎপাদন ব্যয় এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। স্থানীয় বাজার, শহরের খুচরা বিক্রেতা, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে সমবায় গঠন করলেই সাফল্য নিশ্চিত হবে না। রাজনৈতিক দখল, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা সমবায়কে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই সদস্যদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, নিয়মিত নিরীক্ষা, স্বচ্ছ হিসাব, নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সমবায়ের ব্যবস্থাপনা পেশাদার হতে পারে, কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি সদস্যদের হাতে থাকতে হবে।

তিস্তা অববাহিকার মতো কৃষিনির্ভর অঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র শিল্পকে সমন্বিত করে আঞ্চলিক অর্থনীতি গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণকেন্দ্র, পরিবহনব্যবস্থা এবং বাজারসংযোগ তৈরি করা গেলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে। কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাম থেকে শহরে বাধ্যতামূলক শ্রম অভিবাসনের চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

কৃষির সঙ্গে পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রশ্নও যুক্ত করতে হবে। বন্যা, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল বীজ, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং কৃষিবৈচিত্র্য রক্ষায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষকের মুক্তি মানে শুধু বেশি উৎপাদন নয়; উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অংশ।

শ্রমিকের অধিকার ও উৎপাদনশীলতা পরস্পরের পরিপূরক

বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শ্রমিকের অধিকার ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে বাস্তবসম্মত সমন্বয় প্রতিষ্ঠার ওপর। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর দাবি এবং উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার যুক্তিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। একইভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রশ্ন উপেক্ষা করেও স্থায়ীভাবে মজুরি ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করা কঠিন।

ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। এসব নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ, উৎপাদনের মান বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের অভাব, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং বাজারসংযোগের ঘাটতির কারণে সম্ভাবনা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে না। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্পসুদের অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, মান পরীক্ষার সুবিধা এবং শিল্পভিত্তিক সহযোগিতামূলক কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।

শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানোর দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনকে যৌথভাবে প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে কোনো খাতে কাজের ধরন বদলে গেলে শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

এখানে বামপন্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। শ্রমিক সংগঠনকে শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, উৎপাদন পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, মুনাফা ও উৎপাদনশীলতার তথ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

শ্রমিকের অংশগ্রহণ মানে মালিকের সব সিদ্ধান্ত অকার্যকর করে দেওয়া নয়; বরং যেসব সিদ্ধান্ত শ্রমিকের জীবন, নিরাপত্তা ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে, সেসব ক্ষেত্রে তাঁদের কার্যকর মতামত ও অধিকার নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, উৎপাদনের পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থানের ঝুঁকি সম্পর্কে শ্রমিক প্রতিনিধিদের যথাযথ তথ্যপ্রাপ্তি থাকলে শিল্পসম্পর্ক আরও স্বচ্ছ হতে পারে।

জনস্বার্থই হওয়া উচিত মানদণ্ড

বামপন্থী রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে প্রায়ই জনস্বার্থের সমার্থক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারের মালিকানায় থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনগণের সম্পদ হয়ে ওঠে না। রাজনৈতিক নিয়োগ, দুর্নীতি, অদক্ষতা, অপচয় কিংবা জবাবদিহির অভাব থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে, সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই জনস্বার্থবিরোধী—এমন ধারণাও সঠিক নয়। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, কোন খাতে কী ধরনের মালিকানা কার্যকর, বাজারে প্রতিযোগিতা কতটা রয়েছে, শ্রমিক ও ভোক্তার অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা সমাজের বৃহত্তর অংশের হাতে কতটা ছড়িয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, বিদ্যুৎ, গণপরিবহন ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূমিকা প্রয়োজন। এসব সেবার প্রাপ্যতা শুধু মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভর করলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়বে। তাই মানসম্মত সরকারি সেবা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সেবার মান সম্পর্কে জনজবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ হিসাব, নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত ক্রয়প্রক্রিয়া এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন অপরিহার্য। শ্রমিকের অংশগ্রহণ ও জনগণের তদারকির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও পরিচালনাগত দায়িত্বও স্পষ্ট থাকতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকলেই তাকে অবিলম্বে বন্ধ করা কিংবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যেমন যথেষ্ট যুক্তি নয়, তেমনি জনস্বার্থের নামে অনির্দিষ্টকাল অদক্ষতা ও অপচয় বহন করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়িত্ব ও আর্থিক দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানকে জনস্বার্থে লোকসান দিয়ে সেবা দিতে হয়, সেখানে সেই ভর্তুকির উদ্দেশ্য, পরিমাণ এবং উপকারভোগী কারা—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের যৌক্তিকতা বাড়বে এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারের সুযোগ কমবে।

বিকল্প অর্থনীতির প্রশ্নে তাই মালিকানার ধরনই একমাত্র বিবেচ্য নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র, সমবায়, সামাজিক মালিকানা ও বেসরকারি উদ্যোগের ভূমিকা নির্ধারিত হবে জনস্বার্থ, ন্যায্যতা, দক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ভিত্তিতে।

প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ওপর গণমানুষের অধিকার

একবিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম উৎস প্রযুক্তি, তথ্য এবং জ্ঞান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, ডিজিটাল বাণিজ্য, তথ্যভিত্তিক সেবা এবং নতুন ধরনের আর্থিক প্রযুক্তি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে, একই সঙ্গে নতুন বৈষম্যের ঝুঁকিও তৈরি করছে।

প্রযুক্তির সুবিধা যদি শুধু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে ছোট উৎপাদক ও ব্যবসায়ী বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের ফলে কিছু কাজের চাহিদা কমতে পারে, আবার নতুন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়লেও শ্রমিকের আয়, কাজের সময়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং তথ্যের মালিকানা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দেয়।

বাংলাদেশের বামপন্থীদের প্রযুক্তিবিরোধী অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তির ওপর গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। কৃষকের জন্য আবহাওয়া, বাজারদর ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ডিজিটাল বিপণনের সুযোগ দেওয়া, শ্রমিককে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত করা এর অংশ হতে পারে।

সরকারি ডিজিটাল সেবা ও তথ্যভান্ডারের ব্যবস্থাপনাতেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সেবা সহজ করা সম্ভব, কিন্তু নজরদারি, তথ্যের অপব্যবহার এবং অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয়তার কারণে কর্মসংস্থান পরিবর্তিত হলে তার দায় শুধু শ্রমিকের ওপর চাপানো যাবে না। রাষ্ট্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনঃপ্রশিক্ষণ, কর্মজীবন পরিবর্তনের সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তির সুফল যেন শুধু উৎপাদন ব্যয় কমানো ও মুনাফা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মানুষের কাজের মান, অবসর, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নতিতেও ভূমিকা রাখে—সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিকল্প অর্থনীতির অর্থের সংস্থান কোথা থেকে আসবে?

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নতুন শিল্প গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান কোথা থেকে হবে, তার সুস্পষ্ট উত্তর না থাকলে কর্মসূচি বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

বাংলাদেশের বামপন্থীদের তাই রাজস্ব, ব্যাংকিং, সরকারি ব্যয়, করব্যবস্থা এবং অর্থের অপচয় রোধের বিষয়ে একটি বিস্তারিত নীতিপ্রস্তাব হাজির করতে হবে। বড় সম্পদ ও উচ্চ আয়ের ওপর ন্যায়সংগত কর আরোপ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং করব্যবস্থার প্রগতিশীলতা বাড়ানো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে শুধু কর বাড়ানোর কথা বললেই হবে না। করের বোঝা যেন উৎপাদনশীল ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সাধারণ ভোক্তার ওপর অযৌক্তিকভাবে না পড়ে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। করনীতি এমন হতে হবে, যাতে রাজস্ব বাড়ে, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত না হয়।

ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রেও ন্যায্যতা ও জবাবদিহি জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ অনিয়ম এবং বড় ঋণগ্রহীতার বিশেষ সুবিধার সংস্কৃতি আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে। ঋণখেলাপি সমস্যার কার্যকর সমাধান, ঋণ মূল্যায়নের স্বচ্ছতা, ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারিত্ব এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। তবে সুলভ ঋণ মানে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ নয়। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়ন করতে হবে।

সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো প্রকল্পের ঘোষিত ব্যয়ের পাশাপাশি তার বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফলও পরিমাপ করা উচিত।

বিকল্প অর্থনীতির জন্য একটি স্বচ্ছ মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে রাজস্বের উৎস, বিনিয়োগের অগ্রাধিকার, কর্মসংস্থানের লক্ষ্য, সামাজিক সুরক্ষার পরিধি এবং অর্থায়নের ঝুঁকি স্পষ্ট থাকবে। মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তুলে ধরতে হলে বামপন্থীদের অর্থনীতির হিসাবও বুঝতে হবে এবং সেই হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

সমবায়, সামাজিক মালিকানা ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র

বিকল্প অর্থনীতির আলোচনায় রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি মালিকানার বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে—সমবায় ও সামাজিক মালিকানা। এই ব্যবস্থায় উৎপাদক, শ্রমিক, ভোক্তা কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠী যৌথভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন এবং তার সুফল বণ্টনে অংশ নিতে পারেন।

কৃষি সমবায়ের পাশাপাশি শ্রমিক-পরিচালিত উদ্যোগ, ভোক্তা সমবায়, আবাসন সমবায়, স্থানীয় জ্বালানি সমবায় এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের যৌথ বিপণন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হবে শুধু মুনাফা অর্জন নয়; বরং সদস্যদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, উৎপাদনক্ষমতা এবং সম্মিলিত দর-কষাকষির শক্তি বৃদ্ধি করা।

তবে সমবায়কে কোনো আদর্শিক স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সমবায় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর হতে হলে হিসাবরক্ষণ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, বাজার বিশ্লেষণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং সদস্যদের আস্থা অর্জন করতে হবে। সদস্যদের বিনিয়োগ, প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকতে হবে।

সমবায় অর্থনীতির আরেকটি সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো যায়। একটি এলাকার কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভোক্তা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে পারেন। তবে স্থানীয় উদ্যোগের পরিসর সীমিত হতে পারে; তাই জাতীয় পর্যায়ের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং বাজারসংযোগের সঙ্গে এসব উদ্যোগের সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা, আইনি সুরক্ষা দেওয়া, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা এবং সমবায়ের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের নামে দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলে সমবায়ের গণতান্ত্রিক চরিত্র নষ্ট হবে। আবার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বাজারের শক্তির ওপর ছেড়ে দিলে বড় পুঁজি সমবায়কে দুর্বল করতে পারে। প্রয়োজন স্বচ্ছ বিধিব্যবস্থা, সদস্যদের অধিকার এবং কার্যকর জবাবদিহি।

জনগণতন্ত্র ছাড়া শোষণমুক্তির সমাজ সম্ভব নয়

অর্থনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি জনগণের গণতন্ত্রকে বিকল্প সমাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শ্রমিক-কৃষকের নামে কথা বললেই তাঁদের ক্ষমতায়ন হয় না। তাঁদের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার অধিকার, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নজরদারির সুযোগ থাকতে হবে।

ইতিহাসে দেখা গেছে, জনগণের মুক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন আমলাতান্ত্রিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়। উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে গেলেও যদি সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশ নিতে না পারেন, তাহলে তাঁদের ওপর থেকে ক্ষমতার দূরত্ব দূর হয় না। ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় মালিকানার নামে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই সমাজতন্ত্র নয়।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্র বলতে বোঝায়, মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করা সিদ্ধান্তে তাঁদের বাস্তব অংশগ্রহণ থাকবে। শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে, কৃষকের উৎপাদন ও বিপণনে, স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এবং নাগরিকের সরকারি সেবার মূল্যায়নে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন গণমাধ্যম, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এ ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।

বামপন্থী দলগুলোর নিজেদের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে। নেতৃত্ব নির্বাচন, নীতিগত বিতর্ক, আর্থিক হিসাব, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং কর্মীদের মতামতের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে বৃহত্তর সমাজে গণতান্ত্রিক বিকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। যে রাজনৈতিক সংগঠন নিজের ভেতরে ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, সে কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা দেবে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

Manual7 Ad Code

সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য অর্জনে সংগ্রামের মানে হচ্ছে মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্য কমানো, জীবিকার অনিশ্চয়তা হ্রাস করা এবং প্রত্যেকের মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তাই অর্থনৈতিক সমতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো যাবে না। টেকসই শোষণমুক্তির জন্য দুটিই প্রয়োজন।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা মানে নতুন নির্ভরতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়া নয়

বাংলাদেশের বামপন্থীদের সাম্রাজ্যবাদ ও আন্তর্জাতিক করপোরেট আধিপত্যের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান আরও বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা মানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের নীতির বিরোধিতা নয়; একই সঙ্গে অন্য কোনো শক্তির ওপর একতরফা নির্ভরশীল হয়ে পড়া থেকেও সতর্ক থাকা।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ নিজে থেকেই ভালো বা খারাপ নয়। বিনিয়োগের শর্ত, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় কর্মসংস্থান, পরিবেশগত প্রভাব, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং চুক্তির স্বচ্ছতা বিবেচনা করেই তার মূল্যায়ন করা উচিত।

বিদেশি ঋণ ও অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব প্রকাশ্য আলোচনার বিষয় হওয়া প্রয়োজন। কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে কোনো প্রকল্পকে সমর্থন কিংবা প্রত্যাখ্যান না করে তার প্রকৃত সুবিধা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে হবে।

আত্মনির্ভরতা মানে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা নয়। বরং এমন উৎপাদনক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি সক্ষমতা এবং আর্থিক স্থিতি গড়ে তোলা, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণ করেও দেশ নিজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য রপ্তানিপণ্যের বৈচিত্র্য, দক্ষ মানবসম্পদ, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুফল যেন কেবল বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য শ্রমিকের অধিকার, করনীতি এবং সামাজিক সুরক্ষাকে শক্তিশালী করতে হবে।

বাম ঐক্য: স্লোগানের নয়, কর্মসূচির ভিত্তিতে

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম দুর্বলতা হলো বিভিন্ন বাম দল, শ্রমিক সংগঠন, কৃষক সংগঠন এবং গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে স্থায়ী ও কার্যকর কর্মসূচিভিত্তিক ঐক্যের ঘাটতি। মতাদর্শগত পার্থক্য ও রাজনৈতিক পথ নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু সেই পার্থক্যের মধ্যেও সাধারণ মানুষের জীবনসংক্রান্ত প্রশ্নে অভিন্ন কর্মসূচি গড়ে তোলা সম্ভব।

কৃষকের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সুশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা, একচেটিয়া ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের মতো বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হওয়ার কথা নয়।

এই ঐক্য শুধু নির্বাচনী সমঝোতা কিংবা যৌথ বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পাড়া, গ্রাম, কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার পর্যন্ত জনগণের সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিক ও কৃষকের নিজস্ব সংগঠনকে রাজনৈতিক দলের অধীনস্থ শাখায় পরিণত না করে তাদের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।

বামপন্থীদের উচিত একটি ন্যূনতম বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করা, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে—কৃষি বিপণনব্যবস্থা কীভাবে সংস্কার করা হবে, শ্রমিকের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, ক্ষুদ্র শিল্পের অর্থায়ন কীভাবে বাড়বে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তার অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে।

এই কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। কোনো কৃষি সমবায় সফল হলে তার আয়-ব্যয়, উৎপাদন খরচ, বাজারদর ও সদস্যদের আয় বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা কর্মসূচির ফলাফল পরিমাপ করা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবার মান পর্যবেক্ষণ করে নাগরিক জবাবদিহির কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করা যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য এসব উদ্যোগের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও প্রকাশ করতে হবে। কোন পদ্ধতি কাজ করছে না, কেন করছে না এবং কীভাবে সংশোধন করা যায়—সেই শিক্ষা জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। বাস্তব ফলাফল দেখানোর এই সংস্কৃতি বাম রাজনীতিকে নতুন সামাজিক ভিত্তি দিতে পারে।

প্রতিবাদের পাশাপাশি নির্মাণের রাজনীতি

বামপন্থীদের আন্দোলন ও প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে, কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হলে, ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদে অনিয়ম ঘটলে কিংবা নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হলে প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু প্রতিবাদের পাশাপাশি বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজও করতে হবে।

কোনো এলাকায় কৃষকেরা যদি উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পারেন, সেখানে বাজারতথ্য, যৌথ সংরক্ষণ এবং সরাসরি বিপণনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কোনো অঞ্চলে ক্ষুদ্র শিল্প অর্থায়নের অভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলে সেখানে সমবায়ভিত্তিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা যেতে পারে। শ্রমিকের নিরাপত্তা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে মালিক, শ্রমিক সংগঠন এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে যৌথ কর্মসূচি তৈরি করা যেতে পারে।

এ ধরনের উদ্যোগ রাতারাতি অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে দেবে না। কিন্তু এগুলো মানুষের সামনে বিকল্পের বাস্তব নমুনা তুলে ধরতে পারে। মানুষ যখন দেখবেন, সম্মিলিত উদ্যোগে উৎপাদন ব্যয় কমছে, বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ছে, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কিংবা সরকারি সেবার মান উন্নত হচ্ছে, তখন বিকল্প অর্থনীতির প্রতি তাঁদের আস্থা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এখানে রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্ব হবে সফল উদ্যোগের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেওয়া, প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কারের দাবি তোলা এবং স্থানীয় উদ্যোগকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা। কোনো ক্ষুদ্র উদ্যোগকে জাতীয় অর্থনীতির বিকল্প বলে অতিরঞ্জিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সীমিত পরিসরের উদ্যোগ বলে তার গুরুত্ব অস্বীকার করাও ভুল।

বিকল্প নির্মাণের রাজনীতি মানে বিদ্যমান ব্যবস্থার সব প্রতিষ্ঠান এক মুহূর্তে বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়। বরং যেসব ক্ষেত্রে শোষণ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রয়েছে, সেখানে মানুষের সম্মিলিত অধিকার ও নিয়ন্ত্রণের পরিসর ধাপে ধাপে বাড়ানো। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা এবং আর্থিক স্থায়িত্বের সম্পর্কও নিশ্চিত করা।

নতুন সমাজতন্ত্রের রূপরেখা কেমন হবে?

একবিংশ শতাব্দীর সমাজতান্ত্রিক বিকল্পকে একই সঙ্গে উৎপাদনশীল, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, পরিবেশবান্ধব এবং প্রযুক্তিসক্ষম হতে হবে। শুধু সম্পদের পুনর্বণ্টন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে না; সম্পদ সৃষ্টি করার ক্ষমতাও বাড়াতে হবে। আবার উৎপাদন বাড়ানোর নামে শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার বিসর্জন দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

এই বিকল্প অর্থনীতির কয়েকটি ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।

প্রথমত, উৎপাদনের উপকরণ ও অর্থনৈতিক সুযোগের ওপর অধিকতর ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শ্রমিক এবং নতুন উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী তরুণদের জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মৌলিক সেবাকে মানুষের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, পুষ্টি, বাসস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার ন্যূনতম নিশ্চয়তা মানুষের জীবনকে বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেবে।

তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রকে জনস্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা দিতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না।

চতুর্থত, সমবায় ও সামাজিক মালিকানার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক চরিত্র বজায় রেখে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, করব্যবস্থা ও আর্থিক খাতকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন, কর ফাঁকি, ঋণ অনিয়ম এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে।

ষষ্ঠত, পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রশ্নকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। নদী, পানি, কৃষিজমি, বন এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অর্জন করলে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্প, গণপরিবহন এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

সপ্তমত, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের মুক্তির নামে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করা যাবে না। স্বাধীন সংগঠন, মতপ্রকাশ, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ছাড়া অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারও টেকসই হয় না।

এই ভিত্তিগুলোকে একত্র করেই নতুন সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বাস্তব রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব। এর লক্ষ্য হবে বাজারকে প্রয়োজনমতো কাজে লাগানো, কিন্তু বাজারকে মানুষের ভাগ্যনির্ধারক হতে না দেওয়া; রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে জবাবদিহির বাইরে না রাখা; এবং সামাজিক মালিকানা বাড়ানো, কিন্তু তাকে অদক্ষতা ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের শিকার হতে না দেওয়া।

উপসংহার: মানুষের জীবনে পরিবর্তনই রাজনীতির চূড়ান্ত কর্তব্য ও পরীক্ষা

Manual1 Ad Code

বাংলাদেশের বামপন্থীদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময়। তাঁরা কি শুধু অতীতের গৌরব, বিপ্লবের স্মৃতি, পরিচিত স্লোগান এবং পুঁজিবাদের পতনের প্রত্যাশার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন, নাকি মানুষের বর্তমান সংকটের বাস্তব সমাধান নিয়ে মাঠে নামবেন?

এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ প্রাসঙ্গিকতা গভীরভাবে জড়িত। কৃষককে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সক্ষমতা দিতে হবে, শ্রমিককে অধিকার ও মর্যাদা দিতে হবে, তরুণকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে উৎপাদন সম্প্রসারণের উপায় দিতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতার ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা তখনই কার্যকর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হবে, যখন তা দেশের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াবে, বিদেশি নির্ভরতার ঝুঁকি কমাবে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলবে এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের ক্ষমতা বাড়াবে। পুঁজিবাদবিরোধিতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা শুধু মুনাফার সমালোচনায় থেমে না থেকে শ্রমিক-কৃষকের জীবনমান উন্নত করার কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও নীতির জন্ম দেবে।

দেং জিয়াও পিংয়ের বিড়ালের উপমার রাজনৈতিক শিক্ষা এখানেই। তত্ত্বের নাম, স্লোগানের উচ্চতা কিংবা বিপ্লবী পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের জীবনে রাজনীতি কী পরিবর্তন আনতে পারছে। তবে সেই পরিবর্তনের বিচার শুধু উৎপাদন বা প্রবৃদ্ধি দিয়ে করলেও চলবে না; দেখতে হবে, সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কতটা গণতান্ত্রিক হচ্ছে।

বাংলাদেশের বামপন্থীদের তাই তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতার, প্রতিবাদের সঙ্গে নির্মাণের, উৎপাদনের সঙ্গে ন্যায্য বণ্টনের এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সংযোগ ঘটাতে হবে। বিকল্প অর্থনীতি নির্মাণের সংগ্রামকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এই কাজ কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং অনিশ্চয়তাপূর্ণ। কিন্তু এর কোনো সহজ বিকল্প নেই।

শোষণমুক্ত সমাজের প্রতিশ্রুতি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন মানুষ সেই সমাজের সম্ভাব্য রূপ নিজেদের জীবনে অনুভব করতে পারবেন। কৃষকের আয় বাড়বে, শ্রমিকের জীবন নিরাপদ হবে, তরুণের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলবে, মৌলিক সেবা নাগালের মধ্যে আসবে এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পাবে—এমন পরিবর্তনই বিকল্প রাজনীতির বাস্তব ভিত্তি তৈরি করবে।

Manual8 Ad Code

অন্যথায়, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান যতই উচ্চকণ্ঠ হোক, মানুষের জীবনে তার প্রভাব সীমিত থেকে যাবে। বাংলাদেশের বামপন্থীদের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরোধিতা করা নয়; বরং তার চেয়ে ন্যায়সংগত, উৎপাদনশীল ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতা প্রমাণ করা। সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারলেই শোষণমুক্তির রাজনীতি নতুন প্রাসঙ্গিকতা, সামাজিক ভিত্তি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ফিরে পেতে পারে।
#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ