বাস্তিল দুর্গের পতন ও ফরাসী বিপ্লবের কথা

প্রকাশিত: ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২৬

বাস্তিল দুর্গের পতন ও ফরাসী বিপ্লবের কথা

Manual4 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

বাস্তিল দুর্গের পতনের ২৩৭ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ।

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্স রাজ্যের প্যারিসের কুখ্যাত বাস্তিলে বিক্ষোভ হয়। ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুই তৃতীয় শ্রেণীর বুর্জোয়াদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও তিনি পুরোনো রাজতন্ত্রের প্রতীক হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। শুধুমাত্র সেই কারণে ফ্রান্সের প্রধান অর্থমন্ত্রী নেকারকে সরিয়ে দিয়ে সেই পদে প্যারিস ও ভার্সাই এর সেনা মোতায়েন করেন। এরপর ফ্রান্সের উত্তপ্ত জনতা ১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে ও দখল করে নেয়।

এই বাস্তিল দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে ফরাসী বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই বিপ্লব ছিল তদানীন্তন ফ্রান্সের শত শত বছর ধরে নির্যাতিত ও বঞ্চিত “থার্ড স্টেট” বা সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই বিপ্লবের আগে সমগ্র ফ্রান্সের ৯৫ শতাংশ সম্পত্তির মালিক ছিল মাত্র ৫ ভাগ মানুষ। অথচ সেই ৫ ভাগ মানুষই কোনো আয়কর দিত না এবং এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করত তাদেরকে এই বাস্তিল দুর্গে বন্দী করে নির্যাতন করা হতো। বাস্তিল দুর্গ ছিল স্বৈরাচারী সরকারের নির্যাতন ও জুলুমের প্রতীক। একবার কোনো বন্দী সেখানে প্রবেশ করলে জীবন নিয়ে আর ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকত না। কারাগারের ভিতরেই মেরে ফেলা হতো অসংখ্য বন্দীদের। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গের আশেপাশের বিক্ষুব্ধ মানুষ বাস্তিল দুর্গ অভিমুখে রওনা হয়। দুর্গের সৈন্যরাও ভিতর থেকে কামান দাগাতে থাকে। প্রায় দুইশো বিপ্লবী হতাহত হয়। এরপর চারিদিক থেকে উত্তেজিত বিক্ষুব্ধ জনতা বাস্তিল দুর্গ ধ্বংস করে। জয় হয় সাম্য, মৈত্রী এবং স্বাধীনতার। এই ঘটনাটিই ফ্রান্সের জাতীয় উৎসব বলে পালন করা হয়।
বাস্তিল দুর্গের পতনের পর ফ্রান্সের রাজতন্ত্র খানিকটা শিথিল হয়ে পড়ে। আতঙ্কিত রাজা ফ্রান্সের জাতীয় পতাকাকে মেনে নেয়। জনগণের নির্ধারিত মেয়রকে প্যারিস পৌরসভার প্রধান করা হয়। স্বৈরতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল দুর্গের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্র ক্ষমতা হারায়। ফ্রান্সে রাজতন্ত্র পতনের শুরু হলে, গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে শুরু করে। জনগণের আক্রমণে ফ্রান্সের বাস্তিল দুর্গের পতন হলে সম্রাটরা বুঝতে পারে, তাদের সময় বেশিদিন থাকবে না। এরপর থেকে গণতন্ত্র জোর বাঁধতে শুরু করে ও ফ্রান্সে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়।

ফরাসী বিপ্লব ইউরোপ এবং নতুন বিশ্বের উপর একটি বড় প্রভাব ফেলেছিল। মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনের নির্ণায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এটি সামন্তবাদের অবসান ঘটায় এবং পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত ব্যক্তিগত মুক্তির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করেছিল।

ফরাসী বিপ্লব (১৭৮৯–১৭৯৯) ফরাসি, ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং একই সাথে দেশের রোমান ক্যাথলিক চার্চ সকল গোঁড়ামী ত্যাগ করে নিজেকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়। ফরাসী বিপ্লবকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি জটিল সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতা নিরঙ্কুশ রাজনীতি এবং অভিজাততন্ত্র থেকে নাগরিকত্বের যুগে পদার্পণ করে।

ফরাসী বিপ্লবের মূলনীতি ছিল “স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, অথবা মৃত্যু”। এই শ্লোগানটিই বিপ্লবের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিলো যার মাধ্যমে সামরিক এবং অহিংস উভয়বিধ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শ্লোগানটি তখন সকল কর্মীর প্রাণের কথায় পরিণত হয়েছিলো।

ফরাসী বিপ্লবের কারণ

ফরাসী বিপ্লবের রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক প্রকৃতিকে ইতিহাসবিদরা স্বীকার করেননা। কারণ সম্বন্ধে একটি ধারণায় বলা হয়: অ্যানসিয়েন সরকারের প্রাচীন অভিজাত নীতি ও আইনসমূহ একটি উদীয়মান বুর্জোয়াতন্ত্রের উচ্চাভিলাষের খোরাক যোগাতে শুরু করে যা আলোকসম্পাতের দ্বারা ছিলো ব্যাপকভাবে আক্রান্ত। এই বুর্জোয়ারা শহরের বিশেষত প্যারিস এবং লিওনের চাকুরিজীবী এবং অত্যাচারিত চাষী শ্রেণির সাথে মিত্রতা সৃষ্টি করে। আরেকটি ধারণা অনুসারে অনেক বুর্জোয়া এবং অভিজাত মহল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের চেষ্টা করতে থাকে যা পরবর্তীতে চাকুরিজীবী শ্রেণির আন্দোলনগুলোর সাথে একাত্ম হয়ে যায়। এর সাথে এক হয় প্রাদেশিক চাষীদের আন্দোলন। এই ধারণা অনুসারে তাদের মধ্যে কোন মেলবন্ধন কেবল ঘটনাক্রমে হয়েছে, তা পরিকল্পিত ছিলোনা।
যে ধারণাকেই ধরা হোক না কেন, অ্যানসিয়েন সরকারের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিলো যা বিপ্লবের মূল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। একদিক দিয়ে সেগুলো ছিলো অর্থনৈতিক কারণ:

নিম্নমানের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং বল্গাহীন জাতীয় ঋণ। এর মূল কারণ ছিল অসম করারোপণ যার বোঝা মোটেই বহনযোগ্য ছিলনা, সম্রাট লুই ১৬-এর অত্যধিক খরচ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধসমূহ।
বেকারত্বের উচ্চহার এবং খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য।
বিপ্লবের ঠিক আগের মাসগুলোতে বিরাজমান খাদ্য সংকট।

অপর দিকে এর পিছনে কিছু সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণ ছিল। আলোকিত সমাজ এই কারণগুলোকে কেন্দ্র করেই তাদের আন্দোলন শুরু করে যারা ছিল আলোকসম্পাতের যুগ দ্বারা প্রভাবিত।

এই কারণগুলো হল:

নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের পুনঃস্থাপন যা রাজত্বের পক্ষে ছিল ক্ষতিকর।
সমাজের একটি বিশেষ পেশাদার শ্রেণি এবং উঁচুশ্রেণির লোকদের ব্যাপক সুবিধা দেয়া হচ্ছিলো যা জনসাধারণের জীবনকে নিজের প্রভাবাধীনে রাখতে শুরু করেছিলো।
কৃষক, চাকুরিজীবী শ্রেণি এবং কিছু পরিমাণ বুর্জোয়া কর্তৃক জমিদারতন্ত্রের উচ্ছেদের পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়।
বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য, যাজকশ্রেণির ভোগ-বিলাস চরমে উঠে। অপরদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে একটি জোয়ার সৃষ্টি হয়।
স্বাধীনতা এবং প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের অনুপ্রেরণা।
সবশেষে যে কারণ সম্বন্ধে বলতে হয় তা হল এই সমস্যাগুলোর যেকোনটির সমাধানে সম্রাট লুই ১৬-এর চূড়ান্ত ব্যর্থতা।

রাজকীয় অর্থ সংকট

ফ্রান্সের সম্রাট লুই ১৬ (রাজত্বকাল: ১৭৭৪ – ১৭৯২) যখন রাজকীয় অর্থের সংকটে পড়েন তখনই বৈপ্লবিক সংকটকাল শুরু হয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বলতে হয় ফরাসী রাজের শোধক্ষমতা (solvency) ছিল ফরাসী রাষ্ট্রের শোধক্ষমতার সমমানের। ফরাসী রাজ বিপুল পরিমাণ ঋণের ফাঁদে পড়েছিলো যা তদানীন্তন অর্থ সংকটের সৃষ্টি করে।

লুই ১৫ (রাজত্বকাল: ১৭১৫ – ১৭৭৪) এবং লুই ১৬-এর শাসনকালে মূলত অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সিদ্ধান্ত রাজকীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য গৃহীত হয়েছিলো। মন্ত্রীদের মধ্যে মূল হিসেবে বলা যায় Baron de Laune Anne Robert Jacques Turgot (অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রক: ১৭৭৪ – ১৭৭৬) এবং জ্যাক নেকারের (অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রক: ১৭৭৭ – ১৭৮১) নাম। তারা বারবার অর্থ সমস্যার সমাধানের জন্য ফরাসী করারোপণ পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করেন যা কোন সফলতার মুখ দেখেনি। আর এ ধরনের উদ্যোগ সংসদ থেকে ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। সংসদ তখন ছিলো Robe Nobility-দের করায়ত্তে যারা নিজেদেরকে জাতির অভিভাবক জ্ঞান করতেন। এর ফলশ্রুতিতে দুজন মন্ত্রীই পদচ্যুত হন। চার্লস আলেকজান্ডার দ্য ক্যালোঁ, যিনি ১৭৮৩ সালে অর্থ বিভাগের মহানিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পান, বিশিষ্ট ব্যয়সমূহের জন্য একটি নতুন নীতিমালা হাতে নেন যার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতাদের বুঝানোর চেষ্টা চালান।

রাজ্যসভা

জুন ১০, ১৭৮৯ তারিখে Abbé Sieyès প্রস্তাব করে যে তৃতীয় এস্টেট তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে এগুবে এবং অন্য দুইটি এস্টেটকে আমন্ত্রণ জানাবে, কিন্তু উক্ত এস্টেটদ্বয় তৃতীয় এস্টেটের জন্য অপেক্ষা করবেনা।

বাস্তিল দুর্গ

রাজপ্রাসাদের বিলাস ব্যসন ও রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা ফরাসী জনগণকে রাজতন্ত্রের প্রতি ক্রমেই বিক্ষুব্ধ করে তুলছিল। ভার্সাই রাজপ্রাসাদ ছিল বিলাস ব্যসন ও ঐশ্বর্যের ইন্দ্রপুরী। ১৮ হাজার কর্মচারী রাজপরিবারের সেবায় সদাসর্বদা নিযুক্ত থাকত এবং সভাসদদের মধ্যে কোটি কোটি মুদ্রা পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হতো।

একটি হিসাব থেকে জানা যায়, ১৭৮৯ সালে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে বিলাসী কর্মকাণ্ডে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। রাজা, রানি ও তাঁদের সন্তান-সন্ততি এবং অগণিত আত্মীয়স্বজন সবার জন্য পৃথক পৃথক সুরম্য অট্টালিকা ছিল। এক হিসাবে রানি মেরি অ্যান্টয়নেটের নিজস্ব সহচরীসংখ্যা ছিল ৫০০। রাজা, রানি, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের প্রমোদভ্রমণের জন্য রাজদরবারে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ও ২০০ অশ্বশকট সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকত।

এসব বিষয় ফরাসী জনগণের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। এতে রাজতন্ত্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়। অবস্থা এমন হয়েছিল যে ৫ অক্টোবর প্যারিস থেকে মহিলাদের ভুখামিছিল বা হাঙ্গার মার্চ অব দ্য ওমেন ভার্সাই রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে রুটির দাম কমানোর দাবি জানায়।
তখন রানি মেরি অ্যান্টয়নেট অবাক হয়ে মিছিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, এরা কী চায়? তাঁর সহচরী উত্তর দেন, এরা রুটির দাম কমাতে বলছে, রুটি চায়। রানি অবাক হয়ে বললেন, রুটি কেন? এরা কেক খেতে পারে না! প্রকৃতপক্ষে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিলাস ব্যসনে জীবনযাপন করে রানি অ্যান্টয়নেট নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি।

ফ্রান্সের সমাজ প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যেমন-সুবিধাভোগী শ্রেণি ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি। অভিজাত সম্প্রদায় ও যাজক সম্প্রদায় প্রথম শ্রেণিভুক্ত ছিল। যাজক সম্প্রদায়কে ফার্স্ট এস্টেট ও অভিজাত সম্প্রদায়কে সেকেন্ড এস্টেট বলা হতো। মধ্যবিত্ত ও সাধারণ জনগণ ছিল সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি, তাদের বলা হতো থার্ড এস্টেট।

যাজকদের নিজস্ব প্রাসাদ, দুর্গ ও গির্জা ছিল। যাজকদের দুর্নীতি ও ধর্মীয় অনাচার লক্ষ করে রাজা ষোড়শ লুই নিজে একসময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, অন্তত একজন আর্চবিশপকে চাই, যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। তাঁর ভাষায়-লেট আস অ্যাটলিস্ট হ্যাভ এ আর্চবিশপ অব প্যারিস, হু বিলিভস ইন গড।
ফরাসী সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণি ছিল অভিজাত সম্প্রদায়। তারা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত এবং রাষ্ট্রের করভার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। দরবারি অভিজাতরা বৃত্তি, পুরস্কার ও পেনশন ভোগ করত। অভিজাতদের শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধা, ভোগ-বিলাস এবং কৃষকদের ওপর শোষণ ও নিষ্পেষণে প্রকৃতপক্ষে ফরাসী সমাজে শ্রেণিসংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে, যা সর্বাত্মক বিপ্লবের পরিণতি লাভ করে।

বিপ্লব শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ফরাসীদের মনোজগতে পরিবর্তন শুরু হয়। আঠারো শতকের শেষভাগে ফ্রান্সে এমন কয়েকজন দার্শনিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তানায়কের আবির্ভাব হয়, যাঁদের অবদানে মধ্যযুগীয় সমাজ কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। চিন্তানায়কদের পুরোভাগে ছিলেন মন্টেস্কু। দীর্ঘ ২০ বছর পরিশ্রম করে তিনি ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন।

আরেকজন দার্শনিক ছিলেন ভলতেয়ার। ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ভলতেয়ার লিখলেন-দ্য পেন ইজ মাইটার দ্যান দ্য সোর্ড-অর্থাৎ অসির চেয়ে মসি বেশি শক্তিশালী। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্সের শোষণনীতি, চার্চের গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের তীব্র নিন্দা করেন।

Manual8 Ad Code

স্বাধীনচেতা ভলতেয়ার সোজাসাপ্টা ভাষায় তাঁর মত প্রকাশ করে ফরাসী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি লিখলেন-তুমি যা বলছ তা আমি অস্বীকার করতে পারি; কিন্তু আমি আমার মৃত্যু দিয়ে হলেও এ কথা প্রতিষ্ঠা করব যে তোমার বলার অধিকার আছে। কেউ কেউ তাঁকে মানবজাতির বিবেক আখ্যা দিয়েছেন।
রাজা সাধারণ মানুষের ওপর দমননীতি শুরু করেন। রাজকীয় বাহিনী অতর্কিত হামলার প্রস্তুতি নেয়। জার্মান ও সুইস সৈন্যদের ভার্সাইয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাজার এই দমননীতির বিরোধিতা করে তৃতীয় শ্রেণির সমর্থক সাধারণ জনতা ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্রাচীন যুগের অত্যাচারের প্রতীক বাস্তিল কারাদুর্গ আক্রমণ করে বন্দিদের মুক্ত করে আনে। রাজকীয় শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য লাফায়েতের নেতৃত্বে জাতীয় গার্ডবাহিনী গঠন করা হয়।
জাতীয় পরিষদ ২৭ আগস্ট ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। যেখানে মানুষের স্বাধীনতা, বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা, অবাধ গ্রেপ্তারের অবসান, বিবেকের স্বাধীনতা, আইন মানে জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ, সার্বভৌমত্ব জাতির ওপর ন্যস্ত- এ সব কিছু ম্যাগনাকার্টা হিসেবে ঘোষিত হয়।

বাস্তিল দুর্গের পতন ও ফরাসি বিপ্লব, মানুষের মুক্তি এবং সাম্যের স্বপ্নকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“বাস্তিল দুর্গের পতন”

আজও জুলাই এলেই দেখি
ইতিহাসের লাল প্রভাতে
একটি দুর্গ ভেঙে পড়ে
মানুষ জাগে নতুন রাতে।

সে দুর্গ শুধু পাথর ছিল না,
ছিল শাসনের লৌহদ্বার,
ছিল রাজার নিষ্ঠুর হাসি,
শৃঙ্খল, কারা, রক্তধার।

বাস্তিল নামে সেই দুর্গটি
দাঁড়িয়ে ছিল অহংকারে,
অগণিত জনমানুষের
অশ্রু জমা ছিল তারে।

যে কণ্ঠ বলত সত্য কথা,
যে হাত লিখত মুক্তির গান,
যে চোখ চাইত ন্যায়ের আলো,
সেই ছিল বন্দী প্রতিক্ষণ।

অন্যায় ছিল রাষ্ট্রের আইন,
ন্যায় ছিল কেবল রাজদ্বারে,
করের বোঝা কৃষকের কাঁধে,
ভোজের থালা অভিজাত ঘরে।

Manual4 Ad Code

মাত্র অল্প ক’জন মানুষ
ভোগ করিত দেশের ধন,
অগণিত জন ক্ষুধায় কাতর,
রইত বঞ্চিত প্রতিক্ষণ।

একদিকে স্বর্ণমণ্ডিত সভা,
অন্যদিকে খালি ভাঁড়ার,
একদিকে উৎসবের আলো,
অন্যদিকে ক্ষুধার অন্ধকার।

ভার্সাই প্রাসাদ ঝলমল করে,
ঝাড়বাতির দীপ্তি ঝরে,
কিন্তু গ্রামের ধানের ক্ষেতে
কৃষক কাঁদে রক্তভরে।

রানির প্রাসাদ সুগন্ধময়,
শত সহচর, বিলাসবেশ,
শিশুর মুখে একমুঠো রুটি
হয়ে ওঠে দুর্লভ শেষ।

মানুষ যখন রুটি চায়,
ক্ষমতা তখন কেকের ভাষা,
সেই বিভেদের আগুন থেকেই
বিপ্লব পায় জাগার আশা।

মন্টেস্কু লিখেন আইনের কথা,
ক্ষমতারও সীমা চাই,
রাষ্ট্র যেন মানুষের হয়,
অত্যাচারের শেষই পাই।

ভলতেয়ার কলম হাতে
সত্যের আগুন জ্বালিয়ে দেন,
তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী
কলম হতে পারে— শেখান তিনি।

রুশো বলেন— জনগণই
রাষ্ট্রশক্তির মূল উৎস,
জনমতের ঊর্ধ্বে নয়
রাজমুকুটের কোনো রূপ।

চিন্তার ভিত গড়ে ওঠে,
মানুষ শেখে প্রশ্ন করা,
ভয়ের দেয়াল ক্ষয়ে ক্ষয়ে
সাহস শেখে মুখোমুখি দাঁড়ানো।

তারপর আসে সেই জুলাই,
চৌদ্দ তারিখ ইতিহাসে,
প্যারিস তখন জ্বলছে আগুন,
মানুষ নেমেছে রণ-উল্লাসে।

হাজার কণ্ঠ একসাথে বলে—
ভাঙো অত্যাচারের ঘর,
আজকে হবে শেষ হিসাব,
ভাঙবে লৌহ কারাগার।

বাস্তিল দুর্গ ঘিরে ফেলে
জনতার ঢেউ উত্তাল হয়ে,
কামান গর্জে, গুলি ছুটে,
রক্ত ঝরে পথের বুকে।

তবু থামে না মুক্তির যাত্রা,
তবু নত নয় মানুষের শির,
যে স্বপ্ন জন্ম নেয় হৃদয়ে
তার চেয়ে বড় নয় কোনো দুর্গ।

প্রাচীর ভাঙে, দ্বার খুলে যায়,
শৃঙ্খল ছিঁড়ে ওঠে গান,
মানুষ বুঝে— একতার চেয়ে
শক্তিশালী কিছু নেই জান।

বাস্তিল তখন শুধুই ধ্বংস নয়,
একটি যুগের অবসান,
নতুন যুগের প্রথম সূর্য,
মানবমুক্তির ঘোষণা মহান।

সাম্য তখন পথের ভাষা,
মৈত্রী মানুষের অঙ্গীকার,
স্বাধীনতার দীপশিখাটি
ছড়িয়ে পড়ে বারবার।

কৃষক তখন মাথা তোলে,
শ্রমিক গায় বিজয়ের গান,
বুর্জোয়া আর সাধারণ মানুষ
একত্রে লেখে নতুন বিধান।

জাতীয় পরিষদ ঘোষণা করে—
মানুষ সবার সমান অধিকার,
বাকস্বাধীনতা, ধর্মস্বাধীনতা,
জীবন-সম্পদের নিরাপদ দ্বার।

আইনের চোখে সবাই সমান,
রাষ্ট্র জনগণের আপন ঘর,
ক্ষমতার মূল জাতির হাতে—
এই হলো নতুন অঙ্গীকার।

Manual2 Ad Code

তবু বিপ্লব সহজ ছিল না,
রক্তের নদী বইতে থাকে,
স্বাধীনতার প্রতিটি ধাপে
ত্যাগের আগুন জ্বলতে থাকে।

রাজমুকুট পড়ে যায় শেষে,
গিলোটিনে শেষ অহংকার,
ইতিহাস লেখে কঠিন বাণী—
জনগণের ঊর্ধ্বে নয় কোনো রাজাধিরাজ।

ফরাসি ভূমি শেখায় তখন
ক্ষমতারও আছে ক্ষয়,
মানুষ যদি জেগে ওঠে
লোহার শাসন টেকে না আর কভু।

আজও পৃথিবীর প্রতিটি দেশে
যেখানে অন্যায় মাথা তোলে,
বাস্তিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে
নতুন নামে, নতুন ছলে।

কোথাও সে সেনাশাসনের মুখ,
কোথাও ধর্মের অপব্যাখ্যা,
কোথাও লুণ্ঠন, কোথাও বৈষম্য,
কোথাও ক্ষমতার অন্ধ নেশা।

কোথাও সংবাদ বন্দী হয়,
কোথাও সত্য নির্বাসিত,
কোথাও বিবেক কারাবন্দী,
কোথাও মানুষ অধিকারহীন।

তবু ইতিহাস শেখায় বারবার—
প্রাচীর কোনো চিরস্থায়ী নয়,
যেখানে মানুষ এক হয়ে দাঁড়ায়
সেখানেই জেগে ওঠে বিজয়।

বাস্তিল ভাঙা কেবল অতীত নয়,
এ এক চিরন্তন আহ্বান,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও,
রচনা করো নতুন ভোরের গান।

শিশুর হাসি রক্ষার জন্য,
ক্ষুধার বিরুদ্ধে জেগে ওঠো,
মানুষ যেন মানুষ থাকে—
এই প্রতিজ্ঞায় পথটি গড়ো।

ধর্ম হোক বিবেকের আলো,
রাষ্ট্র হোক সকলের সমান,
আইনের কাছে সকল মানুষ
হোক সমমর্যাদার প্রাণ।

কৃষকের ঘামে জন্ম নিক সুখ,
শ্রমিকের হাতে মর্যাদা,
জ্ঞানীর কলম আলোক ছড়াক,
ভাঙুক অজ্ঞতার বাধা।

মানুষ যখন মানুষ হবে,
শোষণ যখন হবে পরাজিত,
তখনই সত্য পূর্ণ হবে
ফরাসি বিপ্লবের অঙ্গীকার অমিত।

স্বাধীনতা শুধু পতাকা নয়,
শুধু কোনো বিজয়-উৎসব নয়,
স্বাধীনতা মানে প্রতিটি মুখে
ভয়ের পরিবর্তে আশার পরিচয়।

সমতা শুধু আইনের পাতা নয়,
শুধু শপথ কিংবা ভাষণ নয়,
সমতা মানে ক্ষুধাহীন ভোর,
সুযোগের সমান নিশ্চয়।

ভ্রাতৃত্ব শুধু স্লোগান নয়,
মানবতার গভীর ডাক,
মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক—
এই হোক সভ্যতার স্বাক্ষর আজ।

জুলাই এলেই তাই শুনি
বাস্তিল ভাঙার বজ্রধ্বনি,
অত্যাচারের শেষ প্রহরে
মানুষ লেখে মুক্তিবাণী।

Manual3 Ad Code

যতদিন শোষণ পৃথিবীতে,
ততদিন এই গান অমর,
মানুষ জাগার প্রতিটি ক্ষণে
বাস্তিল আবার হবে ভস্মীভূত ঘর।

স্বাধীনতা— আমাদের শ্বাস,
সমতা— আমাদের প্রাণ,
ভ্রাতৃত্ব— মানবতার পতাকা,
এই হোক আগামী দিনের জয়গান।

হে ইতিহাস!
তুমি আমাদের শেখাও—
ক্ষমতার চেয়ে মানুষ বড়,
অস্ত্রের চেয়ে বিবেক বড়,
দুর্গের চেয়ে স্বপ্ন বড়,
ভয়ের চেয়ে স্বাধীনতা বড়।

আর যতদিন পৃথিবীর বুকে
একটি মানুষ অন্যায়ে কাঁদে,
ততদিন বাস্তিলের পতনের গান
উঠবে নতুন বিপ্লবের সাধে।

জয় হোক মানুষের।
জয় হোক সাম্যের।
জয় হোক স্বাধীনতার।
জয় হোক ভ্রাতৃত্বের।

এই শপথেই ইতিহাস বেঁচে থাকে,
এই শপথেই সভ্যতা এগোয় দূর,
বাস্তিল ভাঙার সেই রক্তিম সকাল
আজও মানবতার অনিঃশেষ নূর।
—(বাস্তিল দুর্গের পতন,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

সংবিধানের বিরোধিতা ও দেশদ্রোহের কারণে ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি রাজা ষোড়শ লুইকে এবং পরে রানি মেরিকেও গিলোটিনে হত্যা করা হয়। তারপরও ফরাসী বিপ্লবের গতি থেমে যায়নি। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। শুরু হয় আরেক যুগ, যা শুধু নেপোলিয়ন বোনাপার্টের।

#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ