সিলেট ২০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৫৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২৬
“ত্যাগে ত্যাগ নয়, ত্যাগে হচ্ছে অর্জন।”– অমল সেন
‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি কমরেড অমল সেনের ১১৩তম জন্মবার্ষিকী আজ।
কমরেড অমল সেনের সাথে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা ও সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় কথা বলার সুযোগ হয়েছিল ৯২ সালে তিন পার্টি (বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ ও সাম্যবাদী দল) একীভূত হওয়ার জন্য ঐক্য কংগ্রেসে। পরবর্তীতে প্রতি বছর ঢাকায় পার্টির প্রোগ্রামে গেলে সুযোগ পেলেই খুব আন্তরিকতার সাথে কাছে টানতেন এবং দীর্ঘ সময় কথা বলতেন। তরুণদের সাথেই তাঁর সখ্যতা ছিলো বেশি।
আজীবন বিপ্লবী মহান এই নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা! যৌবনের প্রারম্ভে আরাম-আয়েশ তুচ্ছ করে তিনি সংগ্রাম আর শিক্ষার আলোকবর্তিকা হাতে কৃষকের কুঁড়েঘর থেকে মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিপ্লবী জীবন ও রাজনীতি শুরু করেছিলেন। তাঁর স্মৃতিসৌধের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হতে হবে সকলকে। আজও শপথ নিতে হবে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়ার।
১৯১৩ সালের ১৯ জুলাই কমরেড অমল সেনের জন্ম যশোর জেলার আফরা গ্রামে এক জমিদার পরিবারে। কিন্তু প্রায় শতাব্দীকাল এই ভূখণ্ডে কৃষক আন্দোলন আর কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সার্বিক ভূমিকা রাখার পরও তিনি নড়াইলের অমল সেন ছিলেন। মৃত্যুর পরেও তিনি ফিরে গেছেন তাঁরই অতি প্রিয় মানুষদের কাছে, যারা তাঁকে স্মরণ করবে অনাগতকাল ধরে লোকজ সংস্কৃতির আবহে ‘অমল সেন’ মেলার মধ্য দিয়ে।
তৎকালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আবহে বেড়ে ওঠা কমরেড অমল সেনও অতি অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়েন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে এ দেশেও। তিনি দ্রুতই আকৃষ্ট হন মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী আদর্শের প্রতি। গড়ে তোলেন যশোর-নড়াইল অঞ্চলের ঐতিহাসিক তেভাগা কৃষক আন্দোলন। ‘নড়াইলের তেভাগা আন্দোলনের সমীক্ষা’ বইটিতে কমরেড অমল সেন তাঁর বিশ্লেষণী দক্ষতায় কৃষকের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেছেন।
নড়াইলের তেভাগা আন্দোলন স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসে। এ আন্দোলনের রয়েছে সমষ্টিগত সাফল্য, পাশাপাশি কী ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হয়েছিল এ এলাকার জনগণের, সেটাও ইতিহাসের অংশ। কত পরিবার ধ্বংস হয়েছে, কত জেল-জুলুম আর নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে, তা কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম? কমরেড অমল সেনের বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সংগ্রামে ছিলেন সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে থাকা নেতা। যখন নির্যাতন, নিপীড়ন নেমে এসেছে, তখনো তিনি সামনে দাঁড়িয়েই তা সহ্য করেছেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তি যা করতো, তথাকথিত স্বাধীনতা লাভের পর, পাকিস্তান আমলে, বিপ্লবী সংগ্রামীদের জীবনে নেমে আসে সেই নির্যাতন। পাকিস্তান আমলে ১৯ বছরই তাঁকে কাটাতে হয়েছে জেলে।
ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির গৃহীত রনদিভে লাইনের বাম বিচ্যুতি পার্টিকে যে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে, তা তিনি তাঁর কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক চেতনা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তার বিরোধিতা করেছিলেন। ষাটের দশকে যখন বিশ্বব্যাপী চীন-সোভিয়েত কমিউনিস্ট মতাদর্শগত বিতর্ক, দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে দ্বন্দ্ব ও ভাঙনের মুখোমুখি করে, তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিও সে বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারেনি। ফলে, পার্টির ভাঙন আর তার ফলাফল এখন ইতিহাস। গোটা বিষয় তাত্ত্বিকভাবে যেভাবে মোকাবিলা করেছেন, তার দুটি ঐতিহাসিক দলিলে তা তিনি লিখেছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্টদের ভূমিকা সামনে নিয়ে তিনি যেমন রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নিয়েছেন, তেমনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্টদের ঐক্যবদ্ধ করার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার যে কাজ তিনি শুরু করেছিলেন, তা তিনি আমৃত্যু অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকের সব রাজনৈতিক সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা যেমন নির্দেশ করেছেন, তেমনি কমিউনিস্টদের ঐক্যের প্রতিভূ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছেন।
কোনো দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে পার্টিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে হয়, প্রয়োজনও বটে; কিন্তু সেসব রাজনৈতিক সংগ্রামে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার নিজস্ব বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতেই হয়। কমরেড অমল সেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নির্যাস হিসেবে জনগণের বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন তাঁর ‘জনগণের বিকল্প শক্তি’ লেখায়।
বর্তমান সমাজব্যবস্থার সার্বিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে তাঁর লেখা ‘কমিউনিস্ট জীবন ও আচরণ রীতি প্রসঙ্গে’ বইটি শুধু কমিউনিস্টদের নয়, সার্বিকভাবে ব্যক্তি ও সমাজকল্যাণের দিকনির্দেশক দর্শনের ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইতিহাস তার গতিপথে কিছু মানুষ সৃষ্টি করে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তাঁরা কিংবদন্তি। কমরেড অমল সেন তেমনই একজন মানুষ, যাঁরা পাঁজরের হাড় জ্বালিয়ে, পথভ্রষ্টদের পথ দেখান। তিনি বিপ্লবী জীবনাদর্শ ও মনুষ্যত্বের প্রতীক।
ইতিহাসের জটিল পথপরিক্রমায় আমরা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে সামনে এগোনোই আমাদের একমাত্র রাস্তা। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সংকট, বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের লগ্নি পুঁজির আগ্রাসন, বিশ্বায়ন, দেশের অভ্যন্তরে চরম সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান, শ্রমজীবী ও গণতান্ত্রিক শক্তির বিভ্রান্তি, কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল শক্তির বিভাজন ও হতাশা—এসব সংকট মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কমরেড অমল সেন তাঁর জীবদ্দশায় এর প্রতিটি সংগ্রামে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর রেখে যাওয়া তাত্ত্বিক লেখা জনগণের বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অমূল্য শিক্ষা। তাঁর দেখানো পথ সামনে রেখে ইতিহাসের এই দায়কে কাঁধে নিতে হবে এ প্রজন্মকেই।
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি কমরেড অমল সেন স্মরণে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—
১
জন্ম নিলে একদিন তুমি বাংলার মাটিতে,
যশোরের সেই গ্রামে নীরব সবুজ ঘাটিতে।
জমিদারের অট্টালিকা ছিল তোমার ঘর,
তবু তুমি খুঁজে নিলে কৃষকের অন্তর।
প্রাচুর্যের প্রাসাদ ছেড়ে মেঠোপথের টানে,
জীবন দিলে শোষিত মানুষেরই কল্যাণে।
তোমার চোখে জ্বলেছিল অন্য রকম ভোর,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল অটল দৃঢ় ঘোর।
বলেছিলে—ত্যাগে শুধু হারিয়ে যাওয়া নয়,
ত্যাগেই মানুষের জীবনে অর্জনের পরিচয়।
২
ব্রিটিশ শাসন জ্বলছিল দগ্ধ আগুন হয়ে,
দেশের মানুষ বাঁচতে চায় স্বাধীনতার বয়ে।
তরুণ তুমি অস্ত্র ধরো বুকের সাহস নিয়ে,
শৃঙ্খলভাঙার স্বপ্ন তখন রক্তের স্রোত বেয়ে।
তারপর এলে ইতিহাসের অন্য মোড়ের ডাক,
মার্ক্স-লেনিনের দর্শন খুলল নতুন ফাঁক।
শুধু রাষ্ট্রের স্বাধীনতা যথেষ্ট নয় আর,
মানুষ যদি বঞ্চিত থাকে, ব্যর্থ সব অধিকার।
তুমি বুঝলে শোষণ ভাঙার মূল যে অর্থনীতি,
শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই মুক্তির প্রকৃত গীতি।
৩
কৃষকের ঘরে ঘরে তুমি আলোর প্রদীপ জ্বালো,
অন্যায়ের সব অন্ধকারে সংগ্রামেরই আলো।
তেভাগার সেই আন্দোলন কাঁপায় বাংলার প্রাণ,
লাঙলধরা মানুষের মুখে জাগে নতুন গান।
ধান যার, জমি যার, ফসল তারই হবে,
এই আহ্বানে জেগে ওঠে শত শত জনরবে।
অশ্রু মিশে রক্তধারা গড়ায় ক্ষেতের বুকে,
ইতিহাসের নতুন পৃষ্ঠা লেখা হয় সে সুখে।
তুমি ছিলে সামনের সারি, ভয়কে দিলে হার,
নেতৃত্ব মানে মানুষেরই পাশে দাঁড়ানো বারবার।
৪
জেলখানার লোহার শিকল থামাতে পারেনি,
কারাগারের অন্ধকারে স্বপ্ন মুছে যায়নি।
উনিশ বছর বন্দিজীবন কেটে গেল ধীরে,
তবু তোমার মাথা নোয়েনি কোনো অত্যাচারে।
শিকল শুধু হাতকে বাঁধে, চিন্তাকে নয় কভু,
স্বাধীনতার অগ্নিশিখা জ্বলে অন্তরভূমি।
কারা-প্রাচীর সাক্ষী আছে তোমার অঙ্গীকার,
বিপ্লবীর পথ কখনো হয় না অন্ধকার।
৫
দেশভাগ এল, বিভক্ত হলো উপমহাদেশখানি,
রাজনীতির পথের বাঁকে বাড়ল কত টানি।
বিভিন্ন মত, বিভ্রান্তি আর তর্কের ঝড় বয়,
তুমি দেখলে মানুষেরই শক্তি সত্য হয়।
কৃষকের ঘামে লেখা থাকে রাজনীতির পাঠ,
জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা আনে শুধু ক্ষত।
তাই তো তুমি বলেছিলে—দল যদি হয় দূর,
মানুষ ছাড়া বিপ্লব হবে মরুভূমির সুর।
ইতিহাস আজ সাক্ষ্য দেয় সেই দূরদৃষ্টি মহান,
তত্ত্ব আর বাস্তবতাকে মিলিয়েছিলে প্রাণ।
৬
চীন-সোভিয়েত বিতর্ক যখন বিশ্বজুড়ে ছায়া,
কমিউনিস্টের ঘরে ঘরে ভাঙনেরই মায়া।
অনেক নেতা পথ হারালেন বিভ্রান্তির ঘোরে,
তুমি তখন ঐক্যের ডাক দিলে দৃঢ় স্বরে।
ব্যক্তির আগে সংগঠন, গোষ্ঠীর আগে দেশ,
মানুষেরই মুক্তির মাঝে সংগ্রামের পরিবেশ।
বিভক্তির দেয়াল ভেঙে এক হওয়ার গান,
আজও বয়ে চলে যেন তোমার আহ্বান।
৭
একাত্তরের রণাঙ্গনে রক্তমাখা দিন,
বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে তুমি অগ্রসেনানী বিন।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে অটল ছিলে সদা,
স্বাধীনতার সংগ্রামে ছিল না কোনো বাধা।
শোষণমুক্ত স্বাধীন দেশ—ছিল তোমার স্বপ্ন,
জাতীয় মুক্তি সামাজিক মুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
লাল পতাকা, সবুজ পতাকা মিলল একই স্রোতে,
দেশপ্রেম আর শ্রেণিচেতনা পাশাপাশি রথে।
মুক্তির মানে শুধু নয় পতাকার উড্ডয়ন,
মানুষের অধিকারেই স্বাধীনতার চয়ন।
৮
স্বাধীনতার পরও দেখলে অসমতার ক্ষত,
দুর্নীতি আর বৈষম্যের বিষাক্ত অশ্রুপাত।
তুমি আবার বললে সবে—মানুষ জাগাও ভাই,
জনগণের বিকল্প শক্তি গড়তেই হবে তাই।
ক্ষমতার অলিন্দ পেরিয়ে মাঠে ফিরে যাও,
কৃষক-শ্রমিক-জনতার মাঝে বিশ্বাস খুঁজে পাও।
সংগঠনই মূলধন, মানুষই মূল শক্তি,
এই দর্শনে দীপ্ত ছিল তোমার জীবনভক্তি।
৯
তোমার লেখা শুধু বই নয়, সংগ্রামেরই মানচিত্র,
ভাবনার গভীর সাগর, জাগরণেরই চিত্র।
‘জনগণের বিকল্প শক্তি’ আজও পথের দিশা,
‘কমিউনিস্ট জীবন ও আচরণ’ নৈতিকতার নিশা।
আদর্শ যদি আচরণে না আসে প্রতিদিন,
তবে সে তত্ত্ব রয়ে যায় কেবল বইয়ের ঋণ।
নিজের জীবন দিয়েই তুমি করেছ তার প্রমাণ,
কথা আর কাজ মিলিয়েছিল মহান এক প্রাণ।
১০
নড়াইল তোমার হৃদয় ছিল, মানুষ ছিল ঘর,
তাই তো মৃত্যুর পরও ফিরে এলে তাদের পর।
মেলার নামে, স্মৃতির গানে, লোকসংস্কৃতির ঢেউ,
তোমার নাম আজ উচ্চারিত আপন জনের ন্যায়।
স্মৃতিস্তম্ভের নীরবতায় শুধু পাথর নয়,
শত কৃষকের অশ্রুজল সেখানে কথা কয়।
প্রজন্ম আসে, প্রজন্ম যায়, ইতিহাস রয় জেগে,
অমল সেনের অগ্নিশপথ পথ দেখাবে বুকে।
১১
আজও যখন বৈষম্যের দেয়াল দাঁড়িয়ে রয়,
ঘৃণা যখন মানুষেরই হৃদয় ভাঙতে চায়,
সাম্প্রদায়িক বিষের ছোবল ছড়িয়ে পড়ে দেশে,
গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বরও থমকে যায় শেষে—
তখন তোমার জীবন যেন বজ্রের মতো ডাক,
মানুষ আগে, মতের পরে—এই তো সত্য বাক।
ঐক্য ছাড়া মুক্তি কোথা? বিভক্তি শুধু ক্ষয়,
সাহসীরা ইতিহাস লেখে, ভীরুরা তা নয়।
১২
তরুণেরা আজ প্রশ্ন করে—কোথায় আমাদের পথ?
কোন আলোরই প্রদীপ হাতে পার হব অন্ধরাত?
তোমার জীবন উত্তর দেয়—মানুষেরই মাঝে,
সত্যের জন্য দাঁড়াও দৃঢ় অন্যায়েরই সাজে।
শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা রেখো, মেহনতি জন সাথি,
তাদের ছাড়া রচিত হবে না মুক্তির গাঁথা।
১৩
ত্যাগের অর্থ শূন্য হওয়া নয় কখনোই শুধু,
ত্যাগের ভেতর সৃষ্টি থাকে নবযুগের রূপ।
তোমার বাণী আজও জ্বালে প্রেরণারই দীপ,
অন্ধকারে সাহস জাগায় অবিনাশী নীড়।
যারা ভেবেছে বন্দুক দিয়ে ইতিহাসই শেষ,
তাদের ভুল প্রমাণ করেছে মানুষেরই রেষ।
বিপ্লব আগে জন্ম নেয় মানুষের অন্তরে,
সত্য যদি দীপ্ত থাকে সংগ্রামেরই ঘরে।
১৪
অমল সেন, তোমার নামে শুধু স্মরণ নয়,
দায়িত্বও আজ আমাদের, নতুন শপথ হয়।
বাংলার প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি জনপদে,
সমতা আর ন্যায়ের কথা উঠুক দৃপ্ত স্বরে।
ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ হোক, অশিক্ষার অবসান,
নারী-পুরুষ সমঅধিকার পাক সমান সম্মান।
ধর্ম-বর্ণের বিভেদ পেরিয়ে মানুষ হোক পরিচয়,
এই হোক আগামী দিনের বাংলাদেশের জয়।
১৫
যে মানুষটি চলে গিয়েও হারিয়ে যাননি কভু,
জনতারই হৃদয়জুড়ে রয়ে গেছেন তবু।
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে জ্বলুক তাঁর নাম,
সংগ্রামেরই প্রতিটি গানে উঠুক লাল সালাম।
যতদিন সূর্য উঠবে বাংলার আকাশে,
ততদিন উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা ভালোবাসায়।
অমল সেন মানে সাহস, অমল সেন মানে দীপ,
অমল সেন মানে মানুষের মুক্ত ভবিষ্যৎ রূপ।
অমল সেন মানে ইতিহাসের জাগ্রত উচ্চারণ,
অমল সেন মানে বাংলার সংগ্রামী চিরস্মরণ।
১৬
এসো তবে আজ আবার শপথ করি সবাই,
শোষণহীন সমাজ গড়ার সংগ্রামে নামি তাই।
মানুষ হবে মানুষেরই একমাত্র পরিচয়,
সমতা হবে সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়।
অমল সেনের আদর্শে হোক নতুন অভিযাত্রা,
গণমানুষের হাতে ফিরুক ভবিষ্যতের মাত্রা।
বিপ্লব মানে মানবমুক্তি, ন্যায়ের দীপ্ত গান,
এই বিশ্বাসেই উচ্চারিত—
কিংবদন্তি বিপ্লবী কমরেড অমল সেন—
তোমাকে জানাই রক্তিম, অমল, অবিনাশী লাল সালাম।
—(কমরেড অমল সেন লাল সালাম,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)
২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি কমরেড অমল সেন চলে গেছেন। কিন্ত রেখে গেছেন এমন মহান এক আদর্শ, যার মৃত্যু নাই। তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন।
মহান ও কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই বিশ্বজনীন মহান এই গুণীর রাজনীতি, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী।
রেড সেলুট কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী কমরেড অমল সেন!
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, মৌলভীবাজার জেলা;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি