শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

প্রকাশিত: ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০২৬

শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

Manual1 Ad Code
  • মৌলভীবাজারে বসুন্ধরা শুভসংঘের আলোচনাসভা

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ৩১ আগস্ট ২০২৬ : “শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা ও শিশুশ্রমকে চিহ্নিত করেছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সমাজকর্মীরা। এসব কারণে অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারছে না এবং একপর্যায়ে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে।”

Manual5 Ad Code

শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ও প্রতিকার’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

Manual5 Ad Code

সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে মৌলভীবাজার সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ, এর সামাজিক প্রভাব এবং তা প্রতিরোধে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের করণীয় নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বসুন্ধরা শুভসংঘ মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ও বিশিষ্ট সংগঠক এম মুহিবুর রহমান মুহিব।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোহেনা আক্তার খানম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লেখক ও গবেষক ড. মুহাম্মদ আবু তাহের এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খালেদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোমতাজ বেগম, দিলরুবা বিনতে ইয়াহিয়া ও শরিফা আক্তারসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া বসুন্ধরা শুভসংঘের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি আবদাল হোসাইন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ দুলন আখতার, কার্যকরী পরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান ইয়ামিম ও রাকিব হোসেন ইমন প্রমুখ।

Manual4 Ad Code

আলোচনায় বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া শুধু একটি শিক্ষাগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের উন্নয়ন। কোনো শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়লে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য ও নানা ধরনের সামাজিক ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বক্তারা বলেন, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের অনেক শিশু পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের উপার্জনে সহযোগিতা করতে গিয়ে শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পর একসময় তারা বিদ্যালয় থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রোহেনা আক্তার খানম বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে অভিভাবকদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সন্তান নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনায় তার আগ্রহ কেমন, কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের সঙ্গে অভিভাবকদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি বা পড়াশোনায় অনীহার কারণ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যাটি চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষকরা একসঙ্গে কাজ করলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক ও গবেষক ড. মুহাম্মদ আবু তাহের বলেন, শিশুদের বিদ্যালয়মুখী রাখতে হলে শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে। দারিদ্র্যের কারণে যাতে কোনো শিশুকে শ্রমে যুক্ত হতে না হয়, সে বিষয়ে পরিবার ও সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে কি না, তাদের পড়াশোনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না এবং তারা কেন বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, একটি শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে সামাজিক সংগঠন, বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খালেদ চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রমের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়কে শিশুদের জন্য আনন্দময় ও নিরাপদ পরিবেশে পরিণত করা গেলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।

সভাপতির বক্তব্যে বসুন্ধরা শুভসংঘ মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি এম মুহিবুর রহমান মুহিব বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মতো একটি জটিল সামাজিক সমস্যা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সমাজের সচেতন মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আশপাশে এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা মেধাবী হলেও আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। এসব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতে পারলে ঝরে পড়ার প্রবণতা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া প্রতিরোধে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলেই হবে না; সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী রাখতে নিয়মিত উৎসাহ দেওয়ার মতো উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আলোচনাসভায় বক্তারা আরও বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

সভায় উপস্থিত শিক্ষার্থীরাও আলোচনায় অংশ নেয় এবং নিজেদের পড়াশোনা, বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে। বক্তারা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা এবং কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তা শিক্ষক ও অভিভাবকদের জানাতে উৎসাহিত করেন।

বক্তারা বলেন, একটি শিশুর বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি নয়; এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যতের ওপর। তাই শিক্ষার সুযোগ থেকে কোনো শিশুকে বঞ্চিত না করতে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আলোচনাসভার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ সম্পর্কে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি এ সমস্যা মোকাবিলায় সামাজিকভাবে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে।

Manual6 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ