সিলেট ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:৪১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২৬
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের তিস্তা-তীরবর্তী চরাঞ্চলের কৃষকেরা সম্প্রতি গংগাচড়া নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আট দফা দাবি জানিয়ে যে স্মারকলিপি দিয়েছেন, সেটিকে নিছক স্থানীয় কৃষকদের কিছু দাবি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ভেতরে উত্তরাঞ্চলের চরজীবনের দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা, কৃষির ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, নদীভাঙন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় কৃষিনীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতার একটি বড় ছবি ফুটে উঠেছে।
চরের মানুষ কৃষি করে, কিন্তু কৃষির মৌলিক উপকরণ তাদের হাতের নাগালে নেই। সার পেতে দূরের বাজারে যেতে হয়, বীজ ও কীটনাশক কিনতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়। অনেক প্রকৃত কৃষক এখনো কৃষি কার্ডের আওতায় আসেননি। বন্যা ও নদীভাঙনে জমি হারানো কৃষকদের একটি অংশ সরকারি সহায়তার তালিকাতেও যথাযথভাবে উঠে আসেন না। ফলে কৃষক উৎপাদন করেন, ঝুঁকি নেন, ক্ষতি বহন করেন—কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহায়তার সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়টিতেই অনেক ক্ষেত্রে তিনি অনুপস্থিত থেকে যান।
এটি কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি কৃষি ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা।
সার ডিলারই কি সমস্যার সমাধান?
চরাঞ্চলে নতুন সার ডিলার নিয়োগের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। কৃষককে যদি উৎপাদন মৌসুমে সার সংগ্রহের জন্য দূরের বাজারে যেতে হয়, তাহলে কৃষির প্রকৃত খরচ কাগজে-কলমে হিসাব করা সম্ভব নয়। পরিবহন ব্যয়, সময়ের মূল্য এবং অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
তবে শুধু নতুন ডিলার নিয়োগ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে—ডিলার নিয়োগের পর সার কি সত্যিই কৃষকের কাছে ন্যায্যমূল্যে পৌঁছাবে? সরবরাহে অনিয়ম হলে তার জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে? কৃষকের প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম হলে কী হবে?
তাই চরাঞ্চলে কৃষি উপকরণ সরবরাহের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও জবাবদিহিমূলক বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কৃষকের মোবাইলে বরাদ্দ, ডিলারের মজুত ও বিক্রয়মূল্যের তথ্য পৌঁছানো যেতে পারে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষক কমিটি বা সমবায়ভিত্তিক কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থাও কার্যকর হতে পারে।
কৃষি কার্ড: অধিকার, অনুগ্রহ নয়
যে কৃষক জমিতে ফসল ফলান, অথচ কৃষি কার্ড পান না—এটি রাষ্ট্রীয় কৃষি ব্যবস্থার একটি বড় অসংগতি। কৃষি কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি কৃষকের সরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রবেশদ্বার।
বিশেষ করে চরাঞ্চলে কৃষকের পরিচয় ও জমির মালিকানা অনেক সময় নদীভাঙন, চর জাগা ও বসতি পরিবর্তনের কারণে জটিল হয়। তাই প্রচলিত কাগজপত্রনির্ভর ব্যবস্থার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে যাচাই করে প্রকৃত কৃষকের একটি গতিশীল ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরি করা প্রয়োজন।
কৃষকের জমি নদীতে চলে যেতে পারে; কিন্তু কৃষক হিসেবে তাঁর অধিকার নদীতে ভেসে যেতে পারে না।
নদীভাঙনকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে দায় শেষ করা যাবে না
তিস্তা-তীরবর্তী মানুষের কাছে নদীভাঙন কোনো মৌসুমি খবর নয়; এটি জীবনের বাস্তবতা। একটি পরিবার আজ জমির মালিক, কাল নদীভাঙনে ভূমিহীন। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু—সব হারিয়ে তারা আবার নতুন চরে আশ্রয় নেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পুনর্বাসন কি কেবল ত্রাণের মাধ্যমে সম্ভব?
অবশ্যই নয়।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নীতি। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জমি, আবাসন, কৃষি উপকরণ, স্বল্পসুদে ঋণ এবং জীবিকার নিশ্চয়তা—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। শুধু ক্ষতির তালিকা তৈরি করে কয়েক কেজি খাদ্য বা সাময়িক সহায়তা দিলে নদীভাঙনের মানুষের ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না।
চরাঞ্চলকে প্রান্তিক নয়, সম্ভাবনাময় কৃষি অঞ্চল হিসেবে দেখতে হবে
চর মানেই দুর্ভোগ—এই ধারণাটিও বদলাতে হবে। তিস্তার চরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ উর্বর পলিমাটি রয়েছে। সেখানে ধান, ভুট্টা, আলু, বাদাম, মরিচ, সবজি, ডালসহ নানা ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক সেচ, উন্নত বীজ, কৃষি প্রযুক্তি, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে চরাঞ্চল দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় আরও বড় অবদান রাখতে পারে।
কিন্তু চর কৃষককে শুধু ‘সহায়তা পাওয়ার মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাকে দেখতে হবে উৎপাদক ও অর্থনীতির অংশীদার হিসেবে।
কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোই এখন বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন
সার, বীজ, কীটনাশক, ডিজেল, বিদ্যুৎ, শ্রম—সবকিছুর দাম বাড়ছে। অথচ কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য সবসময় পান না। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললে হবে না; কৃষকের নিট আয় বাড়ানোর নীতি নিতে হবে।
এখানেই সমবায়ভিত্তিক কৃষির গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। কৃষকেরা সমবায়ের মাধ্যমে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ যৌথভাবে কিনতে পারেন, যন্ত্রপাতি ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারেন, উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন এবং সম্মিলিতভাবে বাজারজাত করতে পারেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমতে পারে এবং কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার সঙ্গে চর কৃষকের ভবিষ্যৎকে যুক্ত করতে হবে
তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবনকে নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল হতে পারে না। নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, নদীভাঙন রোধ, কৃষি উৎপাদন, চর উন্নয়ন ও পুনর্বাসন—এসবকে একটি সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত হয়, তার সুফল যেন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে; তিস্তার চরাঞ্চলের কৃষক, ভূমিহীন পরিবার ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনও তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে হবে।
নদীকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা নয়—নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ, মানুষের জীবন ও কৃষির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হতে পারে টেকসই পথ।
এখন প্রয়োজন মাঠে রাষ্ট্রের উপস্থিতি
নোহালীর কৃষকদের স্মারকলিপি গ্রহণ করে উপজেলা প্রশাসন বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়েছে। এখন আসল পরীক্ষা হলো—স্মারকলিপি কি কেবল একটি প্রশাসনিক ফাইলে পরিণত হবে, নাকি মাঠে বাস্তব পরিবর্তন ঘটবে?
সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে চরাঞ্চলে সরেজমিন জরিপ হওয়া দরকার। কোন কৃষকের কৃষি কার্ড নেই, কোথায় সার সংকট, কত পরিবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত, কী পরিমাণ জমি অনাবাদি, কোথায় সেচের সমস্যা—এসবের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে হবে।
কারণ চরাঞ্চলের কৃষকের সমস্যা ঢাকার ফাইলে বসে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
শেষ কথা
নোহালীর কৃষকের আট দফা দাবি আসলে শুধু আটটি দাবি নয়; এটি একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকের পাশে দাঁড়াবে?
যে কৃষক বন্যার পানি, নদীভাঙন, খরা ও ঊর্ধ্বমুখী উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশের খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখেন, তাঁর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তাই গঙ্গাচড়ার চর কৃষকদের স্মারকলিপিকে স্থানীয় একটি প্রশাসনিক আবেদন হিসেবে না দেখে উত্তরাঞ্চলের কৃষি সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে দেখা উচিত। সার ডিলার নিয়োগ থেকে কৃষি কার্ড, কৃষি উপকরণের ন্যায্যমূল্য থেকে নদীভাঙনে পুনর্বাসন—প্রতিটি দাবির পেছনে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন: কৃষককে আমরা কি শুধু খাদ্য উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে দেখব, নাকি দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের অংশীদার হিসেবে মর্যাদা দেব?
তিস্তার চর বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। আর কৃষক বাঁচলেই বাঁচবে দেশের অর্থনীতির ভিত।
এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির নয়—চরের মাটিতে দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি