বীর উত্তম সি আর দত্তের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২৬

বীর উত্তম সি আর দত্তের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual2 Ad Code
  • মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টরের বীর সেনানায়ক ও বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালককে স্মরণ

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা, ২৫ আগস্ট ২০২৬ : মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, ৪ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) বীর উত্তম চিত্তরঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত)-এর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

২০২০ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।

স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব, যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য সাহসিকতা এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সি আর দত্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় একটি সুসংগঠিত বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

চিত্তরঞ্জন দত্ত ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন আসামের শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। তাঁর বাবা উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মা লাবণ্য প্রভা দত্ত।

শিলংয়ের লাবান গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তাঁর পরিবার হবিগঞ্জে চলে আসে। তাঁর বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে হবিগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে সি আর দত্ত হবিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

এরপর তিনি কলকাতার আশুতোষ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে খুলনার দৌলতপুর কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ওই কলেজ থেকেই তিনি বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান ও ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫১ সালে চিত্তরঞ্জন দত্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ‘সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট’ হিসেবে কমিশন লাভ করেন। সামরিক জীবনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে অভিজ্ঞ ও দক্ষ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। আসালং এলাকায় একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধ করেন। ওই যুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে পাকিস্তান সরকার তাঁকে পুরস্কৃত করে।

পরবর্তী সময়ে এই সামরিক অভিজ্ঞতাই মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নেতৃত্ব ও যুদ্ধকৌশল প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে চিত্তরঞ্জন দত্ত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং মুক্তিবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী তাঁকে ৪ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেন।

Manual8 Ad Code

৪ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন এলাকায় সিলেটের পূর্বাঞ্চল, খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল। দায়িত্ব পাওয়ার পর সি আর দত্ত প্রথমে সিলেটের রশীদপুরে ক্যাম্প স্থাপন করেন। চারপাশের বিস্তীর্ণ চা-বাগানকে তিনি যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করেন। চা-বাগানের আড়াল ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের কৌশল নির্ধারণ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে কৌশলগত সুবিধা বিবেচনায় রশীদপুর থেকে ক্যাম্প মৌলভীবাজারে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে ৪ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেন।

যুদ্ধের নয় মাসে সি আর দত্তের নেতৃত্ব, সাহস ও সাংগঠনিক দক্ষতা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

Manual1 Ad Code

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সি আর দত্ত রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি রংপুরে ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামো সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

Manual5 Ad Code

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষায় একটি কার্যকর ও সংগঠিত বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৭৩ সালে সরকার এ বিষয়ে সি আর দত্তকে দায়িত্ব দেয়। তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই বাহিনীর নাম দেওয়া হয় বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রথম মহাপরিচালক। বর্তমানে বাহিনীটির নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ও বিআরটিসিতে দায়িত্ব

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সি আর দত্ত। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি সদর দপ্তরের চিফ অব লজিস্টিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের কল্যাণে গঠিত এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে তিনি পুনরায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

১৯৮৪ সালে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনেও সি আর দত্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা বিভিন্ন মহলে স্মরণীয় হয়ে আছে।

প্রয়াণ

জীবনের শেষ পর্যায়ে সি আর দত্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট ফ্লোরিডার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেন।

আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।

Manual1 Ad Code

সড়কের নামকরণ

মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানায়কের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন থেকে কারওয়ান বাজার সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বীরউত্তম সি আর দত্ত সড়ক’। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের নামকরণের মধ্য দিয়ে তাঁর স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানও প্রতিফলিত হয়েছে।

ওয়ার্কার্স পার্টির শ্রদ্ধা

বীর উত্তম সি আর দত্তের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল পৃথক বিবৃতিতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শ্রদ্ধা নিবেদনের বার্তায় তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সি আর দত্তের ভূমিকা, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাইফেলস প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে তাঁর কর্মকাণ্ড স্মরণ করেন।

মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলেও শ্রদ্ধা

বীর উত্তম সি আর দত্তের মৃত্যুবার্ষিকীতে মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলেও বিভিন্ন পর্যায় থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ ছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক কমরেড তাপস কুমার ঘোষ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি কমরেড দেওয়ান মাসুকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড জালাল উদ্দিন এবং শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি কমরেড শেখ জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড রোহেল আহমদও তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সি আর দত্ত শুধু একজন সাহসী সেক্টর কমান্ডারই নন, স্বাধীনতার পর একটি নবীন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেই সাহসী সেনানায়ককে আবারও স্মরণ করছে জাতি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ