মৌলভীবাজারে জন্মশতবর্ষে কবি সুকান্তকে স্মরণ ও পুনঃপাঠ

প্রকাশিত: ১১:১৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০২৬

মৌলভীবাজারে জন্মশতবর্ষে কবি সুকান্তকে স্মরণ ও পুনঃপাঠ

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ২২ আগস্ট ২০২৬ : ‘জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার—তবু মাথা নোয়াবার নয়’—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে মৌলভীবাজারে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সুকান্ত স্মরণ ও পুনঃপাঠ’ অনুষ্ঠান।

Manual8 Ad Code

কবির জীবন, সাহিত্য ও সমাজভাবনা নিয়ে আলোচনা, কবিতা আবৃত্তি, সংগীত পরিবেশনা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় মৌলভীবাজার পৌরসভা মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, মৌলভীবাজার জেলা শাখা।

শনিবার (২২ আগস্ট ২০২৬) সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে মৌলভীবাজারের কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। শহরের ব্যস্ততা ও নিত্যদিনের কর্মব্যস্ততা পেরিয়ে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। একপর্যায়ে দর্শক-শ্রোতায় মিলনায়তন প্রায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।

আয়োজকদের মতে, সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার দলিল নয়; শোষণ-বঞ্চনা, ক্ষুধা, বৈষম্য ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার কারণে তাঁর কবিতা এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। জন্মের একশ বছর পরও তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি নতুন প্রজন্মের কাছে উচ্চারিত হচ্ছে—এটাই তাঁর সাহিত্যিক শক্তির বড় প্রমাণ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলা কবিতায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে সুকান্ত ভট্টাচার্য নিজস্ব ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মাত্র ২১ বছরের জীবনে তিনি যে সাহিত্যকর্ম রেখে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে তাঁকে স্থায়ী আসন দিয়েছে। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে শ্রমজীবী ও নিপীড়িত মানুষের জীবনসংগ্রাম, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। একই সঙ্গে তাঁর কবিতায় রয়েছে মানবিকতা, সাম্য এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন।

Manual1 Ad Code

সুকান্তের কবিতার শক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পূর্ণিমার চাঁদও যে ‘ঝলসানো রুটি’ হয়ে উঠতে পারে—সুকান্ত সেই বাস্তবতাকে কবিতার ভাষায় ধারণ করেছিলেন। তাঁর কবিতায় ক্ষুধা কেবল ব্যক্তিগত অভাবের বিষয় নয়, বরং তা সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক গভীর প্রশ্ন। ফলে সময় বদলালেও মানুষের মৌলিক অধিকার, খাদ্য, মর্যাদা ও সমতার প্রশ্নে সুকান্তের কবিতা নতুন করে পাঠের দাবি রাখে।

অনুষ্ঠানে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন লেখক ও গবেষক স্বপন নাথ। তিনি কবির সাহিত্যচর্চা, রাজনৈতিক-সামাজিক চেতনা এবং তাঁর কবিতায় সমকালীন বাস্তবতার প্রতিফলন নিয়ে আলোকপাত করেন।

লোকগবেষক আহমদ সিরাজও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সুকান্তের সাহিত্যকে বৃহত্তর সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।

Manual7 Ad Code

জন্মশতবর্ষের এ আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের নিয়মিত প্রকাশনা ‘কোদালি’র সুকান্ত সংখ্যার মলাট উন্মোচন। কবিকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে সুকান্তের জীবন, সাহিত্য ও চিন্তাভাবনাকে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আলোচনা পর্বের পাশাপাশি ছিল সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক আয়োজন। বাচিকশিল্পী দেবাশিস চৌধুরী রাজার আবৃত্তি দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। তাঁর পরিবেশনায় সুকান্তের কবিতার দ্রোহ, ক্ষুধা, মানবিকতা ও প্রতিবাদের সুর নতুন মাত্রা পায়।

এ ছাড়া পরিমল চন্দ্র দেবের দরাজ কণ্ঠের পরিবেশনা অনুষ্ঠানে ভিন্ন আবহ তৈরি করে। উচ্চারণ আবৃত্তি পাঠশালার এগারো শিশুশিল্পীর পরিবেশনাও উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। সুকান্তের কবিতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের এই সম্পৃক্ততাকে আয়োজকেরা অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন।

সঙ্গীত গুরু মীর ইউসুফ আলীর কণ্ঠে সুকান্তের লেখা জাগরণী গান পরিবেশিত হলে অনুষ্ঠানে যোগ হয় আরেক মাত্রা। কবির গান ও কবিতার মধ্য দিয়ে জাগরণ, প্রতিবাদ ও মানবমুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তাঁর পরিবেশনা সেই আবহকে আরও গভীর করে তোলে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে যন্ত্রশিল্পী সুপর্ণা পুতুল, ওরফে মিসেস দেবাশিস, হাওয়াইয়ান গিটারে সুর পরিবেশন করেন। তাঁর পরিবেশিত সুরের মূর্ছনায় অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে এক আবেশময় পরিবেশে।

বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি সৈয়দ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আহমদ আফরোজ।

আয়োজকেরা বলেন, সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন কেবল একজন কবিকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় নতুন করে পাঠ করা। যে সমাজে ক্ষুধা, বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার প্রশ্ন এখনো বিদ্যমান, সেখানে সুকান্তের কবিতা নতুন করে মানুষকে ভাবতে এবং প্রতিবাদী হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

মাত্র দুই দশকের কিছু বেশি সময়ের জীবনে সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যে যে গভীর ছাপ রেখে গেছেন, তা আজও অম্লান। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল সহজ, তীব্র ও জীবনঘনিষ্ঠ। শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং একটি মানবিক সমাজের স্বপ্ন তাঁর কবিতাকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।

মৌলভীবাজারের এ আয়োজন সেই কবিতাকেই নতুন প্রজন্মের সামনে আবারও তুলে ধরল। আলোচনা, আবৃত্তি, গান ও সংগীতের সমন্বয়ে আয়োজিত ‘সুকান্ত স্মরণ ও পুনঃপাঠ’ অনুষ্ঠান তাই নিছক স্মরণসভা হয়ে থাকেনি; বরং সুকান্তের সাহিত্য ও চেতনার সমকালীন পাঠের একটি সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।

Manual4 Ad Code

জন্মের একশ বছর পরও সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা যে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়, যে তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি এখনো অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে—মৌলভীবাজারের এই আয়োজন যেন তারই আরেকটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ।