ঝাড়খণ্ডে ২৪ দিনের ছাত্র আন্দোলনের পর JSSC-CGL বাতিল, স্বচ্ছ নিয়োগের দাবিতে সরব SFI

প্রকাশিত: ১১:৩২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২৬

ঝাড়খণ্ডে ২৪ দিনের ছাত্র আন্দোলনের পর JSSC-CGL বাতিল, স্বচ্ছ নিয়োগের দাবিতে সরব SFI

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | নয়াদিল্লি (ভারত), ১৯ আগস্ট ২০২৬ : দীর্ঘ ২৪ দিনের টানা ছাত্র-যুব আন্দোলন, অনশন, পুলিশের দমন-পীড়ন এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার পর ঝাড়খণ্ডের হেমন্ত সোরেন নেতৃত্বাধীন সরকার JSSC-CGL পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে TDPL-এর মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন পরীক্ষা, ফলাফল ও নিয়োগ প্রক্রিয়াও বাতিল করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন (SFI)-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি।

১৯ আগস্ট ২০২৬ SFI-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি আদর্শ এম সাজি এবং সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য কর্তৃক স্বাক্ষরিত ও গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এই আন্দোলনের জন্য ঝাড়খণ্ডের ছাত্র ও যুবসমাজকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং স্পষ্ট করে বলেছে, একটি পরীক্ষা বাতিল করেই গোটা সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে মনে করা যাবে না।

SFI-এর নেতৃবৃন্দ বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কারচুপি এবং দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডের ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে জমছিল। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক আন্দোলনের রূপ নেয়। প্রায় ২৪ দিন ধরে চলা আন্দোলনে চাকরিপ্রার্থীরা অনশন-সহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের দাবির প্রতি প্রশাসনের যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের হস্তক্ষেপ ও বলপ্রয়োগের অভিযোগও সামনে আসে।

শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে JSSC-CGL পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবিকে স্বীকৃতি দিলেও SFI মনে করছে, এর পরবর্তী পদক্ষেপ আরও গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনটির মতে, শুধু পরীক্ষা বাতিল করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা কাটবে না; পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা না ঘটে, তার জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

Manual7 Ad Code

বেসরকারি সংস্থার হাতে সরকারি পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন

Manual8 Ad Code

ঝাড়খণ্ডের ঘটনাকে বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটে দেখছে SFI। সংগঠনটির অভিযোগ, সরকারি চাকরির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ক্রমশ বেসরকারি এজেন্সির হাতে তুলে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে পরীক্ষার গোপনীয়তা, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, নজরদারি এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনার ব্যবস্থাই প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে বলে দাবি SFI-এর।

SFI-এর মতে, নিয়োগ পরীক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারের ভবিষ্যৎ এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পর একটি পরীক্ষা বাতিল হলে পরীক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক শ্রম নষ্ট হয়। অনেকের ক্ষেত্রে বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। ফলে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের দায় শুধুমাত্র একটি পরীক্ষার প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না।

সংগঠনটি একই সঙ্গে কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতিরও সমালোচনা করেছে। SFI-এর অভিযোগ, বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সরকারি কাঠামোকে দুর্বল করা হয়েছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ সংগঠনটির।

তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তির দাবি

ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় একটি কঠোর, সময়বদ্ধ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে SFI। তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করার পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব বা যোগাযোগের ভিত্তিতে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না বলেও স্পষ্ট করেছে সংগঠনটি।

SFI-এর মতে, পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তাই তদন্তের পাশাপাশি দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।

দ্রুত নতুন পরীক্ষার ক্যালেন্ডারের দাবি

পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অবিলম্বে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও নির্দিষ্ট পরীক্ষার ক্যালেন্ডার প্রকাশের দাবি জানিয়েছে SFI। কোন পরীক্ষা কবে হবে, ফলাফল কবে প্রকাশিত হবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া কতদিনের মধ্যে শেষ হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করার দাবি রয়েছে সংগঠনটির।

Manual6 Ad Code

SFI-এর বক্তব্য, অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে বাধ্য করা হলে তাঁদের আর্থিক ও মানসিক চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি অত্যন্ত জরুরি।

JSSC ও JPSC-কে শক্তিশালী করার আহ্বান

সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা বেসরকারি সংস্থার হাতে না দিয়ে ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (JSSC) এবং ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC)-কে আরও শক্তিশালী করে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা পরিচালনার দাবি তুলেছে SFI।

সংগঠনটির যুক্তি, সরকারি নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির সক্ষমতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। পরিকাঠামো, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, দক্ষ কর্মী এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে কমিশনগুলিকে শক্তিশালী করা হলে বাইরের বেসরকারি সংস্থার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক ও একাডেমিক সহায়তা

পরীক্ষা বাতিলের ফলে যেসব পরীক্ষার্থী প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুরাহার দাবিও জানিয়েছে SFI। এর মধ্যে পরীক্ষার ফি মওকুফ, প্রয়োজনে বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ছাড় এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের দাবি রয়েছে।

সংগঠনটির মতে, পরীক্ষার্থীদের কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও যদি অনিয়মের কারণে পরীক্ষা বাতিল হয়, তাহলে তার আর্থিক ও প্রশাসনিক বোঝা তাঁদের ওপর চাপানো উচিত নয়। বিশেষত নতুন করে পরীক্ষা দিতে হলে যে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হবে, তার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রাখা দরকার।

ছাত্র-যুব সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনার দাবি

পরীক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত সংস্কার প্রক্রিয়া গড়ে তোলার দাবি করেছে SFI। তাদের মতে, পরীক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলি বিবেচনায় না নিয়ে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কার সম্ভব নয়।

স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা—এই চারটি বিষয়কে নিয়োগ পরীক্ষার মূল ভিত্তি করার পক্ষে সওয়াল করেছে সংগঠনটি।

ঝাড়খণ্ডের ঘটনাকে তাই শুধু একটি রাজ্যের একটি নিয়োগ পরীক্ষার সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ SFI। সংগঠনটির মতে, এটি দেশের শিক্ষা, সরকারি চাকরি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। একটি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে পরীক্ষা বাতিল, পুনরায় পরীক্ষা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

SFI-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি আদর্শ এম সাজি এবং সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, JSSC-CGL বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও সংগঠনটি আন্দোলনের এখানেই সমাপ্তি দেখতে চায় না। ঝাড়খণ্ডের ছাত্র ও যুবসমাজের স্বচ্ছ পরীক্ষা, মানসম্পন্ন সরকারি শিক্ষা এবং নিরাপদ সরকারি কর্মসংস্থানের দাবির পাশে সংগঠনটি ভবিষ্যতেও থাকবে বলে জানিয়েছে।

Manual3 Ad Code

মূল দাবি একটাই—পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত হোক, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়সঙ্গত সুরাহা মিলুক এবং সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থায় এমন সংস্কার আনা হোক যাতে ভবিষ্যতে পরীক্ষার্থীদের একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে না হয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ