জেলখানায় বসে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে এক বেলুচ কবির প্রতিক্রিয়া

প্রকাশিত: ১০:৫৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২৬

জেলখানায় বসে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে এক বেলুচ কবির প্রতিক্রিয়া

Manual8 Ad Code
  • বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৪ দিন পর কারাগারের অন্ধকারে বসে মীর গুল খান নাসির লিখেছেন প্রতিবাদের অনন্য কবিতা

ইতিহাস বিষয়ক নিবন্ধ |

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে নেমে এসেছিল এক অভূতপূর্ব অন্ধকার। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যার অভিঘাত শুধু বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উপমহাদেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠী, গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক কর্মী এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় সংগ্রামরত মানুষদের মধ্যেও এই হত্যাকাণ্ড গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

সেই প্রতিক্রিয়ার এক অসামান্য, কিন্তু তুলনামূলকভাবে অপ্রচলিত দলিল হলো বেলুচিস্তানের কবি ও রাজনৈতিক কর্মী মীর গুল খান নাসিরের কবিতা—‘ভোর কোথায়?’। বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র ১৪ দিন পর, ১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট কারাগারে বসে তিনি কবিতাটি রচনা করেন বলে প্রচলিত তথ্য থেকে জানা যায়।

ঘটনাটির তাৎপর্য এখানেই যে, কবি তখন নিজেই পাকিস্তানি শাসকদের কারাগারে বন্দী। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতির হত্যার প্রতিবাদ তিনি করেছিলেন এমন এক বন্দিদশা থেকে, যেখানে নিজ মাতৃভূমি বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে সোচ্চার থাকার কারণে তাকেও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল।

এ কারণে ‘ভোর কোথায়?’ শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদী কবিতা নয়; এটি একই সঙ্গে নিপীড়িত জাতিসত্তার পারস্পরিক বেদনা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক আন্তঃসীমান্ত দলিল হিসেবেও পাঠ করা যায়।

বেলুচিস্তানের বিদ্রোহী কবি মীর গুল খান নাসির

মীর গুল খান নাসির (১৯১৪–১৯৮৩) ছিলেন বেলুচিস্তানের একজন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী। বেলুচ সমাজ ও রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা তাঁর কাছে নিছক নান্দনিকতার বিষয় ছিল না; মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়, রাজনৈতিক মুক্তি এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তাঁর সাহিত্যিক চেতনার কেন্দ্রে ছিল।

পাকিস্তানের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। বেলুচ জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান তাঁকে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরাগভাজন করে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কারাবরণ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়।

এই জীবনপটভূমিই সম্ভবত বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনাকে তাঁর কাছে আরও গভীর অর্থবহ করে তুলেছিল। কারণ তিনি নিজেও জানতেন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিঘাত কী, জানতেন কারাগারের অন্ধকার কী, জানতেন একটি জাতির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার অর্থ কী।

ফলে ১৯৭৫ সালের আগস্টে ঢাকার হত্যাকাণ্ড তাঁর কাছে কেবল দূরদেশের একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। তাঁর কবিতায় বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু এবং বেলুচিস্তানের সংগ্রাম একই বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানে এসে মিলিত হয়েছে।

যে সময়টিতে কবিতাটি লেখা

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশে তখন ভয়াবহ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী মানুষটি নিহত, তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও নিহত। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল গভীর উদ্বেগ।

অন্যদিকে, মীর গুল খান নাসির তখন পাকিস্তানের কারাগারে। তাঁর নিজের মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

এই দুই বাস্তবতা তাঁর কবিতায় একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। কবিতার শুরুতেই তিনি তথাকথিত ‘ভোর’-এর ধারণাকে প্রশ্ন করেন—

“ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।”

এই ‘ভোর’ কেবল সময়ের ভোর নয়। এটি রাজনৈতিক মুক্তির প্রতীক। আর ‘রাত্রি’ হলো দমন, হত্যা, বিশ্বাসঘাতকতা ও স্বাধীনতার ওপর আঘাতের প্রতীক।

কবি তাই প্রশ্ন করেন—“ভোর কোথায়?”

প্রশ্নটি ১৯৭৫-এর বাংলাদেশের জন্য যেমন প্রযোজ্য, তেমনি তাঁর নিজের বেলুচিস্তানের জন্যও।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে তিনি দেখেছেন বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকট হিসেবে

‘ভোর কোথায়?’ কবিতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কবির প্রতিক্রিয়া। অনুবাদে আমরা পাই—

“মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে”

এখানে বঙ্গবন্ধু কবির কাছে কেবল বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি একজন ‘মহান দেশপ্রেমিক’।

কবিতায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে তিনি স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে একটি দেশের নির্বাচিত ও জনপ্রিয় নেতৃত্বকে হত্যা করা শুধু ব্যক্তিহত্যা নয়—এটি একটি জাতির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে রক্তাক্ত করার ঘটনা।

এই কারণেই কবিতায় বারবার ফিরে আসে স্বাধীনতার প্রতীক, পতাকা, রক্ত এবং অন্ধকারের চিত্র।

“বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।”

মাত্র দুটি পঙ্‌ক্তিতে কবি যেন একটি যুগের বিপর্যয়কে ধারণ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু তাঁর কাছে স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত হওয়ার প্রতীক।

কারাগার থেকেই প্রতিবাদ

মীর গুল খান নাসিরের কবিতাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর রচনাস্থল ও সময়।

একজন কবি যখন স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না, নিজেই রাষ্ট্রীয় বন্দিত্বের শিকার, তখন অন্য দেশের একজন নিহত নেতার পক্ষে কবিতা লেখা নিঃসন্দেহে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।

কারাগার সাধারণত মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু নাসিরের ক্ষেত্রে কারাগারের দেয়াল তাঁর কণ্ঠকে আটকে রাখতে পারেনি। বরং সেই বন্দিদশা তাঁর কবিতার রাজনৈতিক তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি লিখেছেন—

“হে সাহসী কমরেডগণ, এজিদ থেকে সতর্ক হও,
তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হও, পরাস্ত হবে তারা”

এখানে ইসলামের ইতিহাস ও কারবালার প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে। এজিদ ও হোসেনের কাহিনি উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই জুলুম ও প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। নাসির সেই সাংস্কৃতিক প্রতীককে ব্যবহার করেছেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে ব্যাখ্যা করতে।

তিনি আরও লিখেছেন—

“এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।”

কবিতার এই উপমা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে একটি বৃহত্তর নৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবে তুলে ধরে—একদিকে ক্ষমতা, নিপীড়ন ও ষড়যন্ত্র; অন্যদিকে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধ।

বাংলাদেশের সঙ্গে বেলুচিস্তানের এক অদৃশ্য সেতু

মীর গুল খান নাসিরের কবিতার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তগুলোর একটি আসে যখন তিনি বাংলাদেশের কথা বলতে বলতে হঠাৎ নিজের মাতৃভূমি বেলুচিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে আনেন—

“আমার মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও জ্বলছে এখন”

এই একটি পঙ্‌ক্তি কবিতাটিকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংহতির এক অনন্য দলিলে পরিণত করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা এবং বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রাম—দুটি ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন ভূগোল এবং ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। কিন্তু নাসিরের চোখে দুটির মধ্যে একটি অভিন্ন মানবিক ও রাজনৈতিক সাদৃশ্য ছিল—নিপীড়িত মানুষের অধিকার ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

বাংলাদেশে তিনি দেখলেন রক্তাক্ত স্বাধীনতার ওপর নতুন আঘাত। আর নিজের দেশে তিনি দেখছিলেন রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও দমন-পীড়ন।

সেই কারণে তাঁর কবিতায় বাংলাদেশ ও বেলুচিস্তান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায়।

‘সাম্রাজ্যবাদ’ প্রসঙ্গ ও কবির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

কবিতার ভাষায় ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটি বারবার এসেছে। নাসিরের রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বামঘেঁষা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তি ও জাতীয় অধিকারের সংগ্রামকে তিনি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দেখতেন।

‘ভোর কোথায়?’-তে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিপর্যয়কে সেই কাঠামোর মধ্যেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাষ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে দেশীয় ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকাও উঠে এসেছে।

তবে ইতিহাসের বিচারে কবিতার এই রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে আলাদা করে দেখা জরুরি। কবিতা একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক অনুভূতি ও বিশ্বাসের দলিল; সেখানে ব্যবহৃত অভিযোগ বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার প্রতিটি উপাদানকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে স্বতন্ত্র প্রামাণ্য উৎস দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

এই সতর্কতা কবিতাটির মূল্য কমায় না। বরং এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে। কারণ কবিতাটি আমাদের জানায়—১৯৭৫ সালের ঘটনাকে একজন সমকালীন বিদেশি রাজনৈতিক কবি কীভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

‘ভোর’ আসার প্রত্যয়

কবিতার শুরুতে অন্ধকার, রক্ত, ক্রন্দন এবং হতাশা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাসির হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।

তিনি লিখেছেন—

“বেশিক্ষণ নয়, কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও
এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে
হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়
বিজয়-পতাকা উড়ছে।”

এখানেই কবিতাটির মূল রাজনৈতিক দর্শন। অন্ধকার যতই দীর্ঘ হোক, তা চিরস্থায়ী নয়। হত্যাকাণ্ড, দমন-পীড়ন ও ষড়যন্ত্রের পরও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা টিকে থাকে।

‘ভোর কোথায়?’ তাই নিছক শোকের কবিতা নয়। এটি একই সঙ্গে প্রত্যয়ের কবিতা।

বঙ্গবন্ধুর রক্ত বৃথা যাবে না—এই বিশ্বাসই কবিতার শেষ দিকে প্রতিরোধের শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

“মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না,
দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা।”

এই বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগকে কবি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

Manual1 Ad Code

বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংহতির একটি দলিল

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাংলাদেশের বাইরে অসংখ্য কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণ রচিত হয়েছে। তবে মীর গুল খান নাসিরের কবিতার বিশেষত্ব তার প্রেক্ষাপটে।

একজন পাকিস্তানি কবি—যিনি নিজেই পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কারাগারে বন্দী—বাংলাদেশের জাতির পিতার হত্যার প্রতিবাদ করছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তিনি সেই প্রতিবাদকে নিজের জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করছেন।

এখানে জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে একটি নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে আরেক নিপীড়িত মানুষের সংহতি প্রকাশ পেয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সাধারণত ১৯৭১-এর যুদ্ধ, গণহত্যা ও রাজনৈতিক বিরোধের আলোকে আলোচিত হয়। সেই বৃহৎ ইতিহাসের ভেতরে পাকিস্তানেরই কিছু রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও নিপীড়িত জাতিসত্তার মানুষের বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান ছিল—মীর গুল খান নাসিরের কবিতা সেই জটিল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা।

কবিতাটি নতুন করে পাঠের প্রয়োজন

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিপুল গবেষণা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস শুধু রাষ্ট্রীয় দলিল, রাজনৈতিক বিবৃতি বা সরকারি নথিতে সংরক্ষিত থাকে না। সাহিত্য, ব্যক্তিগত স্মৃতি, চিঠি, কবিতা, গান ও সমকালীন মানুষের প্রতিক্রিয়াও ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান।

‘ভোর কোথায়?’ সেই অর্থে একটি সমকালীন সাহিত্যিক দলিল।

Manual6 Ad Code

১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট—হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়—একজন দূরদেশের বন্দী কবি বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে কবিতা লিখছেন। তাঁর নিজের চারপাশে কারাগারের দেয়াল, নিজের দেশ রাজনৈতিক সংকটে, তবু তাঁর কবিতার বিষয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ।

এই তথ্যটি আরও বিস্তৃত গবেষণার দাবি রাখে।

কবিতাটির মূল বেলুচি/উর্দু পাঠ, রচনাকাল, কারাগারের নির্দিষ্ট স্থান, প্রথম প্রকাশ, পাণ্ডুলিপি, কবির সংকলনে এর অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে এর প্রচার—এসব বিষয়ে প্রাথমিক উৎসভিত্তিক গবেষণা হলে ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও পরিষ্কার হবে। বিশেষ করে অনুবাদিত পাঠের সঙ্গে মূল পাঠ মিলিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে কবিতায় উল্লিখিত রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোকেও সমকালীন নথি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

কারণ একটি জাতির ইতিহাস যত বেশি প্রাথমিক দলিলের ওপর দাঁড়ায়, ততই তা শক্তিশালী হয়।

ইতিহাসের বিস্মৃত এক মানবিক মুহূর্ত

বঙ্গবন্ধুর হত্যার ৫১ বছর পর দাঁড়িয়ে মীর গুল খান নাসিরের এই কবিতা আমাদের সামনে ইতিহাসের একটি গভীর মানবিক মুহূর্ত হাজির করে।

একজন বেলুচ কবি, যিনি নিজেই বন্দী; যিনি নিজের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করছেন; যিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কারাগারে বসে আছেন—তিনি বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুর হত্যায় ব্যথিত হয়ে কবিতা লিখছেন।

এই দৃশ্যের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বৃহত্তর সত্য নিহিত আছে। রাষ্ট্রের সীমানা মানুষের বেদনার সীমানা নয়। একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই অন্য দেশের নিপীড়িত মানুষের কাছেও অনুরণন সৃষ্টি করতে পারে।

নাসিরের কবিতায় বাংলাদেশ সেই অনুরণনেরই প্রতিচ্ছবি।

তিনি অন্ধকার দেখেছিলেন, কিন্তু ভোরের প্রত্যয় হারাননি। বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহের পাশে তিনি স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত দেখেছিলেন, আবার একই সঙ্গে ভবিষ্যতের বিজয়-পতাকাও কল্পনা করেছিলেন।

সেই কারণেই ‘ভোর কোথায়?’ আজও কেবল একটি শোকগাথা নয়। এটি এক বন্দী কবির রাজনৈতিক বিবেকের সাক্ষ্য; বাংলাদেশের প্রতি এক বেলুচ কবির সংহতির দলিল; এবং স্বাধীনতা, নিপীড়ন ও প্রতিরোধের ইতিহাসকে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়া এক বিরল সাহিত্যিক উচ্চারণ।

ইতিহাসের বড় ঘটনাগুলো অনেক সময় রাষ্ট্রের নথিতে লেখা থাকে। কিন্তু কখনো কখনো তার সবচেয়ে তীব্র প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় কারাগারের নিঃসঙ্গ কক্ষে লেখা কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে।

মীর গুল খান নাসিরের ‘ভোর কোথায়?’ তেমনই এক পঙ্‌ক্তিমালা—যেখানে ১৯৭৫-এর অন্ধকারের মধ্যেও একজন বন্দী কবি ভবিষ্যতের বিজয়-পতাকা দেখতে পেয়েছিলেন।

Manual6 Ad Code

ভোর কোথায়?
মীর গুল খান নাসির

চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মধ্যে
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।
ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে,
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই
রক্তের ধারা বইছে প্রবল।
হে নির্বোধের দল, কোথায় উজ্জ্বল প্রভাত?
এখানে এখনো ক্রুদ্ধ রাত
এজিদরূপী সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো চূর্ণ করছে
সাহসী দেশপ্রেমিকের হাড়,
জনবহুল, চিত্রময় বাংলাদেশে আবারও রক্তের ঝড়।
সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা আবারও জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রাম-নগর,
মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।
হে সাহসী কমরেডগণ, এজিদ থেকে সতর্ক হও,
তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হও, পরাস্ত হবে তারা
তাদের মুখ তাদেরই কিন্তু জবান সাম্রাজ্যবাদীদের।
সেবাদাসেরা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের পকেট স্ফীতকায়
এবং সাহসী দেশপ্রেমিকদের খতম করে দিতে
সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে জোগান আসতেই থাকবে
তারা পাঠাবে ভাড়াটে লোক ও অস্ত্র
এই কাপুরুষদের কোনো দয়া-মায়া নেই,
এদের কারণেই বিশ্বে এখন ঘোর অন্ধকার।
মুক্তির শিখা কোথাও জ্বলে উঠলে এরা তা নিভিয়ে দেয় দ্রুত
বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।
সাম্রাজ্যবাদীরা আবারও ফিরে গেছে তাদের সেই পুরোনো
চক্রান্তে, বিশ্বাসঘাতকতায়
আবারও দ্বন্দ্বের ফয়সালা হচ্ছে বন্দুকের নলে
আবারও সোনার জমিনে জ্বলছে আগুন
হে বন্ধুরা, এভাবেই সময়ের মুখোমুখি আমরা
আমার মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও জ্বলছে এখন
ভয় পেয়ো না হে সাহসী যোদ্ধারা, থেমে যেয়ো না,
কণ্টকিত দুর্গম পথ এখনো অনেক বাকি।
মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না,
দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা।
বেশিক্ষণ নয়, কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও
এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে
হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়
বিজয়-পতাকা উড়ছে।
#
অনুবাদ: রিজওয়ান উল আলম

কবি মীর গুল খান নাসিরের ছবি।

Manual5 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ