সিলেট ১৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২৬
এ দেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল। এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—কৃষকের আন্দোলন সব সময় রাজনৈতিক দলের নির্দেশে, কোনো কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে কিংবা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি। বরং কৃষকের জীবন-জীবিকা যখন সংকটের মুখে পড়েছে, ন্যায্য অধিকার যখন পদদলিত হয়েছে, তখনই তারা নিজেদের তাগিদে মাঠে নেমেছে। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে সার নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ সেই দীর্ঘ কৃষক-প্রতিরোধের ধারাবাহিকতারই নতুন একটি উদাহরণ।
সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগে ৯ আগস্ট ২০২৬ কালীগঞ্জ বাজার এলাকায় কৃষকেরা লালমনিরহাট–পাটগ্রাম–বুড়িমারী জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করেছেন (প্রথম আলো ১০ আগস্ট)। তাঁদের অভিযোগ, আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সার মিললেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত দামের টিএসপি সার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায়। ১ হাজার ৫০ টাকা দামের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। একইভাবে ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত ইউরিয়া বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকায়।
এটি শুধু সারের দাম বাড়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের উৎপাদন খরচ, ফসলের বাজারদর, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। একজন কৃষক যখন বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হন, তখন সেই বাড়তি খরচ কোনো না কোনোভাবে কৃষিপণ্যের দামের ওপর পড়ে। ফলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, ভোক্তাকেও শেষ পর্যন্ত তার বোঝা বহন করতে হয়।
তবে তিস্তা অববাহিকার কৃষকের বর্তমান সংকটটি আরও গভীর। চলতি বছরে এই অঞ্চলের কৃষক একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত সামলেছেন। শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও নদীভাঙনে বহু কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ভুট্টা, বাতাম, পেঁয়াজ, আলু ও বিভিন্ন সবজি চাষে অনেকেই ব্যাপক লোকসান গুনেছেন। কোথাও ফসল নষ্ট হয়েছে মাঠেই, কোথাও বাজারে গিয়ে উৎপাদন খরচও ওঠেনি।
অন্যদিকে চালের দাম বাড়লেও সেই বাড়তি দামের সুফল কৃষকের ঘরে পৌঁছায়নি। কৃষক ধান উৎপাদন করেছেন, কিন্তু ধানের ন্যায্য দাম পাননি। অর্থাৎ ভোক্তার বাজারে চালের দাম বেড়েছে, অথচ উৎপাদক কৃষকের আয় বাড়েনি। কৃষি অর্থনীতির এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে—ফসলের দাম বাড়লে লাভবান হচ্ছেন কে?
এই পরিস্থিতিতে কৃষকের শেষ ভরসা ছিল আসন্ন আমন মৌসুম। তাঁদের আশা ছিল, আমনের ফলন ভালো হলে আগের মৌসুমের কিছু ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সেই আমন আবাদ শুরুর মুখেই যদি সারসংকট দেখা দেয় এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হয়, তাহলে কৃষকের সেই আশাটুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একদিকে আগের ফসলের লোকসান, অন্যদিকে নতুন ফসলের বাড়তি উৎপাদন ব্যয়—এই দুইয়ের চাপে কৃষক যখন দিশেহারা, তখনই তিনি রাস্তায় নেমেছেন।
প্রশ্ন হলো, কৃষকেরা কেন মহাসড়কে নামলেন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
বাংলার কৃষক বহুবার দেখিয়েছেন, তাঁরা নিছক উৎপাদক নন; প্রয়োজনে তাঁরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামী শক্তিতেও পরিণত হতে পারেন। ঔপনিবেশিক আমলে নীলচাষের বিরুদ্ধে কৃষকের প্রতিরোধ, জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে প্রজাদের আন্দোলন, তেভাগার সংগ্রাম কিংবা পরবর্তী সময়ে ভূমি, ফসলের ন্যায্য দাম ও কৃষি উপকরণের দাবিতে বিভিন্ন কৃষক আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট: কৃষকের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত এলে আন্দোলনের বীজ নিজের ভেতর থেকেই জন্ম নেয়।
তেভাগা আন্দোলন রাজনৈতিক সংগঠনের সহায়তা ও নেতৃত্ব পেয়েছিল। কিন্তু তার সামাজিক শক্তির মূল উৎস ছিল কৃষকের বাস্তব জীবন ও জমির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্দোলনকে সংগঠিত করতে পারে, কিন্তু কৃষকের জীবন-অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো কৃষক আন্দোলনের স্থায়ী ভিত্তি তৈরি হয় না।
আজকের বাস্তবতা আরও জটিল। কৃষি ক্রমশ বাজার ও করপোরেট স্বার্থের প্রভাবাধীন হচ্ছে। বীজ, সার, কীটনাশক, কৃষিযন্ত্র, সেচ, জ্বালানি, পরিবহন ও ঋণ—কৃষির প্রায় প্রতিটি উপকরণের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থ গভীরভাবে যুক্ত। কৃষক উৎপাদন করেন, কিন্তু উৎপাদনের বহু গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের দাম নির্ধারণে তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই। আবার উৎপাদিত ফসল বিক্রির সময়ও তিনি অনেক ক্ষেত্রে বাজারদরের নিয়ন্ত্রক নন।
ফলে কৃষক একদিকে উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের চাপে থাকেন, অন্যদিকে ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার অনিশ্চয়তায় ভোগেন। কৃষকের অবস্থাটা যেন দুই দিক থেকে চাপে পড়া একটি মানুষ—ইনপুট কেনার সময় তাঁকে বেশি দাম দিতে হয়, আর ফসল বিক্রির সময় তাঁর উৎপাদনের দাম ঠিক করে অন্যরা।
সারের সংকট এই চাপকে আরও তীব্র করে।
কৃষক হিসাব করেন—বীজের দাম কত, সারের দাম কত, কীটনাশক কত, সেচের খরচ কত, শ্রমিকের মজুরি কত, জমি চাষের খরচ কত। সবশেষে ফসল ঘরে ওঠার পর তিনি দেখেন, বাজারদর তাঁর মোট ব্যয়ও ঠিকমতো তুলতে পারছে না। বছরের পর বছর এই হিসাব মেলাতে না পারলে কৃষকের ঘরে শুধু লোকসান জমে না; জমে ক্ষোভও।
সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ অনেক সময় খুব স্বতঃস্ফূর্ত হয়।
লালমনিরহাটের ঘটনাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মসূচির অপেক্ষা করেননি। তাঁরা দেখেছেন, আমন মৌসুম সামনে; এখনই সার দরকার। নির্ধারিত দামে সার না পেলে তাঁদের উৎপাদন ব্যাহত হবে। অভিযোগ জানানো হয়েছে, কিন্তু সমাধান না হলে শেষ পর্যন্ত তাঁরা মহাসড়কে বসেছেন।
এটিকে শুধু একটি স্থানীয় অবরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের কৃষির গভীর সংকটের একটি প্রতিচ্ছবি রয়েছে—বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকার মতো দুর্যোগপ্রবণ কৃষি অঞ্চলের।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত দাম যদি কাগজে থাকে, কিন্তু কৃষক সেই দামে সার না পান, তাহলে সেই নির্ধারিত দামের কার্যকারিতা কোথায়? বাজারে যদি একজন কৃষককে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হয়, তাহলে অতিরিক্ত অর্থটি কার পকেটে যাচ্ছে? সরবরাহব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে? ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম হচ্ছে কি না? মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না? এসব প্রশ্নের জবাব শুধু প্রশাসনিক আশ্বাসে মিলবে না; প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি।
কালীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষকদের আশ্বাস দিয়েছেন, প্রকৃত কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু কৃষকের অভিজ্ঞতা হলো—সংকটের সময় আশ্বাস পাওয়া যায়, অথচ পরবর্তী মৌসুমে একই সংকট আবার ফিরে আসে।
তাই এখন প্রয়োজন সাময়িক সমাধানের পাশাপাশি একটি স্থায়ী কৃষিনীতি।
প্রথমত, সারসহ কৃষি উপকরণের সরবরাহব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে হবে। প্রকৃত কৃষকের কাছে ভর্তুকির সুফল পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডিলার ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তৃতীয়ত, কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, কৃষক সমবায়কে শক্তিশালী করে কৃষি উপকরণ সংগ্রহ ও উৎপাদিত পণ্য বিপণনে কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। কৃষকের সমস্যা শুধু ‘সার দেওয়া’ দিয়ে সমাধান করা যাবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য কার্যকর ফসলবিমা বা ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সেচব্যবস্থার নিশ্চয়তা এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য বাজার—এসবকে কৃষিনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকার কৃষিকে সাধারণ কৃষিনীতির চোখে দেখলে চলবে না। নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও খরার মতো একাধিক ঝুঁকি এখানে কৃষকের জীবনের অংশ। ফলে এই অঞ্চলের জন্য প্রয়োজন বিশেষ কৃষি-সহনশীলতা ও পুনর্বাসন নীতি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কৃষককে শুধু ভর্তুকি বা সহায়তা পাওয়ার মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁকে কৃষি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
কৃষকের উৎপাদন না থাকলে খাদ্য থাকে না; খাদ্য না থাকলে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাও থাকে না। অথচ খাদ্য উৎপাদনকারী সেই কৃষকই যদি উৎপাদনের উপকরণ কিনতে গিয়ে নিঃস্ব হন এবং ফসল বিক্রি করে ন্যায্য দাম না পান, তাহলে কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
তিস্তা অববাহিকার কৃষকের বর্তমান ক্ষোভ তাই কেবল সার নিয়ে নয়। এর পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক লোকসান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। সারসংকট সেই জমে থাকা ক্ষোভে যেন শেষ আঘাতটি করেছে।
করপোরেট কৃষির যুগে কৃষক হয়তো আগের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন, বেশি ঋণগ্রস্ত এবং বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি খাদ্য উৎপাদন করেন। তাঁর পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন তিনি সংগঠিত না হয়েও সংগঠিত হয়ে উঠতে পারেন। তাঁর প্রতিবাদ তখন কোনো রাজনৈতিক দলের মঞ্চের প্রয়োজন বোধ করে না।
লালমনিরহাটের মহাসড়ক অবরোধ সেই বার্তাই দিচ্ছে।
এই বার্তা সরকার, রাজনৈতিক দল এবং কৃষিনীতি নির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। কারণ কৃষকের অসন্তোষকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি কৃষি অর্থনীতির সংকটের সামাজিক প্রকাশ।
আজ সার নিয়ে কৃষক মহাসড়কে বসেছেন। আগামীকাল একই কৃষক ফসলের দাম, সেচের খরচ, ঋণের বোঝা, জমির অধিকার কিংবা বাজারব্যবস্থার বিরুদ্ধে পথে নামতে পারেন। কৃষকের আন্দোলনকে থামানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় পুলিশি ব্যবস্থা নয়; কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কৃষককে রাস্তায় নামার আগে শুনতে শেখা। কারণ মহাসড়ক অবরোধ কৃষকের প্রথম পছন্দ নয়; অনেক সময় এটি তাঁর শেষ অবলম্বন। যখন প্রশাসনের দরজায় অভিযোগের প্রতিকার হয় না, বাজারে ন্যায্যতা থাকে না, আর উৎপাদনের হিসাব মেলে না—তখনই কৃষকের পা ঘরের উঠান পেরিয়ে রাজপথে যায়।
ইতিহাসের শিক্ষা খুব পরিষ্কার: কৃষককে দীর্ঘদিন ঠেলে রাখা যায়, কিন্তু তাঁর পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন তিনি আর ঘরে থাকেন না—রাস্তায় নেমে আসেন।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ সেই পুরোনো সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিল।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি