সিলেট ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২৬
বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কিংবদন্তি ও অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু লাল সালাম!
তিনি ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর বেলায় বৃটিশদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার জন্য নির্ভয়ে দৃঢ় পায়ে হাসতে হাসতে পরেছিলেন ফাঁসির দড়ি। কোন কোন চরিত্র জীবনভর মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে | ক্ষুদিরাম সেরকম একটি চরিত্র |
ফাঁসির সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বৎসর ৭ মাস ১১ দিন। ফাঁসির দড়ি পরানোর সময় ক্ষুদিরাম হাসতে হাসতে জানতে চান জল্লাদের কাছে, ‘আচ্ছা তোমরা ফাঁসির দড়িতে মোম দাও কেন?’ এই হচ্ছেন ক্ষুদিরাম।
অঞ্জলি লও হে বিপ্লবী | ক্ষুদিরামরা বাংলার বুকে বার বার জন্ম নেন , শিখিয়ে দেন কিভাবে দেশ ও মানুষকে ভালবাসতে হয়-গাইতে হয় মরণ জয়ের গান।
ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘চিনতে নাকি সোনার ছেলে ক্ষুদিরামকে চিনতে? রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে মুক্ত বাতাস কিনতে।’
প্রায় দুইশ বছর শাসন করা ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন সংগ্রামে যারা অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন, যারা অস্ত্র হাতে অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন সেই তালিকার শুরুর দিকে রয়েছে তাঁর নাম।
কিশোর ক্ষুদিরাম বসু’র স্বপ্ন ছিলো স্বদেশকে মুক্ত করা। এর নির্মম পরিণতির কথা তাঁর অজানা ছিলো না। তারপরও দুঃখ, কষ্ট, বিপদ এবং মৃত্যুর কথা জেনেও তিনি দেশকে মুক্ত করতে পিছপা হননি। মুক্ত হাওয়া, মুক্ত পরিবেশ এবং বাধাহীন শৈশবে বেড়ে ওঠার সঙ্গে আত্মপরিচয়ে বাঁচতে শেখার নাম স্বাধীনতা।
বাংলার ইতিহাসে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর থেকে বাংলার স্বাধীনতা ব্রিটিশের হাতে চলে যায়। সেখান থেকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে প্রাণ দিয়েছেন বহু দেশপ্রেমিক।
ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর ১৯০৮ সালের ১২ আগস্ট অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সেই সময়ের বর্ণনায় জানা যায়:
‘মুজাফফরপুর, ১১ আগস্ট অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে। ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়। এমন কি তাহার মাথার ওপর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল। স্বদেশের জন্য মৃত্যুকে কিভাবে হাসিমুখে বরণ করতে হয় তা শিখেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।
আঠারো বছর বয়স যে কি সাহসী হয় তারও প্রমাণ ক্ষুদিরামের দৃঢ় মনোবল। তার স্মরণে রচিত বিখ্যাত গান, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি- আজ মানুষের অন্তরে প্রবাহিত।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ক্ষুদিরাম আজও আছে এই বাংলায়। প্রতিটি সাহসী দেশপ্রেমিক কিশোরই আজ একজন ক্ষুদিরাম।
ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদেনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে। পিতা ত্রৈলক্যনাথ বসু এবং মাতা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম নামকরণের পেছনেও রয়েছে ছোট্ট ইতিহাস। তিনকন্যা সন্তান জন্মের পর তিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান। তার আগেই দুই পুত্র জন্মের পর মারা গিয়েছিল বলে জন্মের পরই তিন মুঠ ক্ষুদের বিনিময়ে তাকে তার দিদির কাছে দেন। এর থেকে তার নাম হয় ক্ষুদিরাম।
১৮৯৫ সালে তার মা-বাবা মৃত্যুবরণ করলে তার বড় বোন অপরূপা তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন। তার ভেতরে স্বদেশের চেতনা জন্ম নিতে সময় নেয়নি।
১৯০৬ সালের মার্চ মাসে মেদেনীপুরের এক কৃষি ও শিল্পমেলায় বিপ্লবী পত্রিকা ’সোনার বাংলা’ বিলি করার সময় ক্ষুদিরাম প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর থেকে ক্ষুদিরাম বসু ক্রমেই ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন কাজে অংশ নেন। স্বদেশি আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার জন্য তার জামাইবাবুর সরকারি চাকরিতে অসুবিধা হলে তাকে আশ্রয় দেন মেদেনীপুরের উকিল সৈয়দ আব্দুল ওয়েজেদের বোন। এ সময় কিংসফোর্ড নামটি ছিল বাঙালিদের কাছে ঘৃণার।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে, কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন।
ক্ষুদিরাম জীবন বাজি রেখে ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারে ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে হত্যা করতে গিয়েছিলেন কিংসফোর্ডকে। তার সঙ্গে ছিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। যে গাড়িটিতে তাদের থাকার কথা ছিল তারা ছিলেন না সেদিন। তার বদলে মারা যায় দুই ইংরেজ মহিলা। দুই বিপ্লবী নিজের রাস্তায় পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গী বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ে নিজের কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম বসু। বিচারে তার ফাঁসির রায় দেন বিচারক মি. কর্নডফ। তিনি ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ফাঁসিতে যে মরতে হবে সেটা বুঝেছো? জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, বুঝেছি। তার মুখের অবিচলিত হাসি হাসি ভাব দেখেই বিচারক প্রশ্নটি করেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ‘সঞ্জিবনী’তে লেখা হয়, ‘মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার পর ক্ষুদিরামকে সম্পূর্ণ অবিচলিত দেখিয়া এবং তাহার নির্বিকার ভাব লক্ষ্য করিয়া বিদেশী রাজার স্বজাতীয় বিচারকের মনে সম্ভবতঃ এইরূপ ধারণা জন্মিয়াছিল যে, আসামীর প্রতি যে চরমদণ্ড প্রদত্ত হইয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে নাই। এই ধারণাতে বিচারক ক্ষুদিরামকে উক্ত প্রশ্নটি করেছিলেন। মৃত্যুকে যে জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে তার কাছে মৃত্যু আর জীবনের মাঝে কোনো বিভেদ নেই সেকথা তখন বিচারকও বুঝতে অক্ষম ছিল।’
মৃত্যু যে কত সহজে বরণ করে নেওয়া যায় তা শিখিয়ে গেছে ক্ষুদিরাম। ফাঁসির আগে শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়। ক্ষুদিরামের কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিল, তিনি বোমা বানাতে জানেন। ব্রিটিশদের অনুমতি পেলে তিনি তার বোমা বানানোর বিদ্যা ভারতবাসীকে শিখিয়ে যেতে চান। কি অসীম সাহস থাকলে মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়েও দেশের কথা ভাবা যায়, মানুষের মুক্তির কথা চিন্তা করা যায় তার উদাহরণ ক্ষুদিরাম বসু।
অগ্নিযুগের রক্তভেজা পথে যে কিশোর যায়,
হাসিমুখে মৃত্যুর কাছে জীবনের গান গায়;
শিকল ভাঙার স্বপ্ন বুকে, মুক্ত আকাশ চায়—
সে তো ক্ষুদিরাম, আজও বাংলার হৃদয় গায়।
মেদিনীপুরের মাটির ঘরে জন্মেছিল ছেলে,
দুঃখ-কাঁটার দিন পেরিয়ে উঠল আগুন জ্বেলে;
স্বদেশ তখন শৃঙ্খলিত, পরাধীনতার জালে,
কিশোর বুকে বজ্র উঠল অন্যায়েরই কালে।
দুটি চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল আঁকা,
মায়ের মুখে দেশের মাটি—সেই তো ছিল মাখা;
জীবন তার ক্ষুদ্র হলেও স্বপ্ন ছিল বড়,
দেশের তরে মৃত্যুকেও করল সে আপন করে।
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে জেগেছিল যে দেশ,
স্বদেশি সেই অগ্নিমন্ত্রে জ্বলল অবশেষ;
কাগজ হাতে, পথে পথে সে বিলিয়েছে বাণী,
ব্রিটিশ শাসন কাঁপিয়ে দিল কিশোরেরই প্রাণী।
কিংসফোর্ডের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ ছিল প্রাণ,
বিচার নামে নিপীড়নের বাড়ছিল অপমান;
প্রফুল্ল চাকী পাশে ছিল, দুজন অগ্নিশপথে,
জীবন রেখে এগিয়ে গেল মৃত্যুরই রথে।
মুজাফফরপুরের অন্ধ রাতে বজ্রের মতো ক্ষণ,
বোমার শব্দ কাঁপিয়ে দিল ঔপনিবেশিক মন;
লক্ষ্যভ্রষ্ট সেই বিস্ফোরণে ঘটল মর্মান্তিক ক্ষয়,
তবু ইতিহাস লিখে রাখল তাদের অমর জয়।
প্রফুল্ল গেল আত্মবলিদানে, বন্দি হলো ক্ষুদিরাম,
বিচারক দিল মৃত্যুদণ্ড—নিভল না তার প্রাণ;
“ফাঁসির দড়ি বুঝেছ?”—প্রশ্ন, শান্ত কিশোর হাসে,
মৃত্যু যেন তুচ্ছ তার কাছে স্বাধীনতার আশে।
এগারো আগস্ট ভোরের বেলা উঠল শেষ প্রহর,
ফাঁসির মঞ্চে কিশোর গেল দৃপ্ত পায়ে নির্ভর;
মাথার উপর মৃত্যুর টুপি, চোখে অমলিন হাসি,
বাংলার মাটি দেখল সেদিন মৃত্যুঞ্জয়ী আসি।
মাত্র আঠারো বছর বয়স—কতটুকু সে কাল!
তবু তারই বুকের ভিতর জ্বলল সূর্যজাল;
যে বয়সে হয় খেলাঘর আর স্বপ্ন বোনার দিন,
সে বয়সেই মৃত্যুর সাথে করল আলিঙ্গন।
শেষ ইচ্ছাতেও নিজের কথা ভাবেনি সে আর,
বোমা বানানোর বিদ্যাটি দিতে চেয়েছে সবার;
দেশের মানুষ শিখুক কেমন শিকল ভাঙার রণ—
মৃত্যুকূপেও জেগে ছিল মুক্তিরই স্পন্দন।
“একবার বিদায় দে মা”—কেঁদে ওঠে বাংলার গান,
ক্ষুদিরামের রক্তে লেখা স্বাধীনতার মান;
প্রতিটি সাহসী কিশোর যখন অন্যায়ের রুখে,
ক্ষুদিরামের ছায়া যেন দাঁড়ায় তারই বুকে।
স্বাধীনতা শুধু পতাকা নয়, শুধু বিজয়গান নয়,
ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি—সেই তো সত্য জয়;
বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার শপথ হোক আজ প্রাণে,
মানুষ যেন মানুষ থাকে মানুষেরই সম্মানে।
ধর্ম-বর্ণের বিভেদ মুছে, শোষণ-শৃঙ্খল ভেঙে,
ন্যায়-সমতার সূর্য উঠুক বাংলার আকাশ রাঙিয়ে;
যে স্বপ্ন নিয়ে প্রাণ দিয়েছিল অগ্নিযুগের ছেলে,
সেই স্বপ্ন আজ বাঁচুক মানুষের অধিকারের মেলে।
ক্ষুদিরাম, তোমার রক্ত বৃথা যেতে দেব না আর,
অন্যায়ের কাছে নত হবে না বাংলার অধিকার;
শোষিত মানুষের মুক্তির পথে জ্বলুক তোমার নাম,
অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী—তোমায় লাল সালাম।
ফাঁসির দড়ি ভয় দেখাতে পারেনি যে প্রাণ,
আজও তারই সাহস জাগায় কোটি মানুষের গান;
মৃত্যু পেরিয়ে বেঁচে আছো বাংলার প্রতিটি ধাম—
স্বাধীনতার অমর সৈনিক, ক্ষুদিরাম—সালাম।
—(ক্ষুদিরাম, তোমায় সালাম;—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)
মহান ও কীর্তিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই অগ্নিযুগের মহান এই বিপ্লবীর রাজনীতি, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। ১১৮তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু তোমায় সালাম!
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি