জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন ও আমাদের সিলেট: সম্ভাবনা, সংকট এবং উত্তরণের পথ

প্রকাশিত: ১১:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২৬

জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন ও আমাদের সিলেট: সম্ভাবনা, সংকট এবং উত্তরণের পথ

Manual6 Ad Code

সৈয়দ আকরাম উজ্জামান |

সম্প্রতি আমাদের প্রিয় সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ‘জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন’-এর পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এই নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়েছেন এবং যারা অংশ নিয়েছেন—সবাইকে জানাই আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে আন্তরিক অভিনন্দন ও মোবারকবাদ।

একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংগঠন হিসেবে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সিলেট বিভাগ ও সিলেটবাসীর যুক্তিসঙ্গত ও মৌলিক অধিকার এবং দাবিগুলো অর্জনে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখা।

Manual4 Ad Code

আমাদের দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সিলেট বিভাগ সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সরকারের আমলেই সিলেটের কৃতি সন্তানেরা অর্থ, পররাষ্ট্র, আইন কিংবা স্বরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান কিংবা বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের পারিবারিক ও আঞ্চলিক শেকড় সিলেট বিভাগের (সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার) সাথে গভীরভাবে যুক্ত, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও সম্ভাবনার।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো—রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসনে এত বড় অর্জন ও উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও সিলেটবাসীর শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, আধুনিক অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি প্রকট বেকারত্ব সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান আজও হয়নি।

Manual1 Ad Code

সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার হার ও পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রায়ই জাতীয় গড়ের তুলনায় উদ্বেগের সৃষ্টি করে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ঢাকামুখী নির্ভরতা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমেনি।

আমাদের এই পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ অভ্যন্তরীণ দূরদর্শী সমন্বয় এবং প্রবাস ও স্বদেশের মধ্যে যোগাযোগের অভাব। দেশের সরকারি-বেসরকারি শীর্ষ পদে অনেক সিলেটি আমলা, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও নীতি-নির্ধারক দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে এক সুতোয় গাঁথতে পারলে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিরাট সুযোগ তৈরি সম্ভব।

জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা:

১. শিক্ষিত বেকারদের ডাটাবেজ তৈরি:
সংগঠনটি সিলেট বিভাগের শিক্ষিত ও যোগ্য বেকার যুবক-যুবতীদের একটি হালনাগাদ ডাটাবেজ তৈরি করতে পারে। পরবর্তীতে এই ডাটাবেজটি দেশ-বিদেশে কর্মরত সিলেটের কৃতি সন্তান—যারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নীতি-নির্ধারণী পদে আছেন—তাদের কাছে পেশ করে চাকরি ও উদ্যোক্তা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। সঠিক নেটওয়ার্কিংয়ের অভাবে আমাদের বহু যোগ্য তরুণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২. আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট স্থাপন:
যেহেতু সিলেট বিভাগের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও পারিবারিক সংযোগ প্রবাসের সাথে যুক্ত, সেহেতু এই অঞ্চলে মানসম্মত একটি ‘আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এতে ইংরেজি, আরবিসহ ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে, যা প্রবাসে ভালোমানের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে।

৩. ‘জালালাবাদ স্বর্ণপদক’ প্রবর্তন:
দেশ-বিদেশে সিলেটের যেসব কৃতি সন্তান স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে সিলেট ও বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন, তাঁদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ‘জালালাবাদ স্বর্ণপদক’ চালু করা যেতে পারে। এটি নতুন প্রজন্মকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে উৎসাহিত করবে।

অবকাঠামো ও পর্যটনে আঞ্চলিক সমন্বয়:
সিলেটের যোগাযোগ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ হলো সিলেট বিভাগের অন্যতম প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র ও ঐতিহ্যে ঘেরা রেল জংশন। ঢাকা-সিলেট মহা-সংযোগস্থলে অবস্থিত শায়েস্তাগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সঠিক পরিকল্পনা নিশ্চিত না করা হলে পুরো হবিগঞ্জ অঞ্চলের পর্যটন শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আড়ালেই থেকে যাবে।

আমাদের অপার সম্ভাবনা ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস:

সিলেট প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক অনন্য দান। এখানে রয়েছে—

প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভিত্তি:
পাহাড়-টিলা, হাওর-বিল, চা-বাগান, নদ-নদী, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মতো সমৃদ্ধ বনভূমি, জলপ্রপাত, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর (যেমন: তামাবিল, সুতারকান্দি)।

আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.)-সহ বহু অলী-আউলিয়ার পুণ্যভূমি। এটি মরমী কবি হাছন রাজা ও বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মতো সুরসাধকদের জন্মস্থান।

ইতিহাস ও আইন অঙ্গনে অনন্য স্থান:
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক-ইতিহাসবিদদের স্মৃতিবিজড়িত এই মাটি। এমনকি বিচার বিভাগের ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করে একই পরিবার (লস্করপুর পশ্চিম হাবিলী, হবিগঞ্জ) থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের তিনজন বিচারপতি (যার মধ্যে দুইজন প্রধান বিচারপতি) উপহার দিয়েছে আমাদের সিলেট।

প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা:
বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চাকা সচল রাখার পাশাপাশি সিলেটের প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের সম্মান ও গৌরব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলেছেন।

সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আর যোগ্য মানবসম্পদ থাকার পরও আমরা যদি শুধু সমন্বয়ের অভাবে পিছিয়ে থাকি, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।

Manual4 Ad Code

আসুন, দল-মত ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের পতাকাতলে সিলেটের কৃতি সন্তানদের ঐক্যবদ্ধ করি এবং আমাদের প্রিয় সিলেট বিভাগকে বাংলাদেশের সেরা ও সর্বাঙ্গীন উন্নত বিভাগে রূপান্তর করি।

#
লেখক :
সৈয়দ আকরাম উজ্জামান
বেঞ্চ অফিসার, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট,
ঢাকা।

Manual1 Ad Code

স্থায়ী নিবাস :
লস্করপুর পশ্চিম হাবিলী,
হবিগঞ্জ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ