ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডাকসু সদস্য ইয়াসিন আলপনা আর নেই

প্রকাশিত: ১১:০১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডাকসু সদস্য ইয়াসিন আলপনা আর নেই

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সাবেক সদস্য এবং এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা ও ১৯৯০-এর মহান গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক মোহাম্মদ ইয়াসিন আলপনা আর নেই।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় রাজধানীর নিজ বাসায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।

Manual3 Ad Code

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে এবং অসংখ্য রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের সমাজসেবক ইসহাক আলীর প্রথম পুত্র।

সোমবার বাদ জোহর রাজধানীর ধানমণ্ডির মধুবাজার বড় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাত ১০টায় চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শান্তিধারা আবাসিক এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

ছাত্র আন্দোলনের সাহসী সংগঠক

Manual1 Ad Code

আশির দশকের শেষভাগে বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ইয়াসিন আলপনা ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম সক্রিয় ও সাহসী সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। শিক্ষার্থীদের অধিকার, গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৮৯ সালের সুলতান-মুস্তাক পরিষদের ডাকসু সদস্য ছিলেন ইয়াসিন আলপনা। একই সময় তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম দেশব্যাপী বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করছেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা।

১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন ইয়াসিন আলপনা ছিলেন সামনের সারির অন্যতম সংগঠক। মিছিল, সমাবেশ, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

‘সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা’

ইয়াসিন আলপনার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও ডাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক নাসির উদ দুজা।

এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, আশির দশকের শেষভাগে ইয়াসিন ছাত্র ইউনিয়নের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী নেতা ছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে সংগঠন করেছেন, মিছিলে স্লোগান দিয়েছেন, আন্দোলন করেছেন এবং একটি সুন্দর ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন।

নাসির উদ দুজা বলেন, ইয়াসিনের এভাবে চলে যাওয়া তাঁর কাছে একজন স্বজনকে হারানোর মতোই বেদনাদায়ক। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন না; ছিলেন তাঁদের যৌবনের দিনগুলোর একজন আপন মানুষ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বেড়ে ওঠার এক উজ্জ্বল সহযাত্রী।

তিনি আরও বলেন, সংগঠনের প্রতি ইয়াসিনের নিষ্ঠা, সাহস, উদ্যম ও দায়িত্ববোধ ছিল অসাধারণ। সংগঠনের প্রয়োজনে সবার আগে ছুটে যাওয়া, ঝুঁকি নিতে কখনো পিছপা না হওয়া এবং তরুণ ও নতুন কর্মীদের সাহস জোগানো ছিল তাঁর স্বভাবজাত নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য।

নব্বইয়ের দশকের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নাসির উদ দুজা বলেন, ইয়াসিন ছিলেন সামনের সারির একজন নেতা ও সংগঠক। শিক্ষার্থীদের অধিকার, গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছেন।

তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন সাহসী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীকে হারিয়েছে উল্লেখ করে নাসির উদ দুজা মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন

ইয়াসিন আলপনার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

শোকবার্তায় তিনি বলেন, ইয়াসিন আলপনা আমৃত্যু শোষণ-বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। এরশাদবিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে তিনি আন্দোলন সংগঠিত করেছেন এবং সংগঠনকে দেশব্যাপী শক্তিশালী করতে নিরন্তর শ্রম দিয়েছেন।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে ইয়াসিন আলপনার মতো নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মৃত্যু প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

সহযোদ্ধাদের স্মৃতিতে ইয়াসিন

Manual1 Ad Code

ইয়াসিন আলপনার মৃত্যুতে রাজনৈতিক সহকর্মী, ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতাকর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী এবং তাঁর অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন।

গণফোরাম নেতা লতিফুর বারী হামীম তাঁকে সাহসী, বিনয়ী ও মেধাবী হিসেবে স্মরণ করে লিখেছেন, ছাত্রজীবন থেকেই তাঁরা একসঙ্গে বহু মিছিল, মিটিং ও রাজনৈতিক পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে একজন দেশপ্রেমিক ও মানবহিতৈষী ব্যক্তিকে হারানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।

সাবেক ছাত্রনেতা জাহিদ খান ইয়াসিন আলপনাকে ‘সময়ের সাহসী সন্তান’ ও ‘সংগ্রামী সাবেক ছাত্রনেতা’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা লাকী আক্তারও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন।

Manual2 Ad Code

ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা মীর মাহমুদ আলী ইয়াসিন আলপনাকে তাঁদের প্রেরণার উৎস হিসেবে স্মরণ করেছেন। তিনি বলেন, ইয়াসিনের নেতৃত্বে তাঁরা অনেক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ।

সাবেক ছাত্রনেতা সৈয়দা শিরীন বলেন, ইয়াসিন সবসময় তাঁদের সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন এবং সহযোদ্ধাদের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা জাগিয়ে তুলেছেন।

সাবেক ছাত্রনেতা সাব্রিনা ইয়াসমিন বলেন, ইয়াসিন আলপনার অবদান কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। তাঁর স্মৃতি দীর্ঘদিন সহযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করবে এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করা হবে।

ছাত্র ইউনিয়নের শোক

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা এবং বাহাউদ্দিন শুভ ইয়াসিন আলপনার মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁরা মরহুমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক জীবনের অবদানের কথা স্মরণ করেন।

এদিকে ইয়াছিন আলপনার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত ও যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান

ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়া ইয়াসিন আলপনা তাঁর প্রজন্মের কাছে ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের একজন পরিচিত মুখ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকার, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে তিনি দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা, সাহসিকতা এবং নতুন কর্মীদের উৎসাহিত করার মানসিকতা তাঁকে আলাদা করে চিনিয়েছে। জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়জুড়ে তিনি যে রাজনৈতিক আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছিলেন, তাঁর সহযোদ্ধারা সেই আদর্শ ও ভূমিকার কথাই স্মরণ করছেন তাঁর মৃত্যুর পর।

ইয়াসিন আলপনার আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, সাবেক সহযোদ্ধা ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সহযাত্রীরা বলছেন, একজন সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকের পাশাপাশি তাঁরা হারিয়েছেন তাঁদের যৌবনের সংগ্রামী সময়ের এক ঘনিষ্ঠ সহযাত্রীকে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ