ইসরায়েলের ভোটে আরব দলগুলোর উত্থান: কমিউনিস্টদের সমর্থনে নয়া রাজনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশিত: ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২৬

ইসরায়েলের ভোটে আরব দলগুলোর উত্থান: কমিউনিস্টদের সমর্থনে নয়া রাজনৈতিক সমীকরণ

Manual7 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

ইজরায়েলের নির্বাচনের ফলাফল হাদাশ এবং ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোটের (ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর পিস অ্যান্ড ইকোয়ালিটি, হাদাস) মধ্যে বৃহত্তম শক্তি কমিউনিস্টরা। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবসময়ই ইহুদি-আরব সংহতি, বর্ণবাদ ও দখলদারিত্বের বিরোধিতা এবং শান্তি, সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জয়েন্ট লিস্টের নির্বাচনী সাফল্য আরব ভোটারদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং ইজরায়েলের ভবিষ্যৎ— সংসদীয় ভারসাম্যের ওপর তাদের সম্ভাব্য প্রভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা এখনও অনিশ্চিত। ট্রাম্প-মোদীর বিশ্বস্ত মিত্র যুদ্ধবাজ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, না কি তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ গাদি আইজেনকট— শেষ হাসি কে হাসবেন, বলবে ভবিষ্যৎ। তবে এই অচলাবস্থার মধ্যে একটি ফলাফল স্পষ্ট: আরব দলগুলির চমকপ্রদ সাফল্য। ইজরায়েলে প্যালেস্তিনীয় মানুষ বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন। এবং আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলিকে অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি আসনে জয়ী করেছেন। আর তা এতটাই যে বিরোধী পক্ষ যদি সুযোগ দেয়, তবে তারাই নির্ধারণ করতে পারবে, কারা সরকার গঠন করবে।

ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, আরব নাগরিকদের অধিকার এবং ইহুদি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আধিপত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। দেশটির সংসদীয় রাজনীতিতে আরব দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত হাদাশের (Hadash) রাজনৈতিক অবস্থান সেই আলোচনা আর বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে বিকল্প প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রশ্নে আরব দলগুলোর ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনী রাজনীতিতে আরবপন্থী দলগুলোর সাফল্য শুধু আসনসংখ্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এটি দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো, গণতন্ত্রের প্রকৃতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। ইসরায়েলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নাগরিক আরব ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। অথচ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীয় কাঠামোতে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতায় আরব দলগুলোর নির্বাচনী অগ্রগতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।

আরব ভোটের গুরুত্ব ও ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

নির্বাচন, ভোটগণনা ও ফলাফল ঘোষণা শেষ। ঘোষিত ফলাফলে ১২০-সদস্যের ইজরায়েলি সংসদ নেসেট-এ নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন উগ্র দক্ষিণপন্থী জোট জয়ী ৫৩টি আসনে। অন্যদিকে, প্রাক্তন সেনাপ্রধান আইজেনকটের ইয়াশার দলের নেতৃত্বাধীন জায়নবাদী জোট-ও খুব একটা পিছিয়ে নেই। জয়ী ৪৮ আসনে। লিকুদ পার্টি একা ২৭ আসনে। আর ইয়াশার ২১ আসনে।

সরকার গড়ার জন্য দরকার ৬১ আসন। ফলে কোনও পক্ষই সরকার গঠনের ধারেপাশে নেই।

দুরন্ত ফল করেছে আরবপন্থী দু’টি ব্লক। ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি (মাকি)-সহ হাদাশের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট এবং সামাজিকভাবে রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাজনৈতিক জোট ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাম)। ১৯টি আসনে জিতেছে এই দু’টি আরব ব্লক। জয়েন্ট লিস্ট ১১ আসনে। রাম ৮ আসনে। যা ২০২০-তে আরব দলগুলির পাওয়া ১৫টি আসনের রেকর্ডকে (বাইশ সালের তুলনায় দ্বিগুণ) ছাপিয়ে যায়।

ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের সংসদ নেসেটের রাজনীতিতে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে কোনো রাজনৈতিক জোটই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, ফলে ছোট দলগুলোর সমর্থন কিংবা সংসদীয় সহযোগিতা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতায় আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। হাদাশের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট এবং ইসলামপন্থী ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম—দুটি পৃথক রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করলেও ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

জয়েন্ট লিস্টের প্রধান শক্তি হাদাশ। এর পূর্ণ নাম ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর পিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি। এটি একটি ইহুদি-আরব বামপন্থী রাজনৈতিক জোট, যার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শক্তি ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি—মাকি (Maki)। এই জোটের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো ইহুদি ও আরব জনগণের ঐক্য, দখলদারিত্বের অবসান, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, নাগরিক সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।

অন্যদিকে, রাম সামাজিক ও ধর্মীয় প্রশ্নে তুলনামূলক রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থান ধারণ করে। ফলে দুটি দলের রাজনৈতিক দর্শনে পার্থক্য থাকলেও আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং বর্ণবৈষম্যের বিরোধিতার প্রশ্নে তাদের সংসদীয় ভূমিকার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

হাদাশ ও কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক ভূমিকা

ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান অধিকার করে আছে। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি ইহুদি ও আরব শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরোধিতা এবং ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য রাজনৈতিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে।

Manual5 Ad Code

হাদাশের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু আরব জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কথা বলে না; বরং ইহুদি ও আরব জনগণের অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলে। এই জোটে ইহুদি ও আরব—উভয় সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা সক্রিয় রয়েছেন।

ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির এই অবস্থান দেশটির প্রচলিত জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিপরীতে একটি বিকল্প প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে। তাদের মতে, ইহুদি ও আরব জনগণের মধ্যে সংঘাত, অবিশ্বাস ও বৈষম্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে কোনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বরং সমান নাগরিক অধিকার, জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি এবং পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এই রাজনৈতিক ধারার অন্যতম পরিচিত মুখ কমরেড ওফের কাসিফ। ইহুদি কমিউনিস্ট আইনপ্রণেতা হিসেবে তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার, গাজায় সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েলি সরকারের নীতির সমালোচনা করে আলোচনায় এসেছেন। তাঁর প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণ করে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও এমন একটি ইহুদি রাজনৈতিক ধারা রয়েছে, যারা ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও ন্যায়সংগত শান্তির প্রশ্নে আপসহীন।

নেতানিয়াহুর রাজনীতির বিরুদ্ধে বিকল্পের সন্ধান

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসন ইসরায়েলকে ক্রমশ দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় দক্ষিণপন্থী শক্তির প্রভাব বেড়েছে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, গাজায় সামরিক অভিযান এবং আরব নাগরিকদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আরও সংঘাতময় করেছে।

বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর দেশটির অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী শক্তির অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি, হাদাশ এবং বিভিন্ন শান্তিকামী সংগঠন যুদ্ধ বন্ধ, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছে।

এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সামনে একটি বড় প্রশ্ন—তারা কি সরকার পরিবর্তনের স্বার্থে আরব দলগুলোর সঙ্গে কার্যকর রাজনৈতিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে প্রস্তুত? কারণ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণে আরব দলগুলোর সমর্থন অনেক সময় সরকার গঠনের নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

তবে বিরোধী জায়নবাদী দলগুলোর একটি অংশ আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক সহযোগিতার পথকে জটিল করে তুলেছে।

এখানেই ইসরায়েলের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক বৈপরীত্য সামনে আসে। আরব নাগরিকেরা নির্বাচনে অংশ নেবেন, সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন, কিন্তু সরকার গঠন কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো বিতর্কিত।

সরকার গঠনে আরব দলগুলোর শর্ত ও রাজনৈতিক অবস্থান

জয়েন্ট লিস্টের নেতারা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন উগ্র দক্ষিণপন্থী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে তাঁদের অবস্থান নিঃশর্তভাবে কোনো বিরোধী জোটকে সমর্থন দেওয়ার পক্ষে নয়।

Manual3 Ad Code

হাদাশ ও কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, সরকার পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রকৃত পরিবর্তন আনবে। আরব নাগরিকদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার, সংগঠিত অপরাধ দমন, আরব পৌরসভাগুলোর উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি, আবাসনের অধিকার এবং দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও অস্বীকৃত আরব জনপদগুলোর স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

এর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দখলদারিত্বের অবসান হাদাশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাবির অন্যতম ভিত্তি।

অর্থাৎ, শুধু নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোই তাদের লক্ষ্য নয়; বরং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ফিলিস্তিন নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাও তাদের উদ্দেশ্য।

এই অবস্থান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—আরব দলগুলো আর কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ছোট রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের দেখতে চায় না। তারা রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়।

ইহুদি-আরব ঐক্য: রাজনীতির একটি বিকল্প দর্শন

ইসরায়েলের রাজনীতিতে ইহুদি ও আরব জনগণের মধ্যে বিভাজনকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিস্তার দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হাদাশের ইহুদি-আরব ঐক্যের রাজনীতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এটি শুধু একটি নির্বাচনী কৌশল নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে একটি বিকল্প প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শন।

এই দর্শনের ভিত্তি হলো—একটি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার অন্য জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করে নিশ্চিত করা যায় না। ইহুদি জনগণের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ইসরায়েলের শান্তিকামী ইহুদি, আরব নাগরিক, বামপন্থী সংগঠন, শ্রমজীবী মানুষ এবং গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর সংগ্রামেরও অংশ।

দমন-পীড়নের মধ্যেও কমিউনিস্টদের সংগ্রাম

ইসরায়েলে যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান এবং সরকারের সামরিক নীতির সমালোচনা নানা সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েছে।

কমরেড ওফের কাসিফসহ হাদাশের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে সংসদীয় ও রাজনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, প্রতিবাদী বক্তব্য এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে বাধা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, যুদ্ধের বিরোধিতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমালোচনা গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান।

কোনো রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে নয়; বরং বিরোধী মত, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তার মাধ্যমেও।

আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ: গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের নির্বাচনী অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে হতাশা, বৈষম্য, রাজনৈতিক অবিশ্বাস এবং প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে আরব ভোটারদের একটি অংশ নির্বাচনে অনাগ্রহী ছিল।

Manual8 Ad Code

কিন্তু যখন তাঁরা বৃহত্তর সংখ্যায় ভোট দিতে এগিয়ে আসেন এবং নিজেদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেন, তখন তা ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

এই বার্তা হলো, আরব নাগরিকদের উপেক্ষা করে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাঁরা শুধু ভোটার নন; তাঁরা রাষ্ট্রের নাগরিক, করদাতা, শ্রমজীবী মানুষ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সমান অংশীদার।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্যকে কেবল নেতানিয়াহুবিরোধী ভোটের ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর প্রতিবাদ, সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার দাবি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমতা এবং রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রগতিশীল এই পরিবর্তনকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী শান্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ, অবরোধ ও সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একইভাবে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার করে ইসরায়েলের নিরাপত্তাও দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা যাবে না।

হাদাশ ও ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘদিন ধরে এই বাস্তবতার ওপর জোর দিয়ে আসছে। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান হলো, সামরিক শক্তির পরিবর্তে রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা, আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে ভিত্তি করে সংকটের সমাধান করতে হবে।

এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

নতুন সম্ভাবনা, নাকি পুরোনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি?

ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে আরব দলগুলোর উত্থান এবং হাদাশের নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের সক্রিয়তা নিঃসন্দেহে একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রস্তুতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রগতিশীল মৌলিক পরিবর্তন আনার সক্ষমতার ওপর।

নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার গঠন করলেই যে ইসরায়েলের ফিলিস্তিন নীতি, আরব নাগরিকদের প্রতি বৈষম্য কিংবা দখলদারিত্বের প্রশ্নে মৌলিক পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ইসরায়েলের বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের একটি বড় অংশও জায়নবাদী রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতির সমর্থক।

সুতরাং প্রকৃত রাজনৈতিক প্রগতিশীল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন। আরব নাগরিকদের পূর্ণ সমতা, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, দখলদারিত্বের অবসান এবং ইহুদি-আরব জনগণের মধ্যে সমমর্যাদার অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়া সেই পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টি ও হাদাশের সামনে তাই ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে সংসদীয় রাজনীতিতে আরব জনগণের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা, অন্যদিকে ইহুদি ও আরব শ্রমজীবী মানুষের অভিন্ন স্বার্থে একটি বৃহত্তর জনগণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী আন্দোলন গড়ে তোলা।

সবশেষে বলা যায়, ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর উত্থান শুধু একটি নির্বাচনী ঘটনা নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নাগরিক সমতা এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে একটি বৃহত্তর লড়াইয়ের প্রতিফলন। এই লড়াইয়ে হাদাশ ও কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তারা এমন একটি ইসরায়েলের স্বপ্ন তুলে ধরছে, যেখানে ইহুদি ও আরব জনগণ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সমান অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের অংশীদার।

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথও শেষ পর্যন্ত সেখানেই—যুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যের রাজনীতির পরিবর্তে স্বাধীনতা, সাম্য, গণতন্ত্র এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; ’৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি; বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি।

ই-মেইল: syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : +8801716599589

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ