আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া একশ্রেণির অলিগার্ক!

প্রকাশিত: ৯:১১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২৬

আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া একশ্রেণির অলিগার্ক!

Manual6 Ad Code

বিপাশা চক্রবর্তী |

রক্ষীতাদের নিরাপদ শহর এখন ঢাকা! আইনি অভিযান বনাম ভাগবাটোয়ারা, কালো টাকা, গ্ল্যামার আর সব আমলের ‘রানিদের’ আসল খেলা!

ঢাকা এক অদ্ভুত অন্ধকার নগরীর নাম। এই শহরের
প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথাকথিত কঠোর পদক্ষেপ, অভিযান আর আইনের প্রয়োগের পেছনেও রহস্য থাকে।

শহরের কোনো উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বাসভবন, অভিজাত এলাকার প্রাইভেট ডিজে পার্টি, হাই-সোসাইটির আস্তানা আর বিলাসবহুল বারগুলোতে হঠাৎ যে আলোড়ন সৃষ্টিকারী রেইডগুলো আমরা দেখি তার শতকরা ৯৯ ভাগই ঘটে অভ্যন্তরীণ স্বার্থের সংঘাতের কারণে।

মাঝে মধ্যে এই রকম রেইডের যে খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এগুলো কোনো আইন প্রয়োগের সাফল্য নয়! এগুলো মূলত ভাগবাটোয়ারা, প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের চাঁদা আর প্রটেকশন মানির টানাপোড়েন। এবং ক্ষমতাসীনদের অভ্যন্তরীণ দখলদারিত্বের ফল। এক গ্রুপের সাথে অন্য গ্রুপের শেয়ার নিয়ে গ্যাঞ্জাম হলেই সেখানে রেইড পড়ে। আর সেই গ্যাঞ্জাম ও নতুন রেটে আপস মিটে গেলেই কয়েক দিন পর সব আবার আগের মতো স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে!

এসব অভিজাত আস্তানা, সিন্ডিকেট কোনো দিনই আইনভঙ্গ করে হুট করে গড়ে ওঠে না। স্থানীয় থানা, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও গোয়েন্দা সোর্সের যৌথ প্রটেকশন মানি আর নিয়মিত ফিক্সড মাসহারার বিনিময়ে এগুলো নিশ্চিন্তে চলে।

ধরুন, হঠাৎ কোনো পক্ষ তাদের চাহিদার চাঁদা বাড়িয়ে দিল। শেয়ারের ভাগ বাড়িয়ে দাবি করে বসল নির্ধারিত সময়ে কমিশন দিতে হবে। তা দিতে ব্যর্থ হলেই ওই আস্তানায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সফল অভিযান চালানো হয়! এটাকে আইন প্রয়োগ বলে না। এটা হলো বকেয়া আর নতুন রেট আদায়ের একটা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ।

ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার কেন্দ্রের ভেতরের বিভিন্ন বলয়ের মধ্যে কোনো ক্লাবের স্পনসরশিপ, লাইসেন্স, জমি, আস্তানা দখল নিয়ে গ্যাঞ্জাম কোন্দল শুরু হয়। তখন এক পক্ষ অপর পক্ষকে সাইজ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। কোনো পাওয়ারফুল সিন্ডিকেটকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। এসবের পেছনে থাকে অন্য কোনো ক্ষমতাধর গ্রুপকে বসানোর অভ্যন্তরীণ কুটিল খেলা।

সাধারণ মানুষের চোখে ধুলা দিয়ে এরপর মিটমাট সমীকরণ টানা হয়।

Manual3 Ad Code

জনগণের মধ্যে দুর্নীতি আর অর্থ পাচার নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে দেখা গেলে হঠাৎ মিডিয়ায় কোনো ইস্যু খুব গরম হয়ে ওঠে। মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে এসব মুখরোচক রেইড দারুণ কাজে দেয়।

কিন্তু শেষমেশ কী হয়? কয়েক দিন মিডিয়ায় গরম আলোচনা চলে। নাগরিকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখরোচক খোরাক পায়। আর পর্দার আড়ালে নতুন করে শেয়ারিং, চাঁদার অংক ও মালিকানার আপস নিশ্চিত হয়ে যায়। যেই গ্যাঞ্জাম মিটে যায় ওমনি সবকিছু আবার আগের চেয়েও দ্বিগুণ দম্ভে স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে!

Manual1 Ad Code

আবার কখনো কখনো পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ কোনো চাপের মুখে পড়লে নিম্নবিত্ত আর সাধারণ মানের কিছু বার, হোটেল, মোটেল, আর লো-প্রোফাইল ক্লাবেও লোকদেখানো রেইড দেয়। প্রেম করতে আসা নর নারীদের লকআপে ঢোকায়।

এর পেছনেও প্রটেকশন মানি আর কমিশনের হিসাব নিকাশের হেরফের কাজ করে। সাধারণ মানুষ ও মিডিয়া তখন সেটা নিয়েও গরম আলোচনা সেনসেশনে মত্ত হয়ে যাত। অথচ এটি সম্পূর্ণ একটি ধোঁয়াশা। স্মোকস্ক্রিন। আসল খেলা অন্যকিছু। মেগাপ্রজেক্টের লুটপাটের কালো টাকা তো ওই নিম্নমানের ক্লাবে হোটেলে থাকে না। তা থাকে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরায়।

Manual6 Ad Code

পুলিশের নাগালের বাইরে থাকা নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে। যেখানে সাধারণ তো দূরের কথা অনেক সময় আইনের রক্ষক বাহিনীরও ঢোকার সাধ্য থাকে না।

রাষ্ট্রের অর্থ লুট করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া একশ্রেণির অলিগার্ক, দুর্নীতিবাজ আমলা, ঠিকাদার ও পলাতক রাজনৈতিক প্রভুরা নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার জন্য  সুন্দরী রক্ষীতাদের নিয়ে গ্ল্যামার প্রক্সি কালচারকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। এরাই সুগার ড্যাডি।

ঢাকায় এখন সোশাল মিডিয়া ও করপোরেট কালচারের আড়ালে সুগার ড্যাডি খোঁজা হয়। এই যে সুগার ড্যাডির ক্রেজ চলছে এটাই বর্তমানের ট্রেন্ড। এর মূলে রয়েছে এই লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি। এখানে শ্রম ও মেধার কোনো মূল্যায়ন নেই।  সহজ উপায়ে বিলাসবহুল জীবন পাওয়ার অসুস্থ এই প্রতিযোগিতা তরুণ সমাজের একটি অংশকে গ্রাস করেছে।

যে সমাজে কোটি কোটি টাকার কালো টাকা এভাবেই গ্ল্যামারের চাদরে ঢেকে যায়। অবাধে ফুর্তি ও পাচারের কাজে ব্যবহৃত হয়। সে সমাজের নৈতিকতা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি একসময় ধ্বসে পড়তে বাধ্য। এই লাগামহীন অনাচার চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে অপরাধের মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? তা অনুমানও করা যায় না!

ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জীবন বাজি রাখে। কিন্তু এই গ্ল্যামার প্রক্সি ও রক্ষীতা সিন্ডিকেটের গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচড় লাগে না। তারা সব আমলেই রানি হয়ে বেঁচে থাকে!

বাংলাদেশের ফিল্ম / মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি কতটা ছোট তা আমরা জানি। এখানকার আর্টিস্টদের আর্থিক বাজার কতটা সীমিত, তাও সবারই জানা। বড় বড় কোনো কাজের প্রজেক্ট নেই। নিয়মিত সিনেমার বালাই নেই।  সামান্য কিছু শোরুম উদ্বোধন, দু-একটা বিজ্ঞাপনের মডেলিং, টুকটাক টক শো, ফ্যাশন শো, টিকটক, রিলস করে তথাকথিত নায়িকা মডেলরা কীভাবে হলিউড বলিউডের সুপারস্টারদের মতো জীবন যাপন করতে পারে?

Manual8 Ad Code

বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, ব্র্যান্ডের গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি আর রাজকীয় লাইফস্টাইল মেইনটেইন করে? সাধারণ হিসাব নিকাশ অনুযায়ী এই অংক কোনোভাবেই মেলে না। এর পেছনে যে অন্য কোনো শক্তিশালী আর্থিক উৎস আছে, ব্ল্যাক মানির ক্যাশ ফ্লো আছে, তা বুঝতে অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর তুমুল দ্বন্দ্ব আর ক্ষমতার বড় বড় পালাবদলেও এই লাক্সারি বাফারদের রাজত্বে কখনো ভাটা পড়ে না। বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা যেকোনো আমল। সব আমলেই এই সিন্ডিকেট সমানভাবে প্রভাবশালী মহলের প্রটেকশন পেয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে কোনো বিশেষ স্বার্থে আঘাত লাগলে,  কোনো বড় মাপের অলিগার্কের সাথে ব্যক্তিগত অথবা ক্ষমতার সংঘাতে ধাক্কা লাগলে (যেমন অতীতে কোন নায়িকার আলোচিত গ্রেপ্তারের ঘটনা) তখনই  লোকদেখানো সাময়িক ঝড় ওঠে। কিন্তু সেই ঝড় থিতিয়ে যেতে না যেতেই তারা আবার আগের চেয়েও বেশি দম্ভে বহাল তবিয়তে ফিরে আসে।

কারণ থলের বেড়াল ও পেটের খবর থাকে এই রক্ষীতা লাক্সারি বাফারের কাছে।
ব্ল্যাকমেইল ও সুরক্ষার অদৃশ্য দেয়ালের জন্য এই গ্ল্যামার প্রক্সিরা সব আমলেই সুরক্ষিত থাকে। ওদের কাছে রাষ্ট্রের ও রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গোপন খবরগুলো থাকে! বিভিন্ন দলের মন্ত্রী, প্রভাবশালী আমলা, শীর্ষ ব্যবসায়ী ও অলিগার্করা ঐ নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটগুলোতে সময় কাটান। তাদের ব্যক্তিগত জীবনের বহু গোপনীয়তা, অবৈধ লেনদেন এবং কে কোন কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত তার সব পেটের খবর ও থলের বেড়াল এই সুন্দরীদের জিম্মায় থাকে। ফলে ক্ষমতাসীন হোক আর ক্ষমতার বাইরে থাকা প্রভাবশালীরাই হোক, কেউ এই রক্ষীতাদের চটাতে সাহস পায় না। উলটো নিজেদের সিক্রেট ও ব্ল্যাকমেইল থেকে বাঁচতে অবৈধ সম্পদ টিকিয়ে রাখতেই এই প্রভাবশালী সুগার ড্যাডিরাই এদেরকে পেলে পুষে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখে।

ডিসক্লেইমার ????
এই লেখায় উপস্থাপিত পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, প্রশ্ন ও মতামত সম্পূর্ণ লেখক হিসেবে আমার নিজস্ব চিন্তা ও ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে রচিত। এখানে আলোচিত বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতাকে একটি সম্ভাব্য বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পী, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধ, অর্থপাচার, অনৈতিক সম্পর্ক, চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো চূড়ান্ত  প্রমাণিত অভিযোগ হিসেবে এই লেখাকে বিবেচনা করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভিত্তি হতে পারে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়া। লেখাটির উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়। অপরাধী সাব্যস্ত করাও নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতা, অর্থ, প্রভাব, সামাজিক বৈষম্য ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং জনপরিসরে আলোচনা তৈরি করা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ