আজ প্রখ্যাত আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হকের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী

প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

আজ প্রখ্যাত আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হকের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ : উপমহাদেশের শ্রদ্ধেয় আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌশলী ছিলেন মরহুম সিরাজুল হক-এর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ২৮ অক্টোবর পালিত হবে।

এ উপলক্ষে তার পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা এবং আখাউড়ায় স্থানীয় ছাত্র-রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে মিলাদ, দোয়া ও আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো — যা তাঁর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের স্মৃতি স্মরণ করবে এবং বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করাবে।

সংগ্রাম ও দায়বদ্ধতা

Manual7 Ad Code

সিরাজুল হক (জন্ম: ১ আগস্ট ১৯২৫, সাতক্ষীরা) ছিলেন আইন, রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জাগ্রত ব্যক্তিত্ব। তাঁর শিক্ষাজীবন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত; পরে ঢাকায় পুনরায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন। তিনি খুলনা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। পিতার কর্মসূত্রে সাতক্ষীরায় জন্ম হলেও তার পারিবারিক শিকড় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায়।

মুক্তিযুদ্ধ ও সর্বাধুনিক রাজনীতি — ভূমিকা ও অবদান

Manual8 Ad Code

সিরাজুল হক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লিপ্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে স্বাধীনতার প্রস্তুতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। সে সময় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল যখন জাতিসংঘে যায়, তখন তাঁর বক্তব্য ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পক্ষ সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Manual3 Ad Code

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গঠিত গণপরিষদের সংবিধান কমিটির একজন সদস্য ছিলেন তিনি — গঠনমূলকভাবে সংবিধানীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ করে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার নীতিমালা স্থাপনায় অবদান রেখেছেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কসবা-আখাউড়া আসনে এমপি নির্বাচিত হয়ে জনসেবায় সরাসরি ভূমিকা পালন করেন।

আইনি প্রতিভা ও মামলা-বিস্তার

সিরাজুল হক ছিলেন উপমহাদেশের খ্যাতনামা আইনজীবী। ৮ জানুয়ারি ১৯৫৭ সালে হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে সনদ লাভ করেন; পরে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘকালীন ও সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধান ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে তিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা তৎকালীন রাজনৈতিক-আইনি প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট ছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো ইতিহাস-সংক্রান্ত ও সংবেদনশীল মামলা থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে থাকা মামলায় তিনি রায় ও আইনি কৌশলে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৮২ সালে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে মার্শাল ল’–এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর কারণে ১০ অক্টোবর ১৯৮২-এ তাকে আটক করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিল — যা তার রাজনৈতিক সাহস ও নৈতিকতার প্রকাশ করে।

Manual6 Ad Code

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা — রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌশলী

১৯৯৬ সাল থেকে জীবনভর তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জেল হত্যা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের চিফ স্পেশাল প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাস ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এই মামলার গুরুত্ব অপরিসীম; সঠিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনা এবং আইনি কৌশল প্রয়োগে তাঁর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। জাতির ইতিহাসে আপন জনহিতকর এই কাজটি তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

জনগণের নেতা ও সংসদ সদস্য

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি কসবা-বুড়িচং এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এমএনএ নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে কুমিল্লা-৪ (বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪, কসবা-আখাউড়া) থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি স্থানীয় উন্নয়ন, কৃষি ও শিক্ষা সংক্রান্ত কাজকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের আহ্বানে যে বৈঠক হয়, তাতে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে উক্ত অনুষ্টানে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ ব্যক্ত করেন — এটি ছিল তাঁর নৈতিক স্পষ্টবচন ও দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয়।

ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার

সিরাজুল হক ছিলেন বেগম জাহানারা হকের স্বামী; দাম্পত্য জীবনে তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যার জনক। তাঁর বড় পুত্র ও সরকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আনিসুল হক — যিনি পরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সিরাজুল হকের জ্যেষ্ঠ সন্তান ও কন্যা সায়মা ইসলাম, এবং ছোট পুত্র আরিফুল হক রনি— উভয়ই পরলোকগমন করেছেন। মহামান্য সাহসী সহধর্মিণী বেগম জাহানারা হক ১৭ এপ্রিল ২০২০ সালে ইন্তেকাল করেন; তাঁকেও বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে। মরহুম সিরাজুল হক নিজেও ২৮ অক্টোবর ২০০২ সালে মৃত্যুবরণ করেন এবং বনানী কবরস্থানে সমাহিত।

স্বীকৃতি ও সম্মান

তার প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক অবদানকে সম্মান জানিয়ে ২০২২ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয় — যা তাঁর জীবনের আন্দোলন ও ত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে গুরুত্ব বহন করে।

স্মরণসভা ও স্থানীয় কর্মসূচি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়া উপজেলায় স্থানীয়ভাবে মিলাদ, দোয়া ও আলোচনা সভার মাধ্যমে তাঁর স্মরণে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। স্থানীয় সমাজকর্মীরা অংশগ্রহণ করবেন এবং সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মসূচি থাকবে — যেখানে মরহুমের জীবনী, স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান, বিচার-আইনি ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব ও সমকালীন পাঠ তুলে ধরা হবে। (স্থানীয় দৈনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিস্তারিত কর্মসূচি প্রকাশিত হবে।)

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষা

সিরাজুল হকের জীবন রাজনৈতিক আদর্শ, নৈতিকতা ও আইনি সমস্যার প্রতি অটল দায়িত্ব—এই তিনদিকেই নজির স্থাপন করে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশের সংবিধান রচনায় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সততা দেখানো—এই সবই বর্তমান ও আগামি প্রজন্মের জন্য আদর্শ। তাঁর জীবনের ঘটনাবলী ইতিহাস সমীক্ষায় পাঠ্যাংশ হিসেবে কাজ করবে এবং তরুণ আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হবে।

উপসংহার

সিরাজুল হক কেবল একজন আইনজীবী ছিলেন না; তিনি একটি আদর্শের নাম, সাহসিকতা ও নৈতিকতার প্রতীক। ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশ তাঁর কাছে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাচ্ছে এবং ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী অবদান স্মরণ করছে। আজ কসবা ও আখাউড়ার অনুষ্ঠানে তার স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও দোয়া-মিলাদ হবে—এগুলো শুধুই স্মরণ নয়, একই সঙ্গে জাতির কাছে তাঁর আদর্শকে টিকিয়ে রাখার এক প্রত্যয়ও হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ