চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে মাখন লাল কর্মকার ছিলেন প্রাতঃস্মরণীয়: সৈয়দ আমিরুজ্জামান

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে মাখন লাল কর্মকার ছিলেন প্রাতঃস্মরণীয়: সৈয়দ আমিরুজ্জামান

Manual8 Ad Code
  • চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাখন লাল কর্মকার স্মরণে শোক সভা

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : চা শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও জীবনমানের উন্নয়নের দাবিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি. নং বি-৭৭) সভাপতি ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাখন লাল কর্মকারের স্মরণে শ্রীমঙ্গলে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুর ১২টায় শ্রীমঙ্গল শহরের বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সদর দপ্তর লেবার হাউসের সভাকক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে এ শোকসভার আয়োজন করা হয়। সভার শুরুতে প্রয়াত শ্রমিক নেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপস্থিত সবাই এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন।

শোকসভায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ, বালিশিরাসহ সাত ভ্যালির প্রতিনিধি, বিভিন্ন চা-বাগানের পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন।

শোকসভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

মাখন লাল কর্মকারের দীর্ঘ শ্রমিক-সাংগঠনিক জীবনের কথা স্মরণ করে সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, চা শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য দাবির আন্দোলনের ইতিহাসে মাখন লাল কর্মকার প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তিনি বলেন, “দীর্ঘ জীবনে মাখন লাল কর্মকার চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, জীবনমানের উন্নয়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের চা শ্রমিক অঙ্গন, শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।”

তিনি আরও বলেন, মাখন লাল কর্মকার ছিলেন চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পরিচিত মুখ। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে থেকে তিনি দীর্ঘদিন চা শ্রমিকদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করেছেন। শ্রমিকদের সংগঠিত করা, তাদের সমস্যা ও দাবি কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে তুলে ধরা এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, শ্রমিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মাখন লাল কর্মকার জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

Manual3 Ad Code

তিনি বলেন, চা অধ্যুষিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকার শ্রমিকদের কাছে মাখন লাল কর্মকার ছিলেন পরিচিত ও আস্থাভাজন নেতা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও শ্রমিক-সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে চা শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, অধিকার ও ন্যায্য দাবির বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

শোকসভায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা বলেন, “বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আমরা আজ এই শোকসভা পালন করছি। মাখন লাল কর্মকার দীর্ঘদিন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনারা জানেন, দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সংগঠনের সংগ্রামী পথচলায় মাখন লাল কর্মকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।”

তিনি বলেন, “মাখন লাল কর্মকার ছিলেন একজন বলিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ শ্রমিক নেতা। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। আমরা প্রার্থনা করি, পরমেশ্বর যেন তাঁকে শান্তিতে রাখেন এবং তাঁর আত্মার শান্তি দান করেন। তাঁর কর্ম ও স্মৃতি চিরঞ্জীব হোক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি চা শ্রমিকদের জন্য অনেক কিছু করে গেছেন। তাঁর অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব।”

Manual1 Ad Code

শোকসভায় বক্তারা বলেন, চা শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, মজুরি, কর্মপরিবেশ ও বিভিন্ন ন্যায্য দাবির প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে মাখন লাল কর্মকার যুক্ত ছিলেন। শ্রমিক সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে তিনি চা শ্রমিকদের দাবিগুলোকে সাংগঠনিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রমিক-সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতিও বক্তারা তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ এ কন্দের সভাপতিত্বে শোকসভায় আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, বালিশিরা ভ্যালির সম্পাদক কর্ণ তাঁতী, লংলা ভ্যালির সভাপতি শহিদুল ইসলাম, ইউনিয়ন প্রতিনিধি সুমন তাঁতী, চা শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার, মাকড়ীছড়া চা বাগানের কাশিনারায়ন গড়, সাতগাঁও চা বাগানের কাজল কালেন্দি, মধুপুর চা বাগানের গোপাল গড়, কামাইছড়া চা বাগানের বিমল ভর, দারাগাঁও চা বাগানের প্রেমলাল আহির, ফুলছড়া চা বাগানের জগবন্ধু রায়, রাজঘাট চা বাগানের পলাশ বোনার্জী, নূর হোসেন, উজ্জ্বল দাস, সরফরাজ সাজু ও সুভাষ রবিদাসসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

বক্তারা প্রয়াত এই শ্রমিক নেতার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে চা শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যায্য দাবির আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।

সংগ্রামী শ্রমিক নেতা মাখন লাল কর্মকার

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন নম্বর বি-৭৭-এর সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সংগ্রামী নেতা ছিলেন মাখন লাল কর্মকার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চা শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি নিয়ে তিনি কাজ করেছেন।

Manual3 Ad Code

চা শ্রমিকদের সংগঠিত করা এবং তাঁদের বিভিন্ন দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন বলে শোকসভায় বক্তারা উল্লেখ করেন।

শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্বের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তাঁর একটি দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

চা-বাগান অধ্যুষিত শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিনের শ্রমিক ও রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় চা শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর চা শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিকদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে বলে সংগঠনের নেতারা জানান।

৬২ বছর বয়সে মৃত্যু

মাখন লাল কর্মকার গত ১৫ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল উপজেলার খেজুরিছড়া চা-বাগানে নিজ বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও চার মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক ও পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা শোক প্রকাশ করেছেন। শোকসভায় বক্তারা তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রয়াত এই শ্রমিক নেতার কর্মময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

Manual4 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ