সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান, কিন্তু লেখক সম্মানী কী একটি ঐচ্ছিক বিষয়

প্রকাশিত: ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬

সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান, কিন্তু লেখক সম্মানী কী একটি ঐচ্ছিক বিষয়

Manual1 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

লেখক পান কী? কলমের দাম কোথায়? লেখক সম্মানী কি বিলাসিতা, নাকি সৃজনশীল শ্রমের ন্যায্য মূল্য?

একটি পত্রিকার সাহিত্যপাতা প্রকাশের দিন পাঠকের চোখে প্রথমে যে বিষয়টি ধরা পড়ে, তা হলো লেখার শিরোনাম, লেখকের নাম এবং পত্রিকার পরিচিতি। কিন্তু এই কয়েকটি শব্দের আড়ালে যে দীর্ঘ শ্রম, চিন্তা, পাঠ, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতার সমন্বয় থাকে, তার আর্থিক মূল্য নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের জগতে লেখকের সম্মানী এখনো যেন একটি ঐচ্ছিক বিষয়। কোথাও সম্মানী দেওয়া হয়, কোথাও সামান্য; আবার বহু ক্ষেত্রেই লেখককে জানিয়ে দেওয়া হয়—‘আপনার লেখা প্রকাশিত হয়েছে, এটিই তো বড় সম্মান।’

কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রকাশিত হওয়াই কি লেখকের শ্রমের একমাত্র মূল্য?

একটি পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি লেখা সংগ্রহ করেন, বাছাই করেন, সম্পাদনা করেন, লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, পৃষ্ঠা পরিকল্পনা করেন, বিভাগ পরিচালনা করেন। এসব কাজের বিনিময়ে তিনি বেতন বা পারিশ্রমিক পান—এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর শ্রমকে প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি দেয়।

তাহলে যে লেখক তাঁর সময়, মেধা, অভিজ্ঞতা, কল্পনা ও সৃষ্টিশীল শ্রম দিয়ে সেই সাহিত্যপাতার মূল উপাদান তৈরি করেন, তাঁর প্রাপ্য কী?

Manual5 Ad Code

এই প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বরং এটি আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ও প্রকাশনা-চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

লেখার মূল্য নেই, নাকি লেখকের শ্রমের মূল্য নেই? প্রকাশিত হওয়াই কি লেখকের সম্মানী?

বাংলাদেশে এখনো এমন একটি ধারণা প্রচলিত—কোনো জাতীয় দৈনিক বা প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হওয়াই লেখকের জন্য যথেষ্ট সম্মান। লেখক তাঁর লেখা প্রকাশিত দেখে আনন্দিত হবেন, নিজের নাম ছাপা দেখে গর্বিত হবেন, আর্থিক পারিশ্রমিকের কথা তুলবেন না—এমন একটি অলিখিত প্রত্যাশা যেন অনেক জায়গায় কাজ করে।

কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে একটি মৌলিক সমস্যা আছে।

একজন লেখক একটি নিবন্ধ লিখতে হয়তো কয়েক ঘণ্টা সময় দেন। কোনো কোনো লেখা তৈরির পেছনে লাগে কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ, কখনো মাসের পর মাস। তথ্য সংগ্রহ, বই পড়া, সাক্ষাৎকার নেওয়া, নথি যাচাই, বিষয় নিয়ে চিন্তা করা, খসড়া তৈরি, পুনর্লিখন, ভাষা সম্পাদনা—সব মিলিয়ে একটি ভালো লেখা তৈরি করা মোটেই বিনা শ্রমের কাজ নয়।

একজন সাংবাদিকের প্রতিবেদনের জন্য যদি প্রতিষ্ঠান পারিশ্রমিক দেয়, একজন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রীর ছবির জন্য যদি অর্থ দেওয়া হয়, একজন ডিজাইনারের নকশার মূল্য নির্ধারিত হয়, একজন অনুবাদকের অনুবাদকে পারিশ্রমিকযোগ্য কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে একজন লেখকের সৃষ্টিশীল শ্রমকে কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনামূল্যের শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হবে?

সৃষ্টিশীল শ্রমেরও মূল্য আছে। শুধু শ্রমটি শারীরিক নয় বলে তার মূল্য শূন্য হতে পারে না।

একটি লেখা তৈরি হয় কীভাবে?

আমরা যখন পত্রিকার পাতায় একটি লেখা পড়ি, তখন সাধারণত শুধু কয়েক হাজার শব্দ দেখি। কিন্তু লেখক সেই শব্দগুলোর পেছনে নিজের সময়ের একটি অংশ বিনিয়োগ করেছেন।

একজন লেখকের পুঁজি তাঁর কলম, কিন্তু কলমের পেছনে রয়েছে তাঁর জীবনভর অর্জিত জ্ঞান।

একটি প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে লেখক হয়তো অসংখ্য বই পড়েছেন। বহু পুরোনো তথ্য খুঁজে বের করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তথ্যের মিল খুঁজেছেন। এরপর সেই সবকিছুকে একটি সুসংহত ভাষায় পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

একজন কথাসাহিত্যিক একটি গল্প লিখতে গিয়ে যে কল্পনার জগৎ নির্মাণ করেন, সেটিও হঠাৎ করে তৈরি হয় না। তাঁর পাঠ, জীবনবোধ, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সৃজনশীল অনুশীলন সেই গল্পের ভিত তৈরি করে।

একজন কবির কয়েকটি পঙ্‌ক্তির পেছনেও থাকতে পারে দীর্ঘ সাধনা।

পাঠক হয়তো একটি কবিতা পড়তে পাঁচ মিনিট সময় দেন। কিন্তু কবিতাটি লিখতে কবির পাঁচ মাসও লেগে থাকতে পারে।

তাই কোনো লেখার শব্দসংখ্যা দিয়ে তার শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো—চূড়ান্ত ফলাফলটি ছোট হতে পারে, কিন্তু তার পেছনের প্রস্তুতি দীর্ঘ হতে পারে।

পত্রিকা কি শুধু কাগজ বিক্রি করে?

সংবাদপত্রের অর্থনীতি বদলে গেছে। মুদ্রিত পত্রিকার পাশাপাশি এখন অনলাইন সংস্করণ, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব মিলিয়ে সংবাদ ও কনটেন্টের একটি বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে।

পাঠক সংবাদপত্র কেনেন মূলত তথ্য, বিশ্লেষণ, মতামত ও বিনোদনের জন্য। আর এসব কনটেন্টের বড় অংশ তৈরি করেন লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক, অনুবাদক, আলোকচিত্রী ও অন্যান্য সৃজনশীল মানুষ।

অর্থাৎ কনটেন্টই সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান সম্পদ।

তাহলে সেই কনটেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যাঁরা তৈরি করেন, তাঁদের শ্রমকে ‘স্বেচ্ছাসেবী’ ধরে নেওয়ার সংস্কৃতি কতটা যৌক্তিক?

অবশ্যই সব লেখার জন্য একই হারে সম্মানী দেওয়া সম্ভব নয়। ছোট পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, সাংস্কৃতিক সংগঠন বা সীমিত বাজেটের প্রকাশনার বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক সম্পাদক ব্যক্তিগত উদ্যোগে পত্রিকা প্রকাশ করেন, নিজের পকেট থেকে খরচ চালান। তাঁদের সীমাবদ্ধতাও বাস্তব।

কিন্তু সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অবস্থান এক বিষয় নয়।

কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সত্যিই সম্মানী দিতে না পারে, তাহলে লেখকের সঙ্গে সেটি স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে। লেখক তখন নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু ‘প্রকাশিত হওয়াই সম্মানী’—এই ধারণাকে একটি সার্বজনীন নীতি বানানো সমস্যাজনক।

সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান—এ প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সাহিত্য সম্পাদক বেতন পান—এটি কোনো অন্যায় নয়। বরং তিনি যদি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর যথাযথ পারিশ্রমিক পাওয়া সম্পূর্ণ ন্যায্য।

প্রশ্নটি হলো, একটি সাহিত্যপাতা পরিচালনার জন্য যদি প্রতিষ্ঠানের বাজেট থাকে, তাহলে সেই পাতার মৌলিক উপাদান—লেখা—তৈরির জন্য লেখকের জন্য কোনো বাজেট থাকবে না কেন?

একজন সম্পাদক লেখা সম্পাদনা করেন, কিন্তু লেখাটি তো আগে কাউকে লিখতে হয়।

সম্পাদক প্রয়োজনীয়। লেখকও প্রয়োজনীয়।

একজন পৃষ্ঠা সাজান, অন্যজন পৃষ্ঠার বিষয়বস্তু তৈরি করেন। একজন প্রকাশনার কাঠামো পরিচালনা করেন, অন্যজন সেই কাঠামোর প্রাণ জোগান।

তাহলে পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে এত বৈষম্য কেন?

এখানে বিষয়টি ‘সম্পাদক বনাম লেখক’ নয়। বরং প্রতিষ্ঠান এবং সৃজনশীল শ্রমের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন।

যে শ্রম প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়ার অংশ, তার মূল্য স্বীকার করা উচিত।

‘নাম ছাপা হয়েছে’—এই যুক্তির সমস্যা কোথায়?

লেখকদের প্রায়ই বলা হয়, ‘আপনার লেখা তো জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে আপনার পরিচিতি বাড়বে। এটাই আপনার লাভ।’

পরিচিতি অবশ্যই একটি মূল্যবান বিষয়। একজন লেখকের জন্য পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হলে লেখকের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচিতি বাড়তে পারে।

কিন্তু পরিচিতি এবং পারিশ্রমিক একে অপরের বিকল্প নয়।

একজন কর্মীকে যদি বলা হয়, ‘আপনার কাজের বিনিময়ে টাকা দিতে পারব না, তবে আপনার নাম অফিসের ওয়েবসাইটে থাকবে’—তাহলে বিষয়টি কেমন শোনাবে?

একজন আলোকচিত্রীকে যদি বলা হয়, ‘আপনার ছবি আমরা প্রকাশ করব, আপনার নামও দেব, তাই টাকা লাগবে না’—এটি কি স্বাভাবিক বলে মনে হবে?

একজন অনুবাদককে যদি বলা হয়, ‘আপনার অনুবাদ বইয়ে ছাপা হবে—এটাই আপনার সম্মান’—তাহলে কি তাঁর শ্রমের মূল্য পরিশোধ করা হয়ে যায়?

তাহলে লেখকের ক্ষেত্রে এই যুক্তি এত সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় কেন?

লেখকের পরিচিতি তাঁর অধিকার হতে পারে, কিন্তু তাঁর শ্রমের মূল্য নয়।

সম্মানী শব্দটির গুরুত্ব

‘পারিশ্রমিক’ শব্দটির পাশাপাশি সাহিত্যে ‘সম্মানী’ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয়। শব্দটি সুন্দর। এর মধ্যে সম্মানের একটি অনুভূতি আছে।
কিন্তু সম্মানীকে শুধু সৌজন্য হিসেবে দেখলে চলবে না।

সম্মানী আসলে লেখককে একটি বার্তা দেয়—‘আপনার শ্রমের মূল্য আছে।’

অর্থের পরিমাণ সব সময় বড় হতে হবে, এমন নয়। একটি প্রতিষ্ঠিত দৈনিক যে পরিমাণ দিতে পারে, একটি ছোট সাহিত্যপত্র হয়তো তা পারবে না। কিন্তু নিয়মিত ও স্বচ্ছ একটি সম্মানী নীতি থাকলে লেখক বুঝতে পারেন, তাঁর কাজকে প্রতিষ্ঠান মূল্য দেয়।

অনেক সময় অল্প পরিমাণ সম্মানীও লেখকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সেটি অর্থের অঙ্কের চেয়েও বড় একটি স্বীকৃতি বহন করে।

একটি খাম, একটি ব্যাংক ট্রান্সফার কিংবা একটি সম্মানী বার্তা লেখককে জানিয়ে দেয়—তাঁর কলমকে বিনামূল্যের শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

লেখালেখি কি পেশা হতে পারে না?

বাংলাদেশে লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন—এ কথা সত্য। অধিকাংশ লেখকেরই লেখালেখির বাইরে অন্য পেশা রয়েছে।

কিন্তু এই বাস্তবতা তৈরি হয়েছে আংশিকভাবে আমাদের প্রকাশনা-সংস্কৃতির কারণেও।

যেখানে লেখকের লেখা নিয়মিত বিনা পারিশ্রমিকে প্রকাশিত হয়, সেখানে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সংকুচিত হয়।

অন্যদিকে, যদি পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ওয়েবসাইট ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে লেখার জন্য সম্মানী দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তাহলে লেখকের সৃজনশীল শ্রমও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করবে।

এর ফলে তরুণ লেখকরাও উৎসাহিত হবেন।

আজ একজন তরুণ লেখক যদি তাঁর একটি ভালো নিবন্ধ লিখে কয়েকশ বা কয়েক হাজার টাকা সম্মানী পান, সেটি হয়তো তাঁকে পরবর্তী লেখা লিখতে অনুপ্রাণিত করবে। কয়েক বছর পর সেই লেখক আরও ভালো লিখবেন, আরও বেশি পাঠক তৈরি করবেন, আর প্রকাশনাও লাভবান হবে।

অর্থাৎ লেখককে সম্মানী দেওয়া শুধু লেখকের জন্য নয়; এটি প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যতের জন্যও বিনিয়োগ।

লেখক তো শখে লেখেন’—এই ধারণা বদলাতে হবে

লেখককে বিনা পারিশ্রমিকে লেখানোর পেছনে আরেকটি প্রচলিত যুক্তি হলো—‘লেখকরা তো শখে লেখেন।’

Manual7 Ad Code

অনেক লেখক সত্যিই ভালোবাসা থেকে লেখেন। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে আবেগ, আনন্দ এবং আত্মতৃপ্তি জড়িয়ে থাকে।

কিন্তু কোনো কাজ ভালোবাসা থেকে করা হয় বলেই তার শ্রমমূল্য থাকবে না—এমন যুক্তি পৃথিবীর অন্য কোনো পেশায় আমরা গ্রহণ করি না।

একজন সংগীতশিল্পী গান ভালোবাসেন। তাই বলে তাঁর পারিশ্রমিক থাকবে না?

একজন আলোকচিত্রী ছবি তুলতে ভালোবাসেন। তাই বলে তাঁর কাজ বিনামূল্যে নেওয়া হবে?

একজন শিক্ষক পড়াতে ভালোবাসেন। তাই বলে তাঁর বেতন থাকবে না?

তাহলে লেখককে কেন বলা হবে—‘আপনি তো লিখতে ভালোবাসেন’?

ভালোবাসা শ্রমের মূল্য বাতিল করে না।

বরং একজন লেখক ভালোবাসা থেকেই লিখছেন বলেই তাঁর সৃষ্টিশীল শ্রমের প্রতি আরও বেশি সম্মান থাকা উচিত।

সম্মানীর অভাবে কী হয়?

লেখকের সম্মানী না দেওয়ার সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু লেখকের পকেটে হয় না; ক্ষতি হয় পুরো সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে।

যে লেখক দীর্ঘদিন ধরে বিনা পারিশ্রমিকে লিখতে বাধ্য হন, একসময় তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা লেখালেখিকে পেশা বা আংশিক পেশা হিসেবে নিতে চান, তাঁদের জন্য এটি বড় প্রতিবন্ধকতা।

এর ফলে ভালো লেখক অন্যত্র চলে যেতে পারেন। অনেকে নিয়মিত লেখা বন্ধ করে দিতে পারেন। কেউ কেউ কেবল এমন প্ল্যাটফর্মে লিখবেন যেখানে অন্তত কিছু পারিশ্রমিক পাওয়া যায়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল মানুষ লেখালেখিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় দিতে পারেন; কিন্তু মেধাবী অথচ আর্থিকভাবে অসচ্ছল তরুণ লেখকের জন্য এই ক্ষেত্রটি কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে সৃজনশীল জগতে বৈচিত্র্যও কমে যেতে পারে।

লেখক সম্মানী তাই শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়; এটি সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নও।

জাতীয় পত্রিকার দায়িত্ব

জাতীয় পর্যায়ের সংবাদপত্রের ভূমিকা শুধু সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা সমাজের রুচি গঠন করে, মতামতের ক্ষেত্র তৈরি করে, নতুন লেখককে পাঠকের সামনে তুলে ধরে এবং সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

তাই তাদের কাছ থেকে একটি ন্যূনতম পেশাদার নীতি প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক নয়।

প্রতিটি পত্রিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা আছে। কিন্তু তারা চাইলে একটি স্বচ্ছ সম্মানী কাঠামো তৈরি করতে পারে।

যেমন—

– নিবন্ধের জন্য নির্দিষ্ট সম্মানী;
– গল্প ও কবিতার জন্য আলাদা সম্মানী কাঠামো;
– অনুবাদের জন্য আলাদা হার;
– বিশেষ সংখ্যা বা দীর্ঘ গবেষণাধর্মী লেখার জন্য অতিরিক্ত সম্মানী;
– অনলাইন ও মুদ্রিত সংস্করণের ব্যবহারের নীতিমালা;
– লেখকের অনুমতি ছাড়া পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতি;
– সম্মানী প্রদানের সময়সীমা ও পদ্ধতি নির্ধারণ।

এসব ব্যবস্থা রাতারাতি সব প্রতিষ্ঠানে চালু করা সম্ভব নয়। কিন্তু আলোচনা শুরু করা সম্ভব।

আর আলোচনা শুরু করার জন্যই প্রশ্নটি তুলতে হবে।

লেখকেরও কিছু দায়িত্ব আছে

লেখকের অধিকার নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি লেখকের দায়িত্বের কথাও বলা দরকার।

একজন লেখককে অবশ্যই মৌলিক ও নির্ভরযোগ্য লেখা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তথ্যভুল, চৌর্যবৃত্তি, অনুমতিহীন অনুবাদ, অন্যের লেখা নিজের নামে প্রকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্য কোনো উৎস থেকে নেওয়া বিষয় গোপন করা—এসবের বিরুদ্ধে লেখককেও নৈতিক অবস্থান নিতে হবে।

সম্মানী দাবি করার অর্থ এই নয় যে লেখক তাঁর দায় থেকে মুক্ত। বরং সম্পর্কটি হওয়া উচিত পারস্পরিক।

পত্রিকা লেখকের শ্রমকে সম্মান করবে; লেখকও পত্রিকার পেশাদার মান, সময়সীমা ও সম্পাদকীয় নীতি সম্মান করবেন।

এই পারস্পরিক সম্মানই একটি সুস্থ প্রকাশনা সংস্কৃতির ভিত্তি।

সম্মানী নির্ধারণে স্বচ্ছতা দরকার

অনেক সময় লেখক জানেনই না তাঁর লেখা প্রকাশের জন্য কোনো সম্মানী আছে কি না। প্রকাশের পরও তাঁকে আলাদা করে জানতে হয়। কোথাও সম্মানী আছে, কিন্তু কত—তা পরিষ্কার নয়। কোথাও কয়েক মাস পর অর্থ দেওয়া হয়। কোথাও লেখককে বারবার যোগাযোগ করতে হয়।

এ ধরনের অনিশ্চয়তা দূর করা জরুরি।

একটি পত্রিকা তার ওয়েবসাইট বা লেখক নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে জানাতে পারে—কোন ধরনের লেখার জন্য তারা সম্মানী দেয় এবং কীভাবে দেয়।

এতে লেখকও তাঁর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। স্বচ্ছতা পেশাদারিত্বের অন্যতম শর্ত। সম্মানী কত হবে—সেটিই কি মূল প্রশ্ন?

এখানে কেউ বলতে পারেন, ‘সম্মানী দেব, কিন্তু কত দেব?’এই প্রশ্নের সহজ কোনো একক উত্তর নেই।

Manual7 Ad Code

পত্রিকার আকার, প্রচারসংখ্যা, বিজ্ঞাপন আয়, ডিজিটাল আয়, লেখার ধরন, দৈর্ঘ্য, গবেষণার মাত্রা—বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

তবে ‘কত’ প্রশ্নটির আগে আসা উচিত ‘দেব কি না’ প্রশ্নটি।
কারণ সম্মানীর পরিমাণ নিয়ে দর-কষাকষি হতে পারে; কিন্তু লেখকের শ্রমের মূল্য স্বীকার করা হবে কি না—এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন।

আজ হয়তো সম্মানী কম। আগামী দিনে তা বাড়তে পারে। কিন্তু যদি শুরুতেই বলা হয়—‘লেখার কোনো মূল্য নেই’, তাহলে উন্নতির পথটিই বন্ধ হয়ে যায়।

পাঠকেরও ভূমিকা আছে

আমরা পাঠকরাও এই ব্যবস্থার অংশ। আমরা যখন একটি পত্রিকা কিনি, ওয়েবসাইটে যাই, বিজ্ঞাপন দেখি, সাবস্ক্রিপশন করি কিংবা কোনো লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করি, তখন আমরা সেই কনটেন্টের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হই।

তাই পাঠকেরও প্রশ্ন করা উচিত—যে লেখাটি আমি পড়ছি, তার লেখক কি তাঁর শ্রমের মূল্য পেয়েছেন?

শুধু লেখকের নাম দেখে প্রশংসা করা যথেষ্ট নয়। একটি সুস্থ সাহিত্য ও প্রকাশনা সংস্কৃতির জন্য লেখকের শ্রমের সামাজিক মূল্যও স্বীকার করতে হবে।

‘কলমের দাম’ বলতে কী বোঝায়?

কলমের দাম বলতে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বোঝানো হচ্ছে না।

কলমের দাম মানে হলো—লেখকের সময়ের দাম আছে। তাঁর চিন্তার দাম আছে। তাঁর গবেষণার দাম আছে। তাঁর অভিজ্ঞতার দাম আছে। তাঁর কল্পনার দাম আছে। তাঁর ভাষা নির্মাণের শ্রমের দাম আছে।
এবং সর্বোপরি, তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রতি সমাজের দায় আছে।

একজন লেখক যখন একটি লেখা প্রকাশের জন্য পত্রিকার কাছে পাঠান, তখন তিনি শুধু কয়েকটি শব্দ পাঠান না। তিনি তাঁর চিন্তার একটি অংশ পাঠকের হাতে তুলে দেন।

সেই চিন্তা যদি পত্রিকার পাঠকসংখ্যা বাড়ায়, ওয়েবসাইটের ভিজিট বাড়ায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠকের আগ্রহ তৈরি করে, পত্রিকার সাহিত্যপাতাকে সমৃদ্ধ করে—তাহলে সেই সৃষ্টিশীল শ্রমের কোনো মূল্য থাকবে না কেন?

লেখককে দয়া নয়, অধিকার দিতে হবে

লেখক সম্মানীর দাবি কোনো দয়ার আবেদন নয়।
এটি করুণার বিষয়ও নয়।
এটি লেখকের অধিকার নিয়ে আলোচনার বিষয়।

অবশ্যই প্রত্যেক লেখার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। সাহিত্য ও শিল্পের মূল্যকে পুরোপুরি টাকায় মাপাও সম্ভব নয়। একটি কবিতা হয়তো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, একটি গল্প হয়তো একটি প্রজন্মকে ভাবতে শেখাতে পারে, একটি প্রবন্ধ হয়তো সমাজের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনতে পারে।

এসবের মূল্য অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

কিন্তু অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না বলেই অর্থনৈতিক মূল্য শূন্য হবে—এই যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়।

একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি লেখা কনটেন্ট; একজন লেখকের জন্য সেটি শ্রম।

এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে স্বীকার করেই একটি ন্যায্য সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।

একটি সম্মানী-সংস্কৃতি গড়ে উঠুক

বাংলাদেশে লেখক সম্মানী নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। সাহিত্য সংগঠন, লেখকসমাজ, সম্পাদক, প্রকাশক, সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ এবং পাঠকদের এই বিষয়ে কথা বলতে হবে।

প্রতিটি পত্রিকা হয়তো একই হারে সম্মানী দিতে পারবে না। কিন্তু অন্তত একটি নীতিগত অবস্থান নেওয়া সম্ভব—

লেখা বিনামূল্যের কনটেন্ট নয়।
যে প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশ করে, তার বাজেটে লেখকের জন্যও একটি নির্দিষ্ট অংশ থাকা উচিত।

হয়তো আজ সেই অর্থ খুব বেশি নয়। কিন্তু নিয়মিত সম্মানী দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে ধীরে ধীরে লেখকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানও বদলাবে।

তরুণ লেখক বুঝবেন, তাঁর লেখার মূল্য আছে।

প্রবীণ লেখক বুঝবেন, তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনের শ্রমকে প্রতিষ্ঠান সম্মান করছে।

আর পাঠক বুঝবেন, একটি লেখা পত্রিকার পাতায় পৌঁছানোর পেছনে একজন মানুষের শ্রম রয়েছে।

“কলমেরও দাম আছে”

কলম শুধু কলম নয়, তার ভেতরে প্রাণ,
জীবনভরা সাধনা আর স্বপ্নেরই গান।
একটি লেখা জন্ম নিতে কত রাত যে যায়,
কত দিনের সঞ্চিত কথা শব্দ হয়ে গায়।

কাগজ জুড়ে নামটি থাকে, থাকে কয়েক লাইন,
কেউ কি দেখে শব্দগুলোর পেছনে কত ঋণ?
কত বইয়ের পাতায় খোঁজা, কত তথ্যভার,
কত রাতের নির্ঘুম চোখ, কত ভাবনার পার।

কবির একটি পঙ্‌ক্তিতে কত যুগের সাধ,
গল্পকারের গল্পে থাকে মানুষেরই স্বাদ।
প্রবন্ধকার তথ্য কুড়িয়ে গড়েন যুক্তিজাল,
শব্দ দিয়ে নির্মাণ করেন সত্যেরই মশাল।

সম্পাদকও শ্রম দেন, তাঁর প্রাপ্য বেতন,
সযত্ন হাতে সাজান তিনি সাহিত্যেরই ক্ষণ।
পাতা বাছেন, লেখা কাটেন, গড়েন নতুন রূপ,
তাঁর শ্রমের স্বীকৃতিতে কেন থাকবে ক্ষোভ?

তবু যে জন লেখে আগে, প্রাণের কথা ঢালে,
তারই শ্রমের মূল্য কেন হারায় কাগজ-জালে?
সম্পাদক যদি পান তাঁর শ্রমের বিনিময়,
লেখকেরই শ্রমের বেলায় কেন অন্য নিয়ম হয়?

‘নাম ছাপানোই সম্মান’—শুনতে ভালো কথা,
তবু তাতে মেটে কি আর শ্রমিক মনের ব্যথা?
নামটি থাকে, খ্যাতি আসে, পাঠক চেনে মুখ,
তাই বলে কি শ্রমের দামটি হয়ে যাবে অসুখ?

শিল্পী যদি গান গেয়ে পান তাঁর প্রাপ্য মূল্য,
চিত্রকরও ছবির বিনিময়ে পান সম্মান-মূল্য;
অনুবাদক শব্দ বুনে পান যদি সম্মান,
লেখকেরই কলম কেন থাকবে বিনামূল্যে দান?

‘শখে লেখেন’—এই কথাটি বড় সহজ ছল,
ভালোবাসা থাকলেই কি শ্রমের মূল্য শূন্য বল?
শিক্ষক যদি ভালোবেসে জ্ঞান বিলান নিরন্তর,
তাঁর কি তবে বেতন নেবে না কোনো প্রতিষ্ঠান?

ভালোবাসা শ্রমের শত্রু—এ কথা সত্য নয়,
ভালোবাসার কাজেও তো শ্রমের মূল্য রয়।
যে হৃদয় দিয়ে সৃষ্টি করে নতুন কোনো ভুবন,
তারও তো আছে অধিকার, তারও আছে স্বপন।

সম্মানী শুধু টাকার অঙ্ক—এমন নয় তো মোটে,
এটি বলে—‘তোমার শ্রমের মূল্য আছে বটে।’
অল্প হলেও স্বীকৃতিটুকু শক্তি জোগায় প্রাণে,
আরও ভালো লেখার তাগিদ জাগে লেখক-মনে।

যে পত্রিকা কনটেন্ট দিয়ে পাঠক ধরে রাখে,
লেখকেরই সৃষ্টিশ্রম সে কিসের তরে ঢাকে?
সংবাদ, মত, গল্প, কবিতা—সবই তো সম্পদ,
সেই সম্পদের স্রষ্টার কেন থাকবে না মজুর?

সব পত্রিকার সামর্থ্য সমান—এ কথা সত্য নয়,
ছোট কাগজের সীমাবদ্ধতা অস্বীকারও নয়।
তবু যদি দিতে না পারে, বলুক স্পষ্ট ভাষায়,
লেখক তখন সিদ্ধান্ত নেবেন নিজের অধিকার চায়।

কিন্তু ‘লেখা বিনামূল্যে’—এ যেন নীতি না হয়,
সৃষ্টিশ্রমের অবমূল্যায়ন সংস্কৃতিতে না রয়।
আজকে যদি অল্প থাকে, কালকে বাড়ুক দাম,
ন্যায্যতারই পথে গড়ে উঠুক নতুন নাম।

লেখকেরও দায়িত্ব আছে—সত্য লিখুক তিনি,
তথ্য যাচাই, মৌলিকতা—হোক তাঁর অঙ্গীকারখানি।
চৌর্যবৃত্তি, মিথ্যা তথ্য দূরে থাকুক সব,
শব্দ হোক বিবেকের কাছে সত্যেরই উৎসব।

পত্রিকা দিক ন্যায্য মূল্য, লেখক রাখুক মান,
দুজন মিলে গড়ে উঠুক সুস্থ প্রকাশন-জ্ঞান।
শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে চলুক পথের রথ,
সাহিত্যেরই ভবিষ্যতের এ হোক শুভ শপথ।

তরুণ যে আজ কলম ধরে, স্বপ্ন চোখে রাখে,
তারও যেন শ্রমের মূল্য পৌঁছে যায় তার হাতে।
শুধু পরিচিতি নয় যে তার, শুধু নাম নয়,
তার সৃষ্টিরও অর্থ আছে—এই সত্য যেন রয়।

অর্থের কাছে সাহিত্য নয়, সাহিত্যও নয় পণ্য,
তবু স্রষ্টার শ্রমকে বলা যায় না কি ‘অমূল্য’?
অমূল্য তার মানবিকতা, অমূল্য তার বাণী,
তবু শ্রমের স্বীকৃতিটুকু হোক তারই সম্মানী।

একটি কবিতা পাঁচ মিনিটে পাঠকের মনে যায়,
কবির পেছনে কত মাসের সাধনা লুকায়।
কয়েকটি শব্দ—তবু তারই পেছনে জীবন,
শব্দ ছোট, শ্রমটি কিন্তু নয় তো কোনো ক্ষণ।

কলম মানে সময় দেওয়া, কলম মানে ধ্যান,
কলম মানে রাত জাগা আর সত্যের সন্ধান।
কলম মানে বুকের ভেতর জমে থাকা কথা,
কলম মানে মানুষেরই আনন্দ এবং ব্যথা।

তাই তো বলি—কলমেরও একটি মূল্য আছে,
লেখকেরও শ্রমের অধিকার পৃথিবীরই কাছে।
নাম ছাপানোর আনন্দ থাক, থাকুক তারই মান,
তার পাশাপাশি লেখক পাক প্রাপ্য সম্মানী-দান।

সাহিত্য যদি সমাজ গড়ে, চিন্তার দুয়ার খোলে,
লেখকেরই শব্দ তবে আলো জ্বালায় বলে।
সম্পাদক তাঁর শ্রমের দাম নেবেন—এ স্বাভাবিক,
লেখকও তাঁর শ্রমের মূল্য পাবেন—হোক ন্যায্য অধিক।

কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়—শ্রমই আসল কথা,
সৃষ্টির প্রতি সম্মান হোক আমাদের প্রথা।
সাহিত্যেরই পাতায় যেন এই সত্যটি রয়—
লেখক শুধু নাম নন, তাঁর কলমও শ্রমময়।

প্রকাশিত নাম সম্মানের—সত্য, এতে দ্বিধা নেই,
কিন্তু শুধু নাম ছাপালেই ঋণ শোধ হয় কি সেই?
সাহিত্য সম্পাদনার যেমন স্বীকৃতির মান,
সাহিত্য সৃষ্টিরও তেমনি প্রাপ্য সম্মান।

তাই আজকের প্রশ্ন থাকুক পাঠকেরই দ্বারে—
যে কলমে আলো জ্বলে, তার মূল্য কে মারে?
সাহিত্যের মূল্য যদি সত্যিই মানি আমরা,
লেখকেরও শ্রমের মূল্য দিই—এই হোক অঙ্গীকার আমাদের।

কলম থামুক ন্যায়ের ভাষায় নয়, জেগে থাকুক গান,
সৃষ্টিশ্রমের মর্যাদা পাক মানুষের সম্মান।
সাহিত্য বাঁচুক, লেখক বাঁচুক, বাঁচুক সৃজনপ্রাণ—
কলমেরও দাম আছে—এ হোক সময়ের গান।
—( কলমেরও দাম আছে, —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

শেষ কথা

Manual4 Ad Code

একটি পত্রিকার সাহিত্যপাতা শুধু কাগজের কিছু পৃষ্ঠা নয়। সেখানে একটি সমাজের চিন্তা, স্বপ্ন, বিতর্ক, কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন প্রতিফলিত হয়।

সেই পাতার সম্পাদক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, লেখকও তেমন গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পাদককে বেতন দেওয়া হলে তাঁর শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। লেখককে সম্মানী দেওয়া হলে তাঁর সৃষ্টিশীল শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

এখানে কাউকে ছোট বা বড় করার প্রশ্ন নেই।

প্রশ্ন হলো—শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন হবে কি না।

আমরা যদি সত্যিই সাহিত্যকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বলে মনে করি, তাহলে সাহিত্য সৃষ্টিকারী মানুষটির শ্রমকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করতে হবে।

কারণ একজন লেখক শুধু শব্দ লেখেন না; তিনি তাঁর সময় দেন, মেধা দেন, জীবন থেকে অভিজ্ঞতা দেন, চিন্তা দেন। সেই চিন্তা যখন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজারো পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন লেখকের শ্রমকে ‘প্রকাশিত হয়েছে—এটাই সম্মান’ বলে শেষ করে দেওয়া যথেষ্ট নয়।

লেখকের নাম ছাপা অবশ্যই সম্মানের।
কিন্তু নাম ছাপার সঙ্গে তাঁর শ্রমের মূল্যও স্বীকার করা হোক।
সাহিত্য সম্পাদক তাঁর কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাবেন—এটাই স্বাভাবিক।
লেখকও তাঁর সৃষ্টিশীল শ্রমের জন্য সম্মানী পাবেন—এটিও যেন একদিন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সরল—

সাহিত্যের মূল্য আছে। সাহিত্য সম্পাদনার মূল্য আছে।
তাহলে সাহিত্য সৃষ্টির মূল্য থাকবে না কেন?
কলমের দাম কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।
#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ