সিলেট ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : আজ ১৯ সেপ্টেম্বর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক কালো দিবস।
১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শিবিরের সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলায় নিহত হন বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা শহীদ জুবায়ের চৌধুরী রীমু। সেই হত্যাকাণ্ডের ৩৩তম বার্ষিকী আজ।
১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে এগারোটার সময়। বিটিভির রাত দশটার খবর শেষ সবাই যখন টিভি রুমে সেই সময়ের জনপ্রিয় একটি ধারাবাহিক নাটক দেখছে, সেই সময় বহিরাগত সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে শেরে বাংলা হলে পরিকল্পিত হামলা চালায় শিবির। সবাই টিভি রুমে থাকায় কিছু বোঝার আগেই সশস্ত্র শিবির কর্মীদের হামলার শিকার হন হলের ছাত্ররা। শিবির সন্ত্রাসীরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন রুমে রুমে তল্লাসী চালায় এবং বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর নেতা কর্মীদের খুঁজে খুঁজে নৃশংসভাবে হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। এই পৈশাচিকতার এক পর্যায়ে শিবির সন্ত্রাসীরা ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার এবং ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় মুখ জুবায়ের চৌধুরী রীমুকে সামনে পেয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। কেটে দেয়া হয় রীমুর হাত-পায়ের রগ। এতেই সন্তুষ্ট হয়নি ঘাতকেরা। মেঝেতে পড়ে থাকা রীমুকে কুপিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। রীমুর মৃত্যু নিশ্চিত করে তবেই ক্ষান্ত দেয় নরঘাতকেরা। ঝড়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ।
উল্লেখ্য, শহীদ রীমুর মা মিসেস জেলেনা চৌধুরী সেই সময় ছিলেন সংরক্ষিত আসনের মহিলা সাংসদ এবং জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী। আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি শহীদ রীমুকে। বন্ধু তুমি নিশ্চয়ই দেখতে পারছো যে স্বপ্ন শহীদ জননী আমাদের দেখিয়েছিলেন, যে স্বপ্ন বাস্তাবায়নের পথে উৎসর্গ করেছো নিজেকে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীর রায় কার্যকর হয়েছে এই দেশে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নিমিত্তে এখন আর সক্রিয় নয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল। এখন আর নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, একে একে সব যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের বিচারের রায় বাস্তাবায়িত হবে কীনা এই বাংলার মাটিতে।
তবুও বলি, তোমার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না বন্ধু। এই বাংলাদেশ থেকে একাত্তরের ঘাতক দালালদের শেষ চিহ্নটুকু নিশ্চিহ্ন করার প্রত্যয়ে হাজারো রীমু এখনও প্রতিনিয়ত ঐ ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঝাণ্ডা উড্ডীন রেখেছে। বিজয় তাদের হবেই। শহীদ রীমুর স্মৃতি চিরজীবী হোক। মৃত্যুঞ্জয়ী বীর শহীদ রীমু লাল সালাম।
ঘটনার পরপরই শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নিহত রিমুর শোকাহত মা জেলেনা চৌধুরীকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।
চিঠিটি আমার মাধ্যমে তৎকালীন দেশের প্রধান প্রগতিশীল কাগজ ‘সংবাদ’এ ‘রিমুর মাকে লিখেছেন রুমীর মা’ শিরোনামে ছাপা হয় সে বছরই ১৮ অক্টোবরে।
অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় ৩০ বছর আগে সংবাদ এ প্রকাশিত চিঠির কাটিংটি নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে তুলে ধরলাম। কাটিঙের ছবিতে চাপ দিলে সহজেই চিঠিটি পাঠ করা সম্ভব হবে। যাঁদের পড়তে সমস্যা, তাঁরা চিঠির অনুলিপি এখানেও পড়তে পারেন।
“চির চেনা বোন,
আপনি আমার অপরিচিত কিন্তু রিমুর শাহাদাতের ঘটনার মাধ্যমে আপনি আমার চির চেনা বোন হয়ে গেছেন। রিমুর মতো আমারও এক ছেলে ছিল বিশ বছরের টগবগে তরুণ– নাম ছিল রুমী, সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চিরকালের মতো আমার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। তার বিচ্ছেদ ব্যথা আমি বাইশ বছর ধরে ভোগ করছি।
পুত্র শোকের এই জ্বালা থেকে আমি আপনার মনের ব্যথা পরিষ্কার বুঝতে পারছি। আপনাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমার জানা নেই, সে চেষ্টাও আমি করবো না। শুধু এইটুকু বলবো– সময়ই আপনার এই শোককে শক্তিতে পরিণত করবে। যে অপশক্তি একাত্তরে সক্রিয় থেকে রুমিসহ তিরিশ লাখ বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করেছিল, তারাই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে আপনার রিমুসহ হাজার হাজার তরুণকে হত্যা করে মায়েদের বুক খালি করছে। পুত্র শোকের বজ্রাঘাততুল্য শোককে বজ্রের শক্তিতে পরিণত করে এই ফ্যাসীবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।”
১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শিবিরের সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলায় শহীদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ও সকলের পরিচিত মূখ, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা শহীদ জুবায়ের চৌধুরী রীমু’র ৩৩তম শাহাদাৎবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন ‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, শহীদ রীমুর আত্মত্যাগ একটি অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অর্জনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অনেক অগ্রগতি হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সংগ্রাম এখনো অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘রীমুর আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। একাত্তরের ঘাতক-দালাল ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের যে সংগ্রাম, তার মধ্যেই শহীদ রীমুর স্বপ্ন ও আদর্শ বেঁচে থাকবে।’’
শহীদ জুবায়ের চৌধুরী রীমুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাঁর আত্মত্যাগকে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
আজ ১৯ সেপ্টেম্বর তাঁর ৩৩তম শাহাদাৎবার্ষিকীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ রীমুকে স্মরণ এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে।
উনিশে সেপ্টেম্বর—কালো এক রাত,
রাজশাহীর বুকে নামে ঘোর আঁধার,
শেরে বাংলা হল জেগে ওঠে হঠাৎ,
হিংস্রতার হাতে কেঁপে ওঠে দ্বার।
নিস্তব্ধ ক্যাম্পাস, নিভে যায় আলো,
হানাদার ছায়া ঘিরে ফেলে ঘর,
রক্তের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে—
কাঁদে পদ্মা, কাঁদে বাংলার প্রহর।
তুমি ছিলে রীমু, তরুণ প্রাণের
স্বপ্নমাখা চোখে আগামী সকাল,
ক্রিকেটের মাঠে ছুটে চলা তুমি,
বন্ধুর হৃদয়ে ছিলে চিরকাল।
কিন্তু সেই রাতে নেমেছিল যারা
মানুষের মুখে হিংস্রতার ছাপ,
তাদেরই হাতে ক্ষতবিক্ষত হলে,
রক্তে লিখে গেলে প্রতিবাদের মাপ।
কেটে গেল রগ, থামেনি যে প্রাণ,
মাটির বুক জুড়ে রক্তের অক্ষর,
শেষ নিঃশ্বাসেও রেখে গেলে তুমি
স্বপ্নের বাংলাদেশের দৃপ্ত উত্তর।
তেত্রিশ বছর পেরিয়ে গেলেও
মুছে যায়নি সেই রক্তের দাগ,
সময়ের স্রোতে বদলেছে অনেক,
তবু শেষ হয়নি ন্যায়েরই রাগ।
তোমার মা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন—
মানুষের হবে মানুষে এ দেশ,
সাম্প্রদায়িকতার কালো প্রাচীর
ভেঙে উঠবে নতুন দিনের রেশ।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে,
ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছে অপরাধ;
তবু কি থেমেছে ঘাতকের ছায়া?
তবু কি ফুরিয়েছে বিভেদের সাধ?
তাই আজও পথে তরুণের মিছিল,
তাই আজও কণ্ঠে প্রতিবাদ-গান,
একাত্তরের সেই অসমাপ্ত শপথ
বুকে নিয়ে জাগে নতুন প্রাণ।
রীমু, তোমার রক্ত বৃথা যাবে না,
যদি জেগে থাকে মানুষের মন;
অন্যায়ের কাছে মাথা নত নয়—
এই হোক আজকের দৃপ্ত শপথগান।
তুমি নেই—তবু আছো প্রতিদিন,
লড়াইয়ের মাঝে, স্বপ্নের ভিতর,
অসাম্প্রদায়িক মানবিক দেশে
তোমারই স্বপ্ন জাগুক নিরন্তর।
উনিশে সেপ্টেম্বর এলেই আবার
কালো রাত নামে স্মৃতির পাতায়,
রক্তমাখা সেই তরুণের মুখটি
বাংলার বিবেক জাগিয়ে যায়।
শহীদ রীমু, তোমায় লাল সালাম,
তোমার স্মৃতি থাক অমলিন,
ন্যায়ের পতাকা উড়ুক আকাশে—
বাংলা হোক মানুষের বাংলাদেশ চিরদিন।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি