সিলেট ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:০৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
সাংবাদিক ও সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুরে অবস্থিত নাজাত ইসলামী মারকাজ ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির এসব বহুমুখী কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সাংবাদিক, স্থানীয় সুধীজন ও ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুর সাড়ে ১২টায় নাজাত ইসলামী মারকাজের কনফারেন্স হলে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এ মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন ইংরেজি দৈনিক দ ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের আহবায়ক বকসী ইকবাল আহমদ, সিনিয়র সাংবাদিক নূরুল ইসলাম শেফুল, সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল হামিদ মাহবুব, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য সচিব রুবেল আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদ, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ ছায়েদ আহমেদ, আরটিভির জেলা প্রতিনিধি চৌধুরী ভাস্কর হোম, সাংবাদিক মিজানুর রহমান আলম, নূর মোহাম্মদ সাগর, এহসান বিন মুজাহির, আব্দুল কাইয়ুম, শামসুল ইসলাম শামীম, বাপ্পী দে, নান্টু রায়, মোহাম্মদ আলামীন, কাওছার আহমেদ, মঞ্জু বিজয় চৌধুরী, শেখ মাহমুদুর রহমান সহ বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ এবং স্থানীয় গুণীজন ও ওলামায়ে কেরাম।
সভায় নাজাত ইসলামী মারকাজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল মাওলানা শেখ ছালেহ আহমদ হামিদী প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য, বর্তমান কার্যক্রম, বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
শিক্ষা, সেবা ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার
মতবিনিময় সভায় মাওলানা শেখ ছালেহ আহমদ হামিদী বলেন, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নাজাত ইসলামী মারকাজ ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে শিক্ষা, সেবা ও গবেষণাকে কার্যক্রমের প্রধান তিনটি ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, একটি জাতির টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। তাই ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পুনর্বাসন এবং বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে হিফজ ও নূরানী বিভাগ, অন্ধ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষা, কারিগরি ও সেলাই প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার ও আইটি শিক্ষা, পাবলিক লাইব্রেরি, স্পোকেন ইংলিশ কোর্স এবং গরিব ও ইয়াতিম ট্রাস্ট ফান্ড উল্লেখযোগ্য বলে জানান তিনি।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা
নাজাত ইসলামী মারকাজের হিফজ ও নূরানী বিভাগের মাধ্যমে শিশুদের শুদ্ধভাবে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। পাশাপাশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষার সুযোগও রাখা হয়েছে।
যুবসমাজকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণ জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পাবলিক লাইব্রেরি এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য স্পোকেন ইংলিশ কোর্স পরিচালনার কথাও তুলে ধরা হয়।
নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আয়মুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত কেন্দ্রের মাধ্যমে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়।
মসজিদ নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উদ্যোগ
মতবিনিময় সভায় প্রতিষ্ঠাতা শেখ ছালেহ আহমদ হামিদী তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সামাজিক ও অবকাঠামোগত উদ্যোগের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন গ্রাম, লোকালয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ পর্যন্ত ১৫৫টি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। অসহায় ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য প্রায় ১ হাজার ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় ৪ হাজার ২২টি টিউবওয়েল ও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তাদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্প
দরিদ্র ও অসহায় পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার আওতায় এনে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্পের আওতায় রিকশা, ঠেলাগাড়ি, সেলাই মেশিন, মাছ ধরার নৌকাসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার পরিবারকে সহায়তা করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু এককালীন সহায়তার পরিবর্তে কর্মসংস্থান বা আয়-উৎপাদনকারী উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করার সুযোগ তৈরি করা হলে দীর্ঘমেয়াদে এর সামাজিক প্রভাব বেশি হতে পারে।
খাদ্য সহায়তা ও মানবিক কার্যক্রম
রমজান, ঈদ এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা দুর্যোগপূর্ণ সময়ে খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার কথাও মতবিনিময় সভায় তুলে ধরা হয়।
শেখ ছালেহ আহমদ হামিদীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১৫ হাজার পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গরিব, এতিম ও অসহায় মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার কথাও জানানো হয়।
স্বাস্থ্যসেবা ও হুইলচেয়ার বিতরণ
মানবিক কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এককালীন চিকিৎসা সহায়তা, চক্ষু শিবির এবং বিভিন্ন মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সেবা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ও চলাচলে অক্ষম মানুষের সহায়তায় হুইলচেয়ার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মানুষের মধ্যে হুইলচেয়ার বিতরণ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তার পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথাও সভায় জানানো হয়।
পানি, বাসস্থান ও জরুরি সেবায় উদ্যোগ
বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, দরিদ্র পরিবারের জন্য বাসস্থান নির্মাণ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে প্রতিষ্ঠানের সামাজিক কার্যক্রমের আওতায় আনার কথা জানানো হয়।
এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, হাউসিং প্রকল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও হুইলচেয়ার প্রকল্প, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, পরিবার স্বাবলম্বীকরণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
সাংবাদিক ও সুধীজনদের বক্তব্য
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সাংবাদিক, স্থানীয় সুধীজন ও ওলামায়ে কেরাম নাজাত ইসলামী মারকাজের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।
বক্তারা বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুধু প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক পুনর্বাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণের উদ্যোগের বিষয়টি তাঁরা উল্লেখ করেন।
বক্তারা বলেন, এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগের পরিধি বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে গণমাধ্যম, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে গণমাধ্যমে তথ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তামূলক উদ্যোগে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রত্যাশা
সভায় নাজাত ইসলামী মারকাজের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন এবং দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা শেখ ছালেহ আহমদ হামিদী বলেন, শিক্ষা, সেবা ও গবেষণাকে ভিত্তি করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করাই নাজাত ইসলামী মারকাজের অন্যতম লক্ষ্য। এ কাজে গণমাধ্যম, সুধীজন, আলেম-ওলামা ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
মতবিনিময় সভায় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা শেষে উপস্থিত সাংবাদিক, সুধীজন ও অতিথিদের ধন্যবাদ জানান আয়োজকরা। পরে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি