বিএনপি সরকারের গণবিরোধী চরিত্র ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে: সিপিবি

প্রকাশিত: ১১:৩৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২৬

বিএনপি সরকারের গণবিরোধী চরিত্র ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে: সিপিবি

Manual2 Ad Code
  • সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির দুইদিনব্যাপী সভা শুরু, রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রির উদ্যোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৬ আগস্ট ২০২৬ : ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের একের পর এক জাতীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সরকারের গণবিরোধী চরিত্র ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির দুইদিনব্যাপী সভার রাজনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের মতো ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভার শুরুতে দলের সভাপতি কমরেড কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন।

সভায় গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পরিকল্পিত সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এর ফলে জননিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রির উদ্যোগের সমালোচনা

Manual3 Ad Code

রাজনৈতিক প্রতিবেদনে সরকারের রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রির উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করা হয়।

সিপিবির দাবি, বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি কিংবা নির্বাচনী ইশতেহারের কোথাও জনগণের সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি ছিল না। কিন্তু সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই ৪৪টি রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।

Manual4 Ad Code

প্রস্তাবে বলা হয়, ইস্পাত, বস্ত্র, রাসায়নিক, চিনি, খাদ্য ও পাট খাতের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার একরেরও বেশি শিল্পজমি, ভবন, ইউটিলিটি সংযোগ, শিল্প অবকাঠামো এবং চিনিকল সংশ্লিষ্ট কৃষিজমি কার্যত বিক্রির প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি গোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করে সিপিবি অভিযোগ করে, এসব প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জমি ও সম্পদ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার ষড়যন্ত্র চলছে।

সংসদের বিরোধী জোট ও জামায়াতের সমালোচনা

সভার প্রতিবেদনে জাতীয় সংসদের বিরোধী জোটের ভূমিকাও সমালোচিত হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারের বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে তথাকথিত বিরোধী জোট কার্যত সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে।

Manual3 Ad Code

একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও তাদের শরিকদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যৌন নিপীড়নসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণ চালানোরও অভিযোগ তোলে সিপিবি।

রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক

রাজনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকার উভয়ই রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

সিপিবির ভাষ্য অনুযায়ী, সংবিধান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, শ্রম, নারী অধিকার ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য একাধিক কমিশন গঠন করা হলেও শাসনব্যবস্থায় কোনো গুণগত পরিবর্তন দেখা যায়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় সংসদে নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন অধ্যাদেশ দ্রুত অনুমোদন পেলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার, পুলিশ কমিশন এবং পাবলিক অডিট সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো অগ্রাধিকার পায়নি। ফলে প্রকৃত সংস্কারের পরিবর্তে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সংস্কার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে দাবি করে দলটি।

‘অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়েছে’

সভায় বক্তারা বলেন, গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি অধিক গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তাদের ভাষায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষের প্রাণের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়েছে।

যুদ্ধজোটে সম্পৃক্ততার প্রতিবাদ

সভা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা প্রদানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধজোটে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্তেরও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

বক্তারা বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দেওয়া সরকার এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাদের মতে, দেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক হওয়া উচিত।

সরকারের প্রতি দাবি

সভা থেকে কয়েকটি তাৎক্ষণিক দাবি জানানো হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—

– দেশের স্বার্থবিরোধী বলে অভিহিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল;
– জ্বালানি সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ;
– দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ;
– আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

উপস্থিত নেতারা

সভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিবির সভাপতি কমরেড কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। রাজনৈতিক রিপোর্ট উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন।

এ সময় বক্তব্য দেন প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, কমরেড রফিকুজ্জামান লায়েক, কমরেড এস এ রশীদ, কমরেড রাগিব আহসান মুন্না, কমরেড জলি তালুকদার, কমরেড আমিনুল ফরিদসহ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক এম এম আকাশ, রুহিন হোসেন প্রিন্স, মিহির ঘোষ, লক্ষ্মী চক্রবর্তী, অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন, পরেশ কর, ডা. দিবালোক সিংহ, অ্যাডভোকেট এমদাদুল হক মিল্লাত, কাজী রুহুল আমিন, ডা. সাজেদুল হক রুবেল, লুনা নূর, মনিরা বেগম অনু, ডা. মনোজ দাশ, রেবেকা সরেন, সাদেকুর রহমান শামীম, এস এম শুভসহ অন্যান্য নেতারা।

Manual7 Ad Code

সিপিবি জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় কমিটির দুই দিনব্যাপী সভার ধারাবাহিকতায় আগামী ৮ আগস্ট (শনিবার) দলের জাতীয় পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ