সিলেট ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২৬
পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা ও জটিল ব্যবস্থার গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি
নিজস্ব প্রতিবেদক | নয়াদিল্লি (ভারত), ১১ আগস্ট ২০২৬ : ভারতীয় পদার্থবিদ ও বিশিষ্ট তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী অধ্যাপক দীপক ধর ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ডিরাক পদক (Dirac Medal) অর্জন করেছেন।পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা (স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স), জটিল ব্যবস্থা এবং ভারসাম্যহীন ব্যবস্থার তাত্ত্বিক গবেষণায় অগ্রণী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আরও তিন খ্যাতিমান বিজ্ঞানীর সঙ্গে এ সম্মান দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র—International Centre for Theoretical Physics (ICTP)—প্রতি বছর পদার্থবিদ্যার কিংবদন্তি বিজ্ঞানী পল ডিরাকের স্মরণে এই পদক প্রদান করে। পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ এ সম্মান এ বছর অধ্যাপক দীপক ধর ছাড়াও বার্নার্ড দেরিদা (Bernard Derrida), মার্ক মেজার্ড (Marc Mézard) এবং হাইম সোমপোলিনস্কি (Haim Sompolinsky)-কে দেওয়া হয়েছে।
ভারতের International Centre for Theoretical Sciences (ICTS) এক ঘোষণায় অধ্যাপক দীপক ধরের ডিরাক পদক লাভের বিষয়টি জানায়। তিনি বর্তমানে ICTS-এর INSA Distinguished Professor হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পুরস্কার ঘোষণায় বলা হয়েছে, চার বিজ্ঞানীকে এ সম্মান দেওয়া হয়েছে “ভারসাম্যপূর্ণ পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যায় তাঁদের অগ্রণী অবদানের জন্য এবং এর ধারণা ও পদ্ধতিকে ভারসাম্যহীন পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা, অপ্টিমাইজেশন সমস্যা, তাত্ত্বিক নিউরোসায়েন্স এবং শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করার জন্য।”
জটিলতার পেছনে সহজ নিয়ম
অধ্যাপক দীপক ধরের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বৃহৎ ও জটিল ব্যবস্থার আচরণ কীভাবে তুলনামূলকভাবে সহজ কিছু নিয়ম ও পারস্পরিক ক্রিয়া থেকে সৃষ্টি হতে পারে—তা ব্যাখ্যা করা।
ডিরাক পদকের ঘোষণায় তাঁর অবদানের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয়েছে, “Deepak Dhar showed how simple interactions can lead to complex and sometimes unpredictable behaviour in large systems.” অর্থাৎ, বৃহৎ কোনো ব্যবস্থার মধ্যে ক্ষুদ্র ও সাধারণ পারস্পরিক ক্রিয়াগুলো কীভাবে শেষ পর্যন্ত জটিল এবং কখনো কখনো অনির্দেশ্য আচরণের জন্ম দিতে পারে, তা বোঝার ক্ষেত্রে ধরের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো তাঁর স্যান্ডপাইল মডেল (Sandpile Model) নিয়ে কাজ। দেখতে সাধারণ একটি বালুর স্তূপের আচরণকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে কোনো ব্যবস্থায় ছোট একটি পরিবর্তন কখনো খুব সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে, আবার কখনো একই ধরনের ক্ষুদ্র পরিবর্তন বড় ধরনের বিপর্যয় বা ধসের সূচনা করতে পারে।
একটি বালুর স্তূপে ক্রমাগত দানা যোগ করা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না, অথবা খুব ছোট আকারের ধস নামে। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে মাত্র একটি বালুকণাই বড় ধরনের ধস বা বৃহৎ অ্যাভাল্যাঞ্চ সৃষ্টি করতে পারে। এই আপাত সাধারণ ঘটনাটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জটিল ব্যবস্থার আচরণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
ধরের গবেষণা দেখিয়েছে, এ ধরনের ব্যবস্থা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন একটি ‘ক্রিটিক্যাল’ বা সংকটপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র কোনো প্রভাবও কখনো কখনো বড় ও আকস্মিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়।
স্যান্ডপাইল থেকে ভূমিকম্প, যানজট ও অর্থবাজার
অধ্যাপক ধরের গবেষণার গুরুত্ব শুধু তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কাজের মাধ্যমে জটিল ব্যবস্থার আচরণ বোঝার যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বাস্তব ও আন্তঃবিষয়ক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে।
ডিরাক পদকের ঘোষণায় বলা হয়েছে, স্যান্ডপাইল মডেলের মতো ধারণা ভূমিকম্প, যানজট এবং আর্থিক বাজারের ওঠানামা—এমন ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থার মডেল তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়েছে।
এখানেই ধরের গবেষণার বিশেষ তাৎপর্য। একটি বালুর স্তূপের মতো সরল একটি মডেল থেকে বৃহৎ ও জটিল বাস্তব ব্যবস্থার আচরণ বোঝার চেষ্টা দেখিয়েছে, প্রকৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যত ভিন্ন ঘটনাগুলোর পেছনে কিছু সাধারণ গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত নীতি কাজ করতে পারে।
পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যার বিস্তৃত প্রয়োগ
পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা মূলত বিপুল সংখ্যক কণিকা বা উপাদান নিয়ে গঠিত ব্যবস্থার সামগ্রিক আচরণ ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়। একেকটি কণিকা কী করছে, তা আলাদাভাবে না দেখে বিপুলসংখ্যক কণিকার সম্মিলিত আচরণ থেকে কীভাবে তাপমাত্রা, চাপ, শক্তি কিংবা অন্যান্য সামষ্টিক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে এ শাস্ত্র।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যার ধারণা পদার্থবিদ্যার প্রচলিত সীমানা ছাড়িয়ে জীববিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, নিউরোসায়েন্স, অপ্টিমাইজেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের ডিরাক পদকপ্রাপ্ত চার বিজ্ঞানীর কাজ সেই বিস্তৃত ধারাকেই প্রতিফলিত করে। তাঁদের গবেষণা দেখিয়েছে, জটিলতা, সমষ্টিগত আচরণ, অনিশ্চয়তা ও অপ্টিমাইজেশনের মতো সমস্যাকে বোঝার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যার ধারণা কতটা শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
পদার্থবিদ্যার সীমানা পেরিয়ে নতুন জগতে
ICTP-এর পরিচালক অতীশ দাবোলকর (Atish Dabholkar) বলেন, ২০২৬ সালের ডিরাক পদকপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীদের কাজ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা, বিশেষ করে পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যাকে এমন একটি শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছে, যার মাধ্যমে প্রচলিত ক্ষেত্রের বাইরেও বিস্তৃত নানা প্রশ্নের মোকাবিলা করা সম্ভব।
তাঁর ভাষায়, এই গবেষণার পরিধি এখন জীববিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
ফলে দীপক ধর ও তাঁর সহপদকপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীদের কাজকে শুধু পদার্থবিদ্যার নির্দিষ্ট কোনো শাখার সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আধুনিক বিজ্ঞানে বিভিন্ন শাখার মধ্যে যে ক্রমবর্ধমান আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তাঁদের গবেষণা তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
পল ডিরাকের নামে মর্যাদাপূর্ণ সম্মান
ডিরাক পদক দেওয়া হয় ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ পল এ. এম. ডিরাকের স্মরণে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিকাশে ডিরাকের অবদান আধুনিক পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে যুগান্তকারী। তাঁর নামে প্রবর্তিত এই পদক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শীর্ষস্থানীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের মধ্য থেকে নির্বাচিত বিজ্ঞানীদের এই পদকে সম্মানিত করা হয়। ফলে ভারতীয় বিজ্ঞানী হিসেবে অধ্যাপক দীপক ধরের এ স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে ভারতের অবস্থানকেও নতুন করে সামনে এনেছে।
দীপক ধরের গবেষণার তাৎপর্য
দীপক ধরের গবেষণার কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর একটি হলো—কীভাবে একটি জটিল ব্যবস্থা কোনো বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই একটি বিশেষ সংকটপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে এবং সেই অবস্থায় ক্ষুদ্র পরিবর্তন কীভাবে বড় ধরনের ফলাফল তৈরি করতে পারে।
এই ধারণাকে বিজ্ঞানের ভাষায় Self-Organized Criticality বা স্ব-সংগঠিত সংকটপূর্ণতা বলা হয়। স্যান্ডপাইল মডেলের মাধ্যমে এই ধারণাকে বোঝানোর ক্ষেত্রে অধ্যাপক ধরের কাজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে কোনো ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ থাকার কথা মনে হলেও জটিল ব্যবস্থায় সব সময় তা ঘটে না। কখনো খুব ছোট একটি পরিবর্তনও বড় প্রভাব তৈরি করতে পারে। ভূমিকম্প, বাজারের বড় ওঠানামা কিংবা যানজটের মতো অনেক জটিল ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই গবেষণার মাধ্যমে ধরের কাজ দেখিয়েছে, জটিলতা সব সময় জটিল নিয়ম থেকে তৈরি হয় না; অনেক সময় অত্যন্ত সহজ নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ থেকেই জটিল আচরণ সৃষ্টি হতে পারে।
ভারতের বিজ্ঞানচর্চায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি
অধ্যাপক দীপক ধরের ডিরাক পদক লাভ ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও দেখালেন, মৌলিক বিজ্ঞানে দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর গবেষণার আন্তর্জাতিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষ করে তাঁর গবেষণায় গাণিতিক মডেল, পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ও পদার্থবিদ্যার ধারণাকে একত্র করে জটিল বাস্তব ব্যবস্থাকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই গবেষণার প্রয়োগ এখন পদার্থবিদ্যার বাইরেও নানা ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের ডিরাক পদক তাই শুধু অধ্যাপক দীপক ধরের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি জটিল ব্যবস্থা ও পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যার মতো মৌলিক গবেষণাক্ষেত্রের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের একটি মৌলিক তত্ত্ব কীভাবে সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে—স্যান্ডপাইলের বালুকণা থেকে শুরু করে ভূমিকম্প, যানজট, আর্থিক বাজার, নিউরোসায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি