সিলেট ৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৩৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২৬
শ্রীমঙ্গলে লেবার হাউসে সংবাদ সম্মেলন, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট প্রত্যাহারের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৬ আগস্ট ২০২৬ : চা শ্রমিকদের জন্য বর্তমান বার্ষিক ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) প্রত্যাহার, নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন এবং বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযোগী মানসম্মত মজুরি নির্ধারণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন।
সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, বিদ্যমান মজুরি কাঠামো চা শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনধারণের প্রয়োজনও পূরণ করতে পারছে না। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মপরিবেশ, ঝুঁকি এবং দেশের অন্যান্য শিল্পখাতের মজুরি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুনভাবে মজুরি নির্ধারণ সময়ের দাবি।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ‘লেবার হাউস’-এর হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি পংকজ এ কন্দ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জেসমিন আক্তার, অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা, মনু দলই ভ্যালির কার্যকরী কমিটির সভাপতি ধনা বাউরী, লংলা ভ্যালির সভাপতি সাইদুল ইসলাম, মনু দলই ভ্যালির সাধারণ সম্পাদক নির্মল দাশ পাইনকা, দুলাল হাজরাসহ বিভিন্ন চা বাগানের পঞ্চায়েত প্রতিনিধি ও ইউনিয়নের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; ৭১ টিভির জেলা প্রতিনিধি আহমেদ ফারুক মিল্লাদ, আরটিভির জেলা প্রতিনিধি চৌধুরী ভাস্কর হোম, প্রথম আলোর প্রতিনিধি শিমুল তরফদার এবং গণমাধ্যমকর্মী রাজেশ ভৌমিক।
‘চা শিল্পের কারিগররা সবচেয়ে কম মজুরি পান’
লিখিত বক্তব্যে নৃপেন পাল বলেন, দেশের অন্যান্য শিল্পখাতের শ্রমিকদের তুলনায় চা শিল্পের শ্রমিকদের দৈনিক ও মাসিক মজুরি অত্যন্ত কম এবং বর্তমান বাজার বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে এমন একটি মজুরি কাঠামো প্রয়োজন, যা শ্রমিকদের শুধু ন্যূনতম জীবনধারণ নয়, ভবিষ্যতের উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গঠনেরও সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তিনি বলেন, “সরকার এমন একটি মানসম্মত মজুরি নির্ধারণ করবে—এই প্রত্যাশাই চা শ্রমিকদের।”
এক লাখ নিবন্ধিত, অর্ধলাখের বেশি অনিবন্ধিত শ্রমিক
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ চা বোর্ডের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দেশে বর্তমানে ১৭৮টি চা বাগান রয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৫৩ একর জমিতে বিস্তৃত এসব বাগানে প্রায় এক লাখ নিবন্ধিত এবং ৫০ হাজারের বেশি অনিবন্ধিত শ্রমিক কর্মরত।
নৃপেন পাল বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা শ্রমিকরা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অবদান রাখলেও শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান, ডিজিটাল সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও বাজার সংযোগের ক্ষেত্রে তারা এখনও পিছিয়ে। চা জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ৫২ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বাস্তবতায় নতুন ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা জরুরি।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি
চা শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, পূর্ববর্তী সরকার চা শিল্পের মজুরি নির্ধারণে যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছিল, তার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ফলে নতুন করে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে বর্তমান বাস্তবতার আলোকে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমান বাজারদর, জীবনযাত্রার ব্যয়, উন্মুক্ত পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম, কাজের ঝুঁকি ও শ্রমের মান বিবেচনায় নতুন মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যমান বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থা বাতিল করে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়।
সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে স্বাগত
সংবাদ সম্মেলনে সরকার চা শ্রমিকদের উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোর প্রশংসাও করা হয়।
নৃপেন পাল বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার সম্প্রতি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
তিনি আরও জানান, সরকারের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চা জনগোষ্ঠীর জন্য ‘চা শ্রমিক উন্নয়ন একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
ভূমি বন্দোবস্তের দাবিও পুনর্ব্যক্ত
চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের ভূমি বন্দোবস্তের দাবির বিষয়েও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া হয়। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং সাক্ষাতের আবেদনও পাঠানো হয়েছে।
আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেন, চলমান আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য কোনো অচলাবস্থা সৃষ্টি করা নয়; বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই, ন্যায়সঙ্গত এবং মর্যাদাপূর্ণ মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করা। তারা সরকারের প্রতি দ্রুত নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
‘শ্রমিকরা দয়া নয়, ন্যায্য পারিশ্রমিক চান’
চা শ্রমিক ইউনিয়নের চলমান আন্দোলন নিয়ে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা শাখার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট-এর বিশেষ প্রতিনিধি ও আরপি নিউজের সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “আলোচনার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযোগী যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। এ নিয়ে কোনো ধরনের গড়িমসি বা তালবাহানা গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকরা কারও দয়া চান না। তাঁরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে যে মূল্য সংযোজন করেন, তার ন্যায্য পারিশ্রমিকই চান।”
তিনি বলেন, বর্তমানে সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধাসহ দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে আট ঘণ্টা বা অনেক ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় কাজ করতে হচ্ছে, যা শোষণমূলক, বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা পরিহার করতে হবে’
কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, মজুরি বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাগান মালিকদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা পরিহার এবং সরকারকে চা শ্রমিকদের পূর্ণ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে মানবিক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সমপর্যায়ের খাতের সর্বনিম্ন মজুরির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চা শ্রমিকদের জন্য গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ পারিশ্রমিক নির্ধারণে বাগান মালিক, বাংলাদেশীয় চা সংসদ, শ্রম অধিদপ্তর এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
‘মাত্র ৫ শতাংশ বৃদ্ধি ন্যায্য দাবির প্রতি উপহাস’
কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, প্রতি দুই বছর পরপর শ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষের মধ্যে মজুরি চুক্তি নবায়নের রীতি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিকরা কার্যকর মজুরি চুক্তির বাইরে রয়েছেন। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে মাত্র ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি অবজ্ঞা এবং কার্যত উপহাসের শামিল।
তার ভাষ্য, আবাসনসহ বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিলেও দেশের অন্য যেকোনো শিল্পখাতের তুলনায় চা শ্রমিকদের মজুরি এখনও সর্বনিম্ন। অথচ চা শিল্প একটি লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য উপস্থাপিত হয়নি, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে বাগান মালিকরা ন্যায্য মজুরি দিতে আর্থিকভাবে অক্ষম।
মজুরি বোর্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, দেশের অন্যান্য খাতে ন্যূনতম মজুরি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও চা শিল্পের ক্ষেত্রে বারবার মালিকপক্ষের নির্ধারিত মজুরি বহাল রেখে সুপারিশ করা হয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা উপেক্ষা করে কেন এমন সুপারিশ করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি