সিলেট ৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৫, ২০২৬
মানুষের জীবনে কিছু দিন থাকে, যাদের শব্দে ধরতে গেলে তারা ছোট হয়ে যায়। কিছু ক্ষত থাকে, যাদের প্রকাশ করলেই তারা আর নিজের থাকে না। তাই একুশ বছর ধরে ৫ আগস্ট আমার ভেতরেই ছিল—নিঃশব্দ, নির্জন, কিন্তু জীবন্ত।
আজ লিখছি।
আজ থেকে ঠিক একুশ বছর আগে—৫ আগস্ট, ২০০৫।
একটি মেয়ে নিজের পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে অচেনা এক জীবনের দিকে পা বাড়িয়েছিল। সময়ের হিসাবে একুশ বছর হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু সেই পথের প্রতিটি দিন যেন একটি করে যুগ।
পরিবার, সমাজ—প্রায় সবাই সেদিন তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছিল। একমাত্র মানুষটি, যিনি তার পাশে নিঃশর্তভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তার বাবা।
সেদিন বাবা শুধু একটাই কথা বলেছিলেন— “কাকলীর জীবন, সিদ্ধান্তটাও কাকলী নেবে।”
আজও মনে হয়, এই একটি বাক্যই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। বাবা আমার ওপর অগাধ, প্রায় অন্ধ বিশ্বাস রেখেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, তাঁর মেয়ে ভুল করতে পারে, হেরে যেতে পারে, কষ্ট পেতে পারে—কিন্তু অন্যায় করবে না।
সেই বিশ্বাসের দায় আজও আমি বহন করে চলেছি।
সেদিন আর কেউ আমার পাশে ছিল না। বাবা যেন নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—”আমার মেয়েকে আমি ওর লক্ষ্যে পৌঁছে দেব।” তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন।
এয়ারপোর্টের উদ্দেশে গাড়ি যখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল, যতদূর চোখ যায়, বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই দৃশ্য আজও আমার স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবিগুলোর একটি। আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, আর একজন অপেক্ষা করছিলেন—আমার পিএইচডি সুপারভাইজার, ইয়োশিও নিশিদে।
জীবনে কিছু ঋণ থাকে, যেগুলো শোধ করার কথা ভাবাটাও ঔদ্ধত্য। বাবার কাছে যেমন আমি চিরঋণী, তেমনি চিরঋণী আমার সুপারভাইজারের কাছে। আর আরেকজনের কাছে—আমার আত্মজা, আমার একমাত্র সন্তান। সে না থাকলে হয়তো আমি এতদূর আসতেই পারতাম না।
আজ যখন একুশ বছরের পথের দিকে ফিরে তাকাই, তখন মাঝে মাঝে নিজেরই ভয় হয়।
ভাবি—আমি সত্যিই সেই পথ দিয়ে হেঁটে এসেছি?
তারপর সেই পথটাই যেন মুচকি হেসে বলে— “তুমি তো হারার মানুষ নও।”
জীবনে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই নিজেকেই। কারণ আমি যদি একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিই, তখন আর ফিরে তাকাই না। তখন যেন বিশ্ববিধাতাও হাল ছেড়ে দেন—ওকে আর ফেরানো যাবে না।
নিজের কথা বলতে আমি কখনো শিখিনি। নিজের প্রচার তো আরও নয়।
আমি চুপ করে থাকি বলে অনেকে ভাবে, আমি ভুলে গেছি। আসলে ভুলে যাই না। আমি শুধু সবকিছু প্রকৃতির খাতায় জমা রেখে দিই। বিচার করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে ভালো লাগে না।
আজ যদি কেউ আমার কাজের তালিকা দেখে—গবেষণা, সম্পাদনা, বই, নাচ, গান, আন্তর্জাতিক একাডেমিক ফোরাম, আন্তর্জাতিক ডান্স কাউন্সিল, নতুন নতুন প্রকল্প, কিংবা আমার কাজ নিয়ে অন্যদের গবেষণা—তাহলে হয়তো ভাববে, এ যেন খুব স্বাভাবিক এক যাত্রা। কিন্তু কোনো যাত্রাই স্বাভাবিক ছিল না।
২১ বছর পরে আজ একটি কথা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই।
আমি কৃতজ্ঞ আমার প্রাক্তনের কাছেও। হ্যাঁ, কৃতজ্ঞ তাঁর দেওয়া আমার শরীরের প্রতিটি কালসিটে দাগের কাছেও। কারণ সেই দাগগুলো আমাকে আজকের আমি বানিয়েছে।
সেই অপমান, সেই নির্যাতন, সেই অসহায়তা—সব মিলিয়েই হয়তো আমাকে শিখিয়েছে, মানুষ কতটা সহ্য করতে পারে, আর কতটা শক্ত হয়ে উঠতে পারে। আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষক হয়তো তিনিই ছিলেন। আজকের এই জায়গায় পৌঁছানোর গল্পটা কোনোদিনই এত সহজ ছিল না।
মানুষ আজ যে পরিচয়ে আমাকে চেনে, যে সম্মান দেয়, যে অর্জনের কথা বলে—তার পেছনে আছে অগণিত নির্ঘুম রাত, অপমান, একাকীত্ব, রক্তক্ষরণ আর অসংখ্য নীরব কান্না। কেউ সাফল্যের আলোটা দেখে, কিন্তু সেই আলো জ্বালাতে কতবার নিজেকে আগুনে পোড়াতে হয়েছে, তা খুব কম মানুষই জানে।
আজ একুশ বছর পর দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, আমি কাউকে হারানোর জন্য লড়িনি; আমি শুধু নিজেকে হারাতে চাইনি। তাই বারবার উঠে দাঁড়িয়েছি।
প্রতিটি অপমানকে শক্তিতে, প্রতিটি প্রত্যাখ্যানকে প্রেরণায়, প্রতিটি ক্ষতকে পরিচয়ে রূপান্তর করেছি।
যদি এই দীর্ঘ পথচলার কোনো নায়ক থেকে থাকে, তবে তিনি আমার বাবা—যিনি আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, যখন পুরো পৃথিবী প্রশ্ন তুলেছিল।
আর নায়িকা যদি কেউ হয়, তবে সে সেই অসম্ভব জেদি কাকলী, যে হাজারবার ভেঙেও নিজের স্বপ্নের হাত ছাড়েনি।
আজও আমি খুব সাধারণ মানুষ।
এখনও শেখার আছে, কাজ করার আছে, অনেক পথ বাকি।
#
কাকলী অধিকারী, ????
লুন্ড, সুইডেন
০৫.০৭.২০২৬

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি