সিলেট ১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৩৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৯ আগস্ট ২০২৬ : শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাগুরু ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জনাব সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। শিক্ষকতা পেশায় নিষ্ঠা, মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে তিনি স্থানীয়ভাবে একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচিত।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং পরবর্তী সময়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে বর্তমানে তিনি অবসরকালীন সময় শ্রীমঙ্গলে নিজ বাড়িতে কাটাচ্ছেন।
তাঁকে নিয়ে পাঁচ বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ‘Proud of Sreemangal’ পেজে প্রকাশিত একটি পোস্ট নতুন করে তাঁর শিক্ষা ও সামাজিক অবদানের প্রসঙ্গ সামনে এনেছে। ওই পোস্টে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানকে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের ‘প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও শিক্ষাগুরু’ হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করা হয়।
কলেজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ আজ উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে যাঁদের উদ্যোগ, শ্রম, সংগঠন ও মেধা জড়িত ছিল, সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান তাঁদের অন্যতম—এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে ‘Proud of Sreemangal’-এর ওই পোস্টে।
শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শ্রীমঙ্গলের তরুণ প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদক্ষেপ। সেই সময়ের বাস্তবতায় একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও তা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল না; বরং এটি ছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলনের অংশ।
সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান পরবর্তীতে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে প্রতিষ্ঠালগ্নের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল বলে স্থানীয়ভাবে তাঁকে স্মরণ করা হয়।
শিক্ষার উন্নয়নে নিবেদিত এক প্রজন্মের প্রতিনিধি
শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে একটি সময় ছিল, যখন সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে স্থানীয় শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান সেই প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি।
‘Proud of Sreemangal’-এর পোস্টে বলা হয়, শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তৎকালীন অগ্রজদের কাছে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদরা ছিলেন ‘আশার’ মতো। তাঁদের চিন্তা, উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষার পথকে সুগম করেছে—এমন মূল্যায়নও উঠে এসেছে ওই পোস্টে।
একজন শিক্ষকের প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখানো, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা এবং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাও একজন শিক্ষকের বড় দায়িত্ব। সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের দীর্ঘ শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রশাসনের জীবনকে ঘিরে স্থানীয়দের স্মৃতিতে এমন নানা দিকের কথা উঠে আসে।
মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ততা
শিক্ষকতার পাশাপাশি সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ‘Proud of Sreemangal’-এর ওই পোস্টে। সেখানে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালনকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, মানুষকে সংগঠিত করা এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় ইতিহাসেও সেই সময়ের নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের ক্ষেত্রেও শিক্ষকতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয় সূত্র ও স্মৃতিচারণে উঠে আসে।
শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরেও প্রভাব
শ্রীমঙ্গলের সামাজিক বিকাশকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বের অবদান পুরোপুরি বোঝা যাবে না। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড—বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
‘Proud of Sreemangal’-এর পাঁচ বছর আগের পোস্টে বলা হয়েছিল, শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা-চেতনা ও কর্মতৎপরতা ইতিহাসে অনন্য মাইলফলক।
এই মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে মূলত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানকে কেবল একজন সাবেক অধ্যক্ষ হিসেবে নয়, বরং শ্রীমঙ্গলের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের একজন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়।
মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী মানসিকতার প্রতি আস্থা
সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে পরিচিতদের মধ্যে তাঁর মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী মানসিকতার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর আত্মীয়তার সূত্রে সম্পর্কিত এবং রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁকে একজন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় আদর্শিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন।
কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের মূল্যায়নে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান একজন ‘মহান জ্ঞানতাপস’, মুক্তচিন্তার মানুষ এবং যুক্তিবাদী দার্শনিকসুলভ ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক মতাদর্শ, নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন মূলত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব অভিমত; তাই সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের সামগ্রিক জীবন ও অবদান মূল্যায়নে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় ইতিহাসের অন্যান্য তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
‘আপনাদের কাছে আমরা লজ্জিত’—পাঁচ বছর আগের পোস্টে আক্ষেপ
‘Proud of Sreemangal’-এর পোস্টটির সবচেয়ে আবেগঘন অংশ ছিল বর্তমান প্রজন্মের প্রতি এক ধরনের দায়বোধ ও আত্মসমালোচনার প্রকাশ। সেখানে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের মতো প্রবীণদের উদ্দেশে বলা হয়েছিল—তাঁদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারায় বর্তমান প্রজন্ম যেন তাঁদের কাছে ঋণী ও লজ্জিত।
পোস্টে বলা হয়, তাঁদের কর্মকাণ্ডের ‘ঢেকে রাখা ফুলঝুড়ি’ প্রজন্মের কাছে উন্মোচনের অঙ্গীকার রয়েছে।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল একজন শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় ইতিহাসের নেপথ্যের মানুষদের অবদান সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে।
একটি অঞ্চলের ইতিহাস শুধু বড় রাজনৈতিক ঘটনা, সরকারি নথি কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার সাল দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। সেই ইতিহাসের পেছনে থাকা শিক্ষক, সংগঠক, সমাজকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী ও চিন্তাবিদদের জীবন ও কর্মও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অবদান লিখিতভাবে সংরক্ষণ না করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক তথ্য হারিয়ে যেতে পারে।
প্রজন্মের কাছে একজন শিক্ষাগুরুর উত্তরাধিকার
সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের দীর্ঘ জীবন ও কর্মের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত তাঁর শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষক অবসর নিলেও তাঁর শিক্ষার্থীদের জীবনে তাঁর প্রভাব থেকে যায় বহু বছর।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন, প্রশাসনিক কাঠামো কিংবা পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের দেওয়া মূল্যবোধ, চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক শিক্ষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
এই কারণেই একজন শিক্ষাবিদের মূল্যায়ন শুধু তিনি কত বছর শিক্ষকতা করেছেন কিংবা কোন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন—এ দিয়ে শেষ করা যায় না। তাঁর শিক্ষার্থীরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের চিন্তাজগতে শিক্ষক হিসেবে তিনি কতটা প্রভাব ফেলেছেন এবং স্থানীয় সমাজে তাঁর অবদান কতটা স্থায়ী হয়েছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
অবসরেও শ্রীমঙ্গলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক
কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষ হলেও শ্রীমঙ্গলের সঙ্গে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের সম্পর্ক শেষ হয়নি। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়িতে অবসরকালীন জীবনযাপন করছেন বলে ওই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে উল্লেখ করা হয়।
একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদের জন্য অবসর মানেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। তাঁর অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও জীবনদর্শন নতুন প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নের ইতিহাস, স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষী হিসেবে তাঁর স্মৃতিচারণ ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য মূল্যবান হতে পারে।
প্রয়োজন জীবন ও কর্মের প্রামাণ্য সংরক্ষণ
সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের মতো প্রবীণ শিক্ষাবিদদের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্য সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ, পুরোনো নথি, ছবি, শিক্ষার্থীদের বক্তব্য এবং সহকর্মীদের সাক্ষ্য সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও এর প্রাথমিক পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য ইতিহাস তৈরি করা হলে স্থানীয় শিক্ষা-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সংরক্ষিত হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট কোনো ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ জীবনী বা ইতিহাসের বিকল্প নয়। তবে অনেক সময় এমন পোস্টই বিস্মৃতপ্রায় ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের অবদানের প্রতি নতুন করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানকে নিয়ে পাঁচ বছর আগে প্রকাশিত ‘Proud of Sreemangal’-এর পোস্টটিও সেই অর্থে একটি স্মরণযোগ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শ্রদ্ধা ও শুভকামনা
শিক্ষা ও সমাজের জন্য দীর্ঘ সময় কাজ করা একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ হিসেবে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের প্রতি শ্রীমঙ্গলের মানুষের শ্রদ্ধা তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম স্বীকৃতি। তাঁর মতো ব্যক্তিত্বদের অবদানকে শুধু স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রামাণ্যভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্থানীয় ইতিহাসের শেকড় সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবে।
পাঁচ বছর আগে ‘Proud of Sreemangal’ তাঁদের পোস্টের শেষে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের সুস্থতা ও দীর্ঘ জীবনের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিল। আজও সেই শুভকামনাই প্রাসঙ্গিক—তিনি যেন সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপন করেন এবং তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি শ্রীমঙ্গলের নতুন প্রজন্মকে আরও সমৃদ্ধ করে।
শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা ও সামাজিক ইতিহাসে সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের মতো অগ্রজদের অবদান স্মরণ, মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ করা শুধু তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়; এটি নিজেদের ইতিহাসের প্রতিও দায়বদ্ধতা।
শ্রীমঙ্গলের সবুজ বুকে জ্ঞানের যে দীপ জ্বলে,
তারই আলো ছড়িয়ে আছে প্রজন্মেরই কোলে।
যে পথ ধরে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন হলো সত্য,
সেই ইতিহাসে অগ্রজ তুমি—শ্রদ্ধার এক নিত্য।
শিক্ষাঙ্গনের প্রভাতবেলায় হাতে ছিল আলো,
অন্ধকারে পথ দেখিয়ে করেছ জীবন ভালো।
শ্রেণিকক্ষে শুধু পাঠের সীমা ছিল না তোমার,
যুক্তিবোধে জাগিয়ে দিতে চেয়েছ চেতনার দ্বার।
মুক্তচিন্তার নির্মল হাওয়া বয়ে গেছে মনে,
প্রশ্ন করতে শিখিয়েছ যে সত্যেরই সন্ধানে।
জ্ঞান যেখানে কুসংস্কারের শৃঙ্খল ভাঙে ধীরে,
সেখানেই তো শিক্ষকেরা দাঁড়ান দীপশিখা নিয়ে।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ—স্বপ্নের সেই ঘর,
যাঁদের শ্রমে গড়ে উঠল, তুমি তাদেরই পর।
প্রতিষ্ঠার সেই প্রভাতদিন, স্মৃতির পাতায় লেখা,
তোমার মতো অগ্রজদের ত্যাগে হলো দেখা।
ভারপ্রাপ্তের গুরুদায়, অধ্যক্ষের আসন,
দায়িত্ব নিয়ে গড়েছ তুমি শিক্ষার পরিবেশ।
প্রতিষ্ঠানের ইট-পাথরে শুধু নয় যে কীর্তি,
মানুষ গড়ার সাধনাতেই শিক্ষকের মহিমা কীর্তি।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনে জেগেছিল যে দেশ,
মানুষ তখন স্বপ্ন বুনে, ভাঙে ভয়ের আবেশ।
সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রান্তে,
তোমারও ছিল কর্মতৎপরতা মানুষেরই কান্তে।
সাহিত্য আর সংস্কৃতিরও বিস্তৃত পরিসরে,
চিন্তার বীজ বুনে গেছ মানুষেরই অন্তরে।
সমাজজীবন, শিক্ষাঙ্গন—সবখানেতে ছাপ,
তোমার কর্মের স্মৃতিগুলো আজও অমলিন মাপ।
কত শিক্ষার্থী আজকে দেশের নানা প্রান্তজুড়ে,
জীবন গড়ে চলেছে তারা তোমার পাঠটি ধরে।
তাদের মাঝে বেঁচে আছো—এই তো বড় জয়,
শিক্ষকের যে সত্য উত্তরাধিকার, হারায় না সে ক্ষয়।
পাঁচটি বছর আগে যখন উঠল স্মৃতির বাণী,
‘প্রাউড অব শ্রীমঙ্গল’ তুলে ধরল তোমার কাহিনি।
ভুলে যাওয়া অগ্রজদের স্মরণ করার তরে,
ঋণী আমরা—এই বোধটি জাগল মানুষের ঘরে।
“আপনাদের কাছে আমরা লজ্জিত”—সে যে আক্ষেপবাণী,
প্রজন্মের দায় মনে করায়, হৃদয় করে খানিকখানি।
ঢেকে রাখা ফুলঝুড়িগুলো খুলে দেওয়ার ডাক,
ইতিহাসের বিস্মৃত পাতায় ফিরুক আলোর ঝলক।
ইতিহাস তো শুধু নয় যে তারিখ, যুদ্ধ, রাজা,
নেপথ্যেরও মানুষ থাকে—তাঁদের জীবন সাজা।
শিক্ষক, সংগঠক, চিন্তক—সমাজ গড়ার কারিগর,
তাঁদের ছাড়া অসম্পূর্ণ আমাদেরই ইতিহাসের ঘর।
আজ অবসরের নীরবতায় নিজের ঘরের পাশে,
স্মৃতিরা সব ফিরে আসে পুরোনো দিনের আশে।
কলেজটির প্রথম দিনের কত কথা যে মনে,
শ্রীমঙ্গলের কত প্রভাত জেগে আছে ক্ষণে ক্ষণে।
তোমার কাছে সময় যেন ইতিহাসেরই খাতা,
কত মুখের স্মৃতি সেখানে, কত দিনের কথা।
নতুন প্রজন্ম শুনুক এসে সেই অভিজ্ঞতার বাণী,
তোমার স্মৃতির ভাণ্ডার হোক আগামী দিনের খনি।
পুরোনো ছবি, নথি, কথা—সংরক্ষণ হোক,
সহকর্মীর স্মৃতিচারণ ভবিষ্যতের লোক।
শিক্ষার্থীদের সাক্ষ্য নিয়ে লিখুক সময়কাল,
শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা-ইতিহাস পাক প্রামাণ্য রূপের জাল।
কারণ যারা পথ দেখায়, তারা থাকে না চিরকাল,
তাদের রেখে যাওয়া আলোই করে পথ উজ্জ্বল।
মানুষ চলে, কর্ম থাকে, থাকে তারই দান,
সত্যিকারের শিক্ষকেরা অমর কর্মে প্রাণ।
সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান—নামটি তাই শুধু নাম নয়,
শ্রীমঙ্গলের স্মৃতিপটে এক দীপ্ত পরিচয়।
শিক্ষাগুরু, অগ্রপথিক, জ্ঞানের সাধক তুমি,
তোমার কাছে প্রণাম জানায় এই জনপদের ভূমি।
সুস্থ থেকো, দীর্ঘজীবী হও—এই আমাদের প্রার্থনা,
তোমার স্মৃতির আলোয় জাগুক আগামী দিনের চেতনা।
যে শ্রীমঙ্গল তোমার হাতে পেয়েছিল শিক্ষার দিশা,
তারই বুকে বেঁচে থাকুক তোমার স্বপ্ন, তোমার আশা।
অগ্রজদের স্মরণ করা নিজেদেরই দায়,
শেকড় ভুলে কোনো জাতি সামনে এগোতে চায়?
তাই তো আজ ইতিহাসের পাতায় লিখি শ্রদ্ধার গান—
শিক্ষাগুরুর কর্মময় জীবন হোক চির অম্লান।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি